আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩১

সম্পাদকীয়

মউ মেলা


শীত যাই যাই। বসন্তের উঁকিঝুঁকি। মেলা-মচ্ছব-পালা-পার্বন ইত্যকার যাবতীয় উৎসবের এটাই তো আদর্শ মরশুম। পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গঞ্জে, শহরে শহরতলীতে বছর বছর তো এমনটাই হয়ে থাকে। বঙ্গীয় সমাজের এটাই দস্তুর। কাজেই রাজ্য সরকারকেও প্রতি বছর এমন একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়। আসলে না, করলেই নয়। সরকার তো আর সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো নৈর্ব্যক্তিক প্রতিষ্ঠান নয়। আর সরকারি স্তরে এমন অনুষ্ঠান আয়োজিত হলে তার তো একটা ডাকসাইটে নাম দিতে হয়। কাজেই ঘটা করে তার নাম দেওয়া হয়েছে - 'বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট' সংক্ষেপে বিজিবিএস।

এবারও ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিজিবিএস-এর আসর বসেছিল। দেশবিদেশের খ্যাতনামা শিল্পপতি, রাষ্ট্রদূত এবং অবশ্যই রাজ্য সরকারের মন্ত্রী-সান্ত্রিরা অনুষ্ঠানস্থলের মসৃণ মেঝের উপর অবাধে বিচরণ করলেন। এমন অনুষ্ঠানের মধ্যমণি নিশ্চিতরূপে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। এটি ছিল বিজিবিএস-এর অষ্টম সংস্করণ।

বিজিবিএস-এর সমাপ্তি লগ্নে (৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫) মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে ৪ লক্ষ ৪০ হাজার ৫৯৫ কোটির বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। প্রচুর নতুন প্রকল্প বাংলায় হবে। অশোকনগরে দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে তেল উৎপাদন শুরু হবে। তিনি আরও জানিয়েছেন যে এই সম্মেলনে ২১২টি মউ (মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং, সংক্ষেপে মউ) স্বাক্ষর হয়েছে। "গত সাত বারে ১৯ লক্ষ কোটি বিনিয়োগ হয়েছিল। যার মধ্যে ১৩ লক্ষ কোটির কাজ হয়েছে। গতকাল প্রচুর বিনিয়োগ হয়েছে। শুধু মুকেশ আম্বানিই একা অনেক বিনিয়োগ করেছেন। আবার করবেন আমাকে একান্ত বৈঠকে বলেছেন। সজ্জন জিন্দালও জানিয়েছেন। আমি খুশি যে ৪ লক্ষ ৪০ হাজার ৫৯৫ কোটির প্রস্তাব এল। এছাড়া আরও বিনিয়োগ আসছে।"

পশ্চিমবঙ্গের জন্য নিঃসন্দেহে সুসংবাদ। শুধু একটাই প্রশ্ন গত সাতবারে যে ১৯ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের মউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল যার মধ্যে ১৩ লক্ষ কোটি টাকার কাজ হয়েছে বলে দাবি করা হল সেগুলি কবে কখন কোথায় স্থাপিত হয়েছে? কবে সেগুলির শিলান্যাস হল আর কবে সেগুলির উদ্বোধন হল? গত প্রায় দেড় দশকে এই রাজ্যের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল সবকিছুই একজনের হাতের ছোঁয়া ছাড়া কাজ শুরু করতে পারে না। সমস্ত বিষয় জনগণের জ্ঞাতার্থে সংবাদপত্রে পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হয়। ১৩ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়ে গেল অথচ তার কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হল না। বিস্ময়কর বিষয়।

রাজ্যের মানুষ এখন এইসব মউ স্বাক্ষর নিয়ে আদৌ আলাপ আলোচনা তো দূরের কথা হাসিঠাট্টা করতেও রাজি নয়। তবে তাজপুরের গভীর সমুদ্র বন্দর সংক্রান্ত প্রস্তাবটি সন্তর্পণে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি কিন্তু পরিকাঠামো বিশেষত বন্দর বিশেষজ্ঞদের নজর এড়ায়নি। বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই বলে আসছিলেন যে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য সমুদ্রের বুকে যে গভীরতা দরকার তা তাজপুরে দুষ্প্রাপ্য। আরও বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছিল যে তাজপুর থেকে একশো কিলোমিটারের মধ্যেই এক দিকে হলদিয়া, অন্য দিকে ওড়িশার ধামরা বন্দর রয়েছে। ধামরা থেকে সামান্য পশ্চিমে রয়েছে পারাদ্বীপ গভীর সমুদ্র বন্দর। পারাদ্বীপ আদতে সরকারি বন্দর। ধামরা নির্মাণ করেছিল টাটা গোষ্ঠী। ঘটনাক্রমে বর্তমানে দুটি বন্দরের পরিচালনার দায়িত্বে এখন রয়েছে আদানি গোষ্ঠী। সেই গোষ্ঠীই কেন একটা সম্পূর্ণ নতুন বন্দর তাজপুরে গড়ে তুলতে চাইছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।

কিন্তু তিনি তো যুক্তি ও প্রযুক্তির পরোয়া করেন না। ২০১৯-এ দিঘায় শিল্প সম্মেলন থেকে তাজপুর বন্দরের শিলান্যাস করে দিলেন। ২০২২ সালে আদানি গোষ্ঠীকে এই সংক্রান্ত আগ্রহপত্র দেওয়া হয়। ২৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল। শঙ্করপুরে ‘সাইট অফিস’ খোলা হয়। তার পরে আর কাজ এগোয়নি। এ বার 'বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন'-এ তাজপুর বন্দর নিয়ে উচ্চবাচ্য হয়নি। বাজেটেও উহ্য থেকেছে তাজপুর। তবে তাজপুরের কুমীর ছানার গল্প শুনিয়ে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে পূর্ব মেদিনীপুরে বেশ কিছু আসনে তাঁর দল জয়ী হয়।

বিজিবিএস-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার অশোকনগরের ওএনজিসি প্রকল্প। ২০১৮-র ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের মন্ত্রীর উপস্থিতিতে ওএনজিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে অবিলম্বে অশোকনগর প্রকল্প থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম উত্তোলন করা যেতে পারে। মন্ত্রীমশাই আরও জানিয়েছিলেন যে প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমির বিষয়ে তিনি রাজ্য সরকারের সঙ্গে অতি দ্রুত যোগাযোগ করবেন। তারপর দু’ দুটি লোকসভা নির্বাচন হয়েছে। হয়েছে একটি বিধানসভা নির্বাচন। অশোকনগর প্রকল্প নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়নি। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে কোনো আন্দোলন গড়ে তোলেনি।

বিজিবিএস-এর অষ্টম সংস্করণের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন যে উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে তেল উত্তোলন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় ১৫ একর জমি ওএনজিসি-কে দিয়েছে রাজ্য। সেই প্রকল্পে রাজ্যের তরফে জরুরি ‘পেট্রলিয়াম মাইনিং লিজ়’ ওএনজিসি-কে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস, এই প্রকল্পে সব ধরনের সহযোগিতা করবে রাজ্য। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্র-রাজ্যের চাপানউতোর চলছিল। কেন প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দিতে দেরি করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজ্যকে চিঠিও দিয়েছিল কেন্দ্র।

অশোকনগরে তেল উত্তোলন প্রকল্প চালু হলে তা নিশ্চয়ই রাজ্যের জন্য একটি শুভ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। তা সত্ত্বেও ধোঁয়াশা কাটছে না। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ১৫ একর জমি দেওয়া হয়েছে। মাত্র ছ’ দিন পর বিধানসভায় বাজেট পেশ করার সময় অর্থ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বলেছেন, - “...রাজ্য সরকার অশোকনগর, হাবরা, উত্তর চব্বিশ পরগনায় তেল ও গ্যাস আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে ব্লক WB-ONN-২০০৫/৪ ব্লকে ৯৯.০৬ স্কোয়ার কিলোমিটার এলাকায় অশোকনগর ফিল্ডে পেট্রোলিয়াম মাইনিং লিজের জন্য ONGC-এর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।...”

হিসেব মিলছে না। ১৫ একর না ৯৯.০৬ ‘স্কোয়ার কিলোমিটার’ কোনটি সঠিক? ১৫ একর অঙ্কের হিসেবে মাত্র ০.০৬০৭০২৮ ‘স্কোয়ার কিলোমিটার’। ৯৯.০৬ ‘স্কোয়ার কিলোমিটার’ হল ২৪৪৭৮.২৫৯ একর। মনে পড়ে, মাত্র ৪০০ একর জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করে একজন নেত্রী নাকি ২৬ দিন ধরে অবস্থান-অনশন ও আরও কী কী যেন করেছিলেন।

অশোকনগরের প্রকল্প সংক্রান্ত আরও একটি বিষয় নজরে আসছে। আম্বানী গোষ্ঠী নাকি পশ্চিমবঙ্গে ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চায়। আম্বানী গোষ্ঠীর (রিলায়েন্স) তেল ও গ্যাস উত্তোলনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আছে। কৃষ্ণা-গোদাবরী উপত্যকায় রিলায়েন্স দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে। এছাড়া গুজরাটের জামনগরে রয়েছে রিলায়েন্স-এর পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে সারা দেশে ছড়িয়ে আছে রিলায়েন্স-এর নিজস্ব পেট্রোল-ডিজেল বিক্রির বন্দোবস্ত যা চলতি ভাষায় পেট্রোল পাম্প বা পেট্রোল স্টেশন নামে পরিচিত।

সরকারি সংস্থা ওএনজিসি দুই দশক ধরে সমীক্ষা করে অশোকনগরে সাফল্য পেয়েছে। দেশের বহু জায়গায় ওএনজিসি বহুদিন ধরেই তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করে চলেছে। বিদেশেও সংস্থাটির সুখ্যাতি রয়েছে। অশোকনগরের দায়িত্ব ওএনজিসি-রই পাওয়া উচিত। কিন্তু গত কয়েক বছরের বি-রাষ্ট্রীয়করণের কালানুক্রমিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে আশঙ্কা হয় শেষ পর্যন্ত ওএনজিসি-র সময়-শ্রম-অর্থের বিনিময়ে অর্জিত সাফল্য বি-রাষ্ট্রীয়করণের নামে বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হবে না তো! তা হলে মেনে নিতে হবে এবারের মউ মেলায় শেষ পর্যন্ত রাজ্যের প্রাপ্তি রিলায়েন্স।