আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা ● ১-১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ● ১৬-৩০ মাঘ, ১৪৩১

প্রবন্ধ

দাবানল

অমিয় দেব


মার্কিনদেশে ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রমান্বিত দাবানলের খবর পড়তে পড়তে [এক্ষুনি শুনলাম আমার প্রয়াত বন্ধু দীপক মজুমদার (এখন আশির কাছাকাছি) ও ক্যারল শার্বনো-র ছেলে জীয়নের বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে - সেই জীয়ন যাকে আমি শেষ দেখেছি চার দশকেরও বেশি আগে (ও এখন পঞ্চাশ মতো)] - আমার ছেলেবেলার এক স্মৃতি জেগে উঠল। আছি সিলেট শহরে - অবিভক্ত ভারতের অসম প্রদেশভুক্ত সিলেট-জেলার সদর। উত্তরে খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড় - এখনকার মেঘালয়ের দক্ষিণাংশ - যার সদর শিলং, ‘হিল স্টেশন’। সিলেট থেকে উত্তরে তাকালে ওই পাহাড়ের ঈষৎ আভাস মেলে। তারই ঢালুতে দেখা গেল একদিন আগুন জ্বলছে। জ্বলতেই থাকল পরপর বেশ কিছুদিন। সুদূর হলেও এক ভয়ংকর দৃশ্য। শুনলাম এরই নাম ‘দাবানল’ - দাব (বন) + অনল (আগুন)। অনেক পরে মহাভারতে পেলাম ‘দাবাগ্নি’। বলছি ‘আশ্রমবাসিক পর্ব’স্থ এক শেষ অধ্যায়ের কথা যাতে বনবাসী ও ইন্দ্রিয়নিরোধী ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তীর - ধৃতরাষ্ট্র বায়ুভুক, গান্ধারী বারিভুক ও কুন্তী মাসভর উপবাসী - এক ঈদৃশ আগুনে মৃত্যুর ঘটনা স্বয়ং শুনে এসে যুধিষ্ঠিরকে শোনাচ্ছেন নারদ। আসলে, এই ক্যালিফোর্নিয়ার নাছোড়বান্দা দাবানল শুধু ওই বাল্যস্মৃতিই জাগিয়ে দেয়নি, মহাভারতের এই তিন দহনের গল্পও মনে করিয়ে দিয়েছিল। যুগপৎ।

ধৃতরাষ্ট্রদের সঙ্গে ছিলেন সূত সঞ্জয়ও। তাঁকে আত্মরক্ষা করতে বলে ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তীসহ, দগ্ধ হবার মানসে উপবেশন করেন। তাঁদের আত্মবৃত এই দহন-শেষে সঞ্জয় হিমালয় যাত্রা করেন। নারদের বয়ে আনা এই সংবাদ শুনে শোকের অবধি রইল না যুধিষ্ঠিরের। ধিক্কারে ভরে উঠল মন। বানপ্রস্থ-আশ্রম না হয় মানা গিয়েছিল - যদিও মাতা কুন্তীর ক্ষেত্রে হয়তো ততটা নয় - তাই বলে এমন মৃত্যু? এমন অপবিত্র আগুনে? কী মানে আছে তবে জীবনের! ধিক্কার জানালেন অগ্নিদেবকে যাঁর অনুরোধে তাঁকে খাণ্ডব দাহন করতে দিয়েছিলেন অজেয়ধন্বা অর্জুন - সেই অর্জুনের মা-কে তিনি অমনভাবে পোড়ালেন?

কিন্তু না, ওই দাবাগ্নি অপবিত্র ছিল না, বললেন নারদ। তার উৎস ছিল, তিনি জেনে এসেছেন, বনে ফিরে এসে তদভিপ্রায়ে সদ্য প্রজ্জ্বলিত যে-পূত যজ্ঞাগ্নি অর্চনা করে চলে যান বায়ুভুক ধৃতরাষ্ট্র, এবং যা, তৎপর, সেই যজ্ঞাগ্নি প্রজ্জ্বালক তাপসেরা বনে ছড়িয়ে দিয়ে প্রস্থান করেন, সেই আগুন। হাওয়া উঠে তা-ই ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ, তাঁর আপন যজ্ঞাগ্নিতেই দহন ঘটেছিল ধৃতরাষ্ট্রের, ও সেইসঙ্গে গান্ধারীর, ও সেইসঙ্গে কুন্তীর। এর জন্য সাক্ষী মানেন নারদ গঙ্গাতীরবর্তী মুনীদের যাঁরা স্বচক্ষে এই অগ্নিসঞ্চরণ দেখেছেন।

‘যাহা নাই মহাভারতে তাহা নাই ভারতে’ বোধকরি এক প্রবচন মাত্র নয়। দাবানলের ইতিহাস ভারতেও নিতান্ত অপ্রাচীন নয়। বলা তো হয় তা লক্ষ লক্ষ বছর ব্যাপ্ত। তাছাড়া, মহাভারত যে মহাভারত মনে রাখে তার নজির এখানে দেখি যুধিষ্ঠিরের শোকে। ‘ধিক অগ্নি’, তিনি বলছেনঃ প্রসঙ্গ খাণ্ডবদাহন। কিন্তু যা আমরা লক্ষ না করে পারি না তা ‘দাবাগ্নি’র এই আগুনের দেবত্ব। যজ্ঞাগ্নিতে যেমন তিনি আছেন তেমনি আছেন দাবাগ্নিতেও। তার মানে কি, আমরা মহাভারত থেকে বেরিয়ে এসে বলব, খাণ্ডবদাহনও এক দাবাগ্নি? ঠিক দাবাগ্নি না বললেও খাণ্ডবদাহন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মরাঠি-ইংরেজি দ্বিভাষিক কবি অরুণ কোলটকর। অমন এক সমৃদ্ধ বন ছাই হয়ে গেল! মৃত্যু হল কত প্রাণীর! আর তা কিনা কৃষ্ণার্জুনের বীরত্ব ফলিয়ে! বস্তুত, যে-সর্পসত্রে বসে বৈশম্পায়ন জনমেজয়কে ব্যাসকৃত 'মহাভারত' শোনাচ্ছেন সেই অগ্নি নিয়েও প্রশ্ন অরুণ কোলটকরের। অগ্নি বুঝি শুধু পোড়াবেনই? (তাহলে, আরও প্রশ্ন, কোথায় তাঁর ঋগ্বেদ-উক্ত পৌরোহিত্য?) আসলে দৈবের স্থলে এখানে মানুষী পৌরোহিত্য ক্রিয়া করছে। একমাত্র জরৎকারু ঋষির ঔরসজাত সর্পিনী জরৎকারুর পুত্র আস্তীকই এই প্রতিহিংসাজনিত সর্পদহন (দাবাগ্নি কথাটা উহ্য রইল) থামাতে পারেন। তবে আস্তিকের এই ভূমিকা তো মহাভারতেরই। দুই-ই আছে মহাভারতে, যেমন প্রতিহিংসা তেমনি তার নিষ্পত্তিও।

কিন্তু আগুনের তো এক নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসও আছে। আগুন সম্ভবত আবিষ্কার, প্রকৃতিতে তা ঘটতে দেখে আদিম মানুষ তা জ্বালতে শেখে। তার মানে, প্রকৃতিজাত দাবানলও সে দেখে থাকবে, কারণ দাবানলের ইতিহাস প্রাচীনতর। বৃক্ষর সাথে বৃক্ষের ঘর্ষণে বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বৃক্ষ বা গুল্মের আগুন হাওয়ায় ছড়িয়ে যাচ্ছে, তাও সেই আদিম মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকবে। কখন মানুষও সেই আগুনে ইতিউতি ইন্ধন জোগাতে শুরু করল, তা বলতে পারবেন নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিকেরা। দাবানলের বহর বিপুল ও ক্রমবর্ধমান, এবং কালক্ষেপ বিস্তৃত। ফলে তা বন পুড়িয়ে সংলগ্ন গ্রামে-শহরেও ঢুকে পড়তে পারে। বস্তুত, কোথাও আগুন লাগলে তার দাবানল-সদৃশ হয়ে উঠবার আশঙ্কা থেকে যায়। অথচ আগুন আমাদের নিত্যদিনের গার্হস্থ্য নির্ভর, আগুন ছাড়া আমাদের চলে না। জলের মতোই। রাসবিহারী এভিনিউতে একসময় দেখেছি, দোকানিরা দোকানের ঝাঁপ দেবার সময় আগুন ছুঁইয়ে দিত, বুঝি আগুনই পাহারা দেবে রাতভর। আজও যদি কোনো গৃহস্থ বাড়িতে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে ‘সন্ধ্যে দেওয়া’ হয়, অবাক হব না। আবার অবাক হব না যদি সকালে সে-বাড়ির সদর খোলে জলের ছিটে সহযোগে। লিখছি, আর আমার স্মৃতি ফুঁড়ে গুনগুনিয়ে উঠছে ধনঞ্জয় বৈরাগীর "আগুন, আমার ভাই,/ আমি তোমারি জয় গাই।" ‘মুক্তধারা’য়। আগেকার ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকেও। তবে এই আগুন অভিপ্রেত ভাঙনেরঃ "তোমার শিকল-ভাঙা এমন রাঙা/ মূর্তি দেখি নাই।" কোনো দাবানলের বীজ এতে নেই, আছে মুক্তির। আর বৈরাগী, সত্যসন্ধ, তো এতে এক অন্তিম মুক্তিরই ভবিষ্যৎ ভণবে।

নারদ শোক পরিহার করতে বললেন যুধিষ্ঠিরকে কেননা ধৃতরাষ্টেরা তদীয় যজ্ঞাগ্নিসম্ভূত দাবাগ্নিতে পুড়ে ‘পরমা গতি’ পেয়েছেন। কিন্তু যজ্ঞাগ্নি প্রজ্জ্বালক তাপসেরা যদি সেই আগুন ছড়িয়ে দিয়ে না যেতেন, অর্থাৎ যজ্ঞাগ্নি যথাস্থানেই থাকত, তাহলেও কি দাবাগ্নি জ্বলে উঠত? হ্য়তো উঠত, কেননা ‘হাওয়া’ বইল। হাওয়া ব্যতিরেকে কি কোনো আগুন দাবানল হয়ে উঠতে পারে? অনেক কিছুই তো আমরা পোড়াই, আবর্জনা, ফসল কাটার পর মাঠ থেকে খড় বয়ে এনে পৌষ সংক্রান্তিতে সযত্ননির্মিত বুড়ির ঘর, নাৎসিরা প্রচুর বইও পুড়িয়েছিল - সব কি দাবানল হয় বা হয়েছিল? টমাস মান্‌ কি কাফকার আগুন কি কোনো দাবানল হয়ে ‘মাইন কাম্‌ফ’ পুড়িয়েছিল? ‘মাইন কাম্‌ফ’-এর ‘রেটরিখ’ বিশ্লেষণ করেছিলেন গত শতকের এক প্রখ্যাত বৈয়াকরণ, কেনেথ বার্ক। তাতে বুঝতে সুবিধে হয় কোন গোঁজামিলে ফুয়েরার ফুয়েরার হয়ে উঠেছিলেন।

দাবানল বিধ্বংসী, তার কোনো দয়ামায়া নেই। ভূমিকম্প হলে মানুষ বেরিয়ে পড়ে, কিন্তু তীব্রতার তারতম্যে তার ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। সেও তার তলায় চাপা পড়ে। দাবানলে? আগুন তাকে ছোঁবার আগেই হয়তো মানুষ পালায়, কিন্তু তার বাড়িঘর? জীয়নকে কী বলে সান্ত্বনা দেব? হেনরি মিলার যে-বাড়িতে থাকতেন তা কি রক্ষা পেয়েছে? আর যাদের ‘সাধারণ লোক’ বলা হয় তাদের কী দশা হয়? দাবানল তাড়িত আশ্রয়শিবির? সারণি যাঁরা তৈরি করেন তাঁরা বলবেন কোন দাবানল কত পুড়িয়েছে। শুধু মানুষ ও তার বাড়িঘর নয়, পশুপাখি, বৃক্ষরাজি, গুল্মবিস্তার, মাটি। দাবানলের লেলিহান শিখা যাঁরা কাছে থেকে দেখেছেন তাঁদের এক সারসত্য জানা হয়ে গেছে জীবনের। একবার এক শ্মশানের দুয়ার খোলার সঙ্গে সঙ্গে এক শিখা দেখেছিলাম। তার স্মৃতি আজও তাড়িয়ে ফেরে।