আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা ● ১-১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ● ১৬-৩০ মাঘ, ১৪৩১
প্রবন্ধ
গল্প হলেও সত্যি
অশোক সরকার
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানীয় গণতন্ত্রের একটি কোর্সের ক্লাস নিতে এসেছিলেন বিজয় দেতে। বছর ৪৫ বয়স, নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, পর্যাবরন মিত্র (বাংলায় পরিবেশ মিত্র) বলে একটি ছোট্ট এনজিও সংস্থার কর্ণধার। কাহিনীটা অবশ্য তাঁর এনজিও-র নয়, মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুর জেলার গোণ্ডপিপারি তালুক-এর একটি গ্রাম পচগাও-এর কাহিনী। বাংলার পাঠকের জন্য বলে নেওয়া ভাল যে গ্রামাঞ্চলে আমরা যাকে ব্লক বলি, মহারাষ্ট্রে তাকে বলে তালুক। বিজয় এই গ্রামের রূপান্তরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তিনি হিন্দি, ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলতে পারেন তাই তাঁকে ডাকা। ফোনে নিজের পরিচয় দিয়ে আমন্ত্রণ জানাতে বললেন, আমন্ত্রণটা পচগাও গ্রাম সভাকে জানাতে হবে, একটা চিঠি দিয়ে, তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে দুজনকে পাঠাবে, একজন গ্রাম সভা সদস্য আর একজন বিজয় নিজে। গ্রাম সভার সদস্যরা গোন্ডি আর মারাঠি ছাড়া কিছু বলতে পারেন না, তাই তাঁর আসা নয়তো গ্রাম সভার সদস্যরা নিজেরাই আসতেন।
সেই মতো কাজ হল। চিঠি লিখলাম পচগাও গ্রাম সভাকে উদ্দেশ্য করে। এক সপ্তাহ বাদে গ্রাম সভার প্যাডে লেখা উত্তরের স্ক্যান কপি এল। চিঠিতে লেখা ছিল, আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে, তাঁরা জানাচ্ছেন যে বিজয় দেতে আর তাঁর সাথে গ্রাম সভা সদস্য রামজি গোণ্ড আসবেন, ক্লাস নিতে।
গ্রাম সভার প্যাডটি দেখে প্রথম খটকা লাগে, প্যাডে ঠিকানা তো লেখাই আছে, তার সঙ্গে প্যান নম্বর, জিএসটি নম্বরও লেখা আছে। গ্রাম সভার প্যান, জিএসটি নম্বর? এটা কি রহস্য? বিজয়ের ক্লাসে তা ক্রমশ পরিষ্কার হল। বিজয় এই নিয়ে চারবার এসেছেন ক্লাস নিতে, আর তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা হয়েছে অনেকবার, সেই সূত্রে স্পষ্ট হয়েছে পচগাওয়ের কাহিনী।
পচগাওয়ের ২৫২ জনসংখ্যার মধ্যে ১৮০ জন গোণ্ড আদিবাসী, বাকিরা কেউ কুনবি বা মারার (Other Backward Classe) এবং লোহার (Nomadic Tribe) বলে পরিচিত। মাত্র ১০ ভাগ পরিবার কৃষি থেকে কিছু রোজগার করেন, বাকিদের জীবন নির্বাহ জঙ্গল আর পশুপালন নির্ভর। জঙ্গলের উপর সামান্যতম অধিকার তাঁদের নেই। নিস্তার অর্থাৎ সীমাবদ্ধ আকারে হলেও বনজ সম্পদ সংগ্রহের অধিকারও তাঁরা পাননি। বন বিভাগকে ফাঁকি দিয়ে গাছ-পাতা-কাঠ-মূল আর বনৌষধি সংগ্রহ করতে হয়। বন বিভাগ সেকথা জানে, কিছুটা চোখ বন্ধ করে থাকে, আর কিছুটা বীটগার্ডদের পকেট ভরতে হয়। অনেকেই মহারাষ্ট্রের বা কর্ণাটকের নানা জেলায় কাজের খোঁজে চলে যান। হ্যাঁ, ১০০ দিনের কিছু কাজ তাঁরা অনেকেই পেয়ে থাকেন তবে তা বন বিভাগের মর্জি নির্ভর। সেখানে দুর্নীতির কোনো অভাব নেই।
বিজয় দেতে ও তাঁর দুই সঙ্গী ২০০৭ নাগাদ ওই গ্রামে কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ১০০ দিনের কাজ সুনিশ্চিত করা। সেই সময় সবে অরণ্য অধিকার আইন ২০০৬ পাশ হয়েছে। বিজয় আইনের বয়ান পড়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। যে বনসম্পদ চুরি করে সংগ্রহ করতে হয় সেই বনসম্পদ নাকি আসলে গ্রামবাসীদের, সরকার এখন সেই অধিকার স্বীকার করছে। গ্রামবাসীদের বলাতে তাঁরা তো হেসেই কুটিপাটি। একজন বলে উঠেছিলেন, "ইংরেজিতে অনেক মিঠে কথা লেখা থাকে, সেগুলো আসলে সত্যি নয়"। বিজয় এব্যাপারে ভাবা ছেড়ে দেন।
ইতিমধ্যে ২০০৯ সালে মহারাষ্ট্রেই গড়চিরোলি জেলার মেন্ডালেখা গ্রামে দেশের প্রথম সামুদায়িক বন অধিকার দেওয়া হল গ্রামবাসীদের। খবরটা পচগাওতে এসে পৌছতে দেরি হয়নি, কিন্তু গ্রামবাসীদের সে খবরে বিশ্বাস জন্মাতে একটু সময় লেগেছিল। সেই সময়টুকুই অপেক্ষা, ২০০৯ সালেই গ্রামবাসীরা একত্র হয়ে গ্রাম সভার মিটিং করে সামুদায়িক বন অধিকারের দাবিপত্র পেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে সিদ্ধান্ত নিলেই তো হয় না, সামুদায়িক বন অধিকারের দাবি পেশ করতে গেলে অনেক কাগজ লাগে, সে সব জোটানোর কাজে লেগে পড়েন বিজয় ও তাঁর সঙ্গীরা, গ্রামবাসীদের কয়েকজনকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের পরিচয় সংগ্রহ করেন, ঘুরে ঘুরে গ্রামের চিরাচরিত সীমানা নির্ধারণ করেন, গ্রামের বনসম্পদের তালিকা তৈরি করেন, গ্রামবাসীরা যে ওই গ্রামে ২০০৫ সালের আগে থেকে বসবাস করছেন তার সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করেন। বলা দরকার যে গ্রামের চিরাচরিত সীমা বলতে গ্রামের মানুষ তাঁদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে বসতির আশেপাশে জঙ্গলের মধ্যে যতটা যাতায়াত করে, সেটাই চিরাচরিত সীমা, আমাদের পরিচিত ম্যাপে গ্রামের যে সীমা দেখানো হয়, তা জমির খাজনার জন্য করা, জঙ্গলের মধ্যেকার গ্রামের সীমা সেরকম নয়।
পচগাওয়ের জঙ্গল অন্য যে কোনো জঙ্গলের মতোই জীববৈচিত্র্যে ভরপুর, তবে তারই মধ্যে প্রধান হল বাঁশ ঝাড়। এছাড়াও জঙ্গলে আছে হরেক রকম বনৌষধির গাছ, আছে ঝর্ণা, আছে বহু ধরণের পশুপাখি এমনকী বাংলার বাঘও আছে ওই জঙ্গলে। এছাড়া আছে দেওরাই, মানে দেবভূমি, যেখানে আদিবাসীরা তাদের পূজ্য দেবদেবীর ও গাছ-প্রাণীর মূর্তি রেখেছেন। বছরে একবার সেখানে উৎসব হয়। পচগাওয়ের গ্রাম সভা ১৭ ডিসেম্বর, ২০০৯ সালে ১,০৬৮ হেক্টর বনভূমির উপর সামুদায়িক বন অধিকারের দাবি পেশ করে। এই দাবি পেশ করতে হয় সাব ডিভিশনাল স্তরের এক কমিটির কাছে। এক দল গ্রাম সভা সদস্য বিজয়কে সঙ্গে করে গিয়েছিলেন এসডিও অফিসে কাগজপত্র জমা দিতে।
দাবিপত্র পেশ করার পর কিছুদিন সবার বেশ উৎসাহ ছিল। এই বুঝি সামুদায়িক বন অধিকারের কাগজ এসে যায়। কিন্তু কিছুই হয় না, মাস গড়িয়ে বছর গেল কিছুই এল না। গ্রামেরা অধিবাসীরা বলাবলি করতে লাগলেন এটা আসলে কোনো ভাঁওতা নয় তো? মানুষের জীবন তো আর থেমে থাকে না। কিন্তু এপাশ ওপাশ থেকে কখনো কখনো খবর আসে, ওই তো ওই গ্রাম পেয়েছে। ক্রমশ গ্রামের মানুষ বুঝল ঘরে বসে থাকলে কিছু হবে না, মাঠে নামতে হবে। ততদিনে গড়িয়ে গেছে প্রায় তিন বছর।
ইতিমধ্যে অবশ্য বিজয় ও গ্রাম সভার কিছু সক্রিয় সদস্য হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না। মাঝে মাঝেই তাঁরা কর্তৃপক্ষকে স্মরণ করিয়ে চিঠি দিয়েছেন। বলা বাহুল্য তাতে কাজ কিছুই হয়নি। শেষ পর্যন্ত গ্রামের মানুষ একত্র হয়ে ২০১২ সালে সিদ্ধান্ত নেয় যে ১৪ এপ্রিল থেকে প্রতিদিন এক একজন গ্রামবাসী একটা করে বাঁশ কাটবেন, যা তখনও বেআইনি। ১৪ এপ্রিল বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মদিন, নিপীড়িত মানুষের লড়াইয়ের প্রতীক তিনি, তাই তাঁর জন্মদিনই থেকেই শুরু হবে আন্দোলন। এই বার্তা দিয়ে তাঁরা কলেক্টরকে চিঠি দিলেন, সংবাদ মাধ্যমকে জানালেন, রাস্তায় পোস্টার দিলেন। পুলিশ এসেছিল সাবধান করতে। বলেছিল, সবাই গ্রেপ্তার হবে। গ্রামবাসীরা বলেছিল, তারা সত্যাগ্রহী, গ্রেপ্তারিতে তাদের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু তারা একলা গ্রেপ্তার হবে না, বউ বাচ্চা সমেত গ্রামের সবাই গ্রেপ্তার হবে, এমনকী সঙ্গে ঘরের পশুরাও গ্রেপ্তার হবে। কিছুদিন টানাপোড়েন চলে, ক্রমশ পুলিশ বুঝতে পারে যে, গ্রামবাসীরা সত্যিই সিরিয়াস। শেষ পর্যন্ত জেলার এসপি কলেক্টরকে চিঠি দেন একটা কিছু বিহিত করতেই হবে। গ্রামবাসীরা পুলিশকে বলেছিল হয় বন অধিকার দিন নয়তো দাবি প্রত্যাখ্যান করে চিঠি দিন। একটা সিদ্ধান্ত দিতে হবে, তিন বছর হতে চলল, দাবি ফেলে রাখলে চলবে না।
অদ্ভুতভাবে ১৪ এপ্রিল তারিখেই পচগাওয়ের অধিবাসীদের হাতে আসে সেই সামুদায়িক বন অধিকারপত্র যার জন্য তাঁরা প্রায় তিন বছর ধরে অপেক্ষা করছিলেন। সেই দিন থেকে শুরু হয় তাঁদের জীবনের নতুন অধ্যায়। দেশের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সামুদায়িক বন অধিকার ওই কাগজটাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, তাতে বন বিভাগের নাক গলানো, ও অন্যান্য উৎপাত কমেছে কিন্তু জঙ্গলের অধিবাসীদের জীবন যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই আছে, প্রায় কিছুই বদলায়নি।
পচগাও এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এমন এক ব্যতিক্রম যে সারা দেশের কাছে তা এক দৃষ্টান্ত। কাগজ পাবার পরেই প্রশ্ন উঠল এবার তাহলে কী হবে? বিজয় ও তাঁর সঙ্গীরা জানতেন স্বশাসন সবচেয়ে কঠিন। কারণ ব্যক্তি ও সামুদায়িক স্তরে নিজেদের শাসন করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। গ্রাম সভার এক মিটিং ডাকা হয়। তখন সদ্য কাগজ এসেছে, সবাই তখন ভাবছে জঙ্গল আমাদের। এই অবস্থায় গ্রামসভায় প্রশ্ন তোলা হয়, কী করা হবে। ঠিক হল যে স্বশাসনের জন্য সবার কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া হবে। প্রতিটি পরিবারে পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা করে বলতে হবে তারা গ্রাম ও জঙ্গলকে শাসন করার জন্য কী চায়। দেখা গেল সবার কিছু না কিছু মতামত আছে। সবাই চায় বন সংরক্ষণের জন্য কিছু নিয়ম, জঙ্গলের পশুপাখির জন্য ব্যবস্থা, রোজগার বাড়ানোর ব্যবস্থা, বাইরে কাজ করতে যাওয়া কমানো, আর মেয়েদের মুখে এক কথা - পুরুষদের মদ খাওয়া বন্ধ করতে হবে। বনৌষধি বাঁচানোর কথাও মেয়েদের মুখেই বেশি শোনা গেল।
প্রস্তাব অনেক কিন্তু গ্রাম সভাকে তো তা রূপায়ণ করতে হবে! গ্রাম সভায় ঠিক হল যে ৩৫ থেকে ৩৮ জনের একটা 'গ্রাম সভা সেক্রেটারিয়েট' তৈরি করা হবে, যারা গ্রাম সভার পক্ষে সব কাজকর্ম দেখবে, আর নিয়মিত গ্রাম সভাকে রিপোর্ট করবে। তার মধ্যে ৩০ ভাগ মহিলা থাকবে। সব রকম প্রস্তাব থেকে বাছাই করে তারা একটা নিয়মাবলী বানাবে। গ্রামসভার সম্মতি পেলে তা গ্রামের নিয়ম বলে সবাই মেনে নেবে। তখন বন সংরক্ষণ নিয়েই সবাই চিন্তিত। কারণ বন তো বন বিভাগের, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তাদের, অধিবাসীরা চুরি করে বনসম্পদ সংগ্রহ করে, এটাই বহুকালের অভ্যাস। তাই গ্রামসভার বিশেষ চিন্তা ছিল বন অধিকারের নামে যথেচ্ছাচার যাতে না হয়। কয়েকটা নিয়মের কথা বলিঃ
১. গ্রাম সেক্রেটারিয়েট থেকে দুজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি জঙ্গল পাহারা দেবার ডিউটি লিস্ট বানাবে, সবাইকে সেই ডিউটি লিস্ট মেনে জঙ্গল পাহারা দিতে হবে।
২. গরমকালে সকাল ৭টা থেকে ১২টা আর শীতকালে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত জঙ্গল পাহারার ডিউটি হবে। যদি রাতে কাঠকাটা, পশু শিকার বা আগুন লাগার খবর আসে তখন রাত-ডিউটি দেওয়া হবে।
৩. কাঠ চুরির ফাইন হল পায়ে হেঁটে মাথায় নিয়ে কাঠচুরি - ১০০ টাকা, সাইকেলে নিয়ে কাঠচুরি - ৩০০ টাকা, মোটরবাইকে নিয়ে কাঠ চুরি - ৫০০ টাকা। এই টাকা গ্রাম কোষে জমা পড়বে।
৪. গরু ও ছাগল চরানো জুন মাস থেকে শুরু হয়ে এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। গ্রামের সবার গরু একজন আর সবার ছাগল একজন পালা করে চরাতে নিয়ে যাবে। তার জন্য গ্রাম সভা পারমিট ইস্যু করবে। দেওরাই-এর আশেপাশে গরু ছাগল চরবে না।
৫. আশপাশের গ্রামের সঙ্গে বিবাদ হলে গ্রাম সভা ডাকা হবে, সেখানে গ্রামের দুজন বয়স্ক ব্যক্তিকে হাজির থাকতে হবে।
৬. জঙ্গলে কেউ যেতে চাইলে মৌখিকভাবে কারণ দেখিয়ে গ্রাম সেক্রেটারিয়েট থেকে স্লিপ নিতে হবে।
৭. দেওরাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা থেকে একটি পাতাও নেওয়া যাবে না।
এ তো গেল বন সংরক্ষণের কথা। রোজগার বাড়ানোর জন্য তো কিছু করতে হবে। গ্রামবাসীরা জানত যে বনবিভাগ প্রতি বছর বাঁশ কাটে ও কনট্রাক্টরেরা এসে বাঁশ নিয়ে যায়। গ্রামসভায় কথা উঠল যে বনসম্পদ এখন তো আমাদের তাহলে আমরাই বাঁশ কেটে কনট্রাক্টরকে বিক্রি করব না কেন? বিজয় আমাদের জানালেন, বিষয়টা বলা যতটা সহজ করা অনেক কঠিন, কারণ ব্যবসার বিন্দুবিসর্গও কেউ জানত না। বাঁশের গুনমান অনুযায়ী দাম হয়, সেই গুনমান নানা বিষয়ের উপর নির্ভর করে। বাঁশের আড়ত ছিল, তার তদারকি বন বিভাগ করত, সেটার দায়িত্ব নিতে হবে। কনট্রাক্টরদের সঙ্গে দরাদরি করতে হয়, কনট্রাক্টররা একে অপরের সঙ্গে সাঁট করে কম দাম দেয়। তাছাড়া বেচাকেনা করতে গেলে কাগজপত্র লাগবে, হিসাব করতে হবে, জিএসটি রেজিস্ট্রেশন লাগবে, ব্যাঙ্কে খাতা করতে হবে, লেবার পেমেন্ট দিতে হবে, লাভ ক্ষতির হিসাব করতে হবে, গ্রাম সভাকে সব কিছুর হিসাব বোঝাতে হবে।
সবটাই করতে করতে শিখতে হয়েছে। বনবিভাগ থেকে কেউ এসে কিছু শিখিয়ে দেয়নি। বরং প্রথমদিকে নানারকম উৎপাত করেছে। প্রথমত পুরো জঙ্গলটাকে চারটে অঞ্চলে ভাগ করা হল, এক এক বছর এক এক অঞ্চলে বাঁশ কাটা হবে। তাহলে সব অঞ্চলেই বাঁশঝাড় বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। বাঁশ কাটার সময় নভেম্বর থেকে এপ্রিল। জুন থেকে অক্টোবর বর্ষার বাঁশের বেড়ে ওঠার সময়, তখন বাঁশ কাটা যাবে না। বাঁশের গুদাম দেখাশোনা করার জন্য গ্রাম সভা থেকে দুজনকে ঠিক করা হল। তাদের মজুরির ব্যবস্থা হল গ্রাম কোষ থেকে। বাঁশ কাটার মজুরি কী হবে, কত জন কাজ করবে, তারা ক'দিনের মজুরি পাবে এসব গ্রাম সভা থেকে ঠিক করা হল। এমনকী নিলামের দিনও।
বিজয় গল্পটা বলছিলেন আর আমরা চমকে চমকে উঠছিলাম। প্রথম বাঁশ বিক্রির চেষ্টা হয় ২০১৭ সালে। কনট্রাক্টর-রা প্রথমে তো বাঁশ নিতেই চায়নি। অবিশ্বাস্য কম রেট দিয়েছিল।
"আমরা দিইনি, তাই নিয়ে গ্রাম সভায় খুব চেঁচামেচি হয়েছিল, একদল বলেছিল আমাদের দ্বারা এসব হবে না, আরেকদল বলেছিল আমরাই করব। অবশ্য শেষ পর্যন্ত কনট্রাক্টররা মেনে যায়। তবে দু' একবার পেমেন্ট বাকিতে রেখে আমরা ঠকেছি"।
"প্রথমবার বাঁশ বিক্রি করে আমরা ১৬ লাখ টাকা পেয়েছিলাম। গ্রামবাসীরা তো থ! ১৬ লাখ টাকায় ক'টা শূন্য তাই অনেকে জানত না। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে গ্রাম সভা অনেককিছু শিখেছিল। লেবার পেমেন্ট-এর রেজিস্টার তৈরি হল, বিলবই তৈরি হল, ভাউচার, লেজার সব তৈরি করতে হল। তারপর এল জিএসটি। সে এক যন্ত্রণা। কমার্শিয়াল একাউন্টিং কেউ জানত না। গ্রামের একজনকে আমরা ট্রেনিং-এ পাঠালাম, সে কিছুটা কম্পিউটার জানত, শিখে এসে, ক্রমশ জিএসটির হিসেব, ও তার ত্রৈমাসিক হিসেব দাখিল ও অন্যান্য কাজ বুঝে নিল। আজও সে-ই চালাচ্ছে। তাকে গ্রাম সভা মাসে ৮ হাজার টাকা মাইনে দেয়"।
১৬ লাখ টাকা থেকে শুরু হয়ে আজ ফি বছর ৫২ থেকে ৫৩ লাখ টাকার বাঁশ বিক্রি হয়, এই ক’বছরে মোট ৪ কোটি টাকার মতো ব্যবসা হয়েছে। গ্রামসভা সরকারকে জিএসটি দিয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকার মতো। সমস্ত হিসাব কম্পিউটারে করা হয়। আজ লেবারের রেট দৈনিক ৭৫০ টাকা, ১০০ দিনের কাজের মজুরির দ্বিগুণ। গ্রাম সভার একটা ঘর হয়েছে। আড়ত রক্ষক, হিসাব রক্ষক, জঙ্গল পাহারা ও অন্যান্য নানা কাজের জন্য গ্রামসভা দৈনিক ৭৫০ টাকা হারে মজুরি দিয়ে থাকে। গ্রাম সভার রোজগার থেকে রাস্তায় সোলার আলো হয়েছে। যারা বাড়িতে পাকা ছাদ করতে চায়, তাদের গ্রাম সভা বিনা সুদে ঋণ দিচ্ছে। গ্রামে একটা নতুন সরকারি স্কুল হয়েছে। একটা সাদামাটা গেস্ট হাউস হয়েছে। সেখানে নানা জায়গা থেকে এদের কাজ দেখতে আসা অতিথিরা থাকতে পারে। একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা সেখানে থেকে গ্রাম সভায় internship করে। সেখান থেকে গ্রাম সভার কিছু রোজগার হয়। গেস্ট হাউস দেখাশোনার লোক আছে তাকে মজুরি দেওয়া হয়। গত কয়েক বছর ধরে কেউ কাজের খোঁজে বাইরে যায়নি। গ্রাম সভার আয় থেকে একটা ট্রেলার সমেত ট্রাক্টর কেনা হয়েছে। তাতে করে বাঁশ নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া খুব সম্প্রতি বহড়া প্রসেসিং-এর একটা মেশিন এসেছে। এখন তাতে কিছু যুবক-যুবতী ট্রেনিং নিচ্ছে। বাঁশ ছাড়াও টেন্ডু পাতার ব্যবসার সুযোগ ছিল। কিন্তু গ্রাম সভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেন্ডু পাতার ব্যবসা করবে না, কারণ তা বিড়ি শিল্পে ব্যবহার হয় যা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। তেমনি গ্রাম সভা ঘরোয়া হিংসার বিষয়েও কঠোর মনোভাব নিয়েছে, ঘরোয়া হিংসার খবর পেলে তাকে রোজগারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, এমনকী একজনকে সামাজিক বয়কটও করা হয়েছে।
বিজয় ল্যাপটপে গ্রাম সভার সমস্ত হিসেব দেখাচ্ছিলেন। লেবার পেমেন্ট, বাঁশের আড়তের স্টকের হিসেব, বাঁশ বিক্রি করে আয়, প্রতি ত্রৈমাসিকে জিএসটি, ফাইন পেনাল্টি বাবদ আয় ইত্যাদি কত কী! বললেন -
"এখন আমাদের সব হিসেবনিকেশ Tally Software ব্যবহার করে করা হচ্ছে। চন্দ্রপুর জেলা শহর থেকে এক চার্টার্ড আকাউন্টান্ট এসে অডিট করে দেন। তাঁকে আমরা ১৬ হাজার টাকা অডিট ফি দিয়ে থাকি"।
জিজ্ঞেস করেছিলাম, অধিবাসীদের তো অবস্থা বদলালো কিন্তু বন সংরক্ষণ হল কি? গ্রাম সভা সে ব্যাপারেও উদ্যোগ নিয়েছে। জঙ্গলের সবচেয়ে ঘন অংশটায় অনেক প্রজাতির ছোটবড় পশুপাখি আছে এমনকী একাধিক বন্যপ্রাণী আছে। গ্রাম সভায় তিন বছর আগে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, জঙ্গলের সেই অংশটাকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। সেই মতো ৫২ হেক্টর জমিতে গ্রামসভার একটি Wildlife Sanctuary আছে। সেই sanctuary-র কিছু ছবি দেখালেন বিজয়। এছাড়া, 'টাটা ইন্সটিটিউট'-এর সাহায্যে পুরো এলাকার জীববৈচিত্র্য ম্যাপ করা হয়েছে। বনৌষধির গাছগুলি নতুন করে লাগানোর জন্য নার্সারি করা হয়েছে। সেখান থেকে প্ল্যানমাফিক নতুন করে বনৌষধি লাগানো হচ্ছে। বললে আশ্চর্য লাগবে যে ১১ রকমের বনৌষধির গাছ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল, সেগুলি এখন আবার পর্যাপ্ত পরিমাণে ফিরে এসেছে। এছাড়া গ্রামবাসীদের বন পাহারার ফলে জঙ্গলে গাছ কাটা, কাঠ চুরি একেবারে বন্ধ।
জানতে চেয়েছিলাম এই রূপকথার পিছনের রহস্যটি কী? তিনটে বিশেষ কথা বেরিয়ে এল। এক, গ্রাম সভার নেতাবিহীনতা। গ্রামসভা কোনোদিনও কোনো নেতা নির্বাচিত করেনি, সবকিছুই সেক্রেটারিয়েট মিটিং-এ সভাপতি নির্বাচন করে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক এক বার এক এক জন সভাপতি হয়েছে। এর ফলে কোনো নেতার প্রতিপত্তি, প্রভাব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের সুযোগ ঘটেনি। দ্বিতীয়, ভোটাভুটি না করে সহমত যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। এই অভ্যাস তৈরি করতে সময় লেগেছে। এখন পূর্ণ সহমত হয় না, তবে অনেকেই মিটিং-এ বলে "একমত হলাম না কিন্তু কাজটা হোক, করে দেখা যাক কী হয়"। তৃতীয়, টাকা পয়সার স্বচ্ছতা ও গ্রাম সভার দায়বদ্ধতা। রোজগার, মজুরি, পেনাল্টি, ফাইন ইত্যাদির হিসেব গ্রাম সেক্রেটারিয়েট-এ ও গ্রাম সভায় পেশ করা হয় - যে কেউ অফিসঘরে এসে কাগজপত্র দেখতে পারে। এই তিন অভ্যাসের ফলে গ্রামসভা ও তার সেক্রেটারিয়েট-এর বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগত সম্পদের তুলনায় সামুহিক সম্পদের প্রতি নির্ভরতা মানুষকে একত্র হতে সহায়তা করেছে, সহমতে পৌঁছানোর পথ সুগম করেছে। আর অবশ্যই রোজগারের ধারবাহিকতা সামগ্রিকভাবে গ্রামবাসীদের মধ্যে এক বিপুল আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ বোধহয় একেই বলেছিলেন আত্মশক্তি। সামুহিক আত্মশক্তির উদয় হলে কী সম্ভব তার এক বেমিসাল উদাহরণ পচগাও, স্থানীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান যে শুধু সরকারের কল্যাণ বিতরণের এজেন্সি নয়, তা স্থানীয় সম্পদের গণতান্ত্রিক শাসনের এক কাঠামো, সেই কথা মনে করিয়ে দেয় পচগাও।
______________________________
'সামুদায়িক বন অধিকার' ২০০৬ সালের অরণ্য অধিকার আইনের স্বীকৃত একটি অধিকার, যাতে বলা হয়েছে, জঙ্গলের মধ্যে বা জঙ্গলের আশেপাশে অবস্থিত গ্রামের আদিবাসী ও অন্যান্য অধিবাসীরা তাঁদের গ্রামের পারম্পরিক সীমার মধ্যে জঙ্গলের অংশ থেকে যে বনজসম্পদ সংগ্রহ করেন, সেই জমি, জল ও জঙ্গলের উপর তাঁদের পূর্ণ অধিকার আছে। পূর্ণ অধিকার বলতে এখানে 'Elinor Ostrom’s Law' বলে পরিচিত জমি বা অন্য স্থাবর সম্পদের উপর ৬টি প্রতিষ্ঠিত অধিকারের মধ্যে ৫টি অধিকার স্বীকার করা হয়েছে।