আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা ● ১-১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ● ১৬-৩০ মাঘ, ১৪৩১

সম্পাদকীয়

ট্রাম্পনামা


"মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন" - আবার আমেরিকা মহান হবে সংক্ষেপে ‘মাগা’। এই ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগান। আর সেই স্লোগানে ভর করেই দ্বিতীয়বারের জন্য আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকার ইতিহাসে দ্বিতীয়বার একই ব্যক্তি একবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পরাজিত হয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। আর তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরেও রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। কিন্তু বিতর্ক বা আলোচনায় এখানেই ইতি ঘটেনি। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। বিশেষত একাধিক বৃহৎ শিল্পপতি, ইলন মাস্ক থেকে শুরু করে ফেসবুকের মার্ক জুকেরবার্গের উপস্থিতি আমেরিকা তথা বিশ্বের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহেই এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফায় আমেরিকার রাজনীতি যে অন্যখাতে গড়াবে তা সবাই বুঝছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্প যে তার প্রথম দফার কার্যকলাপকেই ছাপিয়ে যাবেন তা সন্দেহাতীত। ইতিহাস সচেতন মানুষ ট্রাম্পের এই 'মাগা' স্লোগানে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন নিশ্চিত। একদা যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানীতেও যুদ্ধফেরত এক পরাজিত সৈনিক এইভাবেই শুরু করেছিল - "জার্মানি আবার মহান হবে"। গোটা বিশ্ব জুড়ে সাড়ে আট কোটি মানুষ তাদের জীবন দিয়ে সেই স্বপ্নের দাম দিয়েছিলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণের পরেই রাষ্ট্রপতি হিসাবে একাধিক আদেশনামা জারি করেছেন। তার মধ্যে একটি হল কড়া অভিবাসন নীতি। তিনি ঘোষণা করেছেন এবার থেকে বেআইনি অভিবাসীদের সন্তানেরা আমেরিকায় জন্ম নিলেও সে দেশের নাগরিকত্ব পাবেনা। মনে পড়ে কি এদেশেও প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একইভাবে বেআইনি অভিবাসীদের সন্তানদের বেনাগরিক করার জিগির তুলেছিলেন। তৈরি হয়েছিল ডিটেনশন ক্যাম্প। ট্রাম্পও ঘোষণা করেছেন দরকারে বেআইনি অভিবাসীদের নিজের দেশে ফেরত পাঠাবেন, নয়ত গুনতানাম কারাগারে পাঠাবেন। রাষ্ট্রনায়কের চিন্তার কি অসাধারণ মিল। অবশ্য এ দফায় ট্রাম্প তার বন্ধু নরেন্দ্র মোদিকেও বিশেষ স্বস্তি দিচ্ছেন না। ভারতীয় অভিবাসীদের জন্যও তাঁর নীতি যে বিশেষ আলাদা হবেনা তা তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বগুরু আপাতত সেই কিল হজম করেছেন।

ট্রাম্প তাঁর আদেশনামায় জানিয়েছেন এবার থেকে আমেরিকার সেনাবাহিনী সহ অন্যান্য সরকারি ক্ষেত্রে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য আর কোনও সংরক্ষণ থাকবে না। আমেরিকাতে কেবল দুটিই লিঙ্গ থাকবে, নারী আর পুরুষ। এর মাঝে আর কিছু নেই। ভারতীয় জনতা পার্টিও কি তাই বলে না? তারাও তো প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের 'বিকৃত' বলেই প্রচার করে থাকে। সামাজিক প্রান্তিক মানুষের প্রতি ফ্যাসিবাদীরা বোধহয় বরাবরই খড়্গহস্ত। প্রকৃতির বৈচিত্রকে লালন করার মানসিক ঔদার্য এনারা কোনওকালেই রপ্ত করে উঠতে পারেননি। তাই যে কোনও প্রান্তিক পরিচয়ের প্রতি তাদের অস্বস্তি। ট্রাম্প অবশ্য এখানে এক কদম এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি বিষয়টিকে কেবল আর সরকার বহির্ভূত অমানবিকতায় আটকে রাখেননি। সরাসরি নির্দেশ জারি করে নিজের পক্ষপাত পরিষ্কার করেছেন।

বিলগ্নিকরণ দপ্তর অবশ্য ট্রাম্প এখনও খুলে ওঠেননি। তবে সরকারি দপ্তরের সক্ষমতা যাচাই করার দপ্তরে ধনকুবের ইলন মাস্ককে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার জন্য ২০ জন কর্মীসহ আলাদা অফিসের ব্যবস্থা হয়েছে। বলাই বাহুল্য যে, ইলন মাস্ক কেবলমাত্র আলঙ্কারিক দায়িত্ব নেবেন না। তিনি দপ্তরে এসেই বাউডেন জমানার একাধিক সরকারি আধিকারিকদের অপসারিত করেছেন। অভিযোগ, ট্রাম্প সরকারি অফিসে নিজের লোক বসাচ্ছেন। যেভাবে বেসরকারি দপ্তর অধিগ্রহণ হলে নতুন মালিক নিজের পছন্দের লোকেদের নীতি নির্ধারণ ভূমিকায় প্রতিষ্ঠা করে, এখন সরকারেও সেই নীতিই তারা আমদানী করেছেন। অবশ্য ভারতবাসী এই অভ্যাসের সাথে সুপরিচিত। ২০১৪ থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে যেভাবে বিজেপি বা বিজেপি মনোভাবাপন্নদের নিয়োগ হয়েছে তা সর্বজনবিদিত। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিদের ক্ষেত্রেও সেই অভিযোগ এসেছে।

ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই তাঁর নির্বাচনী পরাজয়ের পর ক্যাপিটালে ভাঙচুর করা শতাধিক অভিযুক্তদের মুক্তি দিয়েছেন। এদের মধ্যে বেশকিছু জন সরকারি কর্মীদের আক্রমণের অভিযোগে অভিযুক্ত। যেভাবে এদেশে দাঙ্গাবাজ, ধর্ষক, আরএসএস তথা বিজেপি কর্মীরা গত এক দশকে ছাড়া পেয়ে গিয়েছে। বিলকিস বানুর ধর্ষকরা আজ ক্ষমা পেয়ে গিয়েছে। গ্রাহাম স্টেইনসের হত্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তি 'পদ্মশ্রী' সম্মান পেয়েছে। দেশে দেশে ফ্যাসিবাদীদের কি অমোঘ মিল। তারা নিজেদের রাজনীতিতে অবিচল। সমস্ত কুকীর্তির ধারক বাহক। তবুও কি অসম্ভব জনমোহিনী। অসম্ভবের স্বপ্ন ফেরী করে ক্ষমতার কেন্দ্রে। মানুষ এদের দেখে প্রশ্ন করে না। প্রশ্ন করলে, রাষ্ট্র তার সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যে কোনও প্রতিবাদকে অঙ্কুরেই বিনাশ করতে চায়। তাই তো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসে সেই পথকেই খর্ব করে। হিটলার থেকে ট্রাম্প, একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। মার্ক্সের কথায়, "ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়, প্রথমবার দুঃখ, পরেরবার হাস্যকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে।"

এবারে অবশ্য ট্রাম্প সাহেব তাঁর আগের জমানাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির গোড়ার শর্তই হল আমেরিকাতে আমদানিকৃত পণ্যের উপর শুল্ক চাপানো। আগের দফায় তিনি চীন ও মেক্সিকোর সাথে শুক্ল যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এবার এর পাশাপাশি তিনি পানামা খাল ও গ্রিনল্যান্ড দখল করার কথাও বলছেন। তিনি 'ব্রিকস'ভুক্ত দেশগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন যে তারা ডলারের বদলে অন্য মুদ্রায় লেনদেন করা শুরু করলে এই দেশগুলো থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১০০% আমদানি শুল্ক চাপাবেন। অর্থাৎ, আমেরিকার অর্থনীতির সাথে তিনি আপোষ করবেন না। তবে প্রশ্ন উঠছে এই শুল্ক যুদ্ধে আমেরিকার আম-জনতার কতটা লাভ হবে। আমেরিকান ধনকুবেরদের পকেট যে ফুলে ফেঁপে উঠবে তা বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু সে দেশে আয়ের বৈষম্য কতটা মিটবে তা পরিষ্কার নয়। ট্রাম্পের পাশে রয়েছেন ইলন মাস্ক, মার্ক জুকারবার্গ, জেফ বজেস, টিম কুক আর এদেশে মোদির পাশে আদানি, আম্বানী, বিড়লা, টাটা। আমেরিকা প্ৰথম যেভাবে সেখানকার শিল্পপতিদের উৎসাহিত করে, বিকশিত ভারত সেভাবেই এদেশের ধনকুবেরদের উৎসাহিত করে। রাজনীতি একই, পার্থক্য কেবল নামে।

আসলে বিগত দুই দশক ধরে গোটা বিশ্বে নয়া উদারবাদ আর্থিক মন্দার কবল থেকে উদ্ধার পায়নি। আর্থিক অসাম্য বেড়েই চলেছে। ফলে উদারবাদী সংসদীয় রাজনীতি মানুষকে আর নতুন কোনো আশা দেখাতে পারছে না। আর ঠিক সেই সঙ্কটের সুযোগ নিয়েই বিশ্বজুড়ে মাথা তুলেছে নব্য ফ্যাসিবাদ। এরা সুকৌশলে দেশের মানুষের ক্ষোভকে চালিত করতে পেরেছে এক অলীক শত্রুর বিরুদ্ধে। পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের বিকল্প হিসাবে তারা হাজির করতে পেরেছে অপরের ধারণাকে। মানুষ আজ সরকারকে প্রশ্ন করে না। বরং দাগিয়ে দেওয়া কোনও ওপরের প্রতি নিজেদের ক্ষোভকে পর্যবসিত করে ফ্যাসিবাদের সমর্থনে। আর এই নব্য ফ্যাসিবাদীরা সেই মানুষের সমর্থনেই সংসদীয় গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলে। গোটা দুনিয়াজুড়ে বাম শিবিরের অবক্ষয় এই উত্থানকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আগামীতে এই প্রবণতা আরও বাড়বে। এটাই দেখার, বাম ও প্রগতিশীল রাজনীতি এই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত কি না।