আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৫ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩১
সমসাময়িক
অবৈধ খনিতে আবার মৃত্যু
নতুন বছর ২০২৫-এর প্রথম সপ্তাহেই আসামের ডিমা হাসাও জেলার উমরাংশু-র কয়লাখনিতে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। অন্তত ৮ জন শ্রমিক খনির ভিতরে আটকে পড়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ সংখ্যাটি আরও বেশি। এক সপ্তাহ ধরে উদ্ধারকাজ চালানোর পর চারজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাদবাকিদের কোনো খবর নেই। খনির ভিতরে থাকা শ্রমিকদের বাঁচার আশা ছাড়েনি তাঁদের পরিবার। তাঁরা খনিমুখেই দিবারাত্র অবস্থান করছেন।
মেঘালয়ের অনেক জায়গায় বিশেষত ইস্ট ও ওয়েস্ট জয়ন্তিয়া জেলার অধিকাংশ এলাকায় এবং সংলগ্ন এলাকা আসামের ডিমা হাসাও জেলার মাটির গভীরে রয়েছে কয়লা। ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের বিধি মেঘালয় রাজ্যে প্রযোজ্য বলে জমির মালিক ওই কয়লার স্বত্বাধিকারী। ডিমা হাসাও জেলাও ভারতের ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত। কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের পক্ষে কয়লা সমৃদ্ধ এইসব জমি অধিগ্রহণ আইনতঃ সম্ভব নয়। এমনকি কোনোভাবেই এইসব জমির কেনাবেচার সুযোগ নেই। তার ওপর এই কয়লা উন্নত মানের নয় বলে কয়লা উত্তোলনের আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে কোনও নামকরা সংস্থা এগিয়ে আসেনি। ফলাফল, প্রচলিত পদ্ধতিতে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে তার ভেতরে সুড়ঙ্গ তৈরি করে তুলে আনা হয় প্রকৃতির নিজস্ব সম্পদ। সুড়ঙ্গ বেশি গভীর নয়। প্রশস্তও নয়। কত গভীরে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য শাখা-প্রশাখার সমন্বয়ে গঠিত এই খনি ব্যবস্থা তা কারও জানা নেই। না আছে তার কোনো নকশা না আছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যখন যেদিকে কয়লা পাওয়া যায় সেদিকেই গাঁইতি মারতে মারতে এগিয়ে চলে শীর্ণ শ্রমিকের দল। কোনোরকম সমীক্ষা না থাকায় তাদের জানা নেই কোথায় গাঁইতি চালালে হঠাৎ করে নদীর তলদেশে ছিদ্র হয়ে যেতে পারে অথবা ভূগর্ভস্থ কোনো জলস্তরে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। সবমিলিয়ে ইঁদুরের গর্তের এ এক পরিবর্ধিত সংস্করণ। প্রযুক্তি-পরিভাষায় তাই এই ব্যবস্থার নাম র্যাট-হোল মাইনিং। বেশি যন্ত্রপাতি নিয়ে বলিষ্ঠ শ্রমিকের পক্ষে ভেতরে ঢুকে কাজ করা সম্ভব নয়। ছোটখাটো চেহারার রোগাসোগা শ্রমিকই জমির ভেতরে যাওয়ার উপযোগী। সেভাবেই বাছা হয় এইসব খনির শ্রমিক। স্থানীয় শ্রমিক। না পাওয়া গেলে প্রতিবেশী অসম-মিজোরাম-মণিপুর থেকেও গরীব ঘরের লোকেদের অর্থের লোভ দেখিয়ে আনা হয়। প্রয়োজনে প্রতিবেশী বাংলাদেশ এবং নেপাল থেকেও সংগ্রহ করা হয় শ্রমিক। অনেকের মতে অন্তত হাজার পঞ্চাশ শ্রমিক আসাম-মেঘালয়ের বেআইনি খনিগুলিতে কর্মরত। দিন-মজুরের কাজ বলে এদের না আছে কোনো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক অধিকার। অসুস্থ হলে মালিক কোনও দায়িত্ব নেয় না। কাজ করতে গিয়ে আহত হলেও মালিক দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে প্রথমে খবরটা চাপা দিয়ে মালিক নির্বিকার থাকে। একান্তই জানাজানি হয়ে গেলে শেষকৃত্য বাবদ থোক টাকা দিয়ে মালিক হাত ধুয়ে ফেলে।
কবে থেকে এমন কান্ড চলছে তা বলা মুশকিল। নথিভুক্ত তথ্য অনুসারে অবশ্য বিংশ শতাব্দীর আশির দশক থেকেই এই ব্যবস্থার রমরমা। এবং সেই সুবাদেই জানা যায় যে এইসব ছোটো ছোটো ইঁদুরের গর্তের মতো খনিতে মাঝে মাঝেই বিপর্যয় ঘটে। কখনও সুড়ঙ্গ বাড়তে বাড়তে নদীর তলদেশে ভাঙন ধরিয়ে দেয়। হু-হু করে সুড়ঙ্গের মধ্যে জল ঢুকতে থাকে। কখনও আবার সুড়ঙ্গ এগোতে এগোতে ফাটিয়ে দেয় জলস্তরের দেওয়াল। ফলাফল, - সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে যায় নিয়ন্ত্রণবিহীন জলস্রোত। এবং হারিয়ে যায় অগণিত প্রাণ। তাদের পরিচয় বেশিরভাগ সময় অজানা থেকে যায়। নাম-ধাম তো দূরের কথা ঠিক কতজন এইসব বিপর্যয়ের বলি হয় তারও কোনও হিসেব নেই।
কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার ধারাবাহিক প্রচার এবং আইনি বিশ্লেষণের ফলে ২০১৪-র ১৭ই এপ্রিল জাতীয় পরিবেশ আদালত (ন্যাশনাল গ্রীন ট্রাইবুনাল সংক্ষেপে এনজিটি) র্যাট-হোল মাইনিং নামের কয়লা খনন ব্যবস্থাকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে। খনন বন্ধের নির্দেশ জারি হয়। জমির ওপর জমে থাকা কয়লা পরিবহণও নিষিদ্ধ হয়। জমির মালিক-পক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হলে সুপ্রিম কোর্ট একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কয়লা পরিবহনের নির্দেশ দেয় যাতে জমে থাকা সমস্ত কয়লা সরিয়ে ফেলা যায়। প্রথমবার সময়সীমা শেষ হয়ে আসার প্রাক্ মুহূর্তে জমি তথা খনির মালিকরা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন যে আরও কিছুদিন সময় না দিলে সমস্ত কয়লা সরিয়ে নেওয়া যাবে না। আদালত আবেদন মেনে নেয়। তারপর বারবার একই আবেদন চলতে থাকে। এবং সময় বাড়ানোর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় আদালতের সম্মতি পাওয়া যায়। প্রশ্ন ওঠে, খনিমুখে কত কয়লা জমে ছিল যা এত বছরেও সরিয়ে দেওয়া গেল না।
এই প্রশ্নের উত্তর বিস্তারিত ভাবে পাওয়া গেছিল ২০১৮-র ১৩ই ডিসেম্বর। ইস্ট জয়ন্তিয়া জেলার কসান গ্রামের এক খনিতে তলিয়ে যান পনেরো জন (মতান্তরে ষোলো) শ্রমিক। অভিযোগ, সুড়ঙ্গ কাটতে কাটতে এগিয়ে যাওয়ার সময় শ্রমিকদের গাঁইতি ফাটিয়ে দেয় পাশের নদীর তলদেশ। হু-হু করে জল সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকতে শুরু করে। বেআইনি এই খনিতে অন্যান্য খনির মতোই না ছিল কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না উদ্ধার করার সাজসরঞ্জাম। ফলে হারিয়ে যায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোজগারের সন্ধানে কাজ করতে থাকা এতগুলি মানুষ। চূড়ান্ত বিচারে যাঁরা বেআইনি কয়লা খনির শ্রমিক।
খনি গহ্বর ও সুড়ঙ্গের মধ্যে জল ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বিশেষত গ্যাস। এর মধ্যে বেশি সময় কোনো মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তবুও চালু থাকে অবৈধ বলে স্বীকৃত র্যাট-হোল মাইনিং নামের কয়লা খনন ব্যবস্থা। সামগ্রিকভাবে এনজিটি-র নির্দেশ প্রয়োগ করে সমস্ত বেআইনি খনি বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উমরাংশুর দুর্ঘটনায় শ্রমিকের প্রাণহানি আবারও প্রমাণ করে দিল যে আসামের তথাকথিত ডাবল ইঞ্জিনের সরকার আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে চলেছে।
ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের বিধি অনুযায়ী খাতায় কলমে জমির মালিক তাঁর জমির ভেতরে থাকা কয়লার স্বত্বাধিকারী হলেও তিনি নিজে উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকেন না। অর্থের বিনিময়ে মৌখিক চুক্তিতে জমির দায়িত্ব ঠিকাদারের হাতে তুলে দিয়ে তিনি অন্যত্র বসবাস করেন। এক বিরাট মাফিয়া চক্র পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। কোন খনির কয়লা কোন ট্রাকে ভর্তি করা হবে থেকে শুরু করে কোন ট্রাক কোথায় যাবে তা ঠিক করে দেয় মাফিয়া চক্রের নিয়োগ করা একদল দালাল। এদের বিরুদ্ধে গেলে প্রাণ সংশয় হতে পারে। ডিমা হাসাও-এর দুঘটনায় আবারও প্রমাণিত হল বেআইনি খনি থেকে নিয়মিত কয়লা তোলার কাজে প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল এবং দুর্বৃত্ত সকলেই যুক্ত। নির্বিবাদে দিনের পর দিন আদালতের নির্দেশ অমান্য করে বেআইনি খনি থেকে কয়লা খনন ও বিপণন ব্যবস্থায় কোনো ছেদ পড়েনি।
এই দুর্ঘটনার পরে রাজ্যের একজন মন্ত্রী ঘটনাস্থলে গেছিলেন। তবে দুর্ঘটনায় বিপর্যস্ত খনির মালিকের নাম প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। তবে প্রথামাফিক আসামের প্রচারপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী যথারীতি প্রতিদিনই বিবৃতি দিয়ে চলেছেন। নাগপুর থেকে কোল ইন্ডিয়ার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প আসার আগে পর্যন্ত তিনি দাবি করেছিলেন যে পাম্পটা এসে গেলেই অল্প সময়ের মধ্যে খনির জল অতি দ্রুত বের করে দেওয়ার বন্দোবস্ত হবে। কিন্তু পাম্পটি কেন ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল সে বিষয়ে তিনি নীরব। বিশাখাপত্তনম থেকে আসা নৌবাহিনীর ডুবুরিরা কেন ফিরে গেলেন তার কোনো ব্যাখ্যা আসামের মুখ্যমন্ত্রী দেননি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম থেকেই এই দুর্ঘটনা সম্পর্কে কোনো মতামত ব্যক্ত করেননি।
উমরাংশুর কয়লা খনির দুর্ঘটনায় উত্তর কাছাড় স্বশাসিত পার্বত্য পরিষদের মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। ডিমা হাসাও জেলার সাত গ্রামবাসী তাঁর বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর করেছেন। তাঁর স্ত্রী-ও অভিযুক্ত। অবৈধ কয়লা খনির মালিক হিসেবে এই দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। 'আসাম মাইনিং ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন'-এর একটি সরকারি নথি যা মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য ও তাঁর স্ত্রী-র নামে ইস্যু করা হয়েছিল তার প্রতিলিপি এফআইআর-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার এবং উত্তর কাছাড় স্বশাসিত পার্বত্য পরিষদ-এ এখন একই রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন।
প্রসঙ্গত, উত্তর কাছাড় স্বশাসিত পার্বত্য পরিষদ ভারতের সবচেয়ে পুরাতন স্বশাসিত পরিষদ। ১৯৫১ সালে মিকির পার্বত্য এলাকা এবং উত্তর কাছাড় পার্বত্য এলাকার জন্য দু’টি পৃথক স্বশাসিত জেলা গঠন করা হয়। স্বাধীন ভারতে এই ছিল প্রথম গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন। তখন এই দু’টি স্বশাসিত পরিষদ এলাকা ছিল সংযুক্ত মিকির পার্বত্য ও উত্তর কাছাড়় পার্বত্য জেলায়। এরপর মিকির পার্বত্য জেলার নতুন নামকরণ হয় কার্বিআংলং জেলা, এবং উত্তর কাছাড় জেলার নাম হয় ডিমা হাসাও। কয়েক বছর আগে কার্বিআংলং জেলা ভেঙে নতুন আর একটি জেলা গঠিত হয়, পশ্চিম কার্বিআংলং। বর্তমানে কার্বিআংলং স্বশাসিত পরিষদের সদর ডিফু শহর, ডিমা হাসাও স্বশাসিত পরিষদের সদর হাফলং শহর। এই দু’টি স্বশাসিত জেলা পরিষদ এলাকা মূলত কার্বি এবং ডিমাসা জনজাতির ভূমি হলেও কাছাড়ি, নাগা, কুকি, তিওয়া, রাংখেল জনজাতির মানুষরাও এখানে বসবাস করেন। রয়েছেন বহু বাঙালি, নেপালি ও হিন্দিভাষী মানুষও।
স্বশাসিত পার্বত্য পরিষদের তরফে দুর্ঘটনাগ্রস্ত খনির সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করা হলেও কয়লাখনিটি যে অবৈধ সে কথা আসামের মুখ্যমন্ত্রী প্রাথমিক পর্যায়ে মেনে নিয়েছিলেন। তা নিয়ে শুরু হয় রাজনীতি-বিক্ষোভ। খনির জমির মালিক হিসেবে পুলিশ যে ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে সে নাকি উত্তর কাছাড় স্বশাসিত পরিষদের মুখ্য কার্যনিবাহী সদস্যর আত্মীয়। আবার 'আসাম মাইনিং ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন'-এর কাছ থেকে খনির ইজারা নিয়েছেন সেই একই মুখ্য কার্যনিবাহী সদস্যর স্ত্রী। এই খবর জানাজানি হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রীর মত বদলে গেল। তাঁর মতে খনিটি পরিত্যক্ত। সবমিলিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী এবং শাসকদলের নাজেহাল অবস্থা। শাসকদলের দুরবস্থার অবসান কবে ঘটবে তা নিয়ে চিন্তার অবকাশ নেই। তবে এই ধরনের অবৈধ খননের কাজ কবে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হবে তা সরকার শুধুমাত্র বিবৃতি দিয়ে নয়, কাজে করে দেখাক।