আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৫ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩১
সমসাময়িক
দ্বিধা কেন?
দেশের সমস্যায় নীরব থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিদেশের সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় উদ্যোগ নিয়েছেন বলে প্রশ্ন উঠেছে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ থামাতে তিনি শান্তিদূত হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। প্যালেস্টাইন-ইজরায়েলের যুদ্ধ নিরসনে তাঁর উদ্যোগ বিশ্লেষকদের নজর কাড়ছে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যেন কিছুতেই মধুর হয়ে উঠছে না। অথবা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিস্থিতি গড়ে উঠছে না। আগ বাড়িয়ে আফগানিস্তানের কট্টর মৌলবাদী তালিবান শাসকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সরল করার চেষ্টা চালালেও তাতে দেশের কী উপকার হবে তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জটিলতায় সে দেশের সঙ্গে সম্পর্ক যথেষ্ট তিক্ত হয়ে গেছে। আরেক প্রতিবেশী মায়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে। সেখান থেকেও শরণার্থীদের ভারতে আগমন ঘটে চলেছে। মায়ানমারের বিদ্রোহীদের দাপট যতই বাড়ছে ততই সরকারি সেনারা প্রাণের দায়ে ভারতে আশ্রয় নিতে চাইছে। তাদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। দেশের মানুষের জন্য বিষয়টি মোটেও সুখকর নয়। অন্য প্রতিবেশী নেপালের সরকার ভারতের বদলে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। অনেক দিন টালমাটাল চলার পর শ্রীলঙ্কার অবস্থা কিঞ্চিৎ স্থিতিশীল। ভারতের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা সুসম্পর্ক গড়ে তোলার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কী হবে তা বুঝতে হলে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। আর উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী চীন সম্পর্কে ভারত সরকারের ভূমিকা একেবারেই স্বচ্ছ নয়। কাজেই ভারতের বিদেশ নীতি নিয়ে বারেবারেই প্রশ্ন উঠছে।
কয়েক সপ্তাহ আগেই পূর্ব লাদাখে সেনা অবস্থান নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার ফলে ভারত-চীন সীমান্ত বিবাদ পরিস্থিতি এখন তুলনামূলক ভাবে স্থিতিশীল হলেও সম্প্রতি তিব্বতে ইয়ার্লুং সাংপো নদের নিম্ন উপত্যকায় চীনের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত রীতিমতো চিন্তার উদ্রেক করেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারত-চীন বিতর্কিত সীমান্তের অনতিদূরে অরুণাচল প্রদেশে ঢোকার বাঁকের মুখে তৈরি হতে চলেছে প্রস্তাবিত ৬০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রর জন্য গড়ে তোলা হবে বিশ্বের বৃহত্তম নদীবাঁধ। পরিবেশগত স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ইয়ার্লুং সাংপো-র জলবিদ্যুৎ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব হবে যা চীনের রিনিউবেল এনার্জি বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে চীন সরকারের তরফে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান এবং পরিকাঠামোগত উন্নতির মাধ্যমে এই বাঁধ তিব্বতের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও সাহায্য করবে বলে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক (geological) ও ভূপ্রাকৃতিক (geomorphological) দিক থেকে এই নদী দু’টি প্লেট-এর সংযোগস্থলে অবস্থিত। তাই এখানে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহকে কৃত্রিম উপায়ে বাধা দেওয়া হলে আশঙ্কা থাকে ভূমিকম্পের। এবং তুলনামূলকভাবে নবীন পর্বতমালা হিমালয়ের বিভিন্ন অংশে প্রায়শই ভূমিকম্প আঘাত হানে।
ইয়ার্লুং সাংপো, যা ভারতে সিয়াং ও ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত। ভারত পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনা নদী নামে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। একাধিক রাজ্যের জীবনরেখা স্বরূপ। ভারত ও বাংলাদেশ ব্রহ্মপুত্রের নিম্নতীরবর্তী রাষ্ট্র হওয়ায় নদীর জলকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে চীন। প্রবল বর্ষায় প্রস্তাবিত বাঁধ থেকে বাড়তি জল ছাড়া হলে তা অসম এবং অরুণাচল প্রদেশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও বন্যা পরিস্থিতি ঘটাতে পারে। অন্য দিকে, শুখা মরসুমে চীন নদীর জল আটকে রাখলে প্রভাব পড়বে এই অঞ্চলের কৃষি, পানীয় জল সরবরাহ এবং জলবিদ্যুৎ শক্তির উপরে। শুধু তা-ই নয়, জলের প্রবাহ হ্রাসের ফলে নদীতে পলি জমবে, প্লাবনভূমির মাটির উর্বরতা কমবে। ভারতের মোট মিষ্টি জলের ৩০ শতাংশ আসে ব্রহ্মপুত্র থেকে, যা এই অববাহিকা অঞ্চলের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে জীববৈচিত্রও। লক্ষণীয়, নদীর জলবণ্টন নিয়ে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বিবাদ তত্ত্বগত ভাবে সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব, যে-হেতু দুই দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি রয়েছে ভারতের। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে এখনও তা না থাকায় ভারতের পক্ষে চীনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনও কূটনৈতিক চাল দেওয়া হয়তো এই মুহূর্তে সম্ভবনয়। তবে ভারতের তরফে ট্রান্স-বাউন্ডারি এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট-এর (Transboundary Environmental Impact Assessment সংক্ষেপে IETA) দাবি জানিয়ে এখনও পর্যন্ত দ্যা হেগ-অবস্থিত 'ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ্ জাস্টিস্'-এ কোনো আবেদন করা সঙ্গত বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত। ভারত সরকার সেই উদ্যোগ নিয়েছে কিনা জানানো হয়নি। প্রকৃতপক্ষে চীনের প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে ভারত সরকার এখনও পর্যন্ত নীরব।
চীনের এ-হেন বাঁধের প্রভাব প্রতিহত করতে কিংবা অন্য কোনো কারণে অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং নদীর উপরে ১০ হাজার মেগওয়াট-এর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা করছে ভারত। যদিও স্থানীয় বিরোধিতা এবং পরিবেশগত সমস্যার জেরে এর বাস্তবায়ন জটিলতার সম্মুখীন। কারণ, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অরুণাচল প্রদেশের 'শস্যভান্ডার' বলে পরিচিত আদি প্ল্যাটু পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। আদি প্ল্যাটু একদিকে যেমন ধান উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত তেমনি এখানকার স্থানীয় জনজাতি যারা আদি নামেই পরিচিত তাদের মধ্যে শিক্ষিত মানুষের হার যথেষ্ট বেশি। প্রকৃতপক্ষে অরুণাচল প্রদেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে প্রশাসনের আধিকারিকদের অধিকাংশই আদি জনজাতির সদস্য। স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় মানুষের সচেতনতা অনেক বেশি। প্রকল্পের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে প্রতিবাদ সংগঠিত হয়ে চলেছে।
অরুণাচল প্রদেশের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র চীনের এ-হেন আধিপত্য প্রশমিত করতে সক্ষম নয়। পক্ষান্তরে প্রকৃতি-পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতা শুরু হলে চূড়ান্ত পর্যায়ে সভ্যতার ক্ষতি হয়। আর্থিক মূল্যে সেই লোকসানের মূল্যায়ন সম্ভব নয়। বরং ভারতকে দায়িত্ব নিয়ে আরও জোরদার আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়ন গড়ে তুলতে হবে। চীনের এ-হেন পদক্ষেপের প্রভাব যে-হেতু বাংলাদেশেও পড়তে চলেছে, তাই পড়শি রাষ্ট্রটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ব্রহ্মপুত্রের জলবণ্টন চুক্তি সম্পন্নে রাজি করানো ছাড়া ভারতের কাছে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। ব্রহ্মপুত্রের জলসম্পদ তথ্য আদানপ্রদানের প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে চীনের উপরে কূটনৈতিক চাপও তৈরি করতে হবে। পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে যথেষ্ট জটিল। তবে আইনগত উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বিষয়টি উত্থাপন একান্তই জরুরি। পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো রকম দ্বিধা করলে চলবে না। যদিও এখনও পর্যন্ত ভারত সরকারের তরফে জানানো হয়নি যে কীভাবে চীনের প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিরোধিতা করা হবে। কেন এই হিরন্ময় নীরবতা? চুপ করে থাকার সময় এখন নয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় সমাজ-সভ্যতার সমূহ বিপদ।