আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৫ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩১

সম্পাদকীয়

অস্বাস্থ্যকর


গত বছর আগস্ট মাসে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে আলোড়ন পড়েছিল একটি মৃত্যু ঘিরে, ছয় মাস অতিক্রম করার পর আবারও পাঁচ প্রসূতির মরণাপন্নতা সেই কঙ্কালসার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অচলায়তনকেই দৃশ্যমান করে তুলেছে। রাজ্যের, তথা দেশের আম জনতার মনে সদা সর্বদা ধ্বনিত হয় যে কথা, "কিছু হয়নি, কিছু হবেনা" - বিগত ছয় মাস যেন তারই হলফনামা। বাংলা তথা ভারতের বিপুল সংখ্যক জনতার বোধহয় এটাই দুর্ভোগ যে তারা এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার খপ্পরে পড়েছেন, যেখানে অর্থ-ক্ষমতাই একমাত্র পরমার্থ। মানুষের হিতের রাজনীতি স্বাধীনতা প্রাপ্তির সময় থেকেই বিদায় নিয়েছে। রাজ্য হোক বা কেন্দ্র, নিজেদের কায়েমী রাজনীতিই সরকারি ব্যবস্থাপনার মূলমন্ত্র। তবু জনতা হৃদয় মাঝে মাঝে উদ্বেলিত হয় বিচারের আশায়। পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বেড়িয়ে আসে রাজপথে, আন্দোলিত হয় মানব জীবন। রাজনৈতিক অচলাবস্থায় খানিক নাড়া পড়ে। হয়ত বা ক্ষমতার পালাবদলও ঘটে যায়। কিন্তু রাজনীতির পরিবর্তন হয় কি? মিলে মিশে থাকার, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার্থে গড়ে ওঠা সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলি একই থেকে যায়। ছলে, বলে তারা জনতার মনে ঢুকিয়ে দেয়, "কিছুই হয়নি, কিছু হবেওনা"। এর শেষ কোথায়?

সরকারি হাসপাতালে কর্মরতা ডাক্তারি ছাত্রী ধর্ষিত হয়ে খুন হয়ে গেলেন। তারপরের তিন মাস রাজপথ আন্দোলিত হল তাঁর জন্য সঠিক ন্যায়বিচার চেয়ে। রাজপথ থেকে অলিগলি রাত জাগল, অর্ধেক আকাশ দখল নিতে চাইল রাতের আকাশের। কিন্তু সেই অসংগঠিত ক্ষোভ খানিক দিশাহারা হল। সংগঠিত শক্তি এসে তার জায়গা নিল। খানিক ধার কি হারালো আন্দোলন? লিঙ্গ সাম্য, নারীর সুস্থভাবে বাঁচার ভয়হীন পরিবেশের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন ঢুকে পড়ল কেবল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে। যদিও বিচারের দাবিটি তখনও রয়ে গেল মুখ্য হিসাবে। কিন্তু অর্ধেক আকাশ অপসারিত হয়ে গেল কিছু মুখ দিয়ে। পরবর্তীতে আরও বিতৃষ্ণা এল, রাত দখলের ডাক দিয়ে যাওয়া মুখেদের পুরস্কার মঞ্চে উঠে পড়ায়। সাধারণ জনতা বিভ্রান্ত, লড়াই কি পরিচিতির না ন্যায় বিচারের? কেউ কি বুঝলেন, রাষ্ট্র ব্যবস্থার চতুর্থ স্তম্ভ অবিরাম কাজ করে গেল রাষ্ট্রীয় অচলায়তনের কাঠামোটিকেই বজায় রাখতে। আন্দোলন থেকে মুখকে বিচ্ছিন্ন করে তারা তো আন্দোলনকেই বেপথু করে দিলেন।

কিন্তু তবুও আন্দোলন বেঁচে আছে। পূর্ণ বিচার এখনও অধরা। আবারও রাজপথে অবস্থান চলছে। নির্যাতিতার হতভাগ্য বাবা-মা মুখ চেয়ে আছেন আন্দোলনকারীদের। তাঁদের আশা আন্দোলনের চাপে হয়ত তদন্তকারীদের বিবেক জাগ্রত হবে। যে তদন্ত খানিক দিশাহারা, হয়ত তার বিপরীত কিছু ঘটবে। মূল অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা হবে। কেবল ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তারাই নয়, বরং তাদের আড়াল দিতে পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার যারা করেছে উভয়েই আদালতের সামনে দোষী হিসাবে কাঠগড়ায় দাঁড়াবে, তাদের অন্যায়ের বিচার হবে। অভয়া বা তিলোত্তমার বাবা-মা, এটাই তো আজ তাঁদের একমাত্র চাওয়া রাষ্ট্রের কাছে। রাজপথে যে স্লোগান উঠেছিল, ‘রাষ্ট্র তোমার কিসের ভয়, ধর্ষক তোমার কে হয়’ - তাকে ভুল প্রমাণ করার দায় কি রাষ্ট্রের আর নেই? অভিজ্ঞতা বলে, নেই। আজন্ম সরকারি দলের তাবেদারী করে চলা ভারতীয় পুলিশি ব্যবস্থা, তার ন্যায় রক্ষকের ভূমিকা গোড়া থেকেই ত্যাগ করেছে। এ বিষয়ে তাদের বিশেষ অনুশোচনা নেই। আর জি কর-এর ঘটনার পরেও রাজ্যে একাধিক জায়গায় নারীদের ওপর অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ফাঁড়ি অবধি ভাঙচুর হয়েছে পুলিশি অকর্মণ্যতার বিরুদ্ধে, কিন্তু ভবি ভোলে নি। প্রমাণ বিকৃত হয়েছিল, লোপাটও হয়। অপরাধী পুলিশের পাশেই বসে থাকে, অথচ খাতায় কলমে ফেরারি ঘোষণা হয়। কেন্দ্র রাজ্য এ বিষয়ে প্রতিযোগী, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনওকালেই নয়। রাষ্ট্র ব্যবস্থার এই দুটি স্তম্ভ, প্রশাসন ও পুলিশি ব্যবস্থা, বহুকালের মিলিজুলিতেই, অকর্মণ্য ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। আজ কেবল তার পুতিগন্ধ ছড়াচ্ছে।

এমনতর হতাশায় বলহীন, ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ আঁকড়ে ধরে রাষ্ট্র কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ, আদালতকে। আইনের শাসনে, বিচার পাওয়ার আশায় মানুষ গিয়ে ভিড় জমান আদালতের দরজায়। সময়ে বিচার হয়ত মেলেনা, প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। তবু জেগে থাকে আশা। এ দফায় অবশ্য হতভাগ্য পিতা-মাতাকে আদালতের দরজায় যেতে হয়নি, আদালতই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিচারের দায় তুলে নেয়। গোটা দেশজুড়ে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের অভূতপূর্ব আন্দোলন, কর্মবিরতি পালন সম্ভবত গোটা দেশের প্রশাসনকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল। হয়ত বা সেই অচলাবস্থা কাটাতেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করেন। তারা কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই-কে মুখবন্ধ খামে তাদের তদন্তের অগ্রগতি জমা করতে বলেন। এমনকি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সেই বিবরণী পড়ে, বিস্মিত, হতবাক হয়ে যান দৃশ্যতই। নিগৃহীতার সাথী আন্দোলনকারী থেকে দেশের জনতা আশায় বুক বাঁধে, এবার তবে বিচার মিলবে। অবশেষে কিছু হয়ত হবে। হয়ত এবার কিছু পরিবর্তন আসবে। হা হতোস্মি। অভিযুক্ত পুলিশকর্মী থেকে আর জি কর-এর তৎকালীন অধ্যক্ষ সবাই প্রায় বেকসুর খালাস পাওয়ার মুখে। সিবিআই তদন্ত করে এযাবৎ কলকাতা পুলিশের তদন্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারেনি। অপরাধী একজনই। সেই হোতা, সেই কুশীলব, সেই মস্তিস্ক। অতএব সমস্ত সরকারি ব্যবস্থাপনা একবাক্যে মেনে নিয়েছেন, একজন অপরাধী, যে কিনা কলকাতা পুলিশেরই কর্মী, একটি রাতে অতিমানবিক শক্তিতে সমস্ত নজরদারী, সুরক্ষা এড়িয়ে এই কান্ডটি ঘটিয়েছে। আদালতও সেই বিচারে সহমত। ফলে সর্বোচ্চ আদালতে মামলার শুনানি ক্রমশ পিছিয়ে চলেছে। রায়দান তো কল্পনাতীত এ মুহুর্তে। রাষ্ট্রের কাছে আমজনতার শেষ দরবার আদালতও আজ সন্দেহাতীত নয়। আদালতের ভূমিকায় তারা হতাশ। দুর্ভাগা পিতা-মাতা তবুও জেদ ধরে আছেন। আদালতের দরবারেই তারা ফিরে যাচ্ছেন ন্যায়বিচারের আশায়। তবে বুঝতে পারছেন, রাস্তার আন্দোলন না থাকলে বিচার তারা এখানেও পাবেন না। কিছু হয়নি, কিছু হবেও না।

এই অপরিবর্তনীয় রাজনৈতিক চক্রেরই প্রতিফল হাসপাতালে ভেজাল ওষুধের জেরে একজন প্রসূতির মৃত্যু ও বাকি তিন প্রসূতির মরণাপন্ন অবস্থা। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এই সার্বিক দুর্নীতিরই ফল। একটি আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যার একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতার দখলদারি, সেখানে ছোট ছোট মনসবদাররা খাজনা মিটিয়ে যা খুশি করার অধিকার পায়। প্রশাসন তাদের ছুঁয়েও দেখেনা, প্রতিহত করা তো দূরস্থান। তাই ডাক্তাররা ওষুধের গুণাগুণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও, রাজ্যের সরকারি পরীক্ষাগার সময় করে উঠতে পারেনা তা পরীক্ষা করার। সরকার বলছে লোকবলের অভাব। কিন্তু লোকবল নেই কেন? সারা বছর মেলা আর খেলাতেই এত সময় চলে গেল তবে? কেবল অনুদানের টাকা দিলেই সব দায়িত্ব পালন হয়ে গেল? রাজ্যের লক্ষ্মীরা, কন্যাশ্রী-যুবশ্রীরা কি এমনই এক হতশ্রী ব্যবস্থা চান? নাকি জনমনে প্রোথিত হয়ে গেছে এই বিশ্বাস - প্রতিবাদে কিছু হবেনা, বরং নিজেরটা বুঝে নেওয়াই ভালো।

ইতিহাস তো সেই সাক্ষ্য দেয়না। মানুষই তো ইতিহাস রচনা করেছেন। বিপ্লব সংঘটিত করেছেন। তাহলে আজ কেন এত হতাশা জাগছে? সমাজে কি আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই, যা এই রাজনৈতিক অচলায়তনের মূল ধরে নাড়া দেয়? নাগরিক আন্দোলন যে দিশা দেখিয়েছিল আগস্টের মধ্যরাতে, তাকে গতিশীল করে তোলায় কোন রাজনৈতিক শক্তি সফল হতে পারল না। নাগরিক আন্দোলন নিজের গতিতে স্তিমিত হয়েছে। প্রয়োজন ছিল সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির, যারা সেই আগুনকে জ্বালিয়ে রাখবে। দুঃখের বিষয় বাংলার কোনো প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি সেই কাজ করে ওঠেনি আজ অবধি। তারা আজও নিজ বৃত্তের পিঠ চাপরানিতেই খুশি। কায়েমী রাজনীতির দুষ্টচক্রে তারা এমন কোনো উপাদানই যোগ করতে পারছেন না, যা সমাজে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। হয়ত তারা নিজেরাই বিশ্বাস করে ফেলেছেন - আর কিছু হবেনা।