আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
কল্যাণ দত্ত
সৌরীন ভট্টাচার্য
বয়সের বিচারে আমি কল্যাণ দত্তর ছাত্রই হতে পারতাম।
বস্তুত আমাদের সমবয়সী কেউ কেউ আছেন যাঁরা কল্যাণবাবুর সরাসরি ছাত্র।
আর আমাদের অন্য বন্ধুদের অনেকে, আমাদের চেয়ে বয়সে কিছু বড়ো এমনও অনেকেই, কল্যাণবাবুর বন্ধু অম্লান দত্তর ছাত্র।
কেননা অম্লান দত্ত দীর্ঘদিন পড়িয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার ক্ষেত্রে কল্যাণবাবুকে বলতে হবে অগ্রজ বন্ধু। তরুণ বয়সে কল্যাণবাবু যখন রীতিমতো রাজনীতি করতেন, তখন উনি আমার অগ্রজর রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন। তখন একটাই কমিউনিস্ট পার্টি ছিল। পার্টি ভাগাভাগি তখনও শুরু হয়নি। এঁরা ছিলেন সেই এক এবং অদ্বিতীয় কমিউনিস্ট পার্টির শিক্ষক সেলের কর্মী।
আমি ছাত্র বয়স থেকেই কল্যাণবাবুর কথা জানতাম। কিছুটা দাদার বন্ধু এবং রাজনৈতিক সহকর্মী মহল থেকে শুনে শুনে। আর তাছাড়া কল্যাণবাবুর অল্প বয়স থেকেই বেশ খ্যাতি ছিল ডিবেটার হিসেবে। অধ্যাপক হিসেবেও ছাত্রমহলে ওঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল। কল্যাণবাবু এবং অম্লান দত্ত, দুজনেরই বিতর্কসভায় তখন বেশ নামডাক। কাজেই এঁদের নাম জানা ছিল সরাসরি পরিচয় হবার অনেক আগে থেকেই।
আমাদের সময়কার সম্বোধনের রেওয়াজ হিসেবে আমি কল্যাণবাবুকে 'কল্যাণদা' বলেই ডাকতাম। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে একটা মিশ্র ব্যাপারও ছিল। আমি 'কল্যাণবাবু'ও বলতাম, অন্তত অন্যদের কাছে উল্লেখ করার সময়ে। শিপ্রাদির বেলায় সে ডাক ছিল অবিমিশ্র। উনি সবসময়েই 'কল্যাণদা' বলে উল্লেখ করতেন। হঠাৎ শিপ্রাদির কথা কেন তুললাম তার একটু কারণ আছে। তখন আমাদের বিভাগীয় প্রধান পঞ্চানন চক্রবর্তী। পঞ্চাননবাবু বিভাগের সবারই মাস্টারমশাই, কিংবা মাস্টারমশাইয়ের মতো। সেকালে যেমন হতো। এঁরা বিভাগীয় প্রধান হিসেবেই নিযুক্ত হতেন, এক অর্থে। আর প্রফেসর পদও তখন অত বেশি ছিল না। অধিকাংশ বিভাগে একজনই মাত্র প্রফেসর। আর পঞ্চাননবাবু তাঁর ব্যক্তিত্বের গুণে বিভাগে ছিলেন আক্ষরিক অর্থে পিতৃপ্রতিম মানুষ। তা নিয়ে কারো খুঁতখুঁতনি ছিল না তাও নয়। সে তো পরিবারেও নিজের পিতাকে নিয়ে থাকে অনেক সময়ে। যেমন শিক্ষকদের মধ্যে কাউকে কাউকে এমন কথা বলতেন, বাইরের আজেবাজে খাবার না খেয়ে বাড়ি থেকে দুটো রুটি আর একটু আলুর তরকারি নিয়ে এলে পারো। শরীরও ভালো থাকে আর খরচও হয় কম। আমাদের সান্ধ্য ক্লাসে ছেলেরা মেয়েরা বিভাগের পিছন দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করত, আড্ডা দিত। উনি রেজিস্ট্রারকে অনুরোধ করেছিলেন সেই বারান্দায় একটা বাড়তি আলো দিতে এবং সম্ভব হলে একজন বাড়তি লোক দিতে, যে ওইদিকটায় একটু নজর রাখবে। কোনোটাই সম্ভব করে তোলেননি রেজিস্ট্রার। তেমনি সন্ধেবেলায় যেদিন লোডশেডিং হতো, তখন তা প্রায়ই হতো, সিঁড়ির মুখে মোমবাতি ধরে প্রত্যেকের নিরাপদে নামা তদারকি করতেন। আরও। ছাত্রীদের কার বাড়ি কোনদিকে, কোথা দিয়ে যাবে, এসব খোঁজ নিয়ে কখনো শিক্ষকদের মধ্যে কাউকে কাউকে, কখনো ছাত্রদের মধ্যে কাউকে দায়িত্ব ভাগ করে দিতেন তাদের আলোর নিরাপত্তায় পৌঁছে দিতে।
তখন হাতে হাতে টেলিফোন ছিল না। বিভাগে একটিই মাত্র ইন্টারনাল টেলিফোন ছিল, বিভাগীয় প্রধানের ঘরে। বাইরে থেকে ফোন করলে, সে ফোন আসত পিবিএক্স হয়ে একতলায় অফিসঘরে। উপরে খবর গেলে নীচে এসে ফোন ধরতে হতো। এইরকম মধ্যযুগীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার দিনে পঞ্চাননবাবুর ঘরের ইন্টারনাল টেলিফোনে প্রায়ই ফোন আসত শিপ্রাদির। কল্যাণদাকে চাইতেন। পঞ্চাননবাবু চোয়াল শক্ত করে নিজে উঠে গিয়ে কল্যাণবাবুকে ঘর থেকে ডেকে আনতেন। বিভাগের মাস্টারমশাইয়ের পূর্ণমর্যাদা বজায় রাখতে হবে তো। নারী স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইত্যাদি প্রসঙ্গে এঁদের অবস্থান নিয়ে একাল ব্যঙ্গও করতে পারে, বিদ্রোহও করতে পারে। কিন্তু ওঁদের অবস্থান তাতে বদলাবে না। পঞ্চাননবাবু একসময়ে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন যাদবপুরে সেন্ট্রাল রোডে, টেলিফোন এক্সচেঞ্জের পাশে একটা বাড়িতে। একতলা বাড়ি। আমি তখন বিভাগের তরুণতম শিক্ষক। সে বাড়িতে গেছি। গরমের ছুটিতে দুপুরবেলা সারা দুপুর ওঁর সঙ্গে বসে বিভাগের রুটিন তৈরি করেছি। বিকেলে চা টিফিন খেয়ে তবে ছুটি। বিভাগে যে যখন তরুণতম তার এটা করণীয় কাজ ছিল। তেমনি প্রথম এক বছর সেই শিক্ষককে পরীক্ষার সময়ে পাহারা দেবার দায়িত্ব দেওয়া হতো না। ছিল, তা এরকম ব্যাপার স্যাপার ছিল তখনকার দিনে। পঞ্চাননবাবু একদিন সে বাড়ি ছেড়ে দিলেন। কারণ পাশের প্রতিবেশী তাঁর বাড়িতে দোতলা তুলেছেন। তাতে কী? এ বাড়ির মেয়েদের আবরু নষ্ট হবার সম্ভাবনা নিয়ে গৃহকর্তাকে ভাবতে হবে না!
শিপ্রাদির আর একটা কথা বলে নিয়ে অন্য কথায় যাই। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনের পরে পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রণ্ট নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে। সেই প্রথম স্বাধীনতার পরে রাজ্যে অকংগ্রেসি সরকার। জনমনে বিপুল উৎসাহ, উদ্দীপনা। বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী। সে সরকার কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। নানারকম রাজনৈতিক সমস্যায় পাঁচ-ছ' মাসের মধ্যেই সরকারের পতন হয়। ধরমবীর তখন রাজ্যপাল। মানুষের ক্ষোভের শিকার। রাজ্যজুড়ে আন্দোলন, অস্থির অবস্থা। যাদবপুরে মাস্টারমশাইদের মধ্যেও যথেষ্ট চঞ্চলতা। প্রতিবাদ সভা, সইসাবুদ সংগ্রহ, পিটিশন ইত্যাদি যা যা হবার সবই চলছে। সেরকম সময়ে মাস্টারমশাইদের তরফের এক প্রতিবাদ বিবৃতি তৈরি করা হয়েছে। সেই বিবৃতিতে সই নেবার জন্যে পঞ্চাননবাবুর ঘরে এসেছেন শিপ্রাদি। কাগজটা পঞ্চাননবাবুর হাতে দিয়েছেন। বেশ লম্বা বিবৃতি ছিল। পঞ্চাননবাবু বেশ সময় নিয়ে খুঁটিয়ে সবটা পড়লেন। তারপর নিঃশব্দে কাগজখানা শিপ্রাদির হাতে ফেরত দিলেন। আপনি সই করবেন না? শান্ত গলায় বললেন, না। কেন, আপনার কি কোনো জায়গায় আপত্তি আছে বা কিছু যোগ করতে চান? আমি সে আলোচনার মধ্যেই যাব না। এরপরে আর কোনো প্রশ্ন ওঠে না। শিপ্রাদিও কোনো বাক্যব্যয় না করে বেরিয়ে গেলেন।
কল্যাণবাবুর কথা বলতে গিয়ে অন্যদের কথা বলে ফেলছি। উপায় নেই। আসলে একটা সময়ের মধ্যে সব জড়িয়ে মিলেমিশে থাকে। জোর করে ছাড়িয়ে নিতে গেলে গল্পের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়। কল্যাণবাবুর যাদবপুরে আসার কথাটাই পঞ্চাননবাবুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যাদবপুরে অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বিভাগীয় প্রধান অমর্ত্য সেন। বছর দুয়েক ছিলেন। পঞ্চাননবাবু আসেন ১৯৫৮-তে। উনি এসে আগ্রহ করে কলকাতার কলেজ শিক্ষকদের মধ্যে থেকে দুজনকে যাদবপুরে নিয়ে আসেন। পঞ্চাননবাবুর প্রায় সমবয়সী প্রভাত সর্বাধিকারী ১৯৫৮-তেই চলে আসেন যাদবপুরে। তিনি তার আগে পড়াতেন সিটি কলেজে আর ইণ্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইন্স্টিটিউটে। কল্যাণবাবু তখন পড়াতেন বিদ্যাসাগর কলেজে। তার আগে কিছুদিন বোধহয় পড়িয়েছিলেন বঙ্গবাসী কলেজে। এ কথাটা আমি নিজে খুব পরিষ্কার জানিনা। বামপন্থী শিক্ষক আন্দোলনের কোনো একটা ধর্মঘটের জেরে অনেকের কর্মক্ষেত্রে অসুবিধা হয়। এইরকম যেন শুনেছিলাম কল্যাণবাবু ওই সময়ে বঙ্গবাসী থেকে বিদ্যাসাগর কলেজে চলে আসেন। এই পর্বটা আমার সরাসরি ঠিক জানা নেই।
আমি কল্যাণবাবুকে পাই বিদ্যাসাগর কলেজে ১৯৬০ সালে। তার আগে আমি বছরখানেক পড়িয়েছি সিটি কলেজ, দক্ষিণ কলকাতা শাখার সান্ধ্য বিভাগে। সেখানে আমাকেও কিছু অসুবিধায় পড়তে হয়, যদিও আমি সরাসরি কোনোদিন বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িত ছিলাম না। তখনকার হাওয়া বেশ অন্যরকম ছিল। দিল্লির কলেজে আমাকে ইন্টারভিউতে দিব্যি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসছি, আমি কমিউনিস্ট কিনা। কমিউনিস্ট জুজুর ভয়টা তখনও ছিল প্রাতিষ্ঠানিক মনে। তখনও কমিউনিস্টরা তেমন করে ক্ষমতায় আসেনি। ওই কেরালায় সামান্য কিছু দিনের জন্যে। ওটা তখনও ছিল ব্যতিক্রমের পর্যায়ে। প্রতিষ্ঠান যে সবকিছু কিভাবে গ্রাস করতে পারে সে শিক্ষা তখনও বাকি ছিল। এতদিনে বোধহয় গা ছমছম ভাবটা কেটে গেছে। আচার আচরণ মন-জনমন-সমাজমন, এসব একসঙ্গে জড়ানো এমন এক জটিল গল্প যে কোনো সহজ গল্পে তা অত সহজে ধরা দেবার নয়। এরকম কথা এখনও আমরা ঠিক মানতে চাই না।
কল্যাণবাবুর সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় বিদ্যাসাগর কলেজে। ১৯৬০-এ আমি তখন কিছুদিনের জন্যে ওই কলেজে মর্নিং সেকশনে পড়াচ্ছি। কিছুদিনের জন্যে, কেননা যে পদে আমার নিয়োগ হয়েছে সে পদটা অস্থায়ী। কল্যাণবাবু তখন পড়ান ওই কলেজেরই ডে সেকশনে। দুপুরবেলায় ছাত্ররা পড়ে, সকালবেলায় ছাত্রীরা। কল্যাণবাবু সকালবেলাতেও ক্লাস নিতে আসতেন, সপ্তাহে দু-তিনদিন। ওই সকালের বিদ্যাসাগর কলেজে আমি তখন পেয়েছি বাংলা বিভাগে অলকা চট্টোপাধ্যায়, প্রতিমাদি, ইতিহাসে রমাকান্ত চক্রবর্তী আর আমাদের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে কল্যাণ দত্ত ছাড়াও সুবোধ দত্ত ও শ্যামল চক্রবর্তীকে। এর মধ্যে অলকাদিকে আমি আগে থেকে চিনতাম। তিনি তখন সিপিআই-এর তরফে শিক্ষা আন্দোলনে বেশ বড়ো নাম। প্রতিমাদি শান্তশিষ্ট মানুষ, খুব বেশি কথাবার্তা বলতেন না। অলকাদি নানা অভাব অভিযোগ নিয়ে অধ্যক্ষের ঘরে প্রায়ই ডেপুটেশনের আয়োজন করতেন। আমরা সঙ্গে যেতাম। বলা কওয়া যা সে অলকাদিই করতেন। আমাদের পিছনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকলেই কাজ চলে যেত। রমাকান্তবাবু গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্য ও দর্শনের গবেষক, নিধুবাবুর গান নিয়ে বই লেখেন, কাজেই তাঁরই বা গল্পের স্টক কম হবে কেন। কিন্তু ওই পর্বে আমাদের যে-আড্ডাটা খুব জমত সেটা হল ওই কল্যাণ দত্ত, সুবোধ দত্ত আর শ্যামল চক্রবর্তী।
ক্লাসের পরে কফি হাউসে। আমি তখন থাকতামও একেবারে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে। কাজেই সব মিলিয়ে আড্ডা সোনায় সোহাগা। সুবোধবাবু এবং শ্যামল চক্রবর্তী দু-জনেই আমার চেয়ে সিনিয়র। শ্যামল চক্রবর্তী বেশ অনেকটাই বড়ো, আমি শ্যামলদা বলেই ডাকতাম। কল্যাণবাবু সমেত এঁরা তিনজনেই তখন সিপিআই। তখন একটাই পার্টি। ভাগাভাগি হতে আরও খানিক দেরি আছে। সে সব সংকট তৈরি হবে ১৯৬২-র চীন-ভারত যুদ্ধের পর থেকে। আমি যে-সময়ের কথা বলছি তখনও পার্টির ভিতরে বা কাছাকাছি মানুষ যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে সেই কুরে-কুরে-খাওয়া সংশয় দানা বাঁধেনি। ১৯৫৬-তে সোভিয়েত পার্টির বিশতম কংগ্রেসে খ্রুশ্চেভের স্তালিন সমালোচনার পরে অনেকের মনে ধাক্কা লেগেছিল। কেউ কেউ তখন থেকে খানিক সংশয়ী মন নিয়েও পার্টির মৌলিক আদর্শে ও ভূমিকায় মোটের উপর লগ্নই ছিলেন। ১৯৬৪-র পার্টি বিভাজনের সময়ে অনেকের বেলাতে অনেক কিছু ওলটপালট হয়ে গেল। তারপরে নকশালবাড়ি উত্থানের পরে সবকিছু আরও জটিল হয়ে গেল। আর সোভিয়েত ভাঙনের পর থেকে যা দাঁড়ালো তাতে পুরোনো হিসাবপত্রে বেবাক গোলমাল পাকিয়ে গেল। ইতিমধ্যে স্থানীয়ভাবে আমাদের এখানে পশ্চিমবঙ্গে সেই চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের পর্বে সবকিছুর আদলবদল হয়ে গেল। আনুষ্ঠানিক উচ্চারণের বাইরে তখন কান পাতলেই যে হা-হুতাশ, যে বক্রোক্তি শোনা যেত, আমার অভিজ্ঞতায় তা একেবারে নতুন জিনিস। সেই হা-হুতাশের মুহূর্তে তাঁদের নিজেদের অনেক পুরোনো অভিজ্ঞতা তাঁদের নিজেদের কাছে এত নতুন আলোতে দেখা দিচ্ছে যে অনেকেই সেই নতুন বোধ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকের ক্ষেত্রে তা মানসিক সংকট, আবেগের সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এতটা কথা এখানে তুললাম শুধু এইটুকু বোঝাতে যে, ১৯৬০-এ আমাদের কফি হাউসের আড্ডাটা ছিল অনেক নিটোল। স্তালিনী ধাঁচ থেকে খানিক সরে এলেও মোটের উপর সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন বিশ্বের সমাজতান্ত্রিকতায় ওঁরা তিনজনেই তখনও, আমার ধারণা, বেশ শামিল ছিলেন। শ্যামলদাকে তখন খুব বিষণ্ণ লাগত। সেটা সম্ভবত ততটা রাজনৈতিক নয়, ওঁর ব্যক্তিগত জীবনে তখন খুব সংকট চলছিল। এসব কথা বলতে গেলেই আশঙ্কা হয় ভুল করে ফেলছি কিনা। পরিষ্কার বোঝা যায় না সবকিছু। শ্যামলদা পরে জিডিআর, অর্থাৎ পূর্ব জার্মানিতে গিয়েছিলেন। সেখানে থাকতেই ওঁর মৃত্যু হয়। এখনও পুরোনো লোকেদের সঙ্গে ওঁর বিষয়ে নানা কথা হয়। তবে সেরকম মানুষের সংখ্যাও আমাদের এখন খুব কমে এসেছে। তা হবারই কথা। সেকালের মাস্টারমশাইদের মতো ধুতি-পাঞ্জাবি-পরা, বিষণ্ণ, একটু চাপা স্বভাবের শ্যামলদার কথা মনে পড়ে। সুবোধবাবু ছিলেন বোধহয় বয়সে আমাদের আর একটু কাছাকাছি। খ্রুশ্চেভ-বুলগানিন পর্ব পেরিয়ে গেছে, কিন্তু চেকোশ্লোভাকিয়া পর্ব তখনও দেরি আছে। কথাটা তুলছি এই কারণে যে, সেখানকার প্রতিবাদী আন্দোলন সামলাতে শেষ পর্যন্ত সোভিয়েতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের প্রশ্নে ভারতের কমিউনিস্ট মহলে বেশ বড়ো রকমের সমালোচনা দেখা দিয়েছিল। সোভিয়েতপন্থী অনেকেরই সংশয় এতদূর পৌঁছেছিল যে তাঁরা প্রকাশ্যে বিবৃতিও দিয়েছিলেন। তবে এটাও ঠিক যে, তারপরেও সবকিছু সত্ত্বেও চীন-বিরোধী সোভিয়েত অনুগামী কমরেডকুল অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন তা নয়। একজনকে আমিই জানতাম। তিনি পার্টি সদস্যও ছিলেন বলে মনে হয় না। তাঁর মুখের লব্জই ছিলঃ মার্ক্সবাদীও হবেন আবার চীনপন্থীও হবেন তা চলবে না। সুবোধবাবুর অবস্থান এই পর্বে কেমন ছিল আমার জানা ছিল না। মাঝখানে অনেকদিন ওঁর সঙ্গে দেখাশোনা হয়নি। অনেক পরে, সোভিয়েত ততদিনে ভেঙেচুরে গেছে, একদিন এক অনুষ্ঠানবাড়িতে দেখা হয়েছিল। ভিড়ভাট্টার মধ্যে একপাশে একটু সরে দাঁড়িয়ে ওরই মধ্যে ওঁর প্রশ্ন ছিল, সোভিয়েতের ব্যাপারটা কী বুঝছেন। সোভিয়েততন্ত্রের অবসানে এই যে একরকমের বৌদ্ধিক আবেগের মনন সংকট, এর জুড়ি ইতিহাসে কোথায় কী আছে তার ইতিবৃত্ত খুব লেখাজোখা আছে কিনা জানি না। ফরাসি বিপ্লবের পরে অনেকের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সংকটের যেসব কথা শোনা যায়, তার চরিত্র মনে হয় এর থেকে আলাদা। বিপ্লবের অব্যবহিত পরে হিংসাশ্রয়ী আতিশয্যের দৃশ্যে বিবেকী মন ব্যাহত বোধ করতেই পারে। সোভিয়েত বিপর্যয় অনেকেরই কাছে দেখা দিয়েছিল এক বিকল্প বিশ্বতন্ত্রের বিপর্যয় হিসেবে। এই বিপর্যয়বোধের সঙ্গে মনন স্তরে জড়িয়েছিল অনেক দীর্ঘকালীন বিনিয়োগ ও রোমন্থন।
কল্যাণবাবুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক বেশি সময়ের। এইসব প্রশ্ন নিয়ে ওঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগও হয়েছে অনেক বেশি। চেকোশ্লোভাকিয়া সমস্যার সময়ে, ১৯৬৮-তে কল্যাণবাবু অনেক সমালোচনাত্মক মনে পৌঁছে গেছেন। এ কথার মানে অবশ্যই এই নয় যে, উনি নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ করে প্রতিবাদে পার্টি থেকে বেরিয়ে এলেন। অনেকে এইরকম সোজাসাপটা আচরণ বিবেচনা করতে পছন্দ করেন। তাঁরা মনে হয় এইজাতীয় সমস্যার হদিশ বেশ মনের মতো করে বিশেষ পাবেন না। বস্তুত এই যে মনোভঙ্গির ইতিহাসের কথা বলছি এর উপাদান সংগ্রহ ঠিক সেই কারণেই রীতিমতো জটিল। মনোভঙ্গিতে কল্যাণবাবু যতদূর বোঝা যায় বেশ সদর্থেই সিপিআই-পন্থীই ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পথের তিনি মোটের উপর সমর্থক। কেবল ওই জরুরি সময়ের দু-বছরের ব্যতিক্রম ছাড়া। উনি বলতেন এভাবে - দেখুন ইন্দিরা গান্ধীর পথই আসল পথ। পশ্চিমবঙ্গে যখন সিএডিসি হচ্ছে, উনি ওই ধাঁচের উৎসাহী সমর্থক ছিলেন। কেননা ওই সিএডিসি-র আদলের পদ্ধতিতে এগোলে খানিক সমবায়ী প্রথায় কৃষিতে পুঁজিতান্ত্রিক বিকাশ হবে। সিএডিসি, কম্প্রিহেন্সিভ এরিয়া ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন। তার অন্তর্গত প্রকল্পগুলির পরিচয় সিএডিপি, কম্প্রিহেন্সিভ এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট। চিন্তা ছিল পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেক জেলায় একটি করে এই প্রকল্প গড়ে তোলা হবে। এরা কাজ করবে খানিকটা আদর্শ কৃষি খামার হিসেবে। মূলমন্ত্র সংকর বীজ, রাসায়নিক সার, ডীপ ও শ্যালো দু-রকম নলকূপ বাহিত পথে কৃত্রিম সেচ। কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের একটা সাংগঠনিক চেহারা। আদর্শ খামারের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ক্রমে ক্রমে এই সবুজ বিপ্লব ছড়িয়ে পড়বে অন্যত্র। এইভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি, তার ভিত্তিতে কৃষি উদ্বৃত্ত, সেই কৃষি উদ্বৃত্তের ভিত্তিতে শিল্প রূপান্তর। মোটামুটি এই এক দৃশ্যপট।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আরম্ভ করে সত্তর দশকে পৌঁছোতে পৌঁছোতেই সবুজ বিপ্লবপন্থী উন্নয়ন মডেলের অনেক সমালোচনা নানাদিকে দানা বাঁধে। কিন্তু তার গতিপথ তার জন্যে যে খুব রুদ্ধ হয়েছে তা বলা যাবে না। ব্যাপারটা মোটের উপরে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। বামপন্থী মনের একাংশেও এই কিঞ্চিৎ বৃহদাকার পরিবেশ প্রতিকূল উন্নয়নধারার প্রতি একরকমের সহানুভূতি ছিল। কল্যাণবাবুর বেলায় যতটা বোঝা যায়, সাধারণভাবে বামপন্থী রাজনীতি বিষয়ে উদ্যমে খানিকটা হয়তো ভাটা পড়েছিল। কিন্তু এই ধাঁচের রাজনীতি ও বিকাশপন্থায় খুব সংশয় ছিল তা আমার মনে হয় না। আসলে প্রচলিত মার্ক্সবাদ ও তৎসংলগ্ন রাজনীতি, এই ঘেরের মধ্যেই ওঁর রাজনৈতিক অবস্থান। এরই মধ্যে ওঁর সংস্কার ভাবনা। পার্টির দৌরাত্ম্য বিষয়ে ওঁর মন যথেষ্ট সজাগ ছিল। সোভিয়েততন্ত্রের রাষ্ট্রীয় দাপট বিষয়ে উনি সমালোচনার পথেই ছিলেন। চেকোশ্লোভাকিয়া পর্বে ওঁর প্রকাশ্য অবস্থানই তাই ছিল। লেনিনের চিন্তাভাবনার মধ্যেই উনি এসবের নিরসনের সম্ভাবনার কথা ভাবতেন বলেই মনে হয়। সমগ্র লেনিন রচনাবলী ওঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। বস্তুত ওই বইগুলো বিভাগে ওঁর বসার ঘরের আলমারিতেই ছিল। শেষদিকে উনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। উনি ঠিক গুছিয়েগাছিয়ে অবসর নেবার সময় পাননি। চাকরির মেয়াদ আরও কিছুদিন ছিল। শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ায় নিজেই ছেড়ে দেন। আমরা বলেছিলাম, দেখুন না আরও কিছুদিন, এত তাড়া করার কী আছে। উনি বলেছিলেন, না, আর পড়ানোর কাজে ফিরতে পারব না। শেষ দিকটায় খানিকটা সুস্থ হবার পরে আবার বাড়িতে বসে কিছুটা লেখাপড়ার কাজ শুরু করেন। ওই সময়টাতেই 'আমার কমিউনিস্ট জীবন' নামে আত্মজীবনীর বইটা লেখেন। ফুলস্ক্যাপ কাগজে বড়ো বড়ো হরফে লেখাটা একটু একটু করে লিখতেন। আমরা ওঁর বেলগাছিয়ার বাড়িতে মাঝেমাঝে যেতাম। আমি আর রঞ্জিত দাশই যেতাম বেশিরভাগ সময়ে। যে পর্যন্ত লেখা হয়েছে সেই পর্যন্ত আমার হাতে দিয়ে বলতেন, রেখে দিন আপনার কাছে, আমি বেঁচে থাকতে ছাপতে দেবেন না। আমাদের স্বপনের খুব আগ্রহ ছিল বইটা ছাপানোর। আমি বলতাম, এখন থাক। উনি স্পষ্ট করে বলেছেন কথাটা। স্বপনও খুব জোর করেনি। কল্যাণবাবুর মৃত্যুর পরে শিপ্রাদি, মদনবাবু, এঁরা উৎসাহ করে বের করেন বইটা। মদনবাবু, মদন ভট্টাচার্য, আমরা যখন ওঁকে জানতাম, তখন তিনি একজন প্রকাশক। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইজাতীয় বই প্রকাশ ও বিক্রি করাই ছিল ওঁর তখনকার জীবিকা। কিন্তু তার পাশাপাশি উনি একটু অন্যধারার বইপত্র বেশ নিয়মিত প্রকাশ করতেন। গ্রামশি, বুখারিন, রোজা লুক্সেমবার্গ এই ধরনের লেখকদের রচনা নিয়ে মদনবাবু তখন বেশ মেতে উঠেছিলেন। যতদূর জানি উনি অল্প বয়সে সিঁথি অঞ্চলে পার্টিকর্মী ছিলেন। সেই পর্বে উনি কলাণবাবুর পার্টি সহকর্মী। কল্যাণবাবুকে ভালোবাসতেন। ওঁর প্রকাশিত ওইসব অন্যধারার মার্ক্স প্রাসঙ্গিক তত্ত্বচিন্তার বই কল্যাণবাবুকে পৌঁছে দিতেন। মদনবাবু নিজে তখন কমিউনিস্ট চিন্তার মূলধারা বিষয়ে যথেষ্ট সমালোচনাত্মক। কিন্তু কল্যাণবাবু তখন আর সেই সমালোচনায় খুব সাড়া দেবার জায়গায় ছিলেন বলে আমার মনে হয় না। মোটামুটি বলতেনও সেকথা।
ওই বেলগাছিয়ার বাড়িতে যখন যেতাম আমরা, তখন একদিন বলেছিলেন, লেনিনের বইগুলো ডিপার্টমেন্টে রয়ে গেছে, থাকলে একটু দেখা যেত। পাঠিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। যাদবপুর থেকে একগাড়ি লেনিন সেদিন বেলগাছিয়া গিয়েছিল। ওই সময়ে উনি থাকছিলেন নিজের বাড়িতেই বড়ো মেয়ের তদারকিতে। পার্টির দিক থেকে যতটা বুঝতে পারতাম উনি তখন তুলনায় বেশি সক্রিয় ছিলেন শান্তি আন্দোলনে। সবাই জানে সারা বিশ্বজুড়ে শান্তি আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির এক সময়ে ছিল খুব অগ্রণী ভূমিকা। কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন 'বিশ্ব শান্তি সংসদ'-এর ১৯৪৯-এর 'বিশ্ব শান্তি কংগ্রেস' ছিল তখনকার খুব উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্যারিসে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের পোস্টারে ব্যবহৃত হয়েছিল সেই বিখ্যাত পিকাসোর শ্বেত শান্তি কপোত। কালো পটভূমিতে লিথোগ্রাফের কালির ওয়াশের কাজ। ওই পায়রা নাকি পিকাসো উপহার পেয়েছিলেন শিল্পী-বন্ধু অঁরি মাতিসের কাছ থেকে। আর শান্তি সম্মেলনের পোস্টারে ব্যবহারের ভাবনা নাকি কবি লুই আরাগঁ-র। এখন ভাবলে মনে হয় কোথা থেকে কী যে সব হয়ে গেল। শান্তি আন্দোলনের জলও একদম ঘুলিয়ে গেল। কলকাতাতেও তখন বড়ো করে শান্তি সম্মেলন হয়েছিল মুহাম্মদ আলি পার্কে। আমারও একদিন যাবার সুযোগ হয়েছিল। সেদিন গান গেয়েছিলেন সুচিত্রা মিত্র। ওঁর গলায় 'কৃষ্ণকলি' সেই আমার প্রথম শোনা। কল্যাণবাবু তখন থেকেই শান্তি আন্দোলনের কর্মী। ওঁর যেদিন শরীর খারাপ হল সেদিনও উনি শান্তি কমিটির কোনো মিটিং-এ বেরোচ্ছিলেন। ওঁদের দপ্তর ছিল বোধহয় লেনিন সরণিতে। মাথার যন্ত্রণায় নিজেই জানলা দিয়ে পাড়ার ছেলেদের ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। স্ত্রী আপিস থেকে তখনও ফেরেননি। আর. জি. কর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আমরা একদিন বাদে খবর পাই। গিয়ে জানা গেল বেশ বড়ো রকমের ব্রেন স্ট্রোক। সেখান থেকে দু-একদিন বাদে সরানো হল এসএসকেএম-এর নিউরোলজিকাল বিভাগে। সেখানে চিকিৎসায় ভালো হয়ে উনি বাড়ি ফিরলেন। কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, হাতে পায়ে প্যারালিসিস। আস্তে আস্তে কথা খানিক ফিরে এল। টেনে টেনে আবার কথা বলা শুরু হল। বড়ো বড়ো অক্ষরে হাতের লেখাও ফিরে এল। ওই তখনই আবার লেখালেখি একটু শুরু করলেন।
উনি বাড়ি ফেরার অল্প পরে ওঁর স্ত্রী আবার নিজের আপিসের কাজে যোগ দিলেন। হঠাৎ একদিন বাড়ি ফিরে রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পরে টিভি দেখতে দেখতে তাঁর শরীর খারাপ হল। সেই রাত্রেই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। সেইদিন বা দু-একদিন বাদেই তিনি চলে গেলেন। ওই সময়ে ওঁর ছোটো মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। সে বিয়ে তখনকার মতো পিছিয়ে গেল। কিন্তু খুব বেশি দেরি না করে যথারীতি তার বিয়ে হয়ে গেল। সেই সময়ে বড়ো মেয়ে তার সংসার নিয়ে এই বাড়িতেই থাকত। আমরা যখন কল্যাণবাবুর কাছে যেতাম সে-ই আমাদের চা-টা দিত।
কল্যাণবাবুর জীবনের এই দুর্যোগ পর্বের কথা বলতে গেলে একটা কথা বলতেই হয়। আমরা নিজেরাও এই কথাটা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতাম। নিজে অশক্ত, পারিবারিক বিপর্যয়, রাজনীতির জগতে ওঁদের দিক থেকে শূন্যতা (তাও অনেকটাই ওঁকে দেখে যেতে হয়নি), কিন্তু হতাশ্বাস, হাহুতাশ বা অভিযোগ কোনোদিন শুনিনি ওঁর মুখে। ওই যে ওঁর বাড়িতে যেতাম, কিছুক্ষণ গল্প করে কথাবার্তা বলার পরে নিজেই বলতেন, আপনারা অনেক দূরে যাবেন, এবার উঠে পড়ুন। আবেগপ্রবণ হতে দেখিনি। মুখে তেতো স্বাদ লাগে এমন কোনো কথা শুনিনি ওঁর কাছে কোনোদিন।
ওঁর ছোটো মেয়ের বিয়ের দিনের একটা কথা বলি। সবাই জানে কল্যাণ দত্ত, অম্লান দত্ত আর সন্তোষ ভট্টাচার্য সহপাঠী এবং নানা টানাপোড়েনেও বন্ধুতা অমলিন। বস্তুত ওঁদের একটা আড্ডার পিকনিক হতো মাঝেমাঝে। কল্যাণবাবু অসুস্থ শরীরেই যেতেন সেখানে। অম্লান দত্ত গাড়ি করে নিজের দায়িত্বে নিয়ে গিয়ে আবার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যেতেন। তা কল্যাণবাবুর ছোটো মেয়ের বিয়ে হবে। অবশ্যই অম্লান দত্ত এবং সন্তোষ ভট্টাচার্য দু-জনেই নিমন্ত্রিত। আমরাও আছি কয়েকজন। ওঁদের বেলগাছিয়ার বাড়িতেই অনুষ্ঠান। কল্যাণবাবু শরীর অশক্ত। একতলার ঘরেই নিজের মতো আছেন। অনুষ্ঠানের হইচই বাড়ির অন্যদিকে, খাওয়াদাওয়ার আয়োজন বাড়ির ছাদে। আমরা একতলায় কল্যাণবাবুর কাছে বসে গল্পগাছা করছি। অম্লানবাবুও আছেন, সন্তোষবাবু তখনও আসেননি। অম্লান দত্তের বেশ একটা অপ্রচলিত চেহারা পাওয়া যাচ্ছে। বাড়ির লোকজনেরা মাঝেমাঝে এ ঘরে ঢুকে পড়ছে একাজে সেকাজে। ওবাড়ির প্রায় অনেকেই তাঁর চেনা। দিব্যি অন্য সুরে তাদের সঙ্গে টুকটাক কথাবার্তা বলছেন। কল্যাণবাবুর ছোটো বোন ঢুকেছেন একসময়ে। এখন তিনি বৃদ্ধা, নিদেন প্রৌঢ়া। কিন্তু দাদার বন্ধুর চোখে কিশোরী। অম্লান দত্ত প্রায় উচ্ছ্বাসের সুরে ডাকনাম ধরে, এ কী, এ চেহারা কেমন করে হল! সেও তখন সোজাসুজি উত্তর দিয়ে গেল, এই যেমন করে হয় আর কী। এইসব হচ্ছে, এমন সময়ে শোনা গেল সন্তোষবাবু এসে গেছেন, গাড়ি থেকে নামছেন। আমরা বললাম, তাহলে এবার উঠি, এখনই এখানে ঘেরাও বসে যাবে। সেই সময়ে সন্তোষবাবু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ক্যাম্পাসের বাম ছাত্র বিক্ষোভে নিয়মিত গোলমাল তখনকার রেওয়াজ। সন্তোষবাবুর তখনও সেই সুঠাম টানটান চেহারা। উনি ঘরে ঢুকতেই আমরা বললাম, এবার ঘেরাও হবে, আমরা যাই। উনি শান্ত গলায় হেসে বললেন, কিছু হবে না, বোসো। জিজ্ঞাসা করলাম, তা কী বুঝছেন, কী দাঁড়াবে। শান্ত সহজ গলায় বললেন, কী আবার দাঁড়াবে, ঘ্যাস্তা ঘ্যাচাং চলবে। কিছু পরে সন্তোষবাবুকে খাবার জন্যে উপরে ডেকে নিয়ে গেল। আমরা আর একটু বসে উঠে পড়লাম। কল্যাণবাবু বললেন, হ্যাঁ,আপনারা চলে যান, কিন্তু সন্তোষ এত দেরি করছে কেন, কী এত খাচ্ছে!
কল্যাণবাবু রাজনীতিতে এসেছিলেন অল্প বয়সে। তখনকার সময়ের চরিত্রটাই ছিল আলাদা। ওই বিটিআর পর্বে উনি তখন পার্টিতে। যতদূর মনে পড়ছে কথাটা ওঁর আত্মজীবনীতে আছে। ওই সময়কার চণ্ডনীতির আবহে ওঁর হাতেও দেশি বোমা ধরিয়ে দিয়ে বরানগরের কাছে কোনো চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটের সময়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওঁর অস্বস্তি গা ছমছম ভাব সবই যা হবার তাই হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই পর্ব নিয়ে ঈষৎ বিষণ্ণ হাসির যে-মনোভঙ্গি সে পর্যন্ত অন্য অনেকের মতো উনিও পৌঁছোতে পেরেছিলেন বলেই মনে হয়। কিন্তু পার্টিপর্ব জীবনকে একটা কিছু দিয়ে গেছে, এই বোধ কল্যাণবাবুর জীবনযাপনে এবং লেখালেখিতে পাওয়া যায়। এটা কিন্তু বেশ বড়ো কথা। দেখেছেন অনেকখানি। তেতোভাব, মনে বিদ্বেষ পোষণ করা, এই জাতীয় ঝোঁক ওঁর মধ্যে দেখিনি। আবার বামমার্গী মানুষের অনেকের মধ্যে এমন একধরনের বিষাদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে ইদানীং, তাও ঠিক ওঁর মধ্যে আমি পাইনি। খুব বড়ো কোনো দৃষ্টিঘেরে তেমন করে পৌঁছোতে না পারলেও সহজ জীবনের একরকম অভিযোগহীন প্রসন্নতা উনি অনেকটা অর্জন করতে পেরেছিলেন বলেই আমার বিশ্বাস।