আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

বাণিজ্যযুদ্ধের দুনিয়া ও টাকার রাজনীতি

অনন্য মুখার্জি


সাম্প্রতিক সময়ে সব গণমাধ্যমে তুমুল আলোচনার বিষয় সোনার দাম প্রায় প্রতিদিন উত্তরোত্তর রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনো। ১৯৯৬ সালের পর এই প্রথমবার, বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চেয়ে বেশি পরিমাণ সোনা জমা করে রেখেছে। বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা বাণিজ্যযুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মিলিত প্রেক্ষাপটে এই দুটো ঘটনা একটা বড় প্রশ্ন তোলে যে এই এসবের পেছনের কারণগুলো কী? সেটা বুঝতে হলে, আমাদের বুঝতে হবে টাকার বিবর্তন আর তার রাজনীতিকে। টাকা মানুষের কাছে সবসময়ই আকর্ষণীয়। অর্থায়িত সমাজে টাকা দিয়ে প্রায় সবকিছু কেনা যায়। টাকা যে কোনো পণ্য বা পরিষেবা কিনতে পারে, এই চরিত্রই একে মানব ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এবং রহস্যময় উদ্ভাবন করে তোলে। একটি চেয়ার বা রুটির মতো, টাকার স্বকীয় ব্যবহারিকতা বা ব্যবহার মূল্য কিছু নেই। টাকার মূল্য প্রতীকী, যা সমাজের সবাই স্বীকার করে। ধরুন, আপনি বাজারে একটি শার্ট নিয়ে গেলেন এবং আলু বা একটি চেয়ার দিয়ে বদলাতে চাইলেন, যেটা খুবই দুঃসাধ্য হবে। কিন্তু টাকার বিনিময়ে সহজেই শার্ট বা চেয়ার দুটোই কেনা যায়। মার্কস একে "universal equivalent” বলেছেন - একটি জিনিস যা যে কোনো অন্য জিনিসের বদলে ব্যবহার করা যায়। শৈশব থেকেই আমরা টাকার এই বিশেষত্ব শিখি। বাবা-মায়ের দেওয়া চকচকে কয়েন তার মানে সম্পূর্ণ বোঝার আগে থেকেই একে জাদুময় মনে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাকা আমাদের জীবনের এবং অনুভূতির গভীর অংশ হয়ে যায়। কিন্তু টাকা সবসময় ছিল না। কেন তা এসেছে তা বোঝার জন্য আমরা একটি সহজ অর্থনীতির কথা ভাবতে পারি।

ধরুন, কয়েকটি পরিবার একসাথে কোনো প্রান্তিক অঞ্চলে থাকে। তারা নিজের জন্য খাবার উৎপাদন করে, কাপড় বানায়, ঘর তৈরি করে। তারা নিজেই সবকিছু উৎপাদন ও ব্যবহার করে। এমন আত্মনির্ভর ব্যবস্থায় বিনিময়ের দরকার নেই, তাই টাকারও প্রয়োজন পড়ে না। এবার ধরে নিন, এই ছোট গ্রুপটি বড় হয়ে একটি গ্রামের রূপ নিলো, যেখানে পঞ্চাশটি পরিবার থাকে। তারা কাজ ভাগাভাগি করতে শুরু করে। কেউ রুটি বানায়, কেউ কাপড় বানায়, কেউ আগুনের কাঠ জোগায়। প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়ার জন্য তারা সপ্তাহে একবার খোলা মাঠে গিয়ে নিজের পণ্যগুলো বিনিময় করে। এটিই বাজারের শুরু। প্রথমে তারা সরাসরি জিনিসগুলো বদলাতে থাকে, যা barter বা সরাসরি বিনিময় নামে পরিচিত। কিন্তু এতে একটি বড় সমস্যা আছে। এটি তখনই কাজ করে যখন দুইজনই একে অপরের তৈরী জিনিস চায়। রুটি বিক্রেতা একটি শার্ট চায় কিন্তু শার্ট বানানোর লোক রুটি চায় না, তাহলে বিনিময় সম্ভব নয়। বিক্রেতাকে রুটিসহ বাড়ি ফিরে যেতে হবে আর রুটিগুলোও নষ্ট হবে। এই সমস্যার সমাধান করতে গ্রামটি টাকা উদ্ভাবন করে, এমন একটি জিনিস যা সবাই গ্রহণ করতে রাজি থাকে। এখন রুটি বিক্রেতা রুটি বিক্রি করে টাকা পায়, পরে সেই টাকায় শার্ট কিনতে পারে। মানুষ যেটাতে সম্মতি দেয়, সেটাই টাকা হতে পারেঃ শামুক, পাথর, ধাতু বা এমনকি পশু।

মূল বিষয় ফলে টাকা শারীরিকভাবে কী রূপের তার মধ্যে নয় বরং সবাই কোন রূপে একে বিনিময়যোগ্য মাধ্যম হিসেবে বিশ্বাস করে তার ভেতরে নিহিত। টাকা কাজ করে শুধু মানুষজন একত্রিতভাবে এতে বিশ্বাস রাখার কারণে। যদি মানুষ টাকার ওপর বিশ্বাস হারায়, যদি তারা বিশ্বাস না করে যে অন্যরা এটি মেনে নেবে, তাহলে টাকা কার্যকর হয় না। এজন্য রাষ্ট্রকে টাকার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কারণ অনেক ধরণের টাকা বাজারে এলে বিভ্রান্তি তৈরী হতে পারে। বেশি টাকা ছাপালে মুদ্রাস্ফীতি হয় যার ফলে টাকার মূল্য কমে যেতে পারে। রাষ্ট্র তাই সেন্ট্রাল ব্যাংক সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, টাকার নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্বাস রক্ষা করার জন্য।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় টাকা আরও শক্তিশালী এবং জাদুময় ভূমিকা নেয়। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি labour power বা শ্রমশক্তি বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পুঁজিবাদে গোড়া থেকেই একটা স্থায়ী দ্বন্দ্ব থাকেঃ শ্রমিক যত বেশি শ্রম করে কম উপার্জন করবে, মালিক তত বেশি লাভবান হবে। এ কারণেই ক্রমাগত মজুরি কমানো, কাজের সময় বৃদ্ধি, এবং সস্তার শ্রম আহরণ করার নানাধরণের পথ খোঁজা চলতে থাকে। এই সামগ্রিক ব্যবস্থা কেবল অসাম্য তৈরি করে না, সামাজিক সংস্কৃতিকেও আকার দেয় শোষণ, সামাজিক শ্রেণিবিভাগ ও তাদের মধ্যেকার ক্ষমতার বিন্যাসকে স্বাভাবিক করে তুলতে। এজন্য সমাজে কিছুটা গণতন্ত্র থাকলেও কাজের জায়গায় একটুও গণতন্ত্র থাকে না। ছোট্ট একটি অংশ অর্থাৎ মালিক ও ম্যানেজার নির্ধারণ করে কী উৎপাদিত হবে, কিভাবে উৎপাদিত হবে, এবং কে লাভবান হবে। এই ব্যবস্থাপনা আরো জটিল হয়ে ওঠে যখন কাজের জায়গা আর জীবনধারণের জায়গা অর্থাৎ বসবাসের জায়গা একই হয়ে যায় যেটি আমরা মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের ক্ষেত্রে দেখতে পাই যেখানে জীবনধারণের সময় অর্থাৎ শ্রমিকের জীবনের সামাজিক পুনরুৎপাদনের সময় আর বিনিময় মূল্য বা এক্সচেঞ্জ ভ্যালু তৈরী করার সময়ের মধ্যে কোনো ফারাক থাকেনা। আর এই পুরো ব্যবস্থাটা নিয়ন্ত্রিত হয় কোনো ব্যক্তির কাছে টাকার যোগান থাকা বা না থাকার মধ্য দিয়ে। যেহেতু প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থায় সামাজিক লেনদেন টাকা ছাড়া সম্ভব নয় যার কাছে টাকা নেই বা তুলনামূলক কম তাকে তার জীবনধারণের জন্য যার কাছে টাকা আছে তার কাছে নিজের শ্রম বিক্রি করতে হয় বা স্বনিযুক্ত হওয়ার জন্য তার থেকে টাকা ধার করতে হয় সুদের পরিবর্তে।

ফলে টাকার গল্প কেবল নোট বা কয়েনের গল্প নয়। এটি মানুষের সম্পর্ক, বিশ্বাস, ক্ষমতা এবং সামাজিক ব্যবস্থার গল্প। টাকা হলো এমন একটি যন্ত্র যা আমরা বিনিময়ের সমস্যা সমাধানের জন্য তৈরি করেছি, কিন্তু পুঁজিবাদের মধ্যে এটি আরও জটিল হয়ে গেছে। সাধারণ পণ্য বিনিময়ের যুগে টাকা শুধু বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এক পণ্য বিক্রি করে টাকা উপার্জন করা হয় অন্য পণ্য কেনার জন্য। অর্থাৎ রুটি > টাকা > শার্ট। কিন্তু পুঁজিবাদে সে সম্পর্ক উল্টো হয়ে যায়। উৎপাদনশীল পুঁজিবাদে সম্পর্কটা হয় টাকা > পণ্য > আরো বেশি টাকা, আর বর্তমান ঋণকেন্দ্রিক পুঁজিবাদে সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকা > আরো বেশি টাকা। পুঁজিবাদে টাকা যা পুঁজির অন্যতম মূর্ত পণ্যরূপ তা যেন এক জীবন্ত, আত্মবর্ধনশীল স্বাধীন সত্তায় পরিণত হয়। পুঁজিবাদ যত এগোয়, টাকা ততই অদৃশ্য ও বিমূর্ত হয়। আগের মতো হাতে ধরা টাকা নয় চলে আসে ক্রেডিট, শেয়ার, বন্ড, ডেরিভেটিভস যেখানে টাকার মূর্ত পণ্যরূপ আরও দূরে সরে যেতে থাকে। মার্কস এই পর্যায়ে টাকাকে "self-moving substance” বলেছেন।

টাকা এখন একটি শক্তি যা নির্ধারণ করে কে ক্ষমতাধর আর কে নয়। অথচ এটি কাজ করে শুধু আমরা সবাই এতে বিশ্বাস করি বলে। ডলার, ইউরো, ইয়েন হলো সামাজিক বিশ্বাসের প্রতীক, একটা প্রতিশ্রুতি - যে কেউ যে কোনো স্থানে এর মান্যতা স্বীকার করবে। কিন্তু এই বিশ্বাস রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। যারা টাকার জারি ও নিয়ন্ত্রণ করে অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন সেন্ট্রাল ব্যাংক ইত্যাদি তারা অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। ফলে টাকা নিরপেক্ষ মনে হলেও এটি গভীরভাবে রাজনৈতিকঃ দৈনন্দিন জীবনে বৈষম্য এবং নির্ভরশীলতা তৈরি করার একটি যন্ত্র। যখন সম্মিলিত বিশ্বাস দুর্বল হয়, টাকা নিজেই অস্থির হয়ে পড়ে। ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থার পতন হয়েছে একমাত্র মানুষের বিশ্বাস হারানোর কারণে। একবার এমন হলে কোনো মুদ্রা ছাপানো বা নীতি পরিবর্তন স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে না, কারণ সমস্যা প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিক ও ব্যবস্থাগত।

কোনো দেশের সরকার লোভ বা অজ্ঞতার কারণে টাকা ছাপে না। তারা এটি করে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার জন্য শুধুমাত্র পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে। প্রতি কয়েক বছরে উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হয়, লাভ কমে যায়, মন্দা আসে। ব্যবসা বন্ধ হয়, শ্রমিক ছাঁটাই হয়, এবং করের আয় কমে যায় ঠিক তখন, যখন জনসাধারণের খরচের প্রয়োজন বাড়ে। পুরো ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ার জন্য রাষ্ট্রকে টাকা ছাপাতে হয় যাতে সেই টাকা বাজারে ছেড়ে থেমে যাওয়া অর্থনীতির চাকাকে কোনোভাবে চালু করা যায় সে দেউলিয়া কোম্পানিকে বাঁচাতে হোক বা ভর্তুকির মাধ্যমে মানুষের হাতে টাকার যোগান দিয়ে তার ক্রয়ক্ষমতাকে বাড়াতে হোক। এটি একটি সংকটকালীন জরুরি পদক্ষেপ, উৎপাদন পুনরায় চালু করা আর সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য। কিন্তু এতে মূল সমস্যার সমাধান হয় নাঃ সম্পদ সমাজের শীর্ষে ক্রমাগত জমতে থাকে। কারণ কোনো সরকারকে যদি টাকা ছাপাতে হয় তার বিনিময়ে তার সেন্ট্রাল ব্যাংককে সভারেন বন্ড ছাড়তে হয় - যা একধরণের ঋণ চুক্তিপত্র। আর এই চুক্তিপত্র বা বন্ড তারাই কিনতে পারে যাদের কাছে ইতিমধ্যেই বিপুল টাকার যোগান আছে। তারা ওই সরকারকে ৫, ১০ বা ৩০ বছরের জন্য টাকা ধার দেওয়ার পরিবর্তে সুদ হিসেবে আরো টাকা জমানোর সুযোগ পায়। কারণ যদি ধার দিয়ে বেশি লাভ করা যায় তাহলে সরাসরি উৎপাদন বা শ্রম কেনাবেচার মধ্যে যাওয়ার দরকার পুঁজিবাদীদের পড়ছে না। ফলে সার্বিক সামাজিক চাহিদায় খুব বেশি পার্থক্য তৈরী হয় না বরং অসাম্য আর ক্ষমতার একচেটিয়া কেন্দ্রীকরণ আরও বাড়তে থাকে। ফলে আর্থিক মন্দার সময় টাকা ছাপানোর প্রক্রিয়া হলো সেই কেন্দ্রিকরণের ওপর সাময়িক প্লাস্টার মাত্র।

যখন টাকার পরিমাণ তার বাস্তব মূল্যের চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে মানুষের তৈরি পণ্য ও পরিষেবার মূল্যের চেয়ে বেশি হয়, তখন মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। শ্রমের মজুরি জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে মেলে না, মানুষের সঞ্চয় তার মূল্য হারায় আর সাধারণ মানুষকে এর বোঝা বইতে হয়। টাকা ছাপানোর এই প্রক্রিয়া যা শুরুতে সংকটকালীন পদক্ষেপ হিসেবে আসে, ধীরে ধীরে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার স্বাভাবিক চরিত্রে পরিণত হয়ে পড়ে। সরকার বারবার হস্তক্ষেপ করে যেতে থাকে এমন একটি ব্যবস্থা বাঁচানোর জন্য যা অভ্যন্তরীণ ভাবে অস্থিতিশীল। প্রতিটি সংকট ও টাকা সৃষ্টির চক্র জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা আর সম্পদকে একটু একটু করে লুট করে যেতে থাকে আর অন্যদিকে যারা এই পুরো ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করেছিল সরকারকে ধার দিয়ে তাদেরও এই আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রতি অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। গোটা অবিশ্বাস আর ক্ষোভ গিয়ে জমা হয় টাকা জারি করা প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যমান বিশ্বায়িত মুদ্রাব্যবস্থার ওপর।

এ বিশ্বাসের কমে যাওয়া এই সময়ের আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্র আমেরিকান ডলার সহ গোটা বিশ্বের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রাগুলোকে প্রভাবিত করছে। যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টাকা ছাপে যুদ্ধ করতে, অলাভজনক কোম্পানিকে বাঁচাতে এবং অভ্যন্তরীণ খরচ মেটানোর জন্য, আর চীন ছাপে তার রপ্তানিভিত্তিক অর্থনীতি এবং সুবিশাল উৎপাদনব্যবস্থাকে চালু রাখার জন্য - তার ফলস্বরূপ এইমুহূর্তে বৈশ্বিক ঋণ-এর পরিমাণ মানবসভ্যতার ইতিহাসে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই এই গোটা মুদ্রাব্যবস্থার ওপর মানুষের অবিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছে। পুঁজিবাদী উন্নয়নের অর্থনীতির ব্যাপক গ্রোথ-এর গল্পের মিথ্যাটি আস্তে আস্তে সবার সামনে বেরিয়ে আসছে যে প্রচলিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একটা বায়বীয় কল্পনামাত্র, যার সাথে প্রকৃত অর্থনীতির অর্থাৎ উৎপাদন বা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। পুরোটাই বিভিন্ন দেশের সরকারের ব্যাপক পরিমাণে ছাপানো টাকায় ফোলানো একটা ফানুস - যার অন্তর্নিহিত বাস্তব মূল্য বাইরে দেখানো বিজ্ঞাপিত প্রজেক্টেড মূল্যর চেয়ে অনেক কম। আর এই সার্বিক সংকট থেকে বেরোতেই বিভিন্ন দেশের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কগুলি টাকা হিসেবে ধীরে ধীরে সোনার দিকে ফিরছে মুদ্রাব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য। ফলে সোনার দাম যে ক্রমাগত ডলারের তুলনায় বাড়ছে, এটি শুধু সোনার অন্তর্নিহিত মূল্য নয়, বরং টাকার দাম পড়ে যাওয়ার প্রতীক। যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন, ডলার সবচেয়ে স্থিতিশীল বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এক বছরের কম সময়ের মধ্যে ডলারের মূল্য প্রায় দশ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্বের অনেক ধনী ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান ডলার বিক্রি করতে শুরু করেছে, কারণ তারা আর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বে বিশ্বাস রাখে না। এটি কোনো আকস্মিক পতন নয়, বরং ভিতর থেকে ক্ষয়ে যাওয়া।

এর সাথে সাথে এই সংকটের আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাকঃ একটি ছোট গ্রামে যদি কোনো পরিবার রুটি উৎপাদন করে এবং পুরো গ্রামকে রাজি করায় যে রুটিই হবে সব লেনদেনের মাধ্যম, তবে তারা একমাত্র রুটির উৎপাদক হিসেবে ওই গ্রামের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এক অসাধারণ অবস্থানে চলে আসে। তাদের তৈরী রুটি সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের সবকিছুর জন্য বিনিময়যোগ্য হয়ে যায়, যেমন কাপড় থেকে শুরু করে হাতিয়ার পর্যন্ত। সবাইকে রুটিকেই টাকা হিসেবে মেনে নিতে হয়, কারো বাড়িতে রুটি খারাপ হয়ে গেলে সাথে সাথে আবার নতুন রুটি কিনতে হয় তাই রুটি উৎপাদনকারীরা শুধুমাত্র লেনদেনে না গ্রামীণ ক্ষমতার কাঠামোতেও বিশেষ সুবিধা পায়। এই একই ঘটনা ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে কাজ করছে। যারা বিশ্ব ফিন্যান্স পুঁজির অর্থাৎ টাকার মালিক - যারা বিভিন্ন দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে বন্ড অর্থাৎ সে দেশগুলোর ঋণ কিনে তার বিনিময়ে দেশগুলোকে টাকার যোগান দিচ্ছে তারা এই সংকট থেকে নিজেদের বিনিয়োগকে রক্ষা করতে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বেছে নিয়েছে। কারণ এই টাকা তৈরির ক্ষমতা বিভিন্ন দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংকের হাতে নেই বরং রয়েছে বহুজাতিক কোম্পানিদের হাতে। ফলে এই ক্রিপ্টোকারেন্সি যতটা সম্ভব গ্রহণযোগ্য করার মাধ্যমে তারা নিজেদের নতুন আর্থিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় অবস্থানে বসাতে চাইছে যাতে টাকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান থেকে তারা নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে পারে। এইভাবে, ক্রিপ্টোকারেন্সিকে তারা শুধু লেনদেনের মাধ্যম নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে হাতেগোনা সম্পদশালী ব্যক্তি ও কর্পোরেশনের হাতে কেন্দ্রীভূত এক জমিদারিতে পরিণত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। আগের জমিদারির সাথে এর পার্থক্য এটাই যে এই নতুন জমিদারিতে সম্পদের উৎস জমির মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং উৎস হলো টাকার শরীরী রূপ ও তার উৎপাদনের ওপর একচেটিয়া মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ।

গোটা বিষয়ে আমাদের শিক্ষণীয় এটাই যে টাকার দাম তখনই থাকে যখন মানুষ এতে বিশ্বাস রাখে। এটি কোনো দেবত্ব বা প্রাকৃতিক শক্তি নয়, একটি সামাজিক চুক্তির ফলাফল যা আমরা মানুষ, আমাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য তৈরি করেছি। আর যখন আমরাই এটা তৈরি করেছি, তাই আমরা এর পরিবর্তনও করতে পারি। পুঁজিবাদের শুরু থেকেই প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, ছোট একটি জনগোষ্ঠী অর্থাৎ মালিক, ব্যবস্থাপক, পরিচালক বোর্ড এরাই সব সিদ্ধান্ত নেয়। আর বিশ্বায়িত পুঁজিবাদে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সেই টাকার মালিকরা যাদের থেকে সরকারকেও ধার নিতে হয়। ফলে যে দলই সরকার চালাক না কেন এক অস্বস্তিকর সত্য এটাই যে - পুঁজিবাদ এবং গণতন্ত্র কখনও একসাথে থাকতে পারেনা। পুঁজিবাদ মানেই একটা অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যা hierarchy বা শ্রেণিভিত্তিক বশ্যতা চায়, অংশগ্রহণ নয়। যদি আমরা মনে করি মানুষ হিসেবে আমাদের স্বাধীনতা আর তাকে বজায় রাখতে গণতন্ত্র অপরিহার্য, তখন আমাদের ভাবতে হবেঃ সমাজে গণতন্ত্র সীমিত কেন? যদিও বা কখনও কখনও ভোট দিয়ে মসনদে বসা রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন ঘটানো যায়ও বা, কাজের জায়গায় কেন একটুও গণতন্ত্র নেই। যদি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ হতো, যারা নিজেদের শ্রম দিয়ে মূল্য তৈরি করে তারাই একজন এক ভোটের ভিত্তিতে একসাথে সিদ্ধান্ত নিত যে তাদের শ্রম থেকে কী উৎপন্ন হবে, কিভাবে উৎপাদন হবে, কিভাবে বিতরণ হবে এবং কে কতটা ব্যবহার করতে পারবে। আর এটা করার জন্য পুঁজিবাদীর প্রয়োজন নেই। বিষয়টা ঠিক বহুযুগ আগে কৃষকদের জমিদারকে ভয় পাওয়ার গল্পের মতো। কৃষকরা ভয় পেত যে জমিদারের অত্যাচারের প্রতিবাদ করলে জমিদার তাদের জমি কেড়ে নেবে। তারা এই ভয় নিয়েই থেকে যেত চিরকাল যদিনা একদিন একজন এসে তাদের বললোঃ "আচ্ছা একটা কথা জানেন কি? জমিদারকে সরানোর পর দেখবেন, জমিটা কিন্তু ঠিক ওখানেই আছে।"