আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
তথ্য জানার অধিকারের দুই দশক
অশোক সরকার
"হামারা পয়সা, হামারা হক" এই সুদূর প্রসারী স্লোগানটি উঠেছিল রাজস্থানে ১৯৯৬ সালে। বক্তব্য খুব সরল। জনতার টাকায় সরকার জনতার জন্য যে কাজ করছে, তার হিসাবনিকাশ জনতার জানার অধিকার আছে। প্রসঙ্গ ছিল সরকারি প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে ঘোটালা। কেউ টাকা পেত, কেউ পেত না, কেউ পেলেও কম পেত, সময়মতো পেত না। মজদুর-কিষান শক্তি সঙ্ঘের ছাতায় গণ আন্দোলন প্রশ্ন তুলেছিল, আমাদেরই হকের টাকা নিয়ে সরকার কী করে, তা আমাদের জানাতে হবে। এই আন্দোলনই তথ্য জানার অধিকার আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি পায়।
তবে রাজস্থান নয়, তামিলনাড়ুই প্রথম তথ্য জানার অধিকার আইন নিয়ে আসে ২০০২ সালে। তারপর রাজস্থান সমেত আরও সাতটি রাজ্যে অনুরূপ আইন হয়েছিল। শেষে ২০০৫ সালে দেশব্যাপী আইন। অবশ্য মাঝে ২০০২ সালে লোকসভায় 'Freedom of Information Act' গৃহীত হয়েছিল, তাকে পালটে 'তথ্য জানার অধিকার আইন' (Right to Information Act - RTI) গৃহীত হয় ২০০৫ সালে।
এ বছর এই আইনের ২০ বছর বয়স হল। আসুন দেখি সরকার ও সমাজ কতটা তাকে গ্রহণ করেছে।
প্রথমে সমাজের কথা। নানা হিসাব বলছে প্রতি বছর এই আইনকে ব্যবহার করে ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ আবেদন জমা পড়ে। দেশে যেহেতু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়, তাই এই সংখ্যাটি সত্যিই গর্ব করে বলার মতো। হ্যাঁ বেশির ভাগ আবেদনই ব্যক্তিগত স্বার্থে - পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পেলে, রেশন কার্ড না পেলে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ না পেলে - এই ধরনের ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। হবে নাই বা কেন। শাসন ব্যবস্থা তো ব্যক্তি ও সমষ্টি দুইয়েরই কল্যাণের জন্য। কাজেই ব্যক্তি স্বার্থে এই আইন বহুল ব্যবহৃত হবে এটাই তো স্বাভাবিক। সঠিক হিসাব না পাওয়া গেলেও তিন ভাগের দুই ভাগ আবেদন যে ব্যক্তি স্বার্থে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তবে সমষ্টি স্বার্থে তথ্যের অধিকারের আবেদনের তালিকাও বেশ লম্বা। তালিকার চেয়ে বড় কথা দেশের ব্যাপক দুর্নীতির খবর জনসমক্ষে আনতে সব চেয়ে বেশি সহায়ক হয়েছে তথ্যের অধিকার। 2G স্ক্যাম, মুম্বাইয়ের আদর্শ হাউসিং সোসাইটি স্ক্যাম, কমনওয়েলথ গেমস স্ক্যাম, ব্যাপম কেলেঙ্কারি, ২৩ হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ধোঁকা, প্রধানমন্ত্রীর ডিগ্রি, এমনকি সর্বশেষ ইলেক্টরাল বন্ড - এ সবেরই পর্দা খুলতে শুরু করেছিল তথ্য জানার অধিকার। তারপরে পুলিশ, আদালত, মামলা, গ্রেপ্তারি ইত্যাদি অনেক কিছু ঘটেছে।
আদর্শ হাউসিং-এর ক্ষেত্রে, কার্গিল যুদ্ধের শহিদদের বিধবাদের জন্য ৬ তলা সমবায় হাউসিং আমলা, নেতা ও মিলিটারির একাংশের চক্রান্তে ৩১ তলা বিল্ডিং হয়ে গিয়েছিল। সিম্প্রিত সিং ও যোগেন্দ্র আনন্দজি নামক দুই আরটিআই কর্মী-র আবেদন থেকে প্রথম এই দুর্নীতির কথা সামনে আসে। তারপর সিবিআই তদন্ত, মামলা গ্রেপ্তারি, আদালত সব কিছু হয়। শেষ পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী অশোক চ্যবন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পাপের নিশান না রাখতে আদালতের নির্দেশে পুরো বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলা হয়।
২০১০ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমস-এর বিশাল দুর্নীতির সেই কাহিনীও জনসমক্ষে এসেছিল তথ্য জানার অধিকারের দৌলতে। মধ্যপ্রদেশে সরকারি চাকরি ও মেডিক্যাল পরীক্ষার ব্যাপক দুর্নীতির নাম, ব্যাপম কেলেঙ্কারি; সেটিও প্রথম নজরে আসে একটি তথ্যের অধিকার আবেদনের মাধ্যমে। ডাক্তার, আমলা, নেতাদের একটা ব্যাপক ও গভীর নেটওয়ার্ক জড়িত ছিল তা স্পষ্ট হয়ে যায়। ব্যাপক ধরপাকড় হয়েছিল। এক হাজারের বেশি লোক গ্রেপ্তার হয়েছিল।
দুর্নীতিরও যেমন অভাব নেই, তথ্য জানার অধিকারের সুবাদে তা জনসমক্ষে আসার উদাহরণেরও অভাব নেই। প্রশ্ন হল এই গত কুড়ি বছরে যে কয়েক কোটি আবেদন পাওয়া গেল, যে কয়েক ডজন বিশাল দুর্নীতির কথা জনসমক্ষে এল, তাতে শাসন ব্যবস্থার চরিত্র কি পালটালো? জানি অনেকেই বলবেন যে, না। আমি বলব হ্যাঁ পালটেছে তবে স্বচ্ছতার দিকে নয়, গোপনীয়তার দিকে। নানাভাবে তা ঘটেছে।
তথ্য জানার প্রক্রিয়াটিকে অকেজো করে দিতে হলে মূল প্রতিষ্ঠান - তথ্য কমিশনগুলিকে পঙ্গু করে দিলেই হয়। ৬টি রাজ্য - ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, হিমাচল, তেলেঙ্গানা, গোয়া এবং মধ্য প্রদেশে তথ্য কমিশন একেবারেই পঙ্গু। কমিশনের ঘর খালি, একজন কমিশনারও নেই। এছাড়া তিনটি কমিশনে - কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন, ছত্তিসগড়, অন্ধ্র প্রদেশে মুখ্য তথ্য কমিশনার নেই। এছাড়াও প্রতিটি তথ্য কমিশনে একজন মুখ্য ও আট জন পর্যন্ত কমিশনার থাকার কথা। একটা দুটো রাজ্য বাদে কোথাও তা নেই। ফলে কী হয়েছে?
কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন চলছে মাত্র দুজন সদস্য নিয়ে। তাই ঝুলে আছে বহু আপিল, সাধারণভাবে একটা আপিল প্রথম শুনানি হতেই সেখানে এক বছর লাগছে। মহারাষ্ট্রে এখন একজন মুখ্য ও সাত জন তথ্য কমিশনার রয়েছেন, কিন্তু কয়েক মাস আগে তাঁদের নিযুক্তির আগে সেখানে ১ লক্ষ আবেদন ঝুলে ছিল, যা কিনা দেশের মধ্যে সর্বাধিক। তেমনি কর্ণাটকে ৫০ হাজার, তামিলাড়ুতে ৪১ হাজার, ছত্তিসগড়ে ৩৪ হাজার ইত্যাদি প্রায় সব রাজ্যেই কয়েক হাজার আবেদন রাজ্য তথ্য কমিশনে ঝুলে আছে। ২৯টি রাজ্যের তথ্য কমিশনকে ধরলে, ৪ লক্ষ ১৩ হাজার আবেদন ঝুলে আছে।
শুধু প্রতিষ্ঠানগুলিকে পঙ্গু করে দেওয়া নয় আইনটিকেই পঙ্গু করে দেবার চেষ্টা হয়েছে বারবার। ২০১৯ সালে আইনকে সংশোধন করতে গিয়ে তথ্য কমিশনারদের পাঁচ বছরের নির্দিষ্ট টার্মের সুরক্ষা কেড়ে নেওয়া হল।তাঁদের পদমর্যাদা ছিল ইলেকশন কমিশনারদের পদমর্যাদার সমান। সেখান থেকে তাঁদের নিচে নামিয়ে দেওয়া হল, অর্থাৎ, তথ্য কমিশনারদের যতটুকু স্বাধীনতা ছিল তা খর্ব করা হল। ২০২৩ সালে এসে আরও সংশোধন করা হল। বলা হল ব্যক্তিগত তথ্য জনতাকে জানানো যাবে না। মানে ব্যাঙ্কগুলিকে ফাঁকি দিয়ে টাকা তছরুপ করে বিদেশে পালিয়ে গেলে তাদের নাম জনতাকে বলা যাবে না। অহরহ যে নদী খাল ইত্যাদির উপর নির্মীয়মাণ বা সদ্য নির্মিত ব্রিজ ভেঙ্গে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, কে সেই ব্রিজের কনট্রাক্টর ছিল, কোন ইঞ্জিনিয়ার সেই ব্রিজের ইন্সপেকশন করেছিল, এসব নাম বলা যাবে না। ব্যক্তিগত তথ্য প্রাইভেট, তাই তা জনতার জানার কথা নয়। এমনকী যে সব তথ্য জনতাকে জানাতে সরকার বাধ্য নয় বলে মূল আইনে উল্লেখ ছিল, তার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা ছিল - বলা ছিল যে তথ্য লোকসভাকে জানানো যায়, তা জনতার কাছে গোপন রাখা যাবে না। অর্থাৎ তথ্যের অধিকারের ক্ষেত্রে জনগণ ও তার প্রতিনিধিরা একই পঙক্তিতে পড়েন এই স্বীকৃতি ছিল। সেটিকেও ২০২৩ সালে তুলে দেওয়া হয়েছে।
তথ্য জানার অধিকারকে পঙ্গু করে দেবার আরও একটি পথ এই ২০ বছরে স্পষ্ট হয়েছে। তা হল সক্রিয় কর্মীদের সরাসরি খতম করে দেওয়া। এ পর্যন্ত ৫০ জনের বেশি সক্রিয় কর্মী খুন হয়েছেন। তাঁদের অপরাধ এই যে তাঁরা নানা দুর্নীতির কাহিনী জনসমক্ষে এনেছেন। গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, গোয়া, বিহার, মহারাষ্ট্র, হিমাচল, ওড়িশা, তেলেঙ্গানা, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, কোথায় নয়? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এঁরা খনি, জমি, ১০০ দিনের কাজ ইত্যাদি সংক্রান্ত দুর্নীতি সামনে এনেছিলেন। আক্রমণ হয়েছে আরও ১০০ জনের বেশি কর্মীর উপরে। রাষ্ট্র এঁদের কোনো সুরক্ষা দেয়নি।
তথ্য জানার অধিকার আইন নিয়ে সব রাজনৈতিক দলের একই অবস্থান। ২০১৩ সালে দেশের কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন বিধান দেয় যে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলি, তথ্য জানার অধিকারের আওতায় আসে। রাজনৈতিক দলগুলি এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যায়, সে মামলা এখনও ঝুলে আছে। পাশাপাশি ২০১৩ সালেই লোকসভায় রাজনৈতিক দলগুলিকে এই আইনের বাইরে রাখতে একটি বিল এসেছিল, সব কটি রাজনৈতিক দলের তাতে সায় ছিল, অবশ্য প্রবল জনবিরোধের ফলে তা আলমারি বন্দি হয়ে যায়।
তথ্য জানার অধিকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সর্বশেষ অস্ত্র হল নিয়ম করে বলে দেওয়া যে অমুক বিষয়টি এই আইনের আওতার বাইরে। যেমন পি. এম. কেয়ার ফান্ড। এই তহবিলটি একটি ট্রাস্টের অধীনে যার মাথায় আছেন প্রধানমন্ত্রী, ট্রাস্টের সদস্যরা হলেন কিছু মন্ত্রীরা। কিন্তু বলা হল এটি প্রাইভেট ট্রাস্ট তাই আইনের আওতার বাইরে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে যে তহবিল চালিত হচ্ছে তা নাকি প্রাইভেট ট্রাস্ট। সুপ্রিম কোর্টও এই ব্যাখ্যা মেনে নিল। ইলেক্টরাল বন্ডের ক্ষেত্রেও তাই। বলেই দেওয়া হল, কে কাকে কত টাকা দিচ্ছে তা তথ্য জানার অধিকারের আওতার বাইরে। সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য শেষ পর্যন্ত মান রক্ষা করেছিল।
আর একটি রাজ্য এই আইনের মান রক্ষা করেছে, সে কথা না বললেই নয়। রাজস্থানের জনসূচনা পোর্টাল (https://jansoochna.rajasthan.gov.in) কিছুটা হলেও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে স্বচ্ছতার দিকে এগিয়েছে। ১১৭টি দপ্তরের ৩৫১টি আলাদা কর্মসূচির সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এই পোর্টালে আছে। তথ্যের অধিকার আইনের ৪ নম্বর ধারা অনুসারে এই পোর্টাল তৈরি করা হয়েছে। তবে এখানেও কিছু দপ্তরের সর্বশেষ খবর পাওয়া যাচ্ছে, অন্য কিছু দপ্তরের খবর বেশ পুরোনো। আসলে এই ধরনের উদ্যোগগুলি কোনো এক সরকারের সময়কালে হয়ে থাকে, রাজস্থানে ইতিমধ্যে সরকার পাল্টে গেছে, ফলে উদ্যোগেও ইতিমধ্যেই ভাঁটা পড়তে শুরু করেছে। তবুও সারা দেশের মধ্যে এই একটি সরকারের উদ্যোগ, যা প্রশংসার দাবি রাখে, নয়ত এই আইন আমাদের রাষ্ট্রতন্ত্রের জনবিরোধী আসল চরিত্রটিকে মুখোশ পরিয়েছে বললেই সঠিক বলা হবে।