আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
এসআইআর বিতর্কের রাজনীতি

কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচক তালিকার যে বিশেষ সংশোধন - এস আই আর - প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে বিস্তর বিতর্ক ও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিজেপি ও আরএসএস এই উদ্যোগকে সামনে রেখে কার্যত উৎসবের মেজাজে নেমেছে। বলা বাহুল্য, বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জোটের বিপুল সাফল্য তাদের এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়াকে অন্য ভোটমুখী রাজ্যগুলিতে ছড়িয়ে দেওয়ার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। বিপরীতে, বিরোধী দলগুলির আশঙ্কা, এসআইআর আসলে নির্বাচক তালিকায় একটি পরিকল্পিত ও বৃহৎ রদবদলের হাতিয়ার, যার লক্ষ্য নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীদের সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে দেওয়া। লোকসভার বিরোধী দলনেতা একাধিক সাংবাদিক সম্মেলনে 'ভোট চুরি'-র অভিযোগ তুলেছেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সেই অভিযোগের কোনও স্পষ্ট ও লিখিত খণ্ডন না আসায় এই আশঙ্কা আরও জোরদার হয়েছে। ফলে কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা আদালতও সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করতে পারেনি। এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক মামলা বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন। সব মিলিয়ে, এই প্রক্রিয়া যে নিঃসন্দেহে বিতর্কিত, তা আর অস্বীকার করার অবকাশ নেই।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে কমিশনের বাস্তবায়ন পদ্ধতি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে গোটা রাজ্যে এসআইআর চালু করা হয়। তার সরাসরি ফল হিসেবে ১ আগস্ট, ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত খসড়া নির্বাচক তালিকায় প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে - যা পূর্ববর্তী তালিকার তুলনায় নজিরবিহীন হ্রাস এবং বিরোধীদের 'ভোট চুরি'-র অভিযোগকে নতুন মাত্রা দেয়। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পর নির্বাচন কমিশন বাদ পড়া ভোটারদের তালিকা প্রকাশে বাধ্য হয় - যা সাধারণত এই ধরনের সংশোধনে করা হয় না। দাবি-আপত্তি পর্বে ২১.৫৩ লক্ষ নতুন নাম যুক্ত হলেও, একই সঙ্গে ৩.৬৬ লক্ষ নাম অযোগ্য বলে বাদ দেওয়া হয়। ফলে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৭.৪২ কোটি। কমিশন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছে যে বাদ পড়া নামের প্রায় ৯৯ শতাংশই মৃত্যু, স্থানান্তরিত বা দ্বৈত নথিভুক্তির মতো 'রুটিন' কারণে। কিন্তু একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে ভোটার যাচাইয়ে কোনও কেন্দ্রীয় ফ্রড-বাস্টিং সফটওয়্যার বা আধুনিক ডেটা-রিকনসিলিয়েশন পদ্ধতি ব্যবহারই করা হয়নি। এই বৈপরীত্যই কমিশনের দাবিকে সন্দেহের মুখে ফেলেছে।
এই সন্দেহ আরও গভীর হয় যখন দেখা যায়, এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রতিটি রাজ্যের জন্য আলাদা আলাদা 'ভিত্তিবর্ষ' নির্ধারণ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ২০০২ সালের শেষ এসআইআর তালিকাকে প্রামাণ্য ভিত্তি ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, কিছু রাজ্যে ২০০৩ বা ২০০৪ সালের তালিকা, আবার কোথাও ২০১১-পরবর্তী আংশিক সংশোধিত তালিকাকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই অসামঞ্জস্য কোনও কারিগরি সিদ্ধান্ত নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। কারণ, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকেও আজ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ জনগণনা সম্পন্ন করেনি। ২০২১ সালে জনগণনা হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত রাখা হয় এবং পরবর্তী চার বছরেও তার কোনও নির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা হয়নি। সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে নাগরিকদের হালনাগাদ ডেটাবেস বর্তমানে রাষ্ট্রের হাতে নেই। এই শূন্যতার মধ্যেই নির্বাচন কমিশন পুরোনো, খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে এসআইআর-এর মতো একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, যা স্বাভাবিকভাবেই আস্থার সংকট তৈরি করছে।
এই আস্থাহীনতা আরও প্রকট হয় যখন কোন কোন রাজ্যে এসআইআর হবে - এই সিদ্ধান্তের পিছনের যুক্তিগুলি খতিয়ে দেখা হয়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কমিশনের বক্তব্য, রাজ্যটি আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানে বিশেষ সংশোধন প্রয়োজন। অথচ সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে - তাহলে কেন একই রকম সীমান্তবর্তী রাজ্য আসামে এসআইআর চালু করা হয়নি? একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন রাজ্যের জন্য বিভিন্ন সময়সীমা ধার্য করা হচ্ছে। বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলিতে সময়সীমা বাড়ানো হচ্ছে না, অথচ উত্তরপ্রদেশের মতো 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারের রাজ্যে একাধিকবার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে - যার কথা কমিশনের নিজস্ব বিজ্ঞপ্তিতেই উল্লেখ রয়েছে। উপরন্তু, এই প্রক্রিয়া চলাকালীন নিয়ম ও নির্দেশিকা বারবার বদলানো হচ্ছে। কখনও নথির ধরন পাল্টাচ্ছে, কখনও যাচাইয়ের পদ্ধতি। এই অস্থিরতা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কোনও সুসংহত পূর্বপরিকল্পনা বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর ছিল না। এই 'আগে সিদ্ধান্ত, পরে নিয়ম' প্রবণতা বিগত দশ বছরে বিজেপি সরকারের নোটবন্দি থেকে শুরু করে একাধিক বড় প্রকল্পেই দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।
এই সবের ঊর্ধ্বে উঠে ষষ্ঠ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রাজনৈতিক। গোটা এসআইআর প্রক্রিয়ায় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে নির্বাচন কমিশন কার্যত বিজেপির হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি এখানেই থেমে নেই। বিজেপি সরকার সংসদে এমন একটি আইন পাশ করিয়েছে, যার ফলে বর্তমান বা ভবিষ্যতের নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কমিশন যদি তার সাংবিধানিক এখতিয়ার লঙ্ঘনও করে, তবু কমিশনাররা আজীবন আইনি রক্ষাকবচ পাবেন। এই প্রেক্ষাপটে এসআইআর-কে আর নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি বা নির্বাচন-সংক্রান্ত অনিয়ম বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিকভাবে দুষ্ট প্রক্রিয়া। এর লক্ষ্য শুধু ভোটার বিন্যাস পরিবর্তন নয়, বরং বিজেপি ও আরএসএসের ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনে অভ্যস্ত করে তোলার চেষ্টা চলছে, যাতে ভবিষ্যতেও একই ধরনের কৌশল বারবার প্রয়োগ করা যায়।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলির সামনে পথ সহজ নয়। আদালতে এই প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে রুখে দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে লড়াই শেষ। বিরোধীদের দায়িত্ব হবে, মানুষের কাছে এই পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের চরিত্রটি বারবার স্পষ্ট করে তুলে ধরা। চটকদার সাংবাদিক সম্মেলন নয়, বরং ধারাবাহিক, নিবিড় এবং গ্রাম-শহর সর্বত্র পৌঁছনো রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। তবেই এই বিষাক্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে ধীরে ধীরে নির্বিষ করা সম্ভব হবে - এবং গণতন্ত্রকে অন্তত কিছুটা হলেও তার নিজের জায়গায় ফিরিয়ে আনা যাবে।