আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২
সমসাময়িক
উচ্চশিক্ষা ধ্বংস নীতি
ভারতের উচ্চশিক্ষা কাঠামো নিয়ে নিঃশব্দে বিপদ নামিয়ে এনেছে যে 'Higher Education Commission of India' বা সংক্ষেপে HECI বিল এ নিয়ে সচেতন হওয়া আজ অবশ্যকর্তব্য। এই বিলটি বোঝার জন্য প্রথমে দেখতে হবে এর গঠন, উদ্দেশ্য এবং ঘোষিত যুক্তি। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি বর্তমানে দেশের উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, অর্থাৎ UGC, AICTE এবং NCTE - এই তিনটি সংস্থার বিচ্ছিন্নতা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় সমন্বয়ের অভাব ও মানহ্রাস ঘটাচ্ছে; তাই একটি "একক, সর্বভারতীয় নিয়ন্ত্রক" প্রয়োজন। সেই যুক্তিতে 'Higher Education Commission of India' (HECI) তৈরি করার প্রস্তাব এসেছে। কমিশনে থাকবে চেয়ারপার্সন, ভাইস-চেয়ারপার্সন এবং আরও কয়েকজন সদস্য। এদের সবার নিয়োগ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। কমিশনের কাজ হবে একাডেমিক মানদণ্ড নির্ধারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন, তাদের রেটিং বা Accreditation ঠিক করা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি বা বাতিলের ক্ষমতা প্রয়োগ করা, প্রয়োজনে কোনও প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি বা বন্ধ করে দেওয়া পর্যন্ত। উল্লেখযোগ্যভাবে, HECI অনুদান দেবে না; সেই ক্ষমতা থাকবে সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে, অর্থাৎ আর্থিক ক্ষমতা ও একাডেমিক ক্ষমতা দুটোই কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীনে কেন্দ্রীভূত হবে।

রাজ্যগুলোর ভূমিকার ক্ষেত্রেও এই বিলটি স্পষ্ট সংকোচন ঘটিয়েছে। কমিশনে কোনও রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক নয়। বরং একটি পরামর্শদাতা পরিষদ বা Advisory Council-এর কথা বলা হয়েছে, যার মতামত গ্রহণ করা বা না করা সম্পূর্ণ কমিশনের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে। উচ্চশিক্ষা ভারতের সংবিধানে কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ তালিকায় থাকা সত্ত্বেও, এই বিল কেন্দ্র-রাজ্য ভারসাম্যের মূল বৈশিষ্ট্যকে কার্যত খর্ব করে একটি একক, সর্বময় কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। আরও লক্ষণীয় যে কমিশনে সামাজিকভাবে বঞ্চিত ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কোনও শর্ত নেই। কিন্তু শিল্পক্ষেত্র বা কর্পোরেট সংযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পরিষ্কার অর্থ শিক্ষার সামাজিক পরিসর ও রাষ্ট্রচেতনার স্থান সংকুচিত করে তাকে একটি বাজারমুখী, দক্ষতা-উৎপাদনমুখী, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত কাঠামো বানানোর লক্ষণ বিলে স্পষ্ট।
এই কারণেই এই বিলটি কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্কার থেকে হয়ে ওঠে একটি আদ্যন্ত রাজনৈতিক কর্মসূচী। কারণ শিক্ষাকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে মানা এক ধরনের নিস্পৃহতা; বাস্তবে শিক্ষা যে কোনও রাষ্ট্রের গভীরতম রাজনৈতিক ক্ষেত্র - এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। তাই HECI বিলকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে এর ক্ষমতাজনিত বিন্যাসের পাশাপাশি এর মতাদর্শগত রূপরেখা বোঝা সমানভাবে জরুরি। এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের কেন্দ্রীয় অংশ। ভারত যে বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির, বহু ইতিহাসের সংমিশ্রণ - সেই সত্যকে আরএসএস তথা বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই স্বীকার করতে চায় না। তাদের কল্পিত জাতি একটা নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলে, একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আখ্যানকে মানে, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আনুগত্য বহন করে, এবং সবচেয়ে বড় কথা কেন্দ্রের প্রতি অন্ধভাবে নত। উচ্চশিক্ষা সেই কল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ই সেই স্থান, যেখানে বিরুদ্ধ মত জন্মায়, প্রশ্ন ওঠে, যুক্তি শাণিত হয়, ইতিহাস পাল্টানো যায়, আর রাষ্ট্রকে আয়নায় নিজের মুখ দেখতে বাধ্য করা যায়। বিজেপি-আরএসএস-এর বৈচিত্র্য-বিরোধী রাজনীতির কাছে এই স্বায়ত্তশাসিত বৌদ্ধিক পরিসরই সবচেয়ে বড় শত্রু। HECI বিল সেই শত্রুকে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রথম বড় কাঠামোগত প্রচেষ্টা।
এই বিলে কেন্দ্রের যে সর্বগ্রাসী ক্ষমতা-সংকুল কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে, তা নিছক প্রশাসনিক পুনর্গঠন নয়; এটি আরএসএস-এর দীর্ঘদিনের 'এককরূপ ভারত' প্রকল্পের শিক্ষাক্ষেত্রের প্রতিফলন। শিক্ষার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনও ফ্যাসিবাদ টেকেনা, এই সত্য ইতিহাস বহুবার দেখেছে। হিটলার যুবকদের হাতেই প্রথম ছুরি তুলে দিত, মুসোলিনি স্কুলের পাঠ্যক্রমে প্রথম ঢুকত, পিনোশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে প্রথম ধ্বংস করত। বিজেপি-আরএসএস সেই পথের আধুনিক সংস্করণ বেছে নিয়েছে যেখানে পাঠ্যক্রম লেখা হয় নাগপুরের ইশারায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি নিয়োগ হয় দিল্লির রাজনৈতিক দরবারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে একরৈখিক আমলাতন্ত্র-বুদ্ধিজীবী মিশেল। HECI বিল সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ, বহুমাত্রিক ভারতকে সরিয়ে দিয়ে একমাত্রিক ভারত নির্মাণের কৌশলগত প্রচেষ্টা।
আরএসএস বহুদিন ধরেই শিক্ষাকে 'জাতীয় চরিত্র' গঠনের উপকরণ বলে মনে করে। সেই 'জাতীয় চরিত্র'-র অর্থ কিন্তু মানবিকতা বা বৈজ্ঞানিক মন নয়; এটি হিন্দু সভ্যতার একমাত্রিক ব্যাখ্যা, ব্রাহ্মণ্যবাদী সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা এবং সংখ্যালঘুদের সন্দেহের চোখে দেখা। NCERT বইয়ে পরিবর্তন, বিজ্ঞান থেকে বিবর্তন বাদ দেওয়া, ইতিহাস পুনর্লিখন এসবই আরএসএস-এর শিক্ষাদর্শের প্রভাব। HECI বিল সেই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আইনি বৈধতা দিচ্ছে। একক কমিশন থাকলে পাঠ্যসূচি, গবেষণার বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো সবকিছু কেন্দ্রীয় নির্দেশে সহজে বদলানো যাবে।
HECI বিলের প্রস্তাবিত কাঠামো, যেখানে রাজ্যগুলোর ভূমিকা অপ্রাসঙ্গিক, যেখানে প্রান্তিক গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিশ্চিত নয়, যেখানে শিল্পক্ষেত্রের স্বার্থকে একাডেমিক স্বাধীনতার ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে, এসবই বিজেপি-আরএসএস-এর রাজনৈতিক অর্থনীতিকে প্রতিফলিত করে। উচ্চশিক্ষাকে স্রেফ দক্ষতা উৎপাদনের কারখানায় রূপান্তরিত করার যে প্রচেষ্টা বহুদিন ধরেই চলছে, এটি তারই সম্প্রসারণ। বিশ্ববিদ্যালয়কে শ্রমবাজারের উপকরণ তৈরির কেন্দ্র বানিয়ে দিলে জিজ্ঞাসাবাদী ছাত্র, বিরুদ্ধ মত, প্রতিরোধের মন - এসব স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। সেটাই বিজেপি-আরএসএস-এর লক্ষ্য। বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল - 'এক দেশ, এক সিদ্ধান্ত' - এই বিলে আরেকবার প্রতিফলিত। যে দেশে তামিলনাড়ু, কেরল, বাংলা, অসম - সব রাজ্যের শিক্ষানীতি আলাদা অভিজ্ঞতা ও সামাজিক কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে একক কমিশন চাপিয়ে দেওয়া মানে সেই অভিজ্ঞতাগুলিকে উপেক্ষা করা। বহুত্ব নয়, একমাত্রিকতা, এই দর্শনই মূলত HECI-এর নকশার ভিত। সব মিলিয়ে, HECI বিল উচ্চশিক্ষার কোনও মৌলিক সংস্কার নয়; এটি রাজনৈতিক দখলদারির একটি সুসংহত হাতিয়ার। এটি প্রশাসনিক উন্নতি নয়, মতাদর্শের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ। বহুস্বরকে নীরব করে একরৈখিক কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র তৈরি করার পথে এই বিল একটি বড়, সংগঠিত, বিপজ্জনক ধাপ।
ভারতের উচ্চশিক্ষা যদি সত্যিই মুক্তচিন্তার ক্ষেত্র হিসেবে টিকে থাকতে চায় তবে এই HECI বিলের বিরোধিতা আর শুধুই মতামতের লড়াই নয়, এটি এখন সরাসরি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচী। এবং এই লড়াইয়ে সংসদের ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ যখন কেন্দ্রীয় সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপটে একের পর এক আইন পাশ করিয়ে নিচ্ছে, তখন বিরোধীদের দায়িত্ব শুধু সংসদে ওয়াকআউট করা নয়। বিলটিকে সিলেক্ট কমিটি বা স্ট্যান্ডিং কমিটিতে পাঠানোর জন্য সুসংগঠিত সাংসদীয় চাপ তৈরি করা, ধারাগুলিকে বিশ্লেষণ করে বিলের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ববাদী কাঠামোকে সংসদীয় নথিতে চিহ্নিত করা, এবং লড়াইকে দেশের সামনে সাংবিধানিক ভাষায় ব্যাখ্যা করা। রাজ্যসভা যা যুক্তরাজ্য কাঠামোর প্রতীক, সেখানে বিরোধীদের আরও আক্রমণাত্মকভাবে এই বিলের যুক্তরাজ্য-বিরোধী চরিত্র তুলে ধরতে হবে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিজেপির হাতে থাকতে পারে, কিন্তু সংসদের নীরবতা তাদের হাতে নয়। এমতাবস্থায় বিরোধীদের প্রশ্ন করা উচিত কেন যৌথ তালিকার একটি বিষয়কে কেন্দ্রীয়করণ করা হচ্ছে? কেন রাজ্যগুলিকে পরামর্শদাতা করে রাখা হচ্ছে? কেন কমিশনে কোনও জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই? কেন অনুদান বিতরণ মন্ত্রণালয়ের হাতে রেখে একাডেমিক কমিশনকে নিছক নিয়ন্ত্রণযন্ত্র বানানো হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলি সংসদের অভ্যন্তরে ধারাবাহিকভাবে তোলা, নথিভুক্ত করা, বিতর্ক বাধ্যতামূলক করা - এটাই গণতান্ত্রিক বিরোধিতার সাংবিধানিক পথ।
সংসদীয় লড়াইয়ের বাইরে, বিল আটকানোর প্রকৃত শক্তি তৈরি হবে ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক ঐক্য, রাজ্য সরকারগুলির প্রশাসনিক প্রতিরোধ, এবং নাগরিক সমাজের সংগঠিত বৌদ্ধিক চাপ থেকে। রাজ্য বিধানসভাগুলিতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এনে এই বিলের বিরোধিতা করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় সেনেট-সিন্ডিকেটকে স্পষ্ট রেজোলিউশন পাশ করতে হবে, শিক্ষক সংগঠনগুলিকে রাজনৈতিক ভয়কে অগ্রাহ্য করে বিলে যুক্তরাজ্য কাঠামো ও একাডেমিক স্বাধীনতার ক্ষতি ব্যাখ্যা করতে হবে। ছাত্রসমাজকে ক্যাম্পাসে গণআলোচনা, বিক্ষোভ, সেমিনার, শিক্ষামূলক প্রচার - এইসবের মাধ্যমে দেখাতে হবে যে উচ্চশিক্ষা কোনও সরকারের মতাদর্শিক প্রপাগান্ডার যন্ত্র হতে পারে না। শিক্ষা যখন রাষ্ট্রের আদর্শে বন্দী হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎও বন্দী হয়ে পড়ে। তাই HECI বিল প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত সংসদে প্রশ্ন, রাস্তায় প্রতিরোধ, ক্যাম্পাসে আলোচনার চাপ - এই তিনটি স্তম্ভ নিয়ে গঠিত এক সুস্পষ্ট, গণতান্ত্রিক প্রতিরোধই আজকের সময়ের একমাত্র বাঁচার পথ।