আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২
সমসাময়িক
এসআইআর ও ভারতীয় গণতন্ত্র

একটি গণতন্ত্র তথা প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রশক্তি কি জনগণের শাসক নাকি জনগণের সেবক? দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজেকে প্রধান-সেবক ঘোষণা করলেও, প্রতি পদে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে রাষ্ট্র এই বার্তা দিচ্ছে যে তারা শাসক, সেবক নয়। অতএব রাত ৮টার সময় প্রধানমন্ত্রীর যদি মনে হয় যে দেশে নোট বাতিল করা হবে, তাহলে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র আপনাকে বাধ্য করবে লাইনে দাঁড়িয়ে আপনারই কষ্টার্জিত টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তোলার জন্য। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে একদিকে বহু মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, ব্যাঙ্ক কর্মীরা অত্যাধিক কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র তাতে বিচলিত হয়নি। আবার কোভিডের সময় সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত এবং অপ্রত্যাশিতভাবে রাতারাতি 'লক ডাউন' ঘোষণা করা হয়। লাখো মানুষ আটকে পড়েন বিভিন্ন শহরে। কোভিডের প্রকোপে মানুষের মৃত্যু হয়, আবার বাড়ি ফেরার পথে মৃত্যু হয় প্রচুর মানুষের। রাষ্ট্রের তাতে কিছু যায় আসেনি।
এবার ২০২৫ সালে রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের দরবারে হাজির করেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন, অথবা এসআইআর। বর্তমানে ১২টি রাজ্যের ৫১ কোটি নথিভুক্ত ভোটারের তালিকা সংশোধন করার জন্য সময় ধার্য করা হয়েছে মাত্র এক মাস। একদিকে যেসব নথিকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে, সুপ্রিম কোর্টে মামলাও চলছে। এই সম্পাদকীয় কলামে আগে আমরা এই বিষয় আমাদের মতামত ব্যক্ত করেছি। কিন্তু যত দিন এগিয়ে চলেছে তত আরেকটি সমস্যা বিপুল আকার ধারণ করেছে। এই একমাসে এত বড় কাজ করার জন্য যে ব্যক্তিদের বিএলও পদে নিযুক্ত করা হয়েছে তাঁরা এই বিপুল পরিমাণ চাপ নিতে পারছেন না। সঠিক ট্রেনিং-এর অভাব, অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা, পারিশ্রমিকের সমস্যা, উপরওয়ালার চোখ রাঙানি, সব মিলিয়ে বিএলও-দের জীবন ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে।
এর পরিণতিতে বেশ কিছু মানুষ আত্মহত্যা করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে, কেরলে বা উত্তরপ্রদেশে। এই বিএলও-রা আত্মহত্যার কারণ হিসেবে অত্যাধিক কাজের চাপের কথা লিখে গেছেন। আবার অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এর পরিণতিতে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ তথা কেরল বা তামিলনাডুর মতন বিরোধী শাসিত রাজ্যেই নয়, বিএলও-রা প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন গুজরাট বা উত্তরপ্রদেশের মতন বিজেপি শাসিত রাজ্যেও। বেশ কিছু বিএলও পদত্যাগ করেছেন। মনে রাখতে হবে যে এই বিএলও-রা সাধারণ সরকারী কর্মী। তাঁরা আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তিতে শিক্ষিত নন, বা দড় নন। তাই প্রতিদিনে তাদের ধার্য ভোটার ফর্ম আপলোড করতে অসুবিধা হচ্ছে। তদুপরি, সাধারণ মানুষের প্রশ্নের জবাব দিতে হচ্ছে তাঁদেরই। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত বিধিতে বিভিন্ন বিষয় পরিষ্কার নয়। যেমন বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েদের পদবী পরিবর্তন হলে তারা কোন পদবী লিখবেন, ২০০২ সালের নাকি ২০২৫ সালের? এই সব প্রশ্নের উত্তর বিএলও-রা অনেক ক্ষেত্রেই দিতে পারছেন না। তাই তাদের উপর চাপ আরও বাড়ছে। আপাতত নির্বাচন কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়ার মেয়াদ আরও এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে। এই মেয়াদ বাড়ানো এই কথাই প্রমাণ করে যে এত বড় কর্মকাণ্ড হাতে নেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে নিজেদের হোমওয়ার্ক করেনি।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষকে আবারও প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তিনি যোগ্য ভোটার কি না। ২০২৪ সালের নির্বাচনে যারা ভোট দিয়ে নতুন সরকার নির্বাচিত করলেন, তাদেরকেও বলা হচ্ছে প্রমাণ করো যে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তোমার নাম রয়েছে! ২০০২ সালের নিবিড় সংশোধন আজকের মতন এই জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধিত হয়নি। তাহলে ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে কেন প্রামাণ্য ধরে নেওয়া হচ্ছে? কেন ২০২৪ সালের ভোটার তালিকাকে প্রামাণ্য ধরা হচ্ছে না? এর কোনও যুক্তিগ্রাহ্য জবাব নির্বাচন কমিশনের কাছে নেই। আসলে রাষ্ট্র আবারও প্রমাণ করছে যে তারা শাসক। তারা দেশের সমস্ত মানুষকে বলছে যে আপনারা কেউই ভোটার নন। নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তুলুন। ক্ষমতার ভারসাম্যে সাধারণ মানুষের হাতে রয়েছে শুধু এই একটি ভোট। তাই তারা বাধ্য হচ্ছেন রাষ্ট্রের এই অবিশ্বাসের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে। রাষ্ট্র ভুয়ো ভোটারদের চিহ্নিত করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেয়নি। এখন সবাইকে অবৈধ ভোটার ঘোষণা করা হয়েছে। এবারে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি ন্যায্য ভোটার। এই অন্যায় চোখের সামনে ঘটে চলেছে।
বিহারের এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে মোট ভোটার সংখ্যা কমে গেছে। বিহারের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রযুক্ত হিসেবের থেকে ভোটার সংখ্যা অনেক কম। যাদের নাম বাদ গেছে তাদের মধ্যে মুসলমান ও মহিলাদের অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই বিপুল পরিমাণ ভোটারের নাম একদিকে যেমন বাদ গেছে, আবার দেখা যাচ্ছে যে বিহারে 'ডুপ্লিকেট' ভোটার এসআইআর-এর পরেও তালিকায় থেকে গেছে। তাহলে এসআইআর কার স্বার্থে করা হল?
দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিহীন কখনই ছিল না। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন একের পর এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষপাতহীনতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। মোদী সরকার নিজের মর্জি মতন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করার অধিকার নিজেকে দিয়েছে, নির্বাচন কমিশনারকে সমস্ত তদন্তের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে, নির্বাচনী দস্তাবেজ সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট করে ফেলা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে, এসআইআর প্রক্রিয়াকে শুধুমাত্র বিজেপি লাগাতার সমর্থন জানিয়ে চলেছে। বিহারে ভোটের সময়েও মহিলাদের ব্যাঙ্কে টাকা জমা পড়ার সরকারী সিদ্ধান্তকে নির্বাচন কমিশন আটকায়নি। সব মিলিয়ে মানুষের মনে এই সন্দেহ জাগছে যে নির্বাচন কমিশন আম্পায়ার না হয়ে বড় টিমের খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য যা সুখের খবর কখনই নয়।