আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

মণীন্দ্র গুপ্তের স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত রাস্তা

চিরন্তন সরকার


মানুষ নানাভাবে নিজের কথা লিখতে লিখতে যান। কবিরা তো যানই। অনেক সময় চেনার উপায় থাকেনা স্পষ্ট করে - কোথায় নিজের কথা বলছেন তিনি, কেননা তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা আর তাঁর দেখা বা তাঁর দ্বারা কল্পিত অন্য মানুষের অভিজ্ঞতার প্রভেদ করা মুশকিল, যতক্ষণ না অব্দি তিনি নিজেই ধরিয়ে দিচ্ছেন, অথবা যদি না সেই অভিজ্ঞতা প্রচণ্ড বিশিষ্ট না হয়ে থাকে। যেমন, মণীন্দ্র গুপ্ত একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, 'গণ্ডারের মতো' কবিতাটি আত্মজৈবনিক। তিনি এই কথা বলবার পর কবিতাটির দিকে ফিরে তাকিয়ে আমাদের এই বোধোদয় হয় বটে, কিন্তু না বলে দিলে একে সাধারণ জীবন-অভিজ্ঞতা বিষয়ে নির্বিশেষ মন্তব্য হিসেবেই হয়তো অনেকে পাঠ করে চলতেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নানা উপাদান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নানাভাবে থাকে। যেমন, 'মৌপোকাদের গ্রাম'-এর 'আমার গুরু' কবিতায় রাভি নদীর সন্নিহিত অঞ্চলের বিবরণ পাঠককে মুহূর্তে 'অক্ষয় মালবেরি'-র তৃতীয় পর্বে বিধৃত লাহোরবাসী মণীন্দ্র গুপ্তের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে, অথবা বরিশালের গ্রামের নামের উল্লেখ না থাকলেও সন্দেহ হয়, 'নীল পাথরের আকাশ'-এর 'একখণ্ড জমি, একটি দুপুর ও আমার শৈশব' তাকে কেন্দ্র করেই রচিত। 'শিলচরের গল্প' কবিতাটি প্রত্যক্ষভাবেই তাঁর শিলচরের জীবনকে ঘিরে আছে। নিজেও বলেছেন তিনি, নানা ভূমিকা তাঁরই আত্মসাৎ করা ভূমিকাঃ "অনেক সময় এমন হয়েছে, দৈত্য, রাক্ষস, যক্ষ, তির্যগযোনি, যবন, কিরাত, ভিনদেশী সহজেই এসেছে, কথা বলেছে আমার কবিতায়। আসলে কেউই ছিল না, আমিই একা একা কথা বলেছি তাদের গলায়।" (গদ্য সংগ্রহ ১, পৃ. ৬৩)। তবু অন্তত দুটি কবিতা লিখেছেন মণীন্দ্র গুপ্ত, যেখানে তিনি নিজের নামের তলায় দাগ বুলিয়েছেন, অর্থাৎ সরাসরি নিজের দিকেই আঙুল তুলে রেখেছেন, যাতে আমাদের পক্ষে একে তাঁর নির্দিষ্ট অবস্থানের সূচক বলে চিনতে ভ্রম না হয়। একটি কবিতা 'এক শিশি গন্ধহীন ফ্রেইগ্রানস'-এর 'কষ্ট'। অপরটি 'ছত্রপলাশ চৈত্যে দিনশেষ'-এর 'প্রথম মণীন্দ্রগুপ্ত'। আমরা মণীন্দ্র গুপ্তকে নিজের লেখা কাব্যগ্রন্থ 'বনে আজ কনচের্টো'-র সরাসরি উল্লেখ করতে দেখি এই প্রথম কবিতাটিতে, অর্থাৎ 'কষ্ট'-তে, যেটি সম্ভবত দ্বিতীয়টির অন্তত দুই দশক পরে লেখা। আর দ্বিতীয়টির শিরোনামেই নিজের নাম উল্লেখ করেছেন। নাম উল্লেখ করেছেন বটে, কিন্তু সেখানে তিনি ণৃপতির ঢংয়ে স্বেচ্ছাকল্পিত রাজপাটে অধিষ্ঠিত। মাতৃহারা বালকবেলায়, নিঃসঙ্গ শিলচর-পর্বে, অসফল ছাত্রজীবন কাটিয়ে, অনেকদিন পর্যন্ত বেকার ও সর্বোপরি সাহিত্যজগতেও তথাকথিত মূলধারার সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে-পড়া একগুঁয়ে, অসফল, প্রত্যাখ্যাত মণীন্দ্র গুপ্ত সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়েছেন যত, ততই কবিতা লেখার জগতে স্বাতন্ত্র্যের অনুসন্ধান তাঁর পক্ষে ক্রমশ সার্থক হয়েছে, যা এক 'দশনামী টং ঘরে'-র ব্যাপার (কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ১৩৬)। লেখার টেবিলে নিবদ্ধ তাঁর নিভৃত মনোযোগ 'জনৈক অজ্ঞাতনামা লাশ'-এর অবস্থান থেকে উদ্ধার করে তাঁকে 'স্তব্ধ সিংহাসন' অর্পণ করে (কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ১৩৬-৩৭)। এই রাস্তাতেই ক্রমশ শেষ জীবনের একটি 'সিদ্ধমন্ত্র'-এর দিকে যে এগোচ্ছেন তিনি - সেই আত্মপ্রত্যয়ের দুর্নিবার স্বাক্ষরগুলি ছড়িয়ে আছে এই কবিতার 'রাজযোগ'-এ (কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ১৩৭)। ততদিনে তিনি হয়তো দেখতে পেতে শুরু করেছেন নিজের চিন্তা ও কবিতা লেখার স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত রাস্তা, যা ভবিষ্যতের দিকে যেতে চাইছে। ওই 'মোক্ষপথ' আঁচ করে তিনি 'রাজাভাব' অভ্যাস করছিলেন, যদিও স্মৃতিতে প্রোজ্জ্বল ছিল 'বহু স্বয়ম্বর হেরে' আসার অভিজ্ঞতাও (কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ১৩৭)। ১৯৮৬ সালে বেরোনো বইয়ের কবিতা এটি। ততদিনে 'এক বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা'-র যাত্রা তিক্তভাবে শেষ হয়েছে। তেরো বছর ধরে প্রকাশিত হয়ে সমাপ্ত হয়েছে 'পরমা' পত্রিকার অভিযান। কবি হিসেবে নিজেকে তিনি ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত লাল স্কুলবাড়ি থেকে গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ করতে শুরু করেছেন। অবশ্য মণীন্দ্র গুপ্তের পাঠক-সমালোচক তাঁর আত্মপ্রকাশের 'নীরব ও সোচ্চার ভাষা'-র সন্ধান পেয়েছেন ১৯৬৯-এ প্রকাশিত 'নীল পাথরের আকাশ'-এর উৎসর্গের পৃষ্ঠাতেও (দাশগুপ্ত, চমৎকার, ৩৯)। ওই নির্মোহ আত্মপ্রত্যয়ই তাঁকে আবহমান বাংলা কবিতা-র তৃতীয় খণ্ডে নিজের কবিতাও সংকলিত করতে চালিত করবে। ওই আত্মপ্রত্যয় ধরা পড়ছে 'প্রথম মণীন্দ্রগুপ্ত' শিরোনামে নিজের নাম ও পদবির মধ্যে স্পেস লুপ্ত করে দেবার সিদ্ধান্তেও, সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত বা সমুদ্রগুপ্তের নাম লিখবার সময় যা আমরা করি! লেখালেখির জগতেও 'ছদ্মবেশী রক্তমুণ্ড নাগ' অথবা 'পূর্ব সখা কুকুর ক্ষত্রিয়'-রা হয়তো তাঁর স্ফটিকের মতো চোখ দেখে ভয়ে ঠিকরে যাচ্ছিল সে সময় কলকাতাতেই।

মণীন্দ্র গুপ্তকে না-জানা বা তাঁর প্রতি উদাসীনতা আর মণীন্দ্র গুপ্তের জন্য সমীহ - এই দুইয়ের ব্যবধান রচনা করেছে অনেকগুলি বছর, কিংবা হয়তো তলিয়ে দেখতে গেলে, এরা জড়াজড়ি করেই ছিল কোনো কোনো সহমানুষ-মানুষীদের মনস্তত্ত্বে। একটি সাক্ষাৎকারে গৌতম বসু কবুল করেনঃ "...পঞ্চাশের দশকে তাঁর প্রথম আবির্ভাবের বিষয়ে আমরা অনেকেই অবহিত ছিলাম না"। (আদম, পৃ. ১৯২-৯৩)। সামাজিক পরিগ্রহণের (reception) কথা ছেড়ে দিলেও, মণীন্দ্র গুপ্ত কিন্তু লিখতে লিখতেই আঁচ করছিলেন, নিজের তরিকা ও নিজের বিন্যাস তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন এমনভাবে, যাতে এ আশা জাগে যে, দীর্ঘজীবনের শেষে আলো ফুটবে। কিন্তু ওই 'মোক্ষপথ' (কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ১৩৭) হিংস্র ছিল, যেহেতু সেই পথ ইতিহাসের নিয়মেই প্রতিরোধের পথ হয়ে উঠেছিল, গড়পরতা কবি-লেখকদের অবস্থানের সঙ্গে অনিবার্য দ্বন্দ্বই সেই পথকে রক্তমথিত করে তুলেছিল হয়তো-বা, যদিও 'বিদ্বেষভাব ও বিষোদ্গার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত' লেখক মণীন্দ্র গুপ্ত প্রত্যাঘাত করেছেন - এমন দৃষ্টান্ত দুর্লভ (বসু, গৌতম পৃ. ৭০)। ওই হিংস্রতা, তদুপরি, একজন কবির অখণ্ড মনোনিবেশের একগুঁয়েমিও হওয়া সম্ভব। আর, পথটি ছিল সুগুপ্ত - তাই মণীন্দ্র গুপ্ত লিখেছেন - "আর একটি গোপন পতন - এই যন্ত্র!" (কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ১৩৭)। ওই কারণেই 'দুরধিগম্য বনে' ঘোরা বৃষকেই 'আদর্শ' সাব্যস্ত করেছিলেন, আত্মসংবরণের দুর্ভেদ্যতার বশবর্তী হয়ে ('সূর্যের বৃষ', কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ৪৯)। প্রাতিষ্ঠানিকতার কৃপাবঞ্চিত লেখকজীবন তিনি যে 'রাজাভাব' অভ্যাস করে কাটাচ্ছিলেন সে সময়, সেই 'রাজযোগ'-এর গুহ্য নিশানাগুলি নিয়ে নানা ম্যানিফেস্টোসুলভ রচনায় ব্যক্তও করেছিলেন তাঁর অবস্থান কখনো কখনো (কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ১৩৭)। চারটি মাত্র উদাহরণঃ

(ক) "তাহলে কবিতার পিদিমটি টিমটিম করে জ্বলছে কাদের জন্য, কোথায়? দূর অন্তরালে, শুধুমাত্র কিছু সন্তপ্ত, সন্ত ও স্বপ্নগ্রস্ত মানুষের জন্য, তাঁদের মনে। ...হুজুক থেকে সুদূরে সরে গিয়ে ইচ্ছে করে, অপেক্ষা করি। ...আমাদের লোক ঐ সন্ত, সন্তপ্ত ও স্বপ্নগ্রস্তরা। কোনোদিন কি তাঁদের কবি হয়ে উঠতে পারব?" (পরমা ১১, শীত ১৩৮২-র একটি পৃষ্ঠা থেকে, দাহপত্র, পৃ. ১৩২)।

(খ) "কবি, আপনি যদি অহংকারী আত্মবিশ্বাসী হন তবে নিজেকে রাখুন একশো বছর পেছনে, একশো বছর সামনে। দুর্বলের রক্ষাগণ্ডি ওসব দশক-ফশক উড়িয়ে দিয়ে নিঃশব্দে পাঞ্জা কষুন মহান প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে।" (পরমা ৯, শীত ১৩৮১-র চতুর্থ মলাট, দাহপত্র, পৃ. ১২৫)।

(গ) "আপনি কি আপনার সমস্ত জাগ্রৎকাল মনে মনে লেখায় ব্যাপৃত থেকেও পাঁচ থেকে পনেরটির বেশি কবিতা বছরে লিখে উঠতে পারেন না? এবং তাও মনোমতো না হলে ছিঁড়ে ফেলেন, তবু ছাড়েন না?: তাহলে আপনারই অধিকার আছে লিখবার।" (পরমা ৯, শীত ১৩৮১, 'লেখকদের প্রতি' থেকে, দাহপত্র, পৃ. ১২৩)।

(ঘ) "কতটা উচ্চতা, কতটা বৈচিত্র্য পাবে সে কবিতা, সে প্রশ্ন এখন নয় - যিনি লিখবেন তাঁরই শিক্ষা, চেতনা ও অভিজ্ঞতার মাপে ও আদলে তৈরি হবে তারা। ধানুকি, পরিশ্রম করুন, নিপুণতা শিখুন, শরবৎ তন্ময় হোন, এখন আপাতত লক্ষ্যটাই হয়তো সব - লক্ষ্যকে দৃষ্টির আয়ত্তে আনুন।" ('হিতোপদেশ', গদ্য সংগ্রহ ১, পৃ. ৩১)।

আমাদের বক্তব্য এখানে এই যে, মণীন্দ্র গুপ্ত নিজে তাঁর লেখালেখির জীবনের 'লক্ষ্যকে দৃষ্টির আয়ত্তে' এনেছিলেন অত্যন্ত সচেতন হয়ে এবং অনেক আগেই, যদিও তাঁর পাঠক ছিল ন'য়ের দশকেও সীমিত এক গোষ্ঠী ('হিতোপদেশ', গদ্য সংগ্রহ১, পৃ. ৩১)। সাক্ষীচৈতন্য অবলম্বন করে দৃষ্টির আয়ত্তে আসা সেই লক্ষ্যকে তিনি নিজেই চরিতার্থ হতে দেখলেন অনেককাল পরে ২০০৯ সালে প্রকাশিত 'বনে আজ কনচের্টো'-র কবিতাগুলিতে আর সেই উপলব্ধি কবুলও করলেন আমাদের আলোচ্য আর-এক কবিতায়, অর্থাৎ 'এক শিশি গন্ধহীন ফ্রেইগ্রানস'-এর 'কষ্ট'-তে। সেই কবুলত, আবারও, অনেকের কাছে, প্রগলভ আত্মকথন মনে হতে পারে, কিন্তু 'প্রথম মণীন্দ্রগুপ্ত' থেকে 'কষ্ট'-অব্দি পার হয়ে আসা মণীন্দ্র গুপ্তের পাঠক বুঝতে পারবেন, এ আত্মসমীক্ষণ বিনা অন্য কিছু নয় - দম্ভ থেকে বাকশৈথিল্যে নয়, বরং ব্যক্তিত্বময় প্রতিরোধ থেকে যা আত্মপ্রশ্রয়মুক্ত সহজ স্বীকারোক্তিতে শেষ হচ্ছে। 'চাঁদের ওপিঠে'-তে তিনি জানিয়েইছিলেনঃ "গ্রীকরা তো শেষ লড়াইয়ে যেতেন পুরো বিবস্ত্র হয়ে। তেমনি শেষ কবিতার বেলায় কোনো আভরণ, আড়াল থাকবে না। এতদিনের এত যে যুদ্ধ শেখা তা কেবল ঠিক লক্ষ্যে আঘাত করার জন্যে।" (গদ্য সংগ্রহ ১, পৃ. ৬০)। পাঠক খেয়াল করবেন, 'প্রথম মণীন্দ্রগুপ্ত' কবিতাটিতে যোদ্ধার নানা চক্রব্যূহ, কামুফ্লাজ ও শৌর্যমণ্ডিত অসিচালনা। 'কষ্ট' কবিতাটিতে সেসবের পালা শেষ হয়েছে বলেই তাকে এমন আভরণশূন্য উপায়ে লেখা হয়েছে বলে বুঝতে পেরে দীক্ষিত পাঠকও চমকে ওঠেন। 'প্রথম মণীন্দ্রগুপ্ত'-র সময় পর্যন্ত অন্তত, যুদ্ধ একটা চলছিলই - রুচির স্বাধীনতা ও গতানুগতিকতার যুদ্ধ, যা একইসঙ্গে নান্দনিক ও রাজনৈতিক। রাজভাবে ভাবিত, অভ্যাসযোগে নিরত 'প্রথম মণীন্দ্রগুপ্ত'-এর কথকের মণিহীন দুই চোখ ছিল 'ঠাণ্ডা স্ফটিকের মতো' - স্থৈর্য যেখানে মূল সুর, কিন্তু সে নিজেই ক্রোধরূপে প্রশমিত অবস্থায় থাকতে পারে মহাজনতন্ত্রের উপেক্ষার করাতকলে পিষ্ট হতে হতে (কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ১৩৭)। তবে কালের গতিতে স্থৈর্য আরও গহন-গভীর হতে হতে ক্রোধ লুপ্ত হল প্রায়, যে ক্রোধ ম্যানিফেস্টোসুলভ লেখাগুলিতে ব্যক্ত হতো, সেই ক্রোধ জায়গা ছেড়ে দিল শান্ত এক অবলোকনকে দুই দশক পরে, স্থৈর্যের সে আর-এক রূপ, যা কথককে লিপ্ত হতে না দিয়ে তাঁর নিজেরই পূর্বসিদ্ধান্ত ও লেখকজীবনের অন্তিমে সেইসব সিদ্ধান্তগুলির দূরপ্রসারী প্রভাবের চিহ্নগুলিকে তফাৎ থেকে বিক্ষুব্ধ না হয়ে, অপ্রমত্ত ভঙ্গিতে শনাক্ত করতে শেখায়। এই স্থৈর্যই ফুটেছে 'কষ্ট' কবিতাটিতেঃ 'বরেনবাবু বেশি মুগ্ধ হয়ে আগেই সেই ফল পেড়ে ফেলেছিলেন/ আর আমি গাছে রেখে দেখে দেখে সেই সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে আছি -/ ছায়া করে আছে ফলে ভরা গাছ।' (কবিতাসংগ্রহ, পৃ. ৩২৯)। ফল সাততাড়াতাড়ি পেড়ে না ফেলে গাছে তাকে রক্ষা করে উপভোগ করা হল কর্তাভাব বা ভোক্তাভাব ত্যাগ করে সাক্ষীভাব অবলম্বনের মনোধর্ম, যা স্থৈর্যের দর্শনগত ভিত্তিভূমি এবং সেই স্থৈর্য স্ফুট হচ্ছে নির্দিষ্ট এক ক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে - অবলোকন। তাই মণীন্দ্র গুপ্ত 'দেখে' শব্দটিতে অমন ঝোঁক দিয়েছেন এখানে (কবিতাসংগ্রহ, পৃ ৩২৯)।

এই দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া বরেনবাবুদের মতো কবিদের মণীন্দ্র গুপ্ত চিহ্নিত করেছিলেন অনেক আগেই, প্রায় মধ্যবয়সেই। ১৯৭২ সালের 'এক বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা'-র ভূমিকায় লিখেছিলেনঃ 'মাত্র তিন-চারজন ছাড়া, চল্লিশ ও পঞ্চাশের সেই বিশ্রুতকীর্তি বিপ্লবী, যোদ্ধা, প্রেমিক ও সন্তগণ এত তাড়াতাড়ি নির্বাপিত হয়ে গেলেন! তাঁদের আপনবৃত্তবদ্ধ রচনার অক্ষম চর্বিতচর্বন থেকে একটি ভালো কবিতা খুঁজে বার করা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।' (দাহপত্র, পৃ ৯৯)। কিন্তু প্রতিরোধ হিসেবে যা অবলম্বন করেছিলেন, তা স্থৈর্য। উপেক্ষিত-প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কষ্টকেও বিকশিত হয়ে রূপান্তরিত হতে দিয়ে তাকে শেষজীবনে নিঃশব্দ উপভোগের সামগ্রী করে তুলতে পেরেছিলেন। তিলক ও রুদ্রাক্ষ সম্বল করে দশনামীদেরও একটা সংগ্রাম থাকে, যে সংগ্রামস্থৈর্যজা্ত, লেখকজীবনের প্রথম দিকের পর্বে তুমুল সেই নিঃশব্দ লড়াই লড়তে হয়েছিল মণীন্দ্রগুপ্তকে, কিন্তু ২০১০ সালের এক শিশি গন্ধহীন ফ্রেইগ্রানস-এর সময় মন তাঁর অনেক শান্ত হয়ে এসেছিল, যদিও সংকল্প ছাড়েননি তখনও। তাই স্থৈর্যের অন্য রূপ খেলা করছে 'কষ্ট' কবিতাটির চূড়ায়ঃ 'দূরে লাল রেখায় রেখায় আঁকা মেঘ।' (কবিতাসংগ্রহ, পৃ. ৩২৯)। গাছ ও মেঘ দিয়ে গড়া আকাশের যে সিল্যুয়েটে এই কবিতা শেষ হয়, তা মণীন্দ্রগুপ্তকে যথাযথ এক ঐতিহ্যেও যেন থিতু করে - অনাপোষী, স্বধর্মথিতু, স্বাধীন আয়ুষ্মানদের ঐতিহ্য। দিগন্তের ওই সৌন্দর্য নিজেকে সেই ঐতিহ্যে থিতু হতে দেখতে পারারও সৌন্দর্য, কেননা যিনি সে সৌন্দর্যে বিভোর, তিনি যেন সাক্ষীস্বভাব থেকে একটু হটে গিয়ে অথচ আত্মকরুণার পাল্লায় না পড়েও সেই সৌন্দর্যেরই অংশ হয়ে গেলেন এই অন্তিম দৃশ্যফ্রেমটিতে। এই ঐতিহ্যের মূল এক পূর্বসূরী যে জীবনানন্দ দাশ, তার একটা ইঙ্গিত ছিল 'প্রথম মণীন্দ্র গুপ্ত' কবিতাটির শেষে। 'চাঁদের ওপিঠ থেকে দুঃসাহসী ছোট্ট শুক/ হাতের পাতায় বসে ছায়াজগতের কথা বলেঃ/ এখনো রানীর অন্ধকার কাঁধে নাকি জ্বলে/ তীক্ষ্ণ অতীত অর্কিড' (কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ১৩৭) - এই পংক্তিগুলি লেখার সময় জীবনানন্দ-কর্তৃক ব্যবহৃত লব্জ 'চাঁদের ওপিঠে'-ই শুধু নয়, 'জ্যোৎস্নারাতে বেবিলনের রানীর ঘাড়ের ওপর চিতার উজ্জ্বল চামড়ার/ শালের মতো জ্বলজ্বল করছিল বিশাল আকাশ' (কাব্য সমগ্র, পৃ. ১৮৭) - জীবনানন্দের 'হাওয়ার রাত' কবিতার এই পরিপ্রেক্ষিত ও দৃশ্যকল্পকে মনে করিয়ে দিয়ে মণীন্দ্র গুপ্ত যে ওই তীক্ষ্ণভাবে স্বাধিকার-চিহ্নিত কবিতাটিতেও 'জ্যোৎস্নালোকে ঢুলেঢুলে' পুনর্জন্মের পথে নামতে চেয়েছিলেন, সেই পুনর্জন্ম অতীতের দানকে অঙ্গীভূত করে পুনরাবর্তিত হবার ধারা, যে ধারার চূড়ায় জীবনানন্দ বিধুর হাস্য করে জেগে রয়েছেন (কবিতা সংগ্রহ, পৃ. ১৩৭)। প্রকাশিত জগতের উল্টোপিঠের যে-বাস্তব কবিতায় ফোটাতে চেয়ে 'চাঁদের ওপিঠে'-র সঙ্গে মণীন্দ্র গুপ্ত একজন ভাস্করের মতো লিভার, পাথর, গর্ত, অর্ধসমাপ্ত মূর্তি নিয়ে লেগে থাকেন (গদ্যসংগ্রহ ১, পৃ. ৫৭), সেই পথে তাঁর সঙ্গে মহাবল, প্রত্যাখ্যাত, দলহীন পূর্বসূরী জীবনানন্দের সাক্ষাৎ হয়, এমনকি 'প্রথম মণীন্দ্র গুপ্ত'-ও নিজেকে ঐতিহ্যে 'বংশধারার একজন' হিসেবে শনাক্ত করতে পেরে অবশেষে 'কষ্ট' কবিতায় নিজেকে দিগন্তে লীন করেন (গদ্যসংগ্রহ১, পৃ. ৬৬)। এই দু-টি কবিতা তাই একজন কবিতা লিখিয়ের জীবন-পরিক্রমার দুই প্রান্তে পোঁতা দুই নিশান।


সূত্রঃ

● গুপ্ত, মণীন্দ্র। কবিতা সংগ্রহ । পূর্ণাঙ্গ আদম সংস্করণ। আদম। কৃষ্ণনগর। ২০১১।
● গুপ্ত, মণীন্দ্র। গদ্য সংগ্রহ ১। প্রথম প্রকাশ। দ্বিতীয় মুদ্রণ। । অবভাস। কলকাতা। ২০১৩।
● গুপ্ত, মণীন্দ্র (সম্পাদক)। পরমা ৯, শীত ১৩৮১ (আংশিক পুনর্মুদ্রণ)। দাহপত্র। সম্পাদকঃ কমলকুমার দত্ত। সংখ্যা ২৭। চন্দননগর। জুন-ডিসেম্বর ২০১৪।
● গুপ্ত, মণীন্দ্র (সম্পাদক)। পরমা ১১, শীত ১৩৮২ (আংশিক পুনর্মুদ্রণ)। দাহপত্র। সম্পাদকঃ কমলকুমার দত্ত। সংখ্যা ২৭। চন্দননগর। জুন-ডিসেম্বর ২০১৪।
● গুপ্ত, মণীন্দ্র ও সিংহ, রঞ্জিত (সম্পাদক)। ভূমিকা। এক বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতাঃ ১৯৭২ (পুনর্মুদ্রণ)। দাহপত্র। সম্পাদকঃ কমলকুমার দত্ত। সংখ্যা ২৭। চন্দননগর। জুন-ডিসেম্বর ২০১৪।
● দাশ, জীবনানন্দ। জীবনানন্দ দাশের কাব্যসমগ্র। সম্পাদকঃ ক্ষেত্র গুপ্ত। ভারবি। কলকাতা। ২০০৪।
● দাশগুপ্ত, সর্বজয়া। 'মণীন্দ্র গুপ্তর উৎসর্গের পাতা'। চমৎকার। সম্পাদকঃ শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়। পঞ্চম সংখ্যা। ফেব্রুয়ারি ২০২২।
● বসু, গৌতম। 'মণীন্দ্র গুপ্তঃ একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য'। আদম। সম্পাদকঃ গৌতম মণ্ডল। অষ্টবিংশ বর্ষ। কৃষ্ণনগর। জানুয়ারি ২০২৩।