আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

নির্মাণ শিল্পে ইঁট ও তার একটি বিনির্মাণ

অনিন্দিতা রায় সাহা


মানব সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে ক্রমশ গড়ে ওঠে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, বড়ো বড়ো ইমারত, অট্টালিকা। অর্থনৈতিক বিকাশ মানে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, পরিকাঠামো নির্মাণ। নির্মাণ ক্ষেত্র ভারতবর্ষের মোট আয়ের প্রায় ৮% আর এখানে কর্মসংস্থান প্রায় ৫ কোটি। দেশের শিল্পোন্নয়ন, শহরের বিকাশ, আবাস যোজনা, স্মার্ট সিটি ইত্যাদি মানেই পরিকাঠামোর বিস্তার। আর এইসব নির্মিতির ভিত্তি গাঁথতে স্টিল আর সিমেন্টের সাথে অবশ্য প্রয়োজন ইঁট। গল্প-উপন্যাসে ইঁটের ভাটার উল্লেখ নানাভাবে উঠে আসে। কখনো সামাজিক নিরাপত্তাহীন জায়গায় নারী সুরক্ষা প্রসঙ্গে, কখনো বা চোরাকারবারীদের বেআইনি কাজকর্মের কেন্দ্র হিসেবে। এছাড়া, ধুঁকতে থাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্যেও ইঁটের ভাটার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বহুযুগ ধরে চলে আসা এই শিল্পক্ষেত্রটি আরেকটি সমসাময়িক প্রয়োজনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে। পরিবেশ দূষণ ও শ্রমিক স্বাস্থ্য। মাটি দিয়ে তৈরি পোড়ানো ইঁট মাটি দিয়ে তৈরী হলেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। কীভাবে তা বুঝতে হলে জানতে হবে এর উৎপাদন প্রক্রিয়া। আর তা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যাবে কীভাবে এটি ইঁটভাটা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সংকট তৈরী করে।

আগুন ব্যবহার করে কাদামাটির ইঁট (clay fired brick) তৈরিতে ভারতবর্ষ পৃথিবীতে দ্বিতীয় স্থানে আছে। এ দেশে মোট প্রায় ১ লক্ষ ইঁটের ভাটা (brick kiln) আছে আর তার থেকে বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ১.৫–২ বিলিয়ন। সুপ্রাচীন এই ক্ষুদ্র শিল্প চলে পুরোনো কারিগরি পদ্ধতিতে, স্বল্প বিনিয়োগ সংস্থানে এবং ছোট মাত্রার উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে। কাদামাটি হচ্ছে এই উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটিমাত্র কাঁচামাল আর পোড়ানো ইঁট তার একটিমাত্র উৎপাদিত দ্রব্য। অর্থাৎ অতি সরল এই প্রক্রিয়া। অথচ এইসব ইঁটের ভাটাতে প্রতি বছর মোট প্রায় আড়াই কোটি টন কয়লা ব্যবহার হয়। ইঁটের ভাটাতে কয়লা আর অন্যান্য জৈব-ভর পোড়ানোর ফলে প্রচুর পরিমাণ কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড এবং PM-১০, PM-৫, PM-২.৫ জাতীয় বস্তুকণা উৎপন্ন হয়।

এখন দেখা যাক, কাদামাটির পোড়ানো ইঁট তৈরির পর্যায়গুলো কী কী। মোটামুটিভাবে এগুলি হল মাটি খোঁড়া, মাটি প্রস্তুতি, ছাঁচনির্মাণ, ইঁট শুকানো, আগুনে পোড়ানো, ঠান্ডা করা আর পরিশেষে ইঁট সংগ্রহ করা। প্রায় ১২-১৪ দিন রোদে শুকানোর পরে কাঁচা ইঁট পোড়ানো হয় ভাটাতে, তাপমাত্রা প্রায় ৮০০–১০০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। আগে ভাটা গরম করা, তারপর আগুন দেওয়া, আর সবশেষে ঠান্ডা করা, এই প্রণালীতে এসে গেল কয়লা। এই তিনটি কাজ চলে একই সাথে তিনটি পাশাপাশি জায়গায় অবিরাম, বছরের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময়। প্রযুক্তিগতভাবে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার ভাটাগুলিতে বেশি ব্যবহার হয় পুরোনো ধরণের Fixed Chimney Bulls Trench Kilns আর Zigzag Kilns, যাতে নিম্নমানের কয়লা ব্যবহার হয়। এর উৎপাদনশীলতা কম, আর বায়ুদূষণ ক্ষমতাও বেশি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ইঁট নির্মাণ শিল্পে বার্ষিক প্রায় ১৩০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। নতুন প্রযুক্তির Induced Draught Zigzag Kilns আর Hoffman Kilns এখনো তেমন চালু হয় নি। তার ওপর, অসম্পূর্ণ দহনের ফলে আরো দূষণকারী দ্রব্য, যেমন, আর্সেনিক, বেনজিন, পারদ ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। যেহেতু আশপাশের জমি থেকে কাদা তোলা হয় এবং ভাটাতে আগুনের কাজ হয়, সেহেতু ভূমিক্ষয় ও চাষের জমির গুণবত্তা হ্রাসপ্রাপ্ত হয়, মাটির নীচের জলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সঙ্গে ক্ষতি হয় শ্রমিকের স্বাস্থ্যের।

পেশাগত ঝুঁকির দিক থেকে দেখলে ইঁট নির্মাণ শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকেরা বেশ বড়ো স্বাস্থ্য সংকটের শিকার। ধুলো, প্রদূষক বস্তুকণা, ভাটার উচ্চতাপ আর বিষাক্ত ধোঁওয়া অনবরত তাদের সঙ্গী। এর ফলে তাদের শরীরে বাসা বাঁধে নানা রকমের ফুসফুসের রোগ, যেমন, কাশি, শ্বাসকষ্ট, ব্রংকাইটিস, হাঁপানি ইত্যাদি। শ্রমিকদের মধ্যে এইসব রোগ পুরুষদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। অবশ্যই মানতে হবে যে, মহিলাদের তুলনায় পুরুষরা সাধারণত অনেক বেশি দিন এইসব কঠোর শ্রমের সাথে যুক্ত থাকে। তার ওপর অনেকেরই নানারকম নেশার অভ্যাস থাকে, যার ফলে শ্বাসজনিত রোগ বেশি হয়। কিন্তু মহিলাদের মধ্যেও রোগের প্রভাব দেখলে বোঝা যায় ইঁট ভাটার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করলে কতখানি শারীরিক ক্ষতিস্বীকার করতে হতে পারে। এই ক্ষুদ্র শিল্পে স্থানীয় লোক প্রচুর, যারা চাষের কাজ আর ভাটার কাজ পালা করে সম্পন্ন করে। কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকও এখানে কম নয়। উভয় ক্ষেত্রেই বাসস্থানের দশা সঙ্গীন। সাধারণত ঠিকাদারেরা অস্থায়ী ঘর তুলে দেয় ওই ইঁট দিয়েই। তাতে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা প্রায় নেই। এইসব গৃহস্থালিতে রান্নার জ্বালানি মূলত কাঠকয়লা। অর্থাৎ, ঘরেও দূষণ, বাইরেও দূষণ। স্বাস্থ্যকেন্দ্র অনেক দূরে। স্বাস্থ্যবীমার বা আর্থিক সহযোগিতার কোনও দায় মালিকের নেই। অতএব, শ্রমিক অচল হয়ে না পড়া পর্যন্ত এইভাবেই কাজ চলতে থাকে। এছাড়াও দেখা যায় পেশী-কঙ্কালের অসুখ (Musculoskeletal Diseases)। দীর্ঘ সময় ধরে ভাটায় কাজ করার ফলে, প্রায় দৈনিক ১২ ঘন্টা, সপ্তাহে ৭ দিন, শ্রমিকেরা কাঁধ, গলা, পিঠ, হাঁটু, এমনকি কব্জির অসুখেও আক্রান্ত হয়। মাথার যন্ত্রণা, চোখের সমস্যা, আর শারীরিক দুর্বলতা তো আছেই। কাজের জায়গায় শ্রমিকদের জন্য কোনো সুরক্ষা পোশাক, ফেস মাস্ক, হাতের দস্তানা দেওয়ার চল নেই। তারা তো জানেই না যে শ্রমিক স্বাস্থ্য আর শ্রমিক সুরক্ষা মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। অন্যান্য অনেক শ্রমক্ষেত্রের মতোই ইঁট উৎপাদন শিল্পটি শ্রমিক প্রান্তিকরণের আর একটি উদাহরণ। আলাদাভাবে বলার নেই এর অন্যান্য সামাজিক সঙ্কটগুলি, পরিবারের পিছিয়ে থাকা আর বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস।

আগেই বলা হয়েছে, ইঁট পোড়ানোর এই কান্ডকারখানা দক্ষিণ এশিয়ায় খুব বেশি দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি ইঁট উৎপন্ন হয় চীনদেশে। প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে আছে বাংলাদেশ। সেখানেও কয়লার ব্যবহার হয়। কিন্তু চীন সরকার এ ক্ষেত্রে পরিবেশ সংক্রান্ত কিছু নীতি নির্ধারণ করেছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি না হলেও, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি আর শক্তি সাশ্রয়কারী যন্ত্রের ব্যবহার করার জন্য আছে সরকারি অনুদান। ওদেশে Tunnel kiln ব্যবহার করার ফলে প্রদূষণ ক্রমশ কমছে। এছাড়া ভূমিক্ষয় আর শক্তির ব্যবহার কমানোর জন্য ফাঁপা ইঁট প্রস্তুত করাকেও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে শক্তির ব্যবহার প্রায় ২০%–৫০% কমে যেতে পারে। এর সঙ্গে আছে পরিবর্ত কাঁচামাল হিসেবে ফ্লাই অ্যাশ ও স্ন্যাগের ব্যবহার। এইসব নীতি প্রণয়নের ফলে চীনদেশে ইঁট ভাটার মানচিত্রে যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশেও শক্তি-দক্ষ প্রযুক্তি আর পরিবর্ত জ্বালানির ব্যবহারে সরকারি উদ্যোগ দেখা গেছে। যদিও নিয়ম না মানলে লাইসেন্স বাতিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তবু বাস্তবে সাফল্য খুব আসেনি। উপযুক্ত প্রযুক্তি আর দূষণ মাত্রা লক্ষ্যের (emission standard) অভাবে ভাটার মালিকেরা তেমন উৎসাহী হয়নি। তবে কিছু আধুনিক প্রযুক্তি বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছে, কিছু নির্দেশিকা জারি হয়েছে এবং আশার সঞ্চার হয়েছে যে এই ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে উন্নতি দেখা যাবে। আমাদের দেশেও এরকম নীতি প্রণয়ন ও প্রয়োগ অতি জরুরি। সেই সঙ্গে পেশাগত স্বাস্থ্য ও শ্রমিক সুরক্ষা আইন জোরদার হওয়া দরকার। তার ফলে পরিবেশ ও শ্রমিক স্বাস্থ্য, দুইয়েরই উপকার হবে।