আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২
সমসাময়িক
কল্পনাহীন স্বৈরাচারী হইতে সাবধান!
মহান নাট্যকার হাবিব তানভির একটি কথা বহুবার তাঁর ভাষণে বলতেন - "beware of the tyranny of the unimaginative"। অর্থাৎ কল্পনাহীনের স্বৈরাচার হইতে সাবধান। মানব মস্তিষ্কের একটি অসাধারণ উপাদান হল কল্পনা। বলা যেতে পারে যে কল্পনা থেকেই জন্ম সৌন্দর্য, মাধুর্য, শিল্প-কলার। অন্যদিকে, যারা হিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তাদের মনে কল্পনা নেই, সৌন্দর্য নেই। তাই তালিবান ধ্বংস করে ফেলে বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তি, হিন্দুত্ববাদীরা ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ, মকবুল ফিদা হুসেনের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয় বজরং দলের মর্কটরা, হাবিব তানভিরের নাটকের উপরে নামিয়ে আনা হয় আক্রমণ। এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে মৌলবাদী ফ্যাসিস্ত শক্তির ক্ষমতার উন্মত্ততা এবং রাজনীতির সংকীর্ণতা বারে বারে তাদের দাঁড় করিয়েছে মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ কীর্তিদের বিরুদ্ধে।
এই ধারার সর্বশেষ সংযোজন রবীন্দ্রনাথের উপর আক্রমণ। অসমের মুখ্যমন্ত্রী এক প্রবীণ কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা রুজু করতে বলেছেন পুলিশকে। তাঁর অপরাধ? তিনি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান, 'আমার সোনার বাংলা' গেয়েছেন কংগ্রেসের একটি সভায়। যেহেতু গানটি বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত, অতএব এই গান ভারতে গাওয়া হলে তা দেশদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়বেই, বিশেষ করে তখন যখন 'হিন্দু হৃদয় সম্রাট' দেশ থেকে বাংলাদেশী 'ঘুশপেটিয়া'-দের নিকেশ করার জন্য আদাজল খেয়ে নেমেছেন! এহেন পরিবেশে বাংলা গান নিয়ে যখন বিতর্ক, তখন বাঙালি রামভক্ত জাতীয়তাবাদীরা কিছু বলবেন না, তা তো হতে পারে না! অতএব, কলকাতার এক দুই-আনার বিজেপি নেতা ঘোষণা করে দিয়েছেন যে এখন পশ্চিমবঙ্গে এই গান গাইতে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তারা ২০২৬-এ ক্ষমতায় এলে এই গান আর পশ্চিমবঙ্গে গাওয়া যাবে না। বাঙালিরা এইসব নিদান নিয়ে কী ভাবছেন তা আজ শুধু সাংস্কৃতিক প্রশ্ন নয়, রাজনৈতিক প্রশ্ন।
রবীন্দ্রনাথ 'আমার সোনার বাংলা' গানটি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। বহু দশক পরে এই গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আসলে গানটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি মহান সঙ্গীত যা বাঙালি জাতিকে প্রেরণা জুগিয়েছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করার। গানটিতে রবীন্দ্রনাথ যে কল্পচিত্র ব্যবহার করেছেন, তাতে ধর্মের কোনও অনুষঙ্গ নেই। বাংলার হিন্দু ও মুসলমান, উভয়ের মনে বাংলা ভাষা, বাংলার প্রতি টানকে ভাষা দিয়েছিলেন কবি, যাতে বাংলার সন্তানরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন। আজ বাংলাদেশের ইসলামি মৌলবাদীরা চায় না 'আমার সোনার বাংলা' সেই দেশের জাতীয় সঙ্গীত হোক। আর আমাদের দেশের হিন্দু মৌলবাদীরা এই গান গাইলে জেলে পাঠানোর ষড়যন্ত্র করে। বোঝাই যায় যে রবীন্দ্রনাথকে মান্য করা যে কোনো মৌলবাদীর পক্ষেই অসম্ভব। 'আমার সোনার বাংলা' গান পশ্চিমবঙ্গের বহু জায়গায় তারপরেও গাওয়া হয়েছে। এই প্রয়াস সাধুবাদযোগ্য। কল্পনাহীনদের মাতব্বরির বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
কিন্তু এই আক্রমণ শুধু অসমের মুখ্যমন্ত্রী তথা কলকাতার দু-আনার বিজেপি নেতার তরফে হচ্ছে না। আসলে বাংলা ভাষা এবং বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ তথা ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি চিন্তার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়েছে আরএসএস ও বিজেপি। বহু বছর ধরে আরএসএস-বিজেপি এই প্রচার চালিয়েছে যে 'জনগণ মন'-এর পরিবর্তে 'বন্দে মাতরম্'-কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এমন কথাও রটিয়ে দেওয়া হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথ 'ভারতভাগ্যবিধাতা' নাকি লিখেছিলেন ইংল্যান্ডের রাজাকে খুশি করার জন্য। এই সমস্ত ফালতু কথা এখন পেয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় শক্তির বল। অতএব দেশের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে দিলেন যে 'বন্দে মাতরম্' কবিতার কিছু অংশ বাদ দিয়ে অন্যায় করা হয়েছে এবং এর মধ্যেই নাকি নিহিত ছিল দেশভাগের বীজ। তাঁর ভাষণে মোদী যদিও রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ করেছেন, কিন্তু তাঁর হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যথারীতি আবারও রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতাই করেছে।
প্রথমত, যখন 'বন্দে মাতরম্' স্লোগান তুলে দেশের মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন, সেই সময় আরএসএস-এর নেতৃত্ব ব্রিটিশদের পদলেহন করছিলেন, সাভারকর মুচলেকা দিয়ে মুক্তি চাইছিলেন। তাই 'বন্দে মাতরম্' নিয়ে এত কথা বলার অধিকার আরএসএস-এর প্রচারক মোদীর রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলতেই হয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতার দিকে তাকালে দেখা যাবে যে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সুভাষ বসু তথা নেহরুকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে গানটির প্রথম দুটি স্তবক গাওয়া হোক বাকিটা নয়। এর কারণ হল এই যে দেশটা শুধুমাত্র হিন্দুদের নয়। মুসলমানরাও এই দেশের নাগরিক, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তারাও সামিল। এই পরিস্থিতিতে দেশকে মা বা দেবীরূপে বন্দনা করায় যদি এই সমাজের আপত্তি থাকে তাহলে তা মনোযোগ দিয়ে শোনা জরুরি। এই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ মনে করেছিলেন যে গানটির প্রথম দুটি স্তবক রেখে বাকিটা বাদ দিলে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গানটির ভূমিকাকে সম্মান জানানো হয়, আবার একই সঙ্গে মুসলমানদের আপত্তিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনাও করা হয়। মোদী তথা আরএসএস-এর রাজনীতি এর মধ্যে দেশভাগের বীজ দেখতে পাচ্ছে, কেননা, তাদের কল্পনায় দেশ বলতে ভারতকে তারা শুধুমাত্র হিন্দুদের দেশ হিসেবেই ভাবেন, ভাবাতে চান, অন্য ধর্মের মানুষের সেখানে কোনও অধিকার নেই। অতএব একই সঙ্গে 'আমার সোনার বাংলা' গানটি, যেখানে ধর্মের কোনও অনুষঙ্গ নেই, তার বিরুদ্ধেও বিজেপির আপত্তি, আবার 'বন্দে মাতরম্'-এর স্তবক কেন বাদ দেওয়া হল, তা নিয়েও তারা ইতিহাস বিকৃত করে রবীন্দ্রনাথের বিরোধী। আসলে নিজেদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা যা দরকার তাই তারা করছে।
রবীন্দ্রনাথের 'আমার সোনার বাংলা' হোক অথবা বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দে মাতরম্' - দুটি নিয়েই আরএসএস-বিজেপির রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রে রয়েছে কল্পনাহীন সাম্প্রদায়িকতা। ক্ষমতার জোরে তারা এখন এই কল্পনাহীন স্বৈরাচার আমাদের উপরে আরোপিত করছে। 'আমার সোনার বাংলা' গানে ধর্ম ব্যতিরেকে যে বঙ্গের কল্পনা রয়েছে তা হিন্দুত্ববাদী তথা মুসলমান মৌলবাদীদের গাত্রদাহ করে। এহেন ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কল্পনা করার ক্ষমতা কোনও ধর্মীয় মৌলবাদীর থাকতে পারে না। আবার 'বন্দে মাতরম্' যখন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্লোগানে পর্যবসিত হয়েছিল, তখন আরএসএস নেতারা ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামকেই দুর্বল করছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে এখন সেই আরএসএস-বিজেপির নেতাদের কাছে আমাদের রবীন্দ্রনাথ তথা বঙ্কিম নিয়ে জ্ঞান শুনতে হচ্ছে!