আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

দূষিত রাজধানী


ফি বছরের মতো এবারও দিল্লির আকাশ ছেয়ে গিয়েছে জমে থাকা বিষ ধোঁওয়ায়। শীতের আবহে যে কুয়াশা নামার কথা, সেখানে নেমে আসে ধোঁওয়ার পর্দা। সূর্যের আলো নিভে যায়, গাছের পাতায় ধুলোর স্তর জমে, আর মানুষের মুখে ভীতির রেখা। এই ভয়ের উৎস শীত নয়, প্রকৃতিও নয় - বরং বহু বছরের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, ঢিলেঢালা নীতি, আর মিথ্যাকে শাসনের প্রধান অস্ত্র করে তোলার অভ্যাস। দিল্লি তাই কেবল ভৌগোলিক রাজধানী নয়, শাসনব্যবস্থার সঙ্কটের প্রতীক হয়ে উঠেছে। শ্বাস নেওয়া এখানে আর নিছক দৈহিক প্রক্রিয়া নয়; রাজনৈতিক লড়াই। এবং সেই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষ প্রতিদিনই পরাজিত। ধোঁওয়ার উৎস জানার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। দিল্লীর পার্শ্ববর্তী রাজ্যে শস্যের আঁটি পোড়ানো, দিল্লির রাস্তায় লক্ষ লক্ষ যানবাহনের পাশবিক গর্জন, কারখানার ধোঁওয়া, নির্মাণস্থলে উড়তে থাকা ধূলিকণা, আর সবশেষে জলবায়ুর অনিশ্চয়তা সব মিলে এক অদম্য দূষণবাহিনী তৈরি করেছে। কিন্তু এই বাহিনীর বিরুদ্ধে সরকার যে ব্যবস্থা নেয়, তা কাগজে কঠোর, বাস্তবে নিস্তেজ। নির্মাণে স্থগিতাদেশ দিলেও হাজারো ফাঁক রাখা হয় যাতে কাজ চলতেই পারে, নির্দিষ্ট জায়গায় প্রণামী দিয়েই। আইন তৈরী হয় দুর্নীতিকে পোক্ত করতে। রাস্তায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণের নিয়ম আসে, কিন্তু তার প্রয়োগ হয় নির্বাচনী হিসাব মেনে। আর কৃষকদের দিকে আঙুল তুলে ক্ষমতার রাস্তা তৈরি হয়। সরকারের চোখে কৃষক দোষী, কারণ তার ওপর দায় চাপানো সহজ। কিন্তু সেই কৃষকই যে বিকল্প উপায় পাচ্ছেন না, ভর্তুকি কার্যকর হচ্ছে না, যন্ত্রপাতি পৌঁছচ্ছে না এ প্রশ্ন শাসক তোলেন না। কারণ বাস্তবের প্রশ্ন তুললে উন্নয়নের সাজানো ছবি ভেঙে যাবে। শাসকেরা সেটাই সবচেয়ে ভয় পায়।

সাথে আছে যমুনা নদী যার জল একসময় শহরের প্রাণ ছিল, আজ হয়ে উঠেছে শহরের পচনের প্রতীক। যমুনার বুকে বিষের ছায়া এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে জল আর জল নেই; আছে এক রাসায়নিক মিশ্রণ। নদীর গন্ধে দাঁড়ানো যায় না, জল ছোঁয়া যায় না, আর সেই জলই মানুষ পায়ে মেখে দেবতার আরাধনা করছে এ দৃশ্য কোনো ধর্মীয় ভক্তির নয়, বরং মানুষের অসহায়তার। নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে বহুদিন। নদী এখন শহরের পাপ বহনের বর্জ্য নালা, যেখানে ফেলে দেওয়া হয় সব ব্যর্থতা, সব অব্যবস্থা। আর রাজনৈতিক ভাষায় নদীর নাম উচ্চারণ হলেই সামনে তুলে ধরা হয় পোস্টার, প্রকল্প, কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ। কথার আড়ালে থাকে বাস্তব; যমুনা আজ এক শ্মশান, যেখানে জলের ওপর ভেসে ওঠে সভ্যতার লাশ।

এই সবের মাঝে ছঠপুজোর নকল ঘাট তৈরির ঘটনা যেন শহরের দুর্যোগকে আরও নগ্ন করে দেয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রতীকী স্নানকে সামনে রেখে যে কৃত্রিম পুকুর তৈরি করা হল, তা শুধু হাস্যকর নয়, বিপজ্জনকও। কারণ এটা দেখায়, সরকার সমস্যার মুখোমুখি নয়; বরং সমস্যার সাজানো ছদ্মবেশ তৈরি করে নিজেদের রক্ষা করছে। নদী পরিষ্কার করা হয়নি, কিন্তু একটি স্থির ফ্রেমে নদীকে 'পরিষ্কার' দেখাতে হবে - এই প্রয়োজনই যেন এখন বাস্তব শাসনের সবচেয়ে বড় নীতি। এ যেন সিনেমার সেট বানানো, বাস্তব পচে যাচ্ছে, কিন্তু পর্দায় গল্পটাকে এখনও সুন্দর রাখার প্রয়াস চলছে। এবং এই প্রহসন এমনই গভীর যে সাধারণ মানুষকে বাস্তব নদীর সামনে দাঁড়াতে হয়, আর নির্বাচিত নেতা নামেন কৃত্রিম পুকুরে। শাসকরাই তাই নদীকে লজ্জা দিতে শুরু করেছে; নদী লজ্জা পায় না, লজ্জা পায় রাষ্ট্র।

কেন সরকার এই পথ বেছে নেয়? কারণ সত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার বদলে সত্যের প্রতিবিম্বকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। বায়ুদূষণ কমানোর প্রকৃত কাজ কঠিনঃ কৃষিকে পুনর্গঠন করতে হবে, শিল্পকে কঠোর নিয়মে আনতে হবে, যানবাহনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে, আর শহরকে নতুন প্রবাহ দিতে হবে। তার বদলে শাসকেরা বেছে নিয়েছেন সহজ পথ - মনিটরিং কেন্দ্রের সামনে জল ছিটিয়ে বায়ুমানের মাত্রাকে 'নিয়ন্ত্রণে' দেখানো, পরিসংখ্যানকে সাজিয়ে উপস্থাপন করা, আর নাগরিকের সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকাকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করা। এ এক অদ্ভুত শাসন যেখানে প্রকৃতি অসুস্থ হলে চিকিৎসা হয় না, রিপোর্টই বদলে দেওয়া হয়।

দিল্লির বাতাস আর যমুনার জল আজ এই দেশের রাজনৈতিক উদাসীনতার নীরব সাক্ষী। এরা দু'জনেই দেখছে, কীভাবে রাজনৈতিক দায়সারা মনোভাব নাগরিকের জীবনের ওপরে চরম বিপদ নামিয়ে এনেছে। নাগরিকেরা যখন ইন্ডিয়া গেটে দাঁড়িয়ে শ্বাস নেওয়ার অধিকার দাবি করে, তখন তাদের মুখে শুধু প্রতিবাদ নয়, এক ধরনের মর্যাদার সন্ধানও থাকে। তারা শ্বাস চাইছে, কিন্তু সেই শ্বাস শুধু প্রকৃতির নয়; গণতন্ত্রেরও। কারণ গণতন্ত্রের প্রথম শর্তই হল মানুষ বাঁচবে। আর সেই বাঁচার জায়গাটাই যখন শাসনব্যবস্থা বিষাক্ত করে তোলে, তখন নাগরিকের প্রতিবাদ শুধু অধিকার নয়, প্রতিরোধের প্রয়োজনও। যে শহর একদিন নদীর তীরে নির্মিত হয়েছিল, আর সেই নদীই আজ শহরের ব্যর্থতার স্মারক। আকাশ একসময় ছিল বিস্তৃত, আজ সে ঢাকা পড়ে নিঃশ্বাসের টানে। মানুষ একসময় শহর বানিয়েছে, আজ সেই শহরই তাকে ধীরে ধীরে ভক্ষণ করছে। আর এই পরিস্থিতিতে সরকার যে মঞ্চ-সাজানো ছবি দেখায়, তা শাসনের ব্যর্থতাকে ঢাকতে পারে না। কারণ বাস্তবের গন্ধ - যমুনার পচা জল, দিল্লির ধোঁওয়ার তীব্রতা - সেটা কোনও কাগজের ঘোষণায় চাপা পড়ে না।

দিল্লির বর্তমান অবস্থা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রাখে। আমরা কি এমন এক রাষ্ট্র গড়েছি, যা সমস্যার সমাধান করে? নাকি এমন রাষ্ট্র, যা সমস্যার কল্পিত ছবি আঁকে, আর তাতেই খুশি থাকে? নদী বাঁচাতে হলে জল পরিষ্কার করতে হয়, বাতাস বাঁচাতে হলে ধোঁওয়া কমাতে হয়। কিন্তু সরকার এখন নদীকে নয় - ক্যামেরাকে পরিষ্কার করছে। বাতাসকে নয় - মনিটরিং কেন্দ্রকে 'শুদ্ধ' করছে। মানুষের জীবনকে নয় - মানুষের ভোটকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সময়ের সঙ্গে ধোঁওয়া কাটবে, বহুদিন পরে যমুনা হয়তো আবার স্বচ্ছ হবে, কিন্তু শাসনের ভিতরে যে নৈতিক অবক্ষয় জমেছে - সেটা কাটবে কীভাবে? এই প্রশ্নই সবচেয়ে বড়। কারণ মানুষ যখন শ্বাস নিতে পারে না, তখন রাষ্ট্রের কোনও যুক্তিই টেকে না। আর যখন নদীর বুকে মৃত্যু জমা হয়, তখন উন্নয়নের কোনও কাহিনিই সত্য থাকে না। দিল্লির গল্প তাই শুধু পরিবেশ নয়, নৈতিকতারও। শহরটা আজ যে ধোঁওয়ার নিচে ঢাকা, তার নিচে চাপা আছে আরও গভীর অন্ধকার - শাসনের মিথ্যার অন্ধকার। শহর একদিন ধোঁওয়া সরিয়ে ফেলবে, নদী একদিন কাদা পরিষ্কার করবে, কিন্তু নাগরিকেরা কি ভুলবে - এই শাসনের মুখোশের অন্তরালে যে নিষ্ঠুর অবহেলা লুকিয়ে আছে? এই প্রশ্নই দিল্লির আকাশে ভেসে থাকে, ধোঁওয়ার থেকেও ভারী হয়ে।