আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
নিউ ইয়র্ক থেকে পাটনা
দূরত্ব ১২,৩৩২ কিলোমিটার। নিউ ইয়র্কের মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে পাটনার মাথাপিছু আয়ের তুলনা অর্থহীন - প্রথমটি পৃথিবীর ধনীতম শহরের একটি, দ্বিতীয়টি ভারতের দরিদ্রতম রাজ্যের রাজধানী। শিক্ষার দিক থেকেও দুটি শহরের মধ্যে কোনও তুলনা চলে না। তাহলে এই দুটি শহরকে একই বন্ধনীতে রেখে সম্পাদকীয় লেখার কি কোনও অর্থ হয়? অর্থটি রাজনৈতিক। বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরকে কীভাবে ব্যবহার করে মানুষের মন জয় করতে হয়, তার উদাহরণ সাম্প্রতিক নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচন, আর তার ব্যর্থতার উদাহরণ হল বিহার তথা পাটনা।
নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে প্রথমবার কোনও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ মেয়র নির্বাচিত হলেন, যিনি ঘোষিতভাবে একজন বামপন্থী। ইজরায়েলের পরে ইহুদি সম্প্রদায়ের সর্বাধিক মানুষ থাকেন নিউ ইয়র্কে। সেই শহরে প্যালেস্টাইনের পক্ষে এবং ইজরায়েল তথা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জোরদার বক্তব্য রেখে জয়ী হলেন জোহরান মামদানি। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিকূলতার কোনও অভাব ছিল না। নিউ ইয়র্ক শহরের মহাধনী বিলিয়েনেয়ার শিল্পপতি গোষ্ঠী সরাসরি মামদানির বিরুদ্ধে, তাঁর পার্টির অধিকাংশ বড় নেতারা তাঁর বিরোধী, যে শহরে আল কায়দার বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন তিন হাজারের বেশি মানুষ, সেই শহরে মুসলমান মেয়রপ্রার্থী ছিলেন মামদানি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসেও তাঁকে কেউ চিনত না। একটি জনমত সমীক্ষায় মাত্র ১ শতাংশ মানুষ তাঁর পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে সেই শহরে ৫১ শতাংশের বেশি মানুষের সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হলেন মামদানি। কীভাবে সম্ভব হল এই অসম্ভব জয়?
এর উত্তরে প্রথমেই বলতে হবে মামদানির প্রচারের সংগঠনের কথা। আমেরিকায় নির্বাচনী প্রচারে টাকা দিয়ে প্রচার সামগ্রী, যেমন প্রার্থীর নাম লেখা টি-শার্ট ইত্যাদি সংগ্রহ করতে হয়। সেই টাকা প্রচারের কাজে লাগে, আবার সেই টি-শার্ট পরে মানুষ প্রার্থীর প্রচার করেন। মামদানি এতে বদল আনলেন। তাঁর প্রচারে কিছু ঘন্টা কাজ করলে উপহার হিসেবে এই প্রচার সামগ্রী দেওয়া হতো। অর্থাৎ শুধুমাত্র টাকা নয়, তিনি মানুষের শ্রমকে নিজের প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেন সৃজনশীলভাবে। সংবাদমাধ্যমের হিসেব অনুযায়ী ১ লক্ষের বেশি মানুষ সামিল হয়েছিলেন তাঁর নির্বাচনী প্রচারে। কিন্তু মানুষ কেন সামিল হলেন, কেন অর্থ বা শ্রম দিলেন, কেন ভোট দিলেন?
মামদানির প্রচারের বিন্দুগুলি ছিল স্পষ্ট। নিউ ইয়র্ক বিশ্বের ধনীতম শহরের মধ্যে অগ্রগন্য হলেও সেখানে গরীব মানুষের সংখ্যাও প্রচুর। বাসস্থান ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে এতটাই, যে সাধারণ মানুষকে শহরের ভিতরে নয়, চলে যেতে হয়েছে শহরের প্রান্তে। মামদানি বললেন, শহরের বাড়ি ভাড়া তিনি বাড়তে দেবেন না। শহরে যাওয়া আসা করার জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবা চালু করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কর্মরতা মহিলা তথা পুরুষদের শিশুদের দেখাশোনা করার জন্য বিনামূল্যে ক্রেশ পরিষেবা সুনিশ্চিত করার কথা বললেন। সব মিলিয়ে নিউ ইয়র্ক শহরকে গরীব মানুষের জন্য নতুনভাবে তৈরি করার কথা বললেন, যেখানে গরীব মানুষের আয়ের সঙ্গে অনুপাত রেখে শহরের পরিষেবা নির্ধারিত হবে, যেখানে গরীব মানুষকে জীবিকার সন্ধানে শহরে এসে, প্রাণপাত পরিশ্রম করে আবার দূরে চলে যেতে হবে না। সমস্ত পরিষেবা সুলভে পাওয়া যাবে গরীব মানুষের জন্য। এই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস রেখেছেন নিউ ইয়র্কের মানুষ। তাঁরা মামদানিকে নির্বাচিত করে ইতিহাস রচনা করেছেন। কিন্তু শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই তো আর মানুষ বিশ্বাস করবেন না। মানুষকে বিশ্বাস করানোর জন্য মামদানি লাগাতার মানুষের সঙ্গে থেকেছেন। গলি-মহল্লা-রাজপথে তাঁর পরিকল্পনার কথা মানুষকে ব্যাখ্যা করেছেন। শুধুমাত্র বিলিয়নেয়ারদের বিরুদ্ধে অথবা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে তাঁর প্রচার করেননি। গঠনমূলক প্রচার করেছেন মানুষের মধ্যে। তাঁদের বুঝিয়েছেন, কীভাবে তিনি তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করবেন। মানুষ তাঁর কথা শুনেছেন, তাঁর পরিকল্পনার উপরে বিশ্বাস রেখে তাঁকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছেন। ১ শতাংশের সমর্থন পাওয়া মামদানি সমাজের নতুন নতুন অংশকে নিজের সঙ্গে জুড়েছেন, তাঁদের বিশ্বাস করে আজ নিউ ইয়র্কের মেয়র পদে জয়ী হয়েছেন।
এবারে চলে আসুন পাটনায়। বিগত ২০ বছর ধরে সেখানে একটি সরকার চলছে নীতিশ কুমারের নেতৃত্বে। ২০ বছর আগেও বিহার দেশের মধ্যে দরিদ্রতম রাজ্য ছিল, এখনও আছে। ২০ বছর আগেও বিহারের শ্রমিকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজের আশায় যেতেন, এখনও যান। নীতিশ সরকার এই ২০ বছরে কোনও উন্নয়ন করেনি বললে ভুল হবে। কিন্তু বিহারের অর্থনৈতিক-সামাজিক আবহে যে কোনো মৌলিক পরিবর্তন করেছেন তা নয়। কিন্তু তাহলে নীতিশের এই জয়ের নেপথ্যে কী রয়েছে?
অনেকে বলছেন, তাঁর উন্নয়নের কাজগুলি, বিশেষ করে মহিলাদের জন্য, এবং ভোটের ঠিক আগে মহিলাদের ১০,০০০ টাকা দেওয়া নির্বাচনের হাল তাঁর দিকে ঘুরিয়েছে। কথাগুলি ফেলে দেওয়ার মতন নয়। কিন্তু বিরোধীরা ২০ বছর ধরে চলে আসা একটি সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়ে সরকার বদলানো দূরের কথা নিজেদের আসন সংখ্যা কমিয়ে ফেলছে এটি কী করে সম্ভব?
নীতিশের জয়ের নেপথ্যে রয়েছে একটি রাজনৈতিক-সামাজিক জোট। এই সমীকরণের রাজনৈতিক দিকে রয়েছে বিজেপি, জিতেন রাম মাঝিদের মতন নেতাদের সঙ্গে জোট। এর সামাজিক দিকে রয়েছে একদিকে ওবিসি এবং অন্যদিকে মহাদলিত, অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া জাতি (ইবিসি) এবং তার সঙ্গে বিজেপি-র হাত ধরে উচ্চবর্ণের সমর্থন। এই সামাজিক জোটটি তৈরি হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে লালু যাদবের আমলে মুসলমান ও যাদবদের দাপট। লালু যাদব বিহারের রাজনৈতিক মানচিত্রে সামাজিক ন্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। উচ্চবর্ণের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ পিছিয়ে পড়া জাতির নেতা ছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি তাঁর সামাজিক জোটকে এই দুই সম্প্রদায়ের বাইরে নিয়ে যেতে পারেননি। দুঃখের বিষয় হল তাঁর ছেলেও পারেননি। তাই তাদের ভোট কমেনি খুব বেশি। কিন্তু যেহেতু তাদের সমর্থনের ভিত্তিটি এমনিতেই সীমায়িত, তাই তারা আসন সংখ্যায় বিপুলভাবে পিছিয়ে গেছে।
এই নির্বাচনে নতুন কোনও আখ্যান নির্মাণ করার তাগিদ তেজস্বী যাদবের মধ্যে দেখা যায়নি। তিনি বলেছিলেন যে প্রত্যেক পরিবারের একজনকে সরকারী চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু কীভাবে তা দেওয়া হবে, তিনি তা ব্যাখ্যা করেননি, প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছেন। অতএব মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করেননি। মামদানি তাঁর এজেন্ডা শুধু বলেননি, কীভাবে তা বাস্তবায়িত করা হবে তা মানুষকে বুঝিয়েছেন। তেজস্বী যাদবরা তা করার চেষ্টা করেননি। কিছু ইবিসি নেতা ও তাদের পার্টির উপরে ভরসা করেছিলেন তেজস্বীরা নীতিশের ইবিসি সমর্থনে ভাগ বসানোর লক্ষ্যে। কিন্তু সেইসব নেতারা এবং তাঁদের দলগুলি কোনও আঁচড় কাটতে পারেনি। এর কারণ সংগঠন-এর অভাব এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃত আন্দোলনভিত্তিক যোগাযোগের অপ্রতুলতা। শুধুমাত্র সামাজিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ভিত্তিতে নির্বাচন জেতা যায় না। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ন্যায়ের আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মানুষের সমর্থন আদায় করতে হয়।
বিরোধীদের, বিশেষ করে কংগ্রেসের প্রচার সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছিল শুধু এসআইআর-এর প্রসঙ্গে। মানুষকে তাঁরা বলার চেষ্টা করেছিলেন যে ভোট চুরি হচ্ছে, এসআইআর-এর থেকে নাম বাতিল হচ্ছে। কথাগুলি ভুল নয়। কিন্তু তার কোনও প্রভাব নির্বাচনে পড়েনি। কারণ শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে নির্বাচন জেতা যায় না। সিস্টেম আপনাদের বিরুদ্ধে, সেকথা শুধুমাত্র বললে মানুষের সমর্থন পাওয়া যায় না। সেই সিস্টেমের বিরুদ্ধে মানুষের স্বার্থে আপনি কী বলছেন, কোন আন্দোলন করছেন, কোন ইস্যুকে নিয়ে মানুষের কাছে যাচ্ছেন তার উপরে নির্বাচনী ভাগ্য নির্ভর করে। আবারও মামদানির দিকে তাকালে আমরা দেখব, তাঁর বিরুদ্ধে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি, তাঁর দলের একটি বিরাট অংশ এবং ধনকুবেররা লাগাতার প্রচার করেছে, তাঁর ধর্মকে কেন্দ্র করে তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে, তিনি তাঁর জবাব যেমন দিয়েছেন, তেমনি নিজের এজেন্ডা সুস্পষ্টভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপিত করেছেন। বিহারের ক্ষেত্রে বিরোধীরা নির্বাচন কমিশন তথা কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু তাদের সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে সেই কথা মানুষকে বিশদে বলেননি।
বিহারের রাজনীতিতে মহিলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করছেন যে নীতিশের জয়ের নেপথ্যে বেশ কিছু নির্বাচন ধরেই মহিলা সমর্থন অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। কীভাবে তা হয়েছে তা নিয়ে বিশদে লেখার পরিসর এখানে নেই। কিন্তু মহিলাদের বিষয়ে, তাদের ইস্যু নিয়ে বিরোধীরা খুব বেশি কথা বলেননি। প্রচারের সময়েই বোঝা যাচ্ছিল যে মহিলাদের বিষয়ে বিরোধী রাজনীতির কোনও বিকল্প ভাষ্য নেই। বরং মহিলাদের জন্য নির্ধারিত স্কিমের সঙ্গে তথাকথিত 'জঙ্গল রাজ'-এর স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে নীতিশ ও বিজেপি মহিলাদের সমর্থন আদায় করেছে। মহিলাদের মনে লালু যাদবের সরকারের যে ছবি রয়ে গেছে তাকে পরিবর্তন করার বিশেষ কোনও পরিকল্পনা তেজস্বীদের তরফে চোখে পড়েনি। আবারও যদি মামদানির দিকে তাকাই দেখা যাবে যে মহিলাদের ইস্যুকে তিনি রাজনৈতিক ভাষ্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন বিনামূল্যে ক্রেশ তৈরি করা তথা রোজকার মুদির দোকানের খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে। তার ফলাফল কী আমরা দেখতেই পাচ্ছি।
আবারও, নিউ ইয়র্ক তথা পাটনার মধ্যে কোনও তুলনা চলে না। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক ভাষ্যকে নির্ভরযোগ্যভাবে কীভাবে মানুষের মধ্যে নিয়ে যাওয়া যায় তার উদাহরণ তৈরি করেছেন মামদানি, যাঁর বয়স ৩৪ বছর। কিন্তু ৩৫ বছরের তেজস্বী যাদব তা পারলেন না। দুই যুবক লড়ছিলেন প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে। সম্পূর্ণ অন্যরকম পরিবেশেও একজনের লড়াই থেকে কী অন্যজন কিছু শিখবেন?