আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ একবিংশ সংখ্যা ● ১-১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-৩০ কার্তিক, ১৪৩২
প্রবন্ধ
জানালার ফাঁকে মুসলিম দুনিয়া
মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
(এক)
আরব দুনিয়া - পশ্চিম এশিয়া আর উত্তর আফ্রিকার গোটা বাইশ দেশের মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলেন। আরবমণ্ডলের দেশগুলি নিজেদের বিভিন্নতা নিয়ে দুটি মহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে, তাদের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে চর্চা করা সহজ কাজ নয়। অথচ জানতে ইচ্ছে করে, আরব দুনিয়ার গণতান্ত্রিক মানুষের লড়াইয়ের কথা। বুঝতে চাই সেই দেশগুলোর জনমানুষের মেজাজ-মানসিকতা এবং তার সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর!
এই চর্চা সহজ নয়, তবে কঠিন কাজকে একটু সহজ করবার প্রয়াস নেওয়া যাক।
মিশর যেন আরব দুনিয়াকে জানবার এক খড়খড়ি দেওয়া জানালা। আরব দুনিয়ার সঙ্গে সামান্য চেনাজানা করতে চাইলে পড়তে হবে বিংশ শতাব্দীতে লেখা এক মিশরীয় মহাকাব্য। সেই মহাকাব্য লিখেছেন এই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, আরব দুনিয়ার একমাত্র 'নোবেল পুরস্কার'প্রাপ্ত সাহিত্যিক, মিশরের ঔপন্যাসিক নাগিব মাহফুজ।

নাগিব মাহফুজ
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের পুরো সময়কাল ধরে, আরব সমাজের সংকটপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, কায়রো শহরকে কেন্দ্র করে, মাহফুজ 'কায়রো ট্রিলজি' উপন্যাস রচনা করেছেন। তিন খণ্ডে বিভক্ত এই উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে একটি পরিবারের তিনটি প্রজন্ম - আছে এক ক্রান্তিকালীন সময়ে সেখানকার মধ্যবিত্ত আরব সমাজের নৈতিকতা ও ভণ্ডামি, ধর্মীয় রক্ষনশীলতা ও বিভ্রান্তি, দিশাহীনতা ও শেষে বিভিন্ন পৃথক গতিপথের ইঙ্গিত।

নাগিব মাহফুজ-এর লেখা অন্যান্য বইয়ের প্রচ্ছদ।
বাড়ির কর্তা এক স্বৈরতন্ত্রী গোষ্ঠীপতি। একদিকে কঠোরভাবে সংসার শাসন করেন এবং অন্যদিকে চলে গোপন কপট জীবনযাপন - দুই সমান্তরাল জীবন দাপটের সঙ্গে তিনি চালিয়ে যান। তিনি বসেন আরাম কেদারায়, আর ভীরু স্ত্রী পদতলে হাঁটুমুড়ে বসেন। তাঁর অনুমোদনের অপেক্ষা না করে পুত্রের সঙ্গে বাড়ির বাইরে যাওয়ার শাস্তিস্বরূপ স্ত্রীকে প্রায় পরিত্যাগ করেন। আবার এই ব্যক্তিই সান্ধ্য অবসর বিনোদন করেন নটী পরিবেষ্টিত হয়ে।
জীবনপ্রান্তে এসে অসহায়ভাবে দেখেন সম্ভাবনাময় এক পুত্রের ট্র্যাজিক মৃত্যু, অন্যজনের চরিত্রহীনতা৷ তৃতীয় পুত্র প্রথমে আত্মানুসন্ধানী, পরে দিশাহীন ও অবশেষে নিরীশ্বরবাদী৷ প্রত্যক্ষ করেন তৃতীয় প্রজন্মের মতাদর্শের সংঘাত - এক পৌত্র ইসলামিক মৌলবাদী, অন্যজন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। বিভিন্ন চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত এই বিশাল সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ধারার ক্রমবিবর্তন, বিশ্বাস ও বিশ্বাসহীনতা, ক্ষমতা ও তার ক্ষয় এক মহাকাব্যিক ঢঙে, নির্লিপ্তভাবে পাশাপাশি অবস্থান করেছে।
নাগিব মাহফুজ একই সঙ্গে শক্তিমান ও সাহসী লেখক। নিজের জীবনকেও যেন তিনি এঁকেছেন এই উপন্যাসে। কায়রোর পুরোনো শহরের অলিগলিতে কেটেছে তাঁর শৈশব। লেখক তাঁর প্রথম বছরগুলি মধ্যযুগীয় পরিবেশে কাটিয়েছেন, যেখানে ছিল সরু গলি, ঝুলন্ত বারান্দা আর ছিলেন কর্তৃত্ববাদী বাবা।
১৯৯৪ সালে কায়রো শহরের একটি ক্যাফেতে সাপ্তাহিক সভায় যাবার সময়ে মাহফুজকে একজন জঙ্গি মৌলবাদী ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করে। তিনি আক্রমণ থেকে বেঁচে যান কিন্তু তাঁর ডান বাহুর স্নায়ু স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে পরে তাঁর পক্ষে লেখা কঠিন হয়ে পড়ে। জঙ্গি ইসলামী আন্দোলন 'আল-গামা আল-ইসলামিয়া'-র সঙ্গে যুক্ত চরমপন্থী এই আক্রমণ চালিয়েছিল। তখন তাঁর বয়স ৮৩।
মাহফুজ তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝে গেছিলেন মিশরের নতুন প্রজন্মের গতিপথ কোন দিকে চলেছে।
(দুই)
চলুন, আফ্রিকা মহাদেশ থেকে, আরব দুনিয়া ছাড়িয়ে সোজা উড়ে যাই উত্তরে, তুরস্ক-এ। তুরস্ক আমাকে মুগ্ধ করে; তুরস্ক আমাকে বিষণ্ণ করে। তুরস্ক এশিয়াতে থেকেও ঠিক এশীয় নয়; আবার ইউরোপীয়ও নয়। তারা এশিয়া আর ইউরোপের মাঝ মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে থেকে দু'দিক থেকে সংস্কৃতি নিয়েছে, আর দিয়েছে।
তুরস্কের 'নোবেল পুরস্কার'প্রাপ্ত একমাত্র লেখক, ওরহান পামুক। তাঁর অনেকগুলো উপন্যাসের মধ্যে দুটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই দুটি উপন্যাসের জন্য অবশ্য তিনি 'নোবেল পুরস্কার' পাননি।

ওরহান পামুক
নাগিব মাহফুজ-এর মতো বিংশ শতাব্দীতে পামুকও নিজের দেশের সাহিত্যকে আধুনিক কালের উপযুক্ত করেছেন - তাঁর উপন্যাসগুলিতে তুলে ধরেছেন তুরস্কের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব এবং রূপান্তর। পামুক তাঁর উপন্যাসগুলিতে প্রাচ্যের যৌথ পরিবারগুলিকে বিভিন্ন প্রজন্ম ধরে এঁকেছেন, দেখিয়েছেন নতুন প্রজন্মর সঙ্গে পুরোনো প্রজন্মের দ্বন্দ্ব, দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য। আবার বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে মমতার বন্ধন।
ওরহান পামুক-এর তুরস্ক পশ্চিম-ঘেঁষা। তাঁর ইস্তাম্বুল-প্রীতি সুবিদিত - ইস্তাম্বুলের শৈশব স্মৃতি, উচ্চ মধ্যবিত্তর জীবন-যাত্রা, সৌধ, সমুদ্রের নোনা গন্ধ, খাবার টেবিলে পারিবারিক ছোটো ছোটো কথা যেন মধ্যযুগের বিখ্যাত কোনো ইউরোপীয় চিত্রের ক্যানভাস, আর সেই ক্যানভাস-এ তিনি এঁকেছেন কয়েক প্রজন্মের মানুষের জীবন। ধূসর ভোরে ধূসর আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি, বরফ আর সমুদ্রের প্রেক্ষাপটে আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিকথা বা উপন্যাস লিখেছেন অথবা এঁকেছেন!

বরফে ঢাকা 'স্নো' উপন্যাসে কোনো এক সীমান্ত শহর কার্স-এ বহিরাগত এক তুর্কি কবির যাত্রা যেন সভ্যতা থেকে বিযুক্ত এক সফর। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে, জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ১২ বছর নির্বাসন কাটিয়ে 'কা' নামে এক কবি তাঁর দেশ তুরস্কে ফিরে আসেন, পুবের এক শহর কার্স-এর তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে নিবন্ধ লেখার জন্য। বাস্তবে, সীমান্ত শহরের এই ভ্রমণকে কা তাঁর পুরোনো প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন।
শহরে প্রবেশের পথে, ক্রমাগত তুষারপাতের ফলে তিনি আটকে পড়েন। কা হলেন ইউরোপীয় এবং পশ্চিমা তুর্কিদের ঐতিহ্যের মিশেলে এক ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাবাদী ব্যক্তি - কার্স শহরে থাকাকালীন তিনি বিশ্বাসের এক অনুভূতি নিয়ে শহরের দারিদ্র্য, অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস এবং দুঃখ দেখে ক্রমাগত বেদনা বোধ করেন। প্রত্যক্ষ করেন ইসলামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠীর আদর্শের দ্বন্দ্ব, তাদের লড়াই, হত্যা, দারিদ্র্য, বেকারী, পর্দা, সেনাবাহিনীর ভূমিকা, আত্মহত্যা এবং আরও রক্তপাত।
'আদর্শের রক্তমোক্ষণ' - এটি এক আদ্যন্ত রাজনৈতিক জটিল উপন্যাস - একটি জাতি এবং তার ব্যক্তি মানুষকে তাদের সমস্ত উন্মাদনা আর বাস্তব জটিলতার মধ্যে ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসা প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করে।
'সাইলেন্ট হাউস' উপন্যাসটি সামরিক অভ্যুথানের ঠিক আগে ১৯৮০-র তুরস্কের প্রেক্ষাপটে রচিত। বৃদ্ধা বিধবা ফাতমা; তাঁর তিন নাতি-নাতনিরা এসেছে বাৎসরিক আচার পালনের জন্য ইস্তাম্বুল শহরের বাইরে সমুদ্রতীরে, ছোট্ট শহরের নিঃশব্দ বাড়িতে। ফাতমার নাতনি নিল্যুন শিক্ষিত আধুনিকমনস্ক। সে সকালবেলা সমুদ্র স্নানে আনন্দ পায়, রাজনৈতিক চর্চা করতে ভালবাসে, বাম রাজনীতিতে আস্থা রাখে। অপরদিকে হাসান এই উপন্যাসের প্রতিনায়ক। তার দলের মূল মন্ত্র - আগে মুসলিম, তারপরে তুমি তুর্কি। নবীনদের এই দল পেশিশক্তির আস্ফালনে জনতাকে দমন করে। হাসান-এর নিল্যুন-এর প্রতি মোহগ্রস্ততা, নিল্যুন-এর রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রকাশে হতাশা ও ক্ষোভ, নিল্যুন-এর সাহসিক সত্যভাষণ, বিনিময়ে তার প্রাপ্তি যন্ত্রণা এবং মৃত্যু। উপন্যাসের করুণ সমাপ্তি তুলেছিল কিছু প্রশ্ন।
সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের টানাপোড়েন; ব্যক্তিগত সততা ও তঞ্চকতা, ধর্মীয় উগ্রপন্থা ও বাম রাজনীতির সংঘর্ষ - সব মিলে উপন্যাসটি হয়ে ওঠে সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের নথি।
পামুক ১৯৫২ সালে ইস্তাম্বুল-এ জন্ম নেন এবং একটি অবক্ষয়িত বিত্তবান পরিবারে বড়ো হন, এখনও তিনি সেখানেই থাকেন। তবে বিগত ১৭ বছর ধরে তাঁর দেহরক্ষী আছে। তিনি বলেছেন -
"প্রথমে, ক্যাফেতে বসতে বা প্রিয় শহর ইস্তাম্বুলে একা হাঁটতে না পারায় আমি চিন্তিত ছিলাম। এই সুরক্ষা আমাকে অনুপ্রেরণার দৈনন্দিন জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই অবস্থায় থেকে এখন বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি... আমি এতে অভ্যস্ত।" তিনি রসিকতা করতে পছন্দ করেন; "আমার আগে তিনজন দেহরক্ষী ছিল, এখন আমার একজন আছে, যার অর্থ তুরস্ক উন্নতি করছে।"
নাগিব মাহফুজ এবং ওরহান পামুক কমিউনিস্ট ছিলেন না, বামপন্থীও বলা যাবে না। তাঁরা ছিলেন সেক্যুলার নাগরিক। তাঁরা আহত হয়েছেন, শারীরিকভাবে বা মানসিক যন্ত্রণাতে, ধর্মীয় মৌলবাদ, উগ্রপন্থার হাতে।
আজকে অবাক হয়ে দেখতে হয়, এই ভারতে, যেখানে জন্মলগ্ন থেকে বিভিন্ন মতবাদ বেড়ে উঠেছে, সেখানেও গালি দেওয়া হয় 'সেক্যুলার' বলে।
(তিন)
এবারে উড়তে উড়তে চলে আসি কাছের পড়শী দেশে। আফগানিস্তানে।
খালেদ হোসেইনি-র নাম হয়তো অনেকেই শুনেছেন। আফগান-মার্কিন লেখক। আফগানিস্তান বলতে আমাদের জ্ঞান হয়তো 'দেশে বিদেশে'-তেই থেমে আছে। তবে 'দেশে বিদেশে' পড়েছি বলেই আবদুর রহমানদের জন্য, আফগানিস্তানের জন্য এখনও হাসি, এখনও কাঁদি।

খালেদ হোসেইনি
খালেদ হোসেইনি-এর জন্ম আফগানিস্তানে। আর কর্ম মার্কিন দেশে। প্রচণ্ড জনপ্রিয় লেখক। খালেদ হোসেইনির বই লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে যায়।
তাঁর প্রথম উপন্যাস 'দ্য কাইট রানার'। এই উপন্যাস মূলত আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপটে লেখা। সেই আফগানিস্তান হল সোভিয়েত দখলদারির সময় থেকে তালিবানদের প্রথমবারের ক্ষমতা দখলের সময়কাল। হোসেইনি-র উপন্যাসে রাজনীতি দূর থেকে আছে, উপন্যাসের কোনো চরিত্রই সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নয়।

'The Kite Runner' বইয়ের প্রচ্ছদ।
আফগানিস্তানের কাবুল শহরে ছেলেরা জীবনের দুঃখ, কষ্ট, অশান্তি ভুলে থাকতে ঘুড়ি ওড়ায়। আকাশে আছে ঘুড়ি আর বাস্তবে আছে জীবন যন্ত্রণা।
বাবা-ছেলে। আছে আরেক ছেলে - পিতৃ পরিচয় লুকোনো বাবার অবৈধ সন্তান।
এই হল মূল থিম। প্রেক্ষাপটে আছে সোভিয়েত আগ্রাসন, বাবা-ছেলের মার্কিন দেশে পলায়ন, তালিবানের আগমন, তালিবানের বিরোধিতা করে গুপ্ত অবৈধ ছেলের মৃত্যু। শেষ পর্যন্ত এতিমখানার ভয়াবহ পরিবেশ থেকে অবৈধ সৎ ভাইয়ের সন্তানকে বাঁচিয়ে নিয়ে আমেরিকাতে পারিবারিক মিলন।
উপন্যাসে বাবা-ছেলের দ্বন্দ্ব আছে - সে তো প্রাগৈতিহাসিক সময়কাল ধরে চলেছে। সেই দ্বন্দ্ব, বাবার অবাস্তব প্রত্যাশা, 'ডেথ অফ এ সেলসম্যান'-এর বাবা ও ছেলের মতো, বাবা থেকে ছেলেতে বর্তায় না। আবহমানকালের দ্বন্দ্বের এখানে সহজ মীমাংসা রয়েছে। পারিবারিক মিলন।
তাঁর আরেকটি উপন্যাসও পড়েছি - 'এ থাউসেন্ড স্প্লেন্ডিড সান'। আফগানিস্তানের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রেক্ষাপটে মা-মেয়ের মর্মান্তিক কাহিনী অনবদ্য ভাষায় লিখেছেন হোসেইনি। প্রেক্ষাপটে আছে তালিবান শাসন, নারীদের উপরে জঘন্যতম অত্যাচার৷
আধুনিক সময়কালে মধ্যযুগের কানুন নিয়ে একটি দেশের অবস্থান।
একনাগাড়ে পড়া যায় না এই বই। এতটাই ভয়াবহ অবস্থায় আছেন সেই দেশের মেয়েরা। এই বই পড়ে আবার, বারবার কাঁদতে হয়। আফগানিস্তানের জন্য। তাদের মেয়েদের জন্য। সেখানকার সংখ্যালঘু মানুষের জন্য। বন্দুকের নলের সামনে হাঁটু মুড়ে বসা মানুষের জন্য।
সেই দেশে সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও তারপরে উদ্ধারকাজে নারীদের অবহেলা দেখিয়ে দিয়েছে দ্বিতীয় তালিবান শাসনে তাদের অবস্থার ক্রমাবনতি হচ্ছে।
বাঁচার অধিকার সমস্ত প্রাণীর জন্মগত অধিকার। নারীর শিক্ষার অধিকার, বাঁচার অধিকার কেড়ে নেয় যে সরকার সেই তালিবান সরকারের সঙ্গে আজকে কূটনৈতিক বন্ধুত্ব করছে ভারত সরকার। নীতি নৈতিকতা নিয়ে বেশি বোলচাল দেওয়া আমাদের মানায় না।
(চার)
সাম্প্রতিককালে এই দেশে আলোচনাতে সমগ্র মুসলমান সমাজকে এক পুরোনোপন্থী, মধ্যযুগীয় চিন্তার বাহক হিসেবে দেখার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে দেশে মুসলমান সমাজ কোনো নিরেট একশিলাসম নয়, বিভিন্ন দেশে, পরিস্থিতি অনুযায়ী, তাদের সমাজের মধ্যে একটা লড়াই দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। এই দ্বন্দ্ব ধর্মীয় উগ্রপন্থা বনাম স্বাধিকারের, ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের। এই সংগ্রামের কথা আমরা জানি না, উপমহাদেশে আলোচিতও হয় না। আধুনিক যুগে মুসলিম সমাজের এই অগ্রপথিকরা সংখ্যায় কম হতে পারেন, তবে তাঁরা যেন মহীরুহতুল্য। তাঁরা আমাদেরও ছায়া দিতে পারেন।
আজকে উপমহাদেশের পরিস্থিতি দেখে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।
ধর্মীয় ও অন্যান্য উগ্রপন্থা কি অপ্রতিরোধ্য? শিক্ষিত ও আলোকপ্রাপ্ত মানুষ কীভাবে প্রতিরোধ করবে উন্মত্ত রাজনীতি ও সমাজনীতিকে? সামগ্রিকভাবে সামাজিক চিন্তার জগতে এশিয়ার মানুষ কি পিছিয়ে পড়ছে?
শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় মৌলবাদের থেকে রক্ষার উপায় কী! সেই প্রশ্ন আজও তুরস্ক বা মিশরে প্রাসঙ্গিক। ভারতেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে!
কোনো সহজ উত্তর নেই!মুসলমানদের প্রতি যখন ঘৃণা সঞ্চার করা হয়, অথবা ঠিক উল্টো পিঠে, হিন্দুদের প্রতি ঘৃণা বর্ষিত হয়, তখন একটা প্রশ্ন রাখব।
কারা মুসলমান?
শুধু তালিবানরা মুসলমান? আর তাদের হাতে প্রায় বন্দি অবস্থায় যে নারীরা রয়েছেন তাঁরা? বাবর কন্যা গুলবদন বেগম আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে 'হুমায়ূন-নামা' লিখেছিলেন। তিনি ছিলেন আফগান কন্যা। আজকের আফগানিস্তানে ১২ বছরের বেশি বয়সী কোনো বালিকা স্কুলে যেতে পারে না। অন্য সভ্য দেশে সরকারি অনুমতি ছাড়া ওই বয়সী বালক-বালিকাকে বাড়িতে রাখা যায় না।
আফগান নারীরাও মুসলিম, ইরানের বোরখা ও হিজাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা নারীরাও মুসলিম। এমনকী যুগ যুগ ধরে অসহ্য অত্যাচারের পরেও টিকে থাকা কুর্দিরাও সুন্নি মুসলিম।
তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজিস্তান, তাজিকিস্তান - এই দেশগুলির নাম আমরা শুনি, তবে তাদের ঠিক অনুধাবন করি না। এই দেশগুলিতেও সুন্নি মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পৃথিবীর হানাহানির মানচিত্রে এরা নেই। এদের মধ্যে তাজিকিস্তান-এ আবার হিজাব পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একটা বিশ্ব ধর্ম। এরা সকলেই মুসলমান। সকলেই কি আমাদের চোখে সমান? কখনোই নয়। তাতে বিভিন্ন সেক্ট আছে, বিভিন্ন ভাবাদর্শ আছে। এই ভাবাদর্শগুলির লড়াই চলে আসছে সহস্র বছর ধরে। আবার তার সঙ্গে আছে এদের সেক্টগুলির মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই - যেমন সৌদি আরব ও ইরান। আছে কট্টরপন্থীদের ক্ষমতা দখলের লড়াই। তুরস্কে সেই লড়াই আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। তীব্র থেকে তীব্রতর রাজনৈতিক লড়াই চলেছে। সেইযুগে, এইযুগেও।
তাদের লড়াইয়ে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ অথবা এই ধর্মের বাইরের মানুষ - কোন পক্ষ অবলম্বন করব!
অবশ্যই আমরা থাকব কট্টরবাদীদের বিরুদ্ধে। আমরা থাকব ইরান ও আফগানিস্তানের নারীদের পক্ষে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মুসলিম হাজারা, তাজিক, উজবেক, বালোচ ইত্যাদি অত্যাচারিত জাতিগত সংখ্যালঘুদের পক্ষে। ওই অঞ্চলের সামান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পক্ষে।
ভয় পাওয়া মানুষের পক্ষে। উদারবাদীদের পক্ষে।
আমরা আছি নাগিব মাহফুজ ও ওরহান পামুক-এর পক্ষে৷ এঁরাই যে প্রকৃত অর্থে ইবনে সিনা আর ওমর খৈয়ামের বংশধর। আমরা আছি লক্ষ কোটি উদারপন্থীদের সঙ্গে।
তাঁরা মুসলিম, তবুও তাঁরা অত্যাচারিত।
মুসলিম মৌলবাদীদের দ্বারা অত্যাচারিত।