আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ একবিংশ সংখ্যা ● ১-১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-৩০ কার্তিক, ১৪৩২

প্রবন্ধ

সত্যের খণ্ডচিত্রঃ বিশ্বাস, পক্ষপাত ও ইতিহাসের অনিশ্চয়তা

সুদীপ্ত সিনহা


ইতিহাস কেবল অতীতের দলিল নয়। এটি মানব মনের বিশ্বাস, পক্ষপাত ও ব্যাখ্যার এক চলমান প্রক্রিয়া। প্রত্নতত্ত্ব ও ভূতত্ত্বের মতোই ইতিহাসও ভাঙা স্তর থেকে অর্থ খুঁজে পায়। কিন্তু প্রতিটি স্তরের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকে কিছু অসম্পূর্ণ তথ্য, যা আমাদের দেখায়, সত্য কখনো সম্পূর্ণ নয়, বরং আংশিক ও অনিশ্চিত। এই প্রবন্ধে আমরা সংক্ষেপে সেই বিষয়গুলি আলোচনা করার চেষ্টা করব।

জটিল পুরাতন ধাঁধা

কল্পনা করুন, দূর দেশের এক গুহায় একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ গভীর অন্বেষণে নিমগ্ন। তাঁর হাতে এক মাটির ফলক বা ট্যাবলেট, যার উপর বহু সহস্রাব্দের ধুলোর আস্তরণ। যত্নসহকারে দক্ষ হাতে সেই ধুলো আস্তে আস্তে সরিয়ে নিচ্ছেন তিনি। ক্ষীণ আলোয় ফুটে উঠছে কিছু চিহ্ন, কিছু অক্ষর, যেগুলি যেন দীর্ঘ নীরবতার পরে কথা বলতে চায়। এই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় ব্যাখ্যা, যা আসলে অনুমান, কল্পনা, ও বিশ্বাসের সংমিশ্রণ। ইতিহাসও এভাবেই শুরু হয়। নিশ্চিত তথ্য দিয়ে নয়, বরং অনিশ্চিত, খণ্ডিত প্রমাণ দিয়ে।

রোজেটা স্টোনের কাহিনি তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সেই শিলালিপি যা আমাদের মিশরীয় হায়ারোগ্লিফ পাঠোদ্ধার করতে সাহায্য করেছিল। এমনকি একটি সভ্যতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছিল সেটি। কিন্তু সে তথ্য কি আমাদের যাবতীয় মিশরীয় সভ্যতার খুঁটিনাটি জানতে শিখিয়েছিল নাকি কিছু অজানা ইতিহাসের কিছু পৃষ্ঠা উন্মোচনে সাহায্য করেছিল? প্রশ্নটি কৌতুলদ্দীপক হলেও, উত্তরটি আরো জটিল, কেন না, আমরা যা পেয়েছি তা তথ্য এবং এর উত্তর তথ্যভিত্তিক হলেও, মূলত ব্যাখ্যা নির্ভর। প্রতিটি নিদর্শনই ব্যাখ্যার জন্ম দেয়। সে যাই হোক, শীলমোহর, মুদ্রা, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি অথবা লোকগাথা, এই সবই ইতিহাসের কাঁচামাল। কিন্তু এগুলো টিকে থাকে সময়ের খেয়ালে, এবং আমরা এই টুকরো টুকরো অংশ জুড়ে বানিয়ে ফেলি একটানা কাহিনি। আমাদের অর্থ খোঁজার প্রবণতাই ইতিহাসকে মসৃণ ও যৌক্তিক বলে মনে করায়।

এই প্রক্রিয়াটি ভূতত্ত্বের সঙ্গে আশ্চর্য মিল রাখে। একজন ভূতাত্ত্বিক কিন্তু পৃথিবীকে কোনো একটানা ধারাবাহিক উপন্যাসের মতন অধ্যয়ন করেন না। বরং তারা লক্ষ্য করেন বিছিন্নভাবে শিলাস্তরে জমে থাকা অগ্ন্যুৎপাত, অনুপ্রবেশ, ক্ষয়, সঞ্চয় এবং হঠাৎ টেকটোনিক পরিবর্তন। এক একটি শিলাস্তর সংরক্ষণ করে এক যুগকে, আবার মুছে দেয় আরেক যুগকে। 'Unconformity' অথবা 'অসংগতি' কখনও লক্ষ লক্ষ বছরের অনুপস্থিত সময়ের প্রতীক। তথ্যের এই ভগ্নাংশ থেকেই তৈরি হয় অনুমান আর যুক্তি। যেখান থেকে আমরা নির্মাণ করি ব্যাখ্যাভিত্তিক সম্ভাবনা। ইতিহাসও একইভাবে কাজ করে, ভাঙা প্রমাণের স্তর মেলানো, অনুপস্থিত অংশ অনুমান করা, এবং একটানা অর্থের বুনন সৃষ্টি করা।

কিন্তু ভূতাত্ত্বিক যেমন জানেন, স্তরের পাঠ কখনো নিরপেক্ষ নয়, ইতিহাসও তেমনই। ব্যাখ্যা একধরনের মানবসৃষ্ট সেতু, যা 'বিশ্বাস' (beliefs) দিয়ে নির্মিত।

বিশ্বাসের রসায়ন

প্রমাণ নিজেরাই অর্থ তৈরি করে না। আমরা অর্থ তৈরি করি। এই belief বা বিশ্বাস হলো এমন একটি ধারণা বা অনুভূতি যা প্রায়শই চুড়ান্ত প্রমাণ ছাড়াই সত্য বা বৈধ হিসেবে আমরা গ্রহণ করি। এটি একটি মনস্তাত্বিক স্থিতি, যার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মতামত রাখা বা না রাখা, কিছু পূর্ব নির্ধারিত এবং অভিযোজিত চিন্তার উপর নির্ভর করে। আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক বা ব্যাক্তিগত ঐতিহ্য, মানসিক গঠন, মতাদর্শ ইত্যাদি সেই অর্থকে নির্ধারণ করে। আর এখানেই বিশ্বাস পরিণত হয় 'Bias' বা পক্ষপাতের উৎসে।

মনোবিজ্ঞানে এই পক্ষপাতগুলির নামও আছে। 'Confirmation Bias' আমাদের পূর্বতন বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্যগুলিকে বেছে নিতে বাধ্য করে। 'Availability Heuristic' নাটকীয় ঘটনাকে অগ্রাধিকার দেয়। কেননা এই নাটকীয়তা আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে প্রভূতভাবে প্রভাবিত করে। এরপর আসে সবচেয়ে বিপজ্জনক পক্ষপাত, 'Motivated Reasoning'। এই পক্ষপাত সরাসরি ভাবে অস্বস্তিকর তথ্যকে প্রত্যাখ্যান করে। এই 'bias' আমাদের বাধ্য করে এমনভাবে যুক্তি সাজাতে, যাতে বিরোধপূর্ণ তথ্যও আমাদের বিশ্বাসের সঙ্গে মানিয়ে যায়। এগুলো বিরল ভুল নয়। এগুলো আমাদের চিন্তার স্বাভাবিক অভ্যাস এবং মনোবিজ্ঞানে বহুলভাবে স্বীকৃত এবং চর্চিত। বিশ্বাস আমাদের দ্রুত অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করে, কিন্তু একই সঙ্গে বিকৃতও করতে পারে অতীতের বাস্তবতাকে। ভাবুন তো, নিজের অভ্যাসের কথা। আপনি কি এমন লেখা বেছে নেন যা আপনার মতের সঙ্গে মেলে, আর অগ্রাহ্য করেন যা চ্যালেঞ্জ করে? পক্ষপাত প্রায়শই জন্ম নেয় নীরবতার ভেতর, যা আমাদের মানসিক স্বাছন্দ্য দেয়। এই স্বাছন্দ্য এবং বিশ্বাস আমাদের চিন্তাকে দ্রুত করে তোলে, কিন্তু একই সঙ্গে সংকীর্ণও করে।

এটি প্রভাব ফেলে সমাজের স্মৃতিতেও। কোন তথ্য সংরক্ষিত হবে আর কোনটা হারিয়ে যাবে, তা ক্ষমতাসীন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্য নিয়ে নির্ধারণ করে। বিজয়ীরা তাদের জয়কে অমর করে, বাকিটা মুছে দেয়। পরিবারগুলি লুকিয়ে রাখে তাদের লজ্জাজনক অতীত। ভাবুন, শত বছর আগে কোনো হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত এক ব্যক্তির বিচার, যা একসময় চূড়ান্ত মনে করা হয়েছিল। সেই ঘটনা কেমন লাগবে যদি একদিন কোনো ধুলোমলিন চিলেকোঠা থেকে উদ্ধার করা এক পুরোনো চিঠি সমস্ত সত্য উলটে পালটে দেয়! প্রতিটি নতুন আবিষ্কার মনে করিয়ে দেয়, যা টিকে আছে, সেটিও 'বিশ্বাস' দ্বারা পরিস্রুত হয়ে এসেছে। এমনকি তথাকথিত 'তথ্য'ও পক্ষপাত দ্বারা গঠিত। ফলে, যা 'তথ্য' বলে টিকে থাকে, সেটিও আসলে একপ্রকার ছাঁকা বাস্তবতা।

অনিশ্চয়তা ও বিচ্যুতি

ইতিহাসের সৌন্দর্য ও সীমাবদ্ধতা দুটো এখানেই। এখানে আমাদের মাথায় রাখতে হবে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে সত্য দুই প্রকার। Ontic Truth বা ধ্রুব সত্য। ইহাই ঘটিয়াছিল। এই সত্য মানুষের জ্ঞান এবং তদজাত বিশ্বাসের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। সত্যি কথা বলতে কী, ইতিহাসের পাতায় এই সত্য খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ, আমরা কেউই সম্রাট অশোকের রাজসভায় গিয়ে তাঁর মুখনিসৃত রাজাদেশগুলি সরাসরি শুনিনি, বা এও দেখিনি বা শুনিনি, কেন সম্রাট অজাতশত্রু পিতৃহত্যার আদেশ দিয়েছিলেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে রাজা মহারাজাদের কথা আমরা শুনি, তাদেরকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে আমরা কেউ চাক্ষুষ করিনি। যা জানি, সেগুলি ধ্রুব সত্যের ভগ্নাংশ মাত্র। এই ধ্রুব সত্যের অপরপক্ষে থাকে Epistemic Availability বা 'অর্জিত সত্য'। একটি ব্যবহারিক তথ্যভিত্তিক সত্য। যা পরোক্ষ প্রমাণ এবং তদ্ভুত অনুমানের ভিত্তিতে গঠিত। এগুলি সবই সেই ইতিহাসের কাঁচামাল মানে লিপি, সাহিত্য ইত্যাদির ভিত্তি যা আমরা আগে আলোচনা করেছি। এর সাথে যখন বিশ্বাস আর পক্ষপাত যুক্ত হয়, এটি সৃষ্টি করে এক মানসিক ছিদ্রপথ বা শর্টকাট যা মানুষকে একটি সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এই উত্তর সর্বোত্তম বা প্রকৃত সমাধান হতে পারে বা নাও হতে পারে। এই সত্য পূর্ণমাত্রায় আপেক্ষিক, এবং যা সর্বদা অনিশ্চয়তায় মোড়া। মনে রাখতে হবে, এই আপেক্ষিকতাই আমাদের তথ্য, যা দিয়ে আমরা নির্মাণ করি ইতিহাসের ব্যাখ্যা।

ঠিক সেই কারণেই প্রমাণ ও ব্যাখ্যা দুটোই বিশ্বাস দ্বারা রূপান্তরিত, পক্ষপাত দ্বারা প্রভাবিত। তাই প্রতিটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত থেকেই জন্ম নিতে পারে একাধিক গল্প। এর মানে এই নয় যে সত্য অধরা; বরং এটি দেখায় যে ইতিহাস নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি প্রমাণের ওপরও। কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির দায় শুধু বিজ্ঞানী, সমাজতাত্ত্বিক বা ইতিহাসবিদের নয়। আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের বিশ্বাস সম্পর্কে সচেতন থাকা, এবং তা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করা এবং অন্যদেরও তেমন আত্মসমালোচনায় অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়া। সত্য আপেক্ষিক নয়; বরং সত্যের পথে পৌঁছনো মানে হলো পক্ষপাত ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়ার সাহস।

অনিশ্চয়তা ইতিহাসকে আরও জটিল করে তোলে। ইতিহাস এক সরল পথ নয় বরং এক জটিল বৃক্ষের মতো। একটিমাত্র সিদ্ধান্ত, একটি দুর্ঘটনা, বা এক মুহূর্তের হঠকারী কাজ ইতিহাসের ধারা ঘুরিয়ে দিতে পারে। প্রতিটি মোড়ে লুকিয়ে থাকে অগণিত সম্ভাব্য ইতিহাস। এমনকি প্রধান ধারাও বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা হতে পারে। কোনো অভ্যুত্থানকে কেউ বলে রক্তাক্ত বিপ্লব, কেউ মুক্তি, কেউ বিশ্বাসঘাতকতা। প্রতিটি শব্দই প্রতিফলিত করে ভিন্ন মূল্যবোধ। সত্য কোনো একক রূপে নয়, বরং এই বৈপরীত্যগুলির সংমিশ্রণে প্রকাশ পায়। পক্ষপাত যেমন প্রকাশ করে, তেমনই লুকিয়েও রাখে।

তবু অনিশ্চয়তা আমাদের থামায় না। সত্যের মূল ধারাটি যেমন থেকে যায়, তেমনি আমাদের জ্ঞান সর্বদাই রয়ে যায় অসম্পূর্ণ এবং পরিস্রুত। যেমন বিজ্ঞানী বা ইতিহাসবিদ, উভয়েই ব্যবহার করেন 'Triangulation', 'Source Checking', 'Multiple Working Hypothesis' ও পরিশেষে 'Peer Review'-এর মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। তথ্য যাচাই, উৎসের অনুসন্ধান, ও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ শোনা, এগুলো কেবল সন্দেহের অভ্যাস নয়, বরং যৌথ সত্য-অনুসন্ধানের অপরিহার্য উপায়। আমরা হয়তো কখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারব না, কিন্তু আরও সঠিক হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে পারি। ইতিহাসবিদদের বা বৈজ্ঞানিকদের কাজ নিখুঁত পুনর্গঠন নয়, বরং ক্রমাগত বৌদ্ধিক উন্নতি ঘটানো, এবং পক্ষপাত ও অসম্পূর্ণ তথ্যের সীমা সম্পর্কে বিনয়ী থাকা।

এইখানেই আবার ফিরে আসে ভূতাত্ত্বিক তুলনা। যেমন ক্ষয় বা চাপ বিকৃত করে পাথরের স্তর, তেমনি ক্ষমতা ও মতাদর্শ বিকৃত করে ঘটনার ইতিহাস। প্রতিবার ইতিহাসে 'খনন' করতে গেলে আমরা কোনো স্পষ্ট কাহিনির সন্ধান পাই না, বরং পাই একতথ্যের মিশ্রণ, যার অধিকাংশ আবার হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে।

ক্ষমতা ও মতাদর্শ

যেমন ক্ষয় বা চাপ শিলাস্তরকে বদলে দেয়, তেমনি ক্ষমতা ও মতাদর্শ ইতিহাসের নথি বদলে দেয়। আজকের বিশ্বে এই প্রভাব আরও দৃশ্যমান।

তবে এই লড়াই কেবল পণ্ডিতদের নয়। আজ জাতিগুলো লড়ছে ইতিহাসের স্মৃতি নিয়ে। কার মূর্তি থাকবে, কোন গল্প পড়ানো হবে, এসব প্রশ্নে সমাজের উন্মত্ততা দেখে আজকাল রীতিমত শঙ্কা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত সংকটকালে, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ইতিহাসের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ব্যবহার করে। বিপদ কেবল ভুল ব্যাখ্যা নয়, বরং ইতিহাসকে গোঁড়া ধর্মে পরিণত করা। যখন একটি গল্পকেই একমাত্র সত্য ঘোষণা করা হয়, সংশোধনের সুযোগ হারিয়ে যায়। ইতিহাস স্থবির হয়ে পড়ে।

বাম ও ডান উভয়পক্ষই স্বাভাবিকভাবে এই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এসেছে নিজেদের সুবিধামতো। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ডানপন্থীরা ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ এক সূক্ষ্ম শিল্পে পরিণত করেছে। তারা অপছন্দের গবেষণাকে বলে 'দেশবিরোধী', আর খোলা প্রশ্নকে দেখে 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে। পাঠ্যবই বদলে দেওয়া হয়, মহাফেজখানা বা পাঠাগারগুলির অর্থায়ন বন্ধ হয়। তারা স্বাভাবিক মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলে। উপনিবেশবাদ, জাতিভেদ, দাসত্ব বা আদিবাসী নিপীড়নের মতো বিষয় হারিয়ে যায় 'জাতীয়তাবাদ'-এর আড়ালে। কারও কাছে এটি প্রয়োজনীয় মনে হতে পারে, কিন্তু ন্যায়সংগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কেবল প্রচারণা নয়, বরং স্বচ্ছতার ইচ্ছাকৃত দমন। এর ফলে সংকুচিত হয় ঐতিহাসিক কল্পনা। নিশ্চিততার সন্ধানে কৌতূহল হয়ে ওঠে অপরাধ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে আজকের দুনিয়ায় সবথেকে বড়ো বাধা হল বৈদ্যুতিন সামাজিক মাধ্যম। ফেসবুক, হোয়াটস্‌অ্যাপ বা পডকাস্টে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মান্য করার কোনো দায় নেই। তাই তথাকথিত 'প্রভাবশালী'-রা যা ইচ্ছে তাই বলে জনমানসকে প্রভাবিত করতে পারেন।

সত্যের সন্ধান এক চলমান অনুশীলন

আমরা কখনো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে পারব না, কিন্তু তবু আমরা স্বচ্ছ হতে পারি। উৎস ও বিশ্বাসের সীমা স্বীকার করা, বিতর্কের সুযোগ তৈরি করা, এই স্বচ্ছতাই পক্ষপাতের প্রতিষেধক। সুস্থ সমাজ ইতিহাসকে অপরিবর্তনীয় নয়, বরং পরিবর্তনশীল এক কথোপকথন হিসেবে দেখে। আত্মসমালোচনা ও প্রশ্নের মধ্য দিয়েই তা শক্তিশালী হয়।আমাদের বিশ্বাস আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে গঠন করবে, এটাই সমকালীন মানবতা। কিন্তু বিশ্বাস আমাদের অন্ধ করলে চলবে না। প্রতিটি গল্প চলমান, প্রতিটি সত্য একটি অন্বেষণ।

ইতিহাস টিকে থাকে মূর্তি বা পাঠ্যপুস্তকে নয়, বরং যারা এগুলোকে প্রশ্ন করার সাহস রাখে তাদের মনে। ধ্রুব সত্য লুকিয়ে আছে অদৃশ্য স্তরের নিচে, সময়ের পাকচক্রে। অপেক্ষা করছে আবিষ্কারের জন্য। আমাদের কাজ হলো সেই সত্য অন্বেষণ, হোক না সে আপেক্ষিক, তাও আমরা খুঁজতে থাকব সতর্কভাবে, খোলা মনে, এবং প্রতিটি নতুন সূত্র থেকে শেখার প্রস্তুতি নিয়ে - যতক্ষণ না পরের খণ্ডচিত্রটি প্রকাশ পায়।