আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ অক্টোবর, ২০২৫ ● ১-১৫ কার্তিক, ১৪৩২
প্রবন্ধ
দুর্নীতি: প্রচলিত থেকে প্রাতিষ্ঠানিক
অম্বিকেশ মহাপাত্র
বিশ্ববাসী একবিংশ শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশ সময়কাল অতিক্রম করতে চলেছেন। বিশ্ববাসী প্রস্তরযুগ, লৌহযুগ, যন্ত্রযুগ... অতিক্রম করে ইলেকট্রনিক যুগ অর্থাৎ e-বিশ্বে প্রবেশ করেছেন। ফলশ্রুতিতে আমরা বিশ্ববাসী ধান্দা পুঁজির বিশ্বায়ন এবং উদারীকরণের সঙ্গে International Network অর্থাৎ InterNet যুগে রয়েছি। বিশ্ববাসীদের মধ্যে উন্নততম প্রাণী মানুষ। মানুষের বেঁচে থাকার তাগিদে বিজ্ঞানচর্চার বিষয় 'স্থূলবস্তু' থেকে 'সূক্ষ্ণ বা আণুবীক্ষণিকবস্তু' থেকে 'অতিসূক্ষ্ণ বা অতিআণুবীক্ষণিকবস্তু'র বিজ্ঞানচর্চায় উন্নীত হয়েছে। যাকে বলা হয়, বিজ্ঞানচর্চা ধ্রুপদী থেকে আধুনিক থেকে অতি-আধুনিক বিজ্ঞানচর্চায় উন্নীত হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে অতীতকে ফিরে দেখা যাক।
অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক বাঙালির গর্ব সত্যজিৎ রায় ১৯৯২ সালের তেইশে এপ্রিল মাত্র সত্তর বছর এগারো মাস ঊনিশ দিন বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। তার ঠিক দু' বছর আগে ১৯৯০ সালে সত্যজিতের প্রায় সত্তর বছর বয়সে নিজের লেখা কাহিনি অবলম্বনে চলচ্চিত্র 'শাখা-প্রশাখা' মুক্তি পায়। সেখানে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ে আমরা পেয়েছি প্রমোদ গাঙ্গুলী, অজিত ব্যানার্জী, হারাধন ব্যানার্জী, লিলি চক্রবর্তী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, দীপঙ্কর দে, মমতা শঙ্কর, সোহম চক্রবর্তী, রঞ্জিত মল্লিক, প্রদীপ মুখার্জী, ভীষ্ম গুহঠাকুরতা প্রমুখদের। সেই 'শাখা-প্রশাখা' চলচ্চিত্রের প্রাসঙ্গিক অংশ এবং কথোপকথন উল্লেখ জরুরি।
"আমি এক-নম্বরী জানি, আমি দু-নম্বরী জানি"
'শাখা-প্রশাখা' চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আনন্দ মোহন মজুমদার। আনন্দ মোহনের সত্তর বছর পূর্তিতে, তাঁর জন্মদিনে আনন্দনগরবাসীদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে আনন্দ মোহন হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ডাক্তারবাবুরা তৎক্ষণাৎ তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং আনন্দ মোহনকে তাঁর বাড়িতে রেখে চিকিৎসার সব বন্দোবস্ত দ্রুত সেরে ফেলেন। স্থানটি তৎকালীন বিহারের হাজারীবাগের কাছে। রাঁচি থেকে বড় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আনিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সব ব্যবস্থাও হয়ে যায়। পাঠকবন্ধু খেয়ালে রাখবেন, সত্যজিতের বয়সও তখন প্রায় সত্তর। জীবনের শেষ সময়ে সত্যজিৎ হৃদরোগে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে শয্যাশায়ী ছিলেন। সেকারণে সত্যজিতের পক্ষে সাত সমুদ্র পেরিয়ে লস এঞ্জেলসে গিয়ে অস্কার পুরস্কার গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তিরিশে মার্চ ১৯৯২, হাসপাতালে শয্যাশায়ী অবস্থায় সত্যজিৎকে অস্কার পুরস্কার গ্রহণ করতে হয়েছিল, যা নজিরবিহীন ঘটনা। তার ঠিক তেইশ দিন পর তেইশে এপ্রিল 'বিশ্ব বই দিবসে' সত্যজিতের জীবনদীপ নিভে যায়। যাইহোক, আবার সত্যজিতের লেখা কাহিনি অবলম্বনে সত্যজিতের 'শাখা-প্রশাখা' প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক।

কেন্দ্রীয় চরিত্র আনন্দ মোহন, সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু চলচ্চিত্রে জানা যায় যে তিনি কখনও ঘুষ দেননি বরাত পাওয়ার জন্য। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে তাঁর পণ্যের গুণগত মানের টানেই বরাত আসবে। অন্যদিকে, সৎভাবে ব্যবসা চালিয়েও তিনি শ্রমিক-কর্মচারীদেরও যথেষ্ট উন্নতিসাধন করতে পেরেছেন।
সিনেমায় আমরা জানতে পারি যে তাঁর ছেলেদের মধ্যে ছোটজন, প্রতাপ, বড় কোম্পানিতে চাকরি করা সত্ত্বেও, সেখানকার দুর্নীতি মেনে না নিতে পেরে পদত্যাগ করেছে। আবার তাঁর অন্য দুই ছেলেকে দেখা যায় একটি দৃশ্যে আলোচনা করতে যে দু-নম্বরি রোজগার আজকের দিনে দস্তুর হয়ে গেছে। জুয়া খেলা, রেসের মাঠে যাওয়া থেকে শুরু করে ব্যবসা করতে গিয়ে অথবা চাকুরি জীবনে ঘুষ নেওয়া, বা দু-নম্বরি কারবারে নিজেদের যুক্ত রাখাই যুগের দাবি, এমন একটি বার্তাও আমরা আনন্দ মোহনের পুত্রদের আলোচনায় পাই। অর্থাৎ সৎ এবং সফল বাবার পরবর্তী প্রজন্মে সেই চিন্তাধারা পালটে যাচ্ছে। সফল হতে হলে, ধনী হতে হলে, কাজ হাসিল করতে হলে দু-নম্বরি ছাড়া যেন গতি নেই।
কিন্তু আনন্দ মোহনের নাতি, যে শিশু সে বড়দের এই সব আলোচনা থেকে কী শিখল বা শিখছে? বিদায় নেওয়ার আগে সে দাদুকে জানিয়ে যায় যে সে এক-নম্বরি জানে, দুই-নম্বরি জানে।
আনন্দ মোহন - "কি করে জানলে দাদু?"
ডিঙ্গো - "বাবা জেঠুকে বলছিল, খুব জোরে জোরে, তোমার দু'নম্বরী আছে, আমার দু'নম্বরী আছে, এক-নম্বরী আছে। আমি শুনেছি। তোমার কি আছে দাদু? তিন-নম্বরী? চার-নম্বরী?"
শুনে আনন্দ মোহনের হার্ট-বিট আবার বেড়ে যায়। মুখমণ্ডলে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। সুস্থতার হাসোজ্জ্বল মুখ নিমেষে বিবর্ণ হয়ে যায়। তারপর বাকিরা সকলে একসঙ্গে এসে বিষন্ন আনন্দ মোহনের সঙ্গে দেখা করে চলে যায়। তারপরই আনন্দ মোহন নিজের কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বলতে থাকেন - "এ কি শুনলাম, এ কি শুনলাম...।"
তখনই তথাকথিত মানসিকভাবে অসুস্থ মেজোছেলে প্রশান্ত বাবার ঘরে ঢুকে বাবার হাতটা মুঠো করে ধরে বলে - "বাবা।"
বাবা আনন্দ মোহন খানিকটা শান্ত হন এবং বলেন - "তুই-ই আমার সব রে প্রশান্ত...।"
প্রাসঙ্গিক অতীত
অভিজ্ঞতাই শিক্ষক। ১৯৮৫ সাল, স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে 'স্কুল সার্ভিস কমিশন' অর্থাৎ 'The WBCSSC' চালু হয়নি। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি (এমসি) সরকারি নিয়মে যোগ্যতম শিক্ষক বাছাই করে নিয়োগপত্র দিতেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে ন্যূনতম যোগ্যতাসম্পন্ন ন্যূনতম সংখ্যক চাকরি প্রত্যাশী না পেলে, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিতেন। এই প্রেক্ষিতে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি পড়বার সময়, তৎকালীন মেদিনীপুর জেলার ডেবরা থানার গোলগ্রাম উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুলের কেমিস্ট্রি শিক্ষক পদের বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করি। স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে স্বজন-পোষণ, দুর্নীতি, অস্বচ্ছতার অভিযোগ ছিল। এইসব জানা সত্ত্বেও আবেদন করেছিলাম। মাসখানেক বাদে পথ-নির্দেশ সহ ইন্টারভিউ লেটার এলো। স্কুলে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে শুনলাম, স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ইচ্ছায় স্বচ্ছতা বজায় রেখে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ হয়ে থাকে। যদিওবা আশপাশের প্রায় সকল স্কুলে দান বা অনুদানের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হয়ে থাকে। কয়েক মাস পরে স্কুলের নিয়োগপত্র হাতে পেলাম। যারপরনাই খুশি এবং স্কুলে যোগদান। পরবর্তী সময়কালে একদিন, একান্তে প্রসঙ্গক্রমে প্রধান শিক্ষক শান্তি রঞ্জন দত্ত মহাশয় জানতে চান, "আচ্ছা, বলুন তো, আমাদের সমাজে ঘুষ, দুর্নীতি কেন রয়েছে?" আমি নিরুত্তর। তখন প্রধান শিক্ষকমশায় বলেছিলেন, "আমরা চাই বলেই রয়েছে।" শুনে বিস্মিত হলেও কথাটা মনের গভীরে দাগ কেটে যায়। যা আজ চল্লিশ বছর পরে, শিক্ষকপদ থেকে অবসরগ্রহণের পর লিখতে বসে স্পষ্ট মনে পড়ছে।
'স্কুলের নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, স্বজনপোষণ এবং দুর্নীতির অভিযোগ' প্রতিকারে ১৯৯৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পাঁচটি জোন সহ 'The WBCSSC' গড়ে শিক্ষক বাছাইয়ে কাজ শুরু করেন। প্রতিটি জোনে স্বচ্ছতার মাধ্যমে প্রস্তুত-মেধাতালিকা থেকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সেই জোনের স্কুলগুলির শূ্ন্যপদে 'The WBCSSC' নাম সুপারিশ করতেন; স্কুলের এমসি'র কাছে। এমসি যোগ্যতম শিক্ষককে নিয়োগপত্র দিতেন। সেই থেকে প্রায় ফি বছর স্কুলে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী পদে নিয়োগ হয়ে আসছিল।
প্রাসঙ্গিক বর্তমান
বর্তমান সময়কালে সরকারি সিদ্ধান্তে 'The WBCSSC'-র জোন অফিস তুলে দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপত্র দেওয়ার দায়িত্বে স্কুল শিক্ষা দফতর এবং মধ্যশিক্ষা পর্ষদ যৌথভাবে। অর্থাৎ সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে। দুর্নীতির অভিযোগে উপদেষ্টা কমিটি সহ শিক্ষা দফতর-সংশ্লিষ্ট সকল আধিকারীকসহ শিক্ষামন্ত্রীর তলব সিবিআইয়ের দফতরে! শিক্ষামন্ত্রী সহ স্কুলের নিয়োগ-সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারীকগণ ('The WBCSSC'-র চেয়ারম্যান ও সচিব; উপদেষ্টা কমিটির প্রধান, মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি) এবং শাসকদলের নেতাগণ, বিধায়কগণ জেলবন্দি। পরিশেষে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ থেকে দীর্ঘসূত্রী বিচার প্রক্রিয়ায় ছ' বছর পর তেসরা এপ্রিল, ২০২৫ চূড়ান্ত রায়। 'The WBCSSC'-র ২০১৬ সালে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োজিত ২৫,৭৫২ শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল। কারণ পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক দু্র্নীতি। ২৫,৭৫২-এর মধ্যে একাংশ 'প্রমাণিত চিহ্নিত দাগি'। বাকি অংশ যে দাগি নয়, 'The WBCSSC' তথ্যপ্রমাণ সহ হলফনামা দিয়ে কোর্টকে জানাতে চায়নি। সেকারণেই পুরো প্যানেল বাতিল করে, একত্রিশে ডিসেম্বর, ২০২৫-এর মধ্যে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মেধাতালিকা প্রস্তুত করে, পুনর্নিয়োগের নির্দেশ দেন দেশের শীর্ষ আদালত। পাশাপাশি এও নির্দেশ, 'প্রমাণিত চিহ্নিত দাগি'দের ১২% সুদ সহ টাকা ফেরৎ এবং তারা আর পরীক্ষায় বসতে পারবে না।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বার্তা
'প্রমাণিত চিহ্নিত দাগি'দের তালিকা প্রকাশ করব না। 'প্রমাণিত চিহ্নিত দাগি'দের স্বার্থ সর্বাগ্রে যে কোনও মূল্যে রক্ষা করব। ফলে কার্যত রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। একটা প্রজন্ম সহ সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা উৎসাহিত হচ্ছে। রাজ্য সরকারের এটাই মূল লক্ষ্য। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে শিক্ষাব্যবস্থার করুণ চিত্র চাপা দেওয়া যাচ্ছে না। এ সবের ফসল হল সামাজিক অবক্ষয়, ছাত্র সমাজের পড়াশোনার প্রতি নিরুৎসাহী হয়ে পড়া, নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়া। সমাজে শিক্ষকরা যে সম্মান শ্রদ্ধা পেতেন তার বদলে তাঁদের দিকে সন্দেহের তীর নিক্ষেপিত হওয়া। প্রাথমিক শিক্ষার হালহকিকতও এই প্রসঙ্গে আলোচিত হতে পারে - শিশুরা হারিয়ে ফেলছে তাদের সারল্য। মোদ্দাকথায় 'প্রচলিত ঘুষ-দুর্নীতি' প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করেছে। এখন সংবাদমাধ্যম ব্যবহারে সামাজিকীকরণের চেষ্টা অনবরত চলছে।
এর শেষ কোথায়
সত্যজিতের 'হীরক রাজার দেশে'-র উদয়ন পণ্ডিতের নেতৃত্বে ভালো মানুষের জোট দরকার এবং ভূতের রাজার বলে বলিয়ান 'গুপি-বাঘা' জুটির ভূত তাড়ানোর মন্ত্র (দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান)-এর সফল প্রয়োগ দরকার। তারসঙ্গে সত্যজিতের পরিণত বয়সের কাহিনি এবং পরিচালিত 'শাখা-প্রশাখা'-য় দুর্নীতি থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা প্রতাপদেরও দরকার। এটাই ঐতিহাসিক বার্তা।