আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ অক্টোবর, ২০২৫ ● ১-১৫ কার্তিক, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন, মহিলাদের বিরুদ্ধে নয়!


আবারও সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ডাক্তারি ছাত্রীর ধর্ষণের খবরে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল। দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে এক ছাত্রী তাঁরই সহপাঠীর সাথে ক্যাম্পাসের বাইরে বেরিয়ে দুষ্কৃতীদের হাতে ধর্ষিতা হন। পরবর্তীতে পুলিশ প্রশাসন সেই সহপাঠী সহ আরও চার অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। ঘটনার বিবরণী হয়ত এখানেই শেষ। কিন্তু এই ঘটনা রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতি একাধিক প্রশ্ন তুলে দেয়। পাশাপাশি এই ঘটনা নিয়ে শাসক ও বিরোধীদলের রাজনৈতিক তরজা, মন্তব্য এই রাজ্যের রাজনৈতিক অবক্ষয়ের এক জীবন্ত দলিল হয়ে রয়েছে। এখনও আর. জি. করের মৃতা ছাত্রী পূর্ণ ন্যায়বিচার পায়নি। আজও আদালতে মামলা চলছে। অভয়ার হতভাগ্য বাবা মা রাজ্য ও কেন্দ্রের শাসকদলের পাশা খেলায় দিকভ্রান্ত ক্রীড়নক। তমন্নার খুনিরা আজও বিচারের আওতার বাইরে। এরই মধ্যে বর্তমান ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় একদা শিক্ষা সংস্কৃতির পীঠস্থান পশ্চিমবঙ্গ কোন অতলান্ত পাঁকে ডুবে চলেছে।

কিছুদিন আগেই রাজ্যের প্রশাসনিক কর্তা, শাসকদল ও তাদের তল্পীবাহকেরা আকাশ বাতাস তোলপাড় করে তুলেছিল এই বলে যে এনসিআরবি কলকাতাকে নিরাপদতম নগরী আখ্যা দিয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই যেন সেই মিথ্যা অহমিকার মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে গেল এই দুর্গাপুরের ঘটনা। তথ্য গোপন ও মিথ্যা ভাষণের মধ্যে দিয়ে যে কল্পরাজ্য মাননীয়া ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণ করেছে তা যে আর প্রকৃত পুতিগন্ধময় দশাকে ঢেকে রাখতে পারছে না সে তো বলাই বাহুল্য। তবু মিথ্যার নির্মাণ, প্রশাসনের অসংবেদনশীল মনোভাব, পক্ষপাতদুষ্টতা কমছে কোথায়! আজকের পশ্চিমবঙ্গের বাস্তবতা হল অপরাধের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার এমন এক চক্র, যেখানে ন্যায়বিচার এক দূরাশা মাত্র। ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, খুন, প্রতিদিনের খবর হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রতিবারই একই চিত্র: প্রথমে শাসকদলের নীরবতা, পরে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য, তারপর বিরোধীদের রাজনৈতিক মঞ্চসজ্জা এবং শেষে ভুক্তভোগীর পরিবারের অসহায় আর্তনাদ। রাজনীতি তার স্বভাবসিদ্ধ নিষ্ঠুরতায় নির্যাতিতার ব্যথাকেও ভোটের অঙ্কে মেপে নেয়।

যে সমাজে নারী চিকিৎসাশিক্ষার্থী এমনকি নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিরাপদ নয়, যে রাজ্যে মায়ের কোলে সন্তান খুন হয়, যেখানে ধর্ষণও এখন রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, সেই রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করা নিছক ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নৈতিকতার সঙ্কট এতটাই প্রকট যে থানায় অভিযোগ দায়ের করতেও সাধারণ মানুষ ভয় পায়। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের হয়না। আর বর্তমানে তৃণমূলের বদান্যতায় সালিশি সভা জায়গা নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের। ফলে খাতায় কলমে রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত। রাজ্য নিরাপদ, মমতাময়ী প্রশাসন পরম যত্নে আগলে রেখেছে রাজ্যের মানুষকে। ফলে বারেবারে জুটে যায় নিরাপদ রাজ্যের তকমা। অথচ সেই রাজ্যের সংবাদপত্রে জায়গা করতে থাকে কামদুনি, পার্ক স্ট্রিট থেকে শুরু করে আর. জি. কর মেডিকেল কলেজ, কসবা আইন কলেজ হয়ে হালে দুর্গাপুরের বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। দুয়ারে উন্নয়ন। মহিলা শিক্ষার্থীকে লাঞ্চিত হতে আর দূরে যেতে হবেনা। দুষ্কৃতীরা পৌঁছে যাবে শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে। কামদুনি থেকে দুর্গাপুর তো সেই উন্নয়নেরই গান!

এ রাজ্যে নারীর নিরাপত্তা এখন কেবল পোস্টার আর প্রচারে সীমাবদ্ধ। 'কন্যাশ্রী', 'রূপশ্রী' প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও মেয়েরা আজও রাস্তায়, কলেজে, এমনকি শিক্ষাঙ্গনেও নিরাপদ নয়। যখন কোনো মেয়ে লাঞ্চিত হয়, তখন প্রশাসনের প্রথম কাজ হওয়া উচিত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়ায় অপরাধীর রাজনৈতিক রঙ নির্ধারণ করা। যদি শাসকদলের ঘনিষ্ঠ হয়, তবে সব চেষ্টা চলে ঘটনাকে আড়াল করার। তবে তারপরেও নাছোড়বান্দা হয়ে নির্যাতিতা ও তাঁর পরিবার যদি অভিযোগ করে ফেলেন, তখন শুরু হয় প্রশাসনিক জাঁতাকলে ঘুরিয়ে মারার দীর্ঘ অবমাননাকর প্রক্রিয়া। দুষ্কৃতীর রাজনৈতিক পরিচয় ঠিক করে দেবে তদন্তের গতি। যদি অপরাধী কোনওভাবে শাসকদলের সাথে যুক্ত হয় তো তদন্ত হয় শ্লথ গতিতে, প্রমাণ নষ্ট হয়, সাক্ষী সুরক্ষা থাকে না, আর দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার ফাঁকে অনেক সময় ভুক্তভোগীর পরিবারও ক্লান্ত ও নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। এভাবেই আইন হারিয়ে যায় রাজনৈতিক হিসেবনিকেশের মধ্যে।

শাসকের এই অনাচারের প্রতিরোধ হতে পারে বিরোধীদলের রাজনৈতিক ক্ষমতায়। কিন্তু আজ রাজ্যের বিরোধীদল আদৌ কোনও সদর্থক রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। নিরন্তর ঘৃণা প্রচার এবং তার মধ্যে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক মতকে প্রতিষ্ঠা করাই তাদের লক্ষ্য। তারা এই ঘটনাতেও লেগে পড়েছে অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় খোঁজার লক্ষ্যে। নির্যাতিতার ন্যায় বিচার নয় - অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয়কে হাতিয়ার করে একটা সম্প্রদায়কে অপরাধী হিসেবে দেগে দিতেই তাদের উৎসাহ। ফলে আজকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা থেকে বিজেপির সাংসদ, ঘটনা নিয়ে যত সাংবাদিক বৈঠক করেছেন তার সিকিভাগও তারা আগের ঘটনাগুলিতে করেনি। কারণ তখন অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় তাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অনুকূল ছিলনা। এমনকি আর. জি. কর মামলার তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে গেছে। অভয়ার বিচার আজ অগাধ জলে। কিন্তু সেখানে বিজেপির নেতারা মুখে রা কাড়ছে না। একবারও কি তারা সিবিআই-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এই বিচার দ্রুত শেষ করার জন্য। ফলে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা তৃণমূলের থেকে কোনও অংশে কম নয়। আর অন্যদিকে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা আন্দোলনের তীব্রতা কতটা হওয়া উচিত এই মীমাংসাই আজ অবধি করে উঠতে পারলেন না। বিরোধী দল থাকাকালীনও দায়িত্বশীল বিরোধী হতে গিয়ে আন্দোলন ভুলেছেন। আর আজ তো অস্তিত্বের সংকট। ফলে রাজ্যের সাধারণ মানুষ কোনওভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ হলো এই রাজনৈতিক ক্লীবতার ফলে সমাজও ধীরে ধীরে এই অনাচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। সংবাদমাধ্যমে এমন খবর পড়েও আমাদের আর শিউরে ওঠা হয় না। নিন্দা করি, ক্ষোভ প্রকাশ করি, তারপর আবার সব আগের মতো। যেন এই অমানবিক ঘটনাগুলো আমাদের বাস্তবতারই অংশ হয়ে গেছে। অথচ প্রতিটি ধর্ষণের পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত জীবন, এক একটি স্বপ্নভঙ্গ, এক একটি পরিবার ভেঙে যাওয়ার কাহিনি। আইনশৃঙ্খলা কেবল পুলিশের বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের মানসিকতার প্রতিফলন। যখন প্রশাসন রাজনৈতিক আনুগত্যে অন্ধ হয়ে পড়ে, তখন ন্যায়বিচারও বিকৃত হয়। রাজ্যের তথাকথিত 'জনমুখী' সরকার আজ এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে তারা নিজের ব্যর্থতাকে ঢাকতে পরিসংখ্যান ও প্রচারণার আড়ালে লুকোতে চায়। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে সেই ঢাকনা আর কার্যকর নয়। ফলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অপরাধীদের হাজতে ঢোকানোর বদলে মেয়েদেরই ঘরে ঢুকে যেতে বলছেন। কতটা নির্লজ্জ্ব হলে এই মানসিকতা পোষণ করা যায়।

আজ প্রয়োজন ন্যায়বিচারের দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। অভিযুক্ত যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক রঙ, আর্থিক প্রভাব, সামাজিক অবস্থান কোনোটিই যেন বিচার ব্যবস্থার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে না পারে। পাশাপাশি সমাজকেও নিজের দায় নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া, সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য ও নৈতিক শিক্ষা এই সবই অপরিহার্য। রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই নৃশংস ঘটনাগুলো থেকে রাজনৈতিক লাভ তুলতে নয়, বরং এমন বাস্তবতার মোকাবিলায় একসাথে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু আমরা জানি, বাস্তবে তা ঘটবে না। কারণ এই রাজ্যে আজ রাজনীতি নীতির উপরে, দল মানুষের উপরে, আর ক্ষমতা ন্যায়বিচারের উপরে।

এই ভয়াবহ সামাজিক অধঃপতনের মাঝেও আজও নির্যাতিতা আইনের কাছে গিয়ে শেষ আশ্রয় খোঁজেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন - আদালতই শেষ ভরসা, যেখানে সংবিধানসম্মতভাবে অপরাধের বিচার হবে। আদালত প্রশাসনকে শুধরে দেবে, বলবে - "লাঞ্ছিতাকে ন্যায় দাও।" কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই পরিসরও যেন ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। আজ যখন বিজেপি প্রকাশ্যে ভারতের সংবিধান পাল্টানোর কথা বলে, তখন রাজ্যের শাসকদল সেই সংবিধান রক্ষার ভেক ধরে প্রতিদিন পদদলিত করছে সেই সংবিধানকেই। একদিকে কেন্দ্র চায় নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে রাজ্য চায় দায়মুক্তি - আর মাঝখানে হারিয়ে যাচ্ছে ন্যায়, মানবতা ও নাগরিক স্বাধীনতা। এই উভয় সংকটের মাঝেই আজ প্রয়োজন এক নতুন নৈতিক রাজনৈতিক অক্ষ। কিন্তু সেই অক্ষ আর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি দিয়ে তৈরি হবে না। তার জন্ম হবে জনতার মানবিক শক্তি থেকে, প্রতিবাদের সম্মিলিত চেতনা থেকে - যেখানে দল নয়, মানুষই হবে কেন্দ্র। সেই শক্তিই হয়তো আনবে নতুন বসন্ত।