আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা ● ১-১৫ জানুয়ারি, ২০২৫ ● ১৬-২৯ পৌষ, ১৪৩১
প্রবন্ধ
উস্তাদ জাকির হোসেন - তবলা বাদনের বিবর্তনের এক পর্যায়
শুভময় দত্ত
"উস্তাদ বা বিদ্বান হতে যেও না, সর্বদা শিষ্য হয়ে থেকো, তাহলেই জীবনের শেষ দিন অবধি শিখতে পারবে" - এই ছিল জাকির হোসেনের জীবনদর্শন, যে-দর্শন শুধু সঙ্গীতশিল্পীর নয় যেকোনো ধরণের সাধনাকেই সার্থক করে।
জাকির হোসেন আল্লারাখা কুরেশীর জন্ম ১৯৫১ সালের ৯ মার্চ, মুম্বাই-এর এক সাঙ্গীতিক পরিবারে। তাঁর পিতা তবলা বাদক উস্তাদ আল্লারাখা। তিনি মাত্র তিন বছর বয়স থেকে তবলা বাজানোর তালিম নেওয়া শুরু করেন। মাহিমের সেন্ট মাইকেলস্ হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, মুম্বই থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন।
জাকিরের পিতা উস্তাদ আল্লারাখা ছিলেন পাঞ্জাব ঘরানার বাজনার একজন দিক-নির্ণায়ক। আল্লারাখার আগে শুধু পাঞ্জাব ঘরানায় কেন, কোনো ঘরানাতেই লয়-এর গণিতের এমন সূক্ষ্ম এবং নান্দনিক প্রকাশ কেউ শোনেননি। বেনারসে এক ধরণের লয়-এর গণিতের নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছিল কিন্তু তা পাঞ্জাবের থেকে ভিন্ন। আল্লারাখা খাঁর বাড়িতে পূর্ববর্তী এবং সমসাময়িক সকল উস্তাদের এবং পন্ডিতের যাতায়াত ছিল। জাকির হোসেন এই আদর্শ পরিবেশে তাঁর তবলা ও সঙ্গীতের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। ওঁনার নিজের কথায়, ওঁনার তালিম ছিল খানিক ভিন্ন। ধরাবাঁধা সময়ে বা ধরাবাঁধা বিস্তার করে তিনি কখনোই রেওয়াজ করেননি। তাঁর পিতা তাঁকে ‘কায়দা’র (তবলার মধ্যলয়ের কিছু রচনা যার মাধ্যমে বোলবাণীর সঠিক প্রকাশ ও লয়-এর সূক্ষ্মতা প্রস্তুত করা যায়) বিস্তারের কিছু ছক দেখিয়ে তাঁকে তৈরি করতে দিতেন। এর ফলে খুব অল্প বয়স থেকেই জাকিরের মধ্যে একটি স্পষ্ট চিন্তাভাবনা লক্ষ্য করা যায়। তাঁর পিতা তাঁকে সবসময় বলতেন, যা হয়ে গেছে তা ভালো কিন্তু নিজের ভাবনার রাস্তা তাঁকে নিজেকেই নির্ণয় করতে হবে। এছাড়াও বাড়িতে যাতায়াতের সূত্রে ফারুকাবাদের উস্তাদ আহমেদ জান থিরকুয়া ও উস্তাদ আমীর হোসেন খাঁর কাছ থেকে জাকিরের কিশোর বয়সে ফারুকাবাদ ঘরের বাজ ও ফারুকাবাদ-লখনউ-র মিশ্রণে লালিয়ানা অঙ্গের বাজের পরিচয় ঘটে। সুতরাং জাকির হোসেনের তবলায় আমরা শুধু পাঞ্জাব ঘরানাই নয়, তার সাথে ফারুকাবাদ-লখনউ-এর এক অপূর্ব সংশ্লেষ লক্ষ্য করি। এই ছিল তাঁর প্রাথমিক তালিম।
এছাড়া উস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ, পন্ডিত গজাননরাও যোশী, পন্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ আলী আকবর খাঁ প্রমুখ বিশিষ্ট শিল্পীদের সাথে কিশোর বয়স থেকে সঙ্গত করার ফলে ওনার সার্বিক সঙ্গীতবোধ ক্রমশ উন্নত হতে থাকে। জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ার পরও তিনি পন্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, পন্ডিত শঙ্কর ঘোষ, পন্ডিত নিখিল ঘোষ প্রমুখ শিল্পীদের কাছ থেকে, এমনকি নিজের সমসাময়িক শিল্পীদের কাছ থেকেও তবলার বিভিন্ন অঙ্গ গ্রহণ করতেন, যেমন স্বপন চৌধুরী, কুমার বসু, অনিন্দ্য চ্যাটার্জী, সুরেশ তলোয়ারকার। উনি মনে করতেন জ্ঞান একটি প্রবাহমান নদীর মতো। শিক্ষার্থীর দায়িত্ব তিনি সেখান কতটা জ্ঞান গ্রহণ করবেন।
ওনার জীবনকে মূলত তিন পর্যায়ে ভাগ করা যায়ঃ ১) একক তবলার বাদন, ২) শিল্পীদের সাথে সঙ্গীতময় সঙ্গত, ৩) ভারতীয় সঙ্গীতের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে তাঁর অবদান।
একক তবলা বাদন
একক তবলা বাদনের কিছু নিয়ম আছে। প্রথমে তার কাঠামোটি বলে দেওয়া প্রয়োজন। তবলার ৬-টি ঘরানাঃ দিল্লি, আজরাড়া, পাঞ্জাব, লখনউ, ফারুকাবাদ, বেনারস। এর মধ্যে সব ঘরানায় তবলার একটি আলাপ হয়। সেই আলাপ কখনও ‘পেশকার’, কখনো ‘উঠান’ কখনও বা 'পাল্টা ঠেকা'র মাধ্যমে হয়। পাঞ্জাবে বহুপূর্বে পেশকারের আগে উঠান বাজানোর রীতি ছিল যা আল্লারাখা খাঁর গুরু উস্তাদ কাদের বক্স বা তারও পূর্ববর্তী শিল্পীরা বাজাতেন। আল্লারাখা খাঁর সময় থেকে পেশকার দিয়ে শুরু হয় একক তবলা বাদন। এই পেশকারের পরিবেশনে আল্লারাখা সূক্ষ্ম লয়ের এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত পেশ করেন। তবলায় পূর্ণ মাত্রার বোল সমষ্টির বদলে ২ ১/২; ৩ ১/২; ৪ ১/২; ৫ ১/২; ৩ ১/৪; ৪ ৩/৪ মাত্রার বোলের সমষ্টির প্রয়োগ করতে থাকেন। ধরা যাক তিনতালে পেশকার বাজছে। আগেকার উস্তাদরা ৪/৪/৪/৪ ভাগে বাজাতেন। আল্লারাখা সেটিকেই করলেন ৩ ১/২; ৪ ১/২; ৪ ৩/৪; ৩ ১/৪। এটি একটি বিশেষ উদাহরণ, এরকম অন্ততপক্ষে শতাধিক ছক উনি তৈরি করেছিলেন। এ তো গেল গণিতের অংশ। কিন্তু শুধু গণিত দিয়ে তো সঙ্গীত হবে না, চাই সেই গণিতের উপযোগী আদর্শ বোলবাণী। উনি তাই করলেন। 'ধা ক্রে ধা ধিননা'/ 'ঘেনা ধাড়-ধা ধিননা'/ 'ঘেনা ধাতি ধাগেনা ধাড়-ধা ধিননা' এই বোলবাণীর সমষ্টি ওই গণিতের ছককে করে তুলল নান্দনিক ও সঙ্গীতময়। জাকির হোসেন ছোট বয়স থেকে এই গাণিতিক ছকে নিজস্ব বোলবাণীর প্রয়োগ করে পিতার চেয়েও স্বতন্ত্র হলেন। এমনিতেই আল্লারাখার পেশকারের মডেল ছিল পূর্ববর্তী তবলা বাদনের থেকে ৫০-বছর এগিয়ে, সেখানে জাকির নিজের স্বাতন্ত্রের ছাপ রেখে গেলেন। পাঞ্জাবের গাবের অঙ্গে কায়দা ছিল জাকিরের নিজস্ব চিহ্নবাহী। ঐতিহ্যবাহী আঙ্গুস্থানা 'ধাতিঘেনেধেনে ধাতিঘেনেধেনে ধাতিঘেনে' ওঁনার হাতে যেন বিশেষ রূপ পেত। এছাড়া ছিল তবলার দ্রুত লয়ের অংশের বাজে বিস্তার বহির্ভূত বাঁধা রচনা।যেমন টুকড়া, চক্রদার, ফর্দগৎ, দরজাদার গৎ ইত্যাদি। উনি বাঁধা রচনার ক্ষেত্রে সব ঘরানার জিনিস বাজিয়েছেন। কোনও কোনও অনুষ্ঠানে আজড়ারা ঘরের 'সুলভ'-কে কায়দা বাজাতেন। লখনউ বা বেনারস ঘরানার বাদকদের মতো তিনি কখনই একক বাদনে লগ্গী-লড়ি বাজাতেন না।
শিল্পীদের সাথে সঙ্গীতময় সঙ্গত
উনি সু-সঙ্গত করেছেন প্রায় সকল শিল্পীর সাথে, সে কন্ঠসঙ্গীত হোক বা যন্ত্রসঙ্গীত বা কত্থকনৃত্য হোক। কিন্তু বাঁশি ও সন্তুরের সাথে তাঁর সঙ্গত একটি নতুন রীতির আবির্ভাব ঘটায়। এখানে লয়ের গণিত ও সুরের জগতের পেলবতার যেন শ্রেষ্ঠ সংশ্লেষ ঘটেছে। এর মূলে আছে তাঁর নিজস্ব প্রতিভা ও পিতার আধুনিক তালিম। একক বাদনের পেশকারের চিন্তাভাবনাই বিভিন্ন রূপে দেখা গেছে তাঁর সঙ্গতে। এই সঙ্গতের রাস্তা ওঁনার নিজের তৈরি, যা ওঁনার সমকালীন ও পরবর্তীকালের সকল তবলাবাদক গ্রহণ করেছেন। এছাড়া সুলতান খাঁর সারেঙ্গিবাদন ও জাকির হোসেনের তবলা সঙ্গত যেন হরিহর আত্মা। গজলে কিছু বিশেষ ধরনের কাহারবা ও দাদরার ঠেকা বাজানো হয় এবং দাদরা থেকে কাহারবায় যাওয়ার কিছু বিশেষ নিয়ম আছে। জাকির এই বিষয়ে কিছু অভিনবত্বের নিদর্শন রেখে গেছেন। গুলাম আলী-র সাথে 'সোজে গাম' গজলে তাঁর সঙ্গত এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়া রবিশঙ্কর, আলী আকবরের সাথে তাঁর কিছু সঙ্গত তো চিরস্মরণীয়। কত্থকসম্রাট বিরজু মহারাজের মতে জাকিরের মতো নিখুঁত লয়কারি তিনি আর কারও মধ্যে পান নি।
ভারতীয় সঙ্গীতের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে তাঁর অবদান
জাকির মালয়ালম ভাষার 'বাণপ্রস্থম' চলচ্চিত্রে সুর দেন এবং সঙ্গীত উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। চলচ্চিত্রটি ১৯৯৯ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় এবং এএফআই লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করে। ২০০০ সালে ইস্তাম্বুল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, মুম্বাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও ৪৭তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়। তিনি কয়েকটি চলচ্চিত্রের সুরায়োজন করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে ইসমাইল মার্চেন্ট পরিচালিত 'ইন কাস্টডি অফ দ্য মিস্টিক ম্যাসোর'। তিনি ফ্রান্সিস ফোর্ড কোপলার 'অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ', বেরনার্দো বেরতোলুচ্চির 'লিটল বুদ্ধা' চলচ্চিত্রে সাউন্ডট্র্যাকে তবলা বাজিয়েছেন। গ্লোবাল ড্রাম অ্যালবামের ১৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে 'হুসেন গ্লোবাল ড্রাম প্রজেক্ট' অ্যালবামে মিকি হার্ট, সিকিরু আদেপোয়ু ও জোভান্নি হিদালগোর সাথে কাজ করেন। ২০০৯ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি এই অ্যালবামটি 'সমকালীন বিশ্বসঙ্গীত অ্যালবাম' বিভাগে ৫১তম 'গ্র্যামি পুরস্কার' অর্জন করে। 'শক্তি' বলে ওঁনাদের একটি ফিউশন সঙ্গীতের দল ছিল যেখানে উনি তবলার মাধ্যমে পশ্চিমের তালবাদ্যের অনেক জিনিস প্রকাশ করেছেন। তাঁর অসংখ্য রেকর্ডিং আছে যা ভারতীয় সঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে গেছে যেমনঃ
• Evening Ragas (1970),
• Vasant Rai, Shanti (1971),
• Rolling Thunder (1972),
• Mickey Hart Shakti (1975),
• Shakti with John McLaughlin, Karuna Supreme (MPS, 1976),
• John Handy with Ali Akbar Khan,
Hard Work - John Handy (ABC/Impulse, 1976),
• A Handful of Beauty (1976),
• Shakti with John McLaughlin,
• Diga (1976) - Diga Rhythm Band,
• Natural Elements (1977),
• Morning Ragas (1979) with Vasant Rai,
• Who's to Know (1980),
• L. Shankar, Song for Everyone (1985),
• L. Shankar, Making Music (1987), with Jan Garbarek, John McLaughlin and Hariprasad Chaurasia,
• Tabla Duet (1988) - Zakir Hussain and Alla Rakha,
• Venu (1989) - Hariprasad Chaurasia and Zakir Hussain,
• At the Edge (1990) - Mickey Hart,
• Maestro's Choice Series One (1991),
• Alla Rakha, Planet Drum (1991),
• Mickey Hart, When Words Disappear (1991) - David Trasoff and Zakir Hussain,
• Flights of Improvisation (1992).
জাকির পুরষ্কৃত হয়েছেন বিভিন্ন সম্মানেঃ পদ্মশ্রী (১৯৮৮), পদ্মভূষণ (২০০২) ও পদ্মবিভূষণ (২০২৩), সঙ্গীত নাটক অকাদেমি (১৯৯০), সঙ্গীত নাটক অকাদেমি ফেলোশিপ, রত্ন সদস্য পদক (২০১৮)। ১৯৯৯ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর দি আর্টসের 'ন্যাশনাল হেরিটেজ ফেলোশিপ' লাভ করেন।
শেষ করব জ্ঞানবাবুর কথা দিয়েঃ "জাকিরকে ১৯৭০ সালে আমি যখন প্রথম ফিলাডেলফিয়াতে রবিশঙ্করের একটি অনন্যসাধারণ সেতারের অনুষ্ঠানে সঙ্গতে এবং কিছুক্ষণ একক বাজাতে শুনি, তখন আমি বাস্তবিকই ভাবতে পারিনি যে এই বয়সে, অতখানি উন্নত ধরনের বাজনার অধিকারী হয়েছে জাকির।... যদি কেবল ভালোলাগাটাই তবলা বাদ্যের একটা বড় প্রমাণ বলে মনে করা যায় এবং হয়তো বাদন ক্রিয়ার মধ্যে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এবং সৌন্দর্য সম্পদও অসাধারণ পরিমাণে পাওয়া যায় বলে স্বীকার করা যায়, সেক্ষেত্রে জাকিরকে আধুনিককালের শ্রেষ্ঠ তবলা শিল্পী বলে চিহ্নিত করা যায়"।