আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা ● ১-১৫ জানুয়ারি, ২০২৫ ● ১৬-২৯ পৌষ, ১৪৩১
প্রবন্ধ
মগজে কারফিউ, ভাবতে ভয় হয়
অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
আমার এক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ বন্ধু বলল, "২০২৪-এ যা পচা পচা গন্ধ পেলাম ভাই, মারিতে হবে ফিনাইল, নচেৎ রক্ষা নাই! এত কোটি লোক একসঙ্গে পচে যাচ্ছে গুরু! বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ তো সবে শুরু। সবার ঘিলুতেই যদি পচন ধরে, একে অন্যকে ঠেকাবে কী করে? গোলাপের বাগানে ইঁদুর মরার গন্ধ প্রকট। নোংরা খালের ধারে তা প্রচ্ছন্ন। আর আমরা, খালমাঝারেই আচ্ছন্ন।"
বন্ধুবর অবসর যাপনে কবিতার কাছেই খুঁজে নেয় মনের আশ্রয়, সেই স্কুলজীবন থেকে।
আমি জুলজুল করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ে হোয়্যাটসঅ্যাপে এসে গেল একটি খবরের একাধিক লিংক। ওই বন্ধুই পাঠাল। প্রথমটি খুললাম। দেখি, 'অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস' বলছে, ২০২৪ সালের 'অক্সফোর্ড ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার'-এর মালা পরেছে যে শব্দটি, তা হল ‘ব্রেইন রট’। বাংলায় বলা যায়, মস্তিষ্কে পচন। ঘিলুতে পচন বললে কথাটা আরও খোলতাই হয়। গন্ধও উগ্রতার আরও একটি মলিন, ধূসর জ্যাকেট গলিয়ে নেয় গায়ে। আমরা আমাদের সর্বাঙ্গে আঠা লেপে দিয়ে বেশি করে জাপ্টে ধরি মোবাইলের স্ক্রিন। ঘিলুতে মাছি বসে। ভনভন করে।
‘ব্রেইন রট’-এর সংজ্ঞা হিসেবে 'অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস' থেকে ধার করে বলা যায়, এটা হল অতিরিক্ত অনলাইন কনটেন্ট গেলার চেষ্টা করে আমাদের মানসিক এবং বৌদ্ধিক অবস্থার ক্রমাবনতি। বলাই বাহুল্য, এই অনলাইন কনটেন্ট অর্থাৎ আন্তর্জালের উপকরণের মধ্যে কোনও বুদ্ধি কিংবা মেধার ব্যাপার নেই। এগুলো দেখার জন্য মাথা খাটানোর প্রয়োজন পড়ে না। সোজা কথায় বলতে গেলে, পর্দায় যতটা উথলে পড়ছে, তা গিলে নাও আকন্ঠ। মৌজ করো। ব্যস, এটুকুই। আর দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এ অভ্যাস রপ্ত করে আমাদের মস্তিষ্ক তার সার্বিক কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। দুনিয়ার নানা প্রান্তে এ নিয়ে হয়ে চলেছে অজস্র কথাবার্তা ও লেখালিখি। বিভিন্ন প্রসঙ্গে ‘ব্রেইন রট’ কথাটি ২০২৩ সালে যতবার ব্যবহার করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে তার ব্যবহার বেড়েছে ২৩০ শতাংশ, অর্থাৎ ২.৩ গুণ। নিম্নমেধার অনলাইন কনটেন্টকে কেন্দ্র করে শব্দটির বিপুল ব্যবহারই ‘ব্রেইন রট’কে বছরের 'সেরার সেরা'র মুকুট পরিয়েছে।
আন্তর্জালের এক জানালা থেকে অন্য জানালায় ঘুরে জানতে পারলাম, ‘ব্রেইন রট’ কথাটি ব্যবহার করা যেতে পারে বিভিন্নভাবে। মস্তিষ্কের উল্টোপথে হাঁটার কথা বোঝাতে যেমন ব্যবহৃত হতে পারে, ঠিক তেমনভাবেই এর প্রয়োগ করা যেতে পারে নিম্নমেধার কোনও অনলাইন কনটেন্টের (মূলত ভিডিও) কথা বলার জন্য। ফালতু রিল দেখে কেউ বলতে পারেন, "চল্লিশ সেকেন্ডের ভিডিওটা একেবারে ‘ব্রেইন রট’ ছিল"। আবার কিছু মনে রাখতে না পেরে কোনও লোক নিজেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, "এত ভুলোমনা হয়ে যাচ্ছি কেন আজকাল? 'ব্রেইন রট’ হল না তো!" শব্দটির ব্যবহারিক প্রয়োগ বিচিত্র। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কয়েকটি ঘটনা ঘটতে শুরু করলে বুঝতে হবে আমি-আপনি পচনশীল ঘিলুর শিকার। সামাজিক মাধ্যমে দেখা কোনও নিম্নমানের, নিম্নমেধার ভিডিওর কথা বারবার মনে পড়া, কিছু মনে রাখতে না পারা, স্বাভাবিকভাবে বাক্য গঠন করতে না পারা, চঞ্চলমতি হয়ে যাওয়া অর্থাৎ কোনও কিছুতেই বেশিক্ষণ মন বসাতে না পারা, খিটখিটে স্বভাব, নিমিত্তমাত্র কিছু জানার প্রয়োজন হলেও মোবাইল, ল্যাপটপসহ বিবিধ গ্যাজেটের উপরে অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া - এগুলি সবই ‘ব্রেইন রট’-এর স্বর্ণ উপসর্গ। আর এর প্রতিটি উপসর্গ কাঁটা জড়ানো আঁকশি মেলে দিয়ে জড়িয়ে ধরতে চায় অন্য উপসর্গকে। আমরা পর্দাবন্দি থাকি। আঁকশিগুলো একে অন্যকে জড়িয়ে জটার রূপ ধারণ করে ক্রমশ। পেঁচিয়ে ফেলে আমাদের। পচে যাওয়া গন্ধ বাতাস ভারী করে।
এক নামজাদা মনোবিদকে বলতে শুনেছিলাম, মহাকালের সঙ্গে আমাদের ধৈর্যশীলতার যে সম্পর্ক রয়েছে, তা দুঃখজনকভাবে ব্যস্তানুপাতিক। তাই তো দশকের পর দশক টেস্ট ক্রিকেট রাজত্ব করার পরেও ওয়ান ডে-র কাছে ব্রাত্য হল। ওয়ান ডে আবার হেরে গেল টি টোয়েন্টির কাছে। টি টেন নামক কোনও খেলা হয়তো একে বধ করবে জলদি। হয় এসপার না হয় ওসপার, মাত্র দশ ওভারে। ফার্স্ট ফরোয়ার্ড নাচ করবেন চিয়ারলিডারেরা। অন্যদিকে দেখি, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা বলার বদলে চলে এলো থাম্বস আপ দেখানো ইমোজি। তবে সবচেয়ে বড় বদল হয়েছে ভিডিও কনটেন্টে। তিন ঘন্টার ক্লাসিক সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়েছে তিরিশ সেকেন্ডের রিলের কাছে। শিশিরভেজা ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে চলার সুখ আহরণ নয়, আমাদের কাছে এখন প্রয়োজন ঝটিতি মস্তি। ফ্ল্যাশ শাওয়ার। ঘিলুতে পচন লাগার সম্ভাব্য কারণ এটাই।
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর অনলাইন সংস্করণে জানতে পারলাম, আমাদের অনলাইন প্রীতির উপরে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গবেষণা চালিয়েছিল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কিংস কলেজ এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল। রিপোর্ট বলছে, মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বলে আমরা যে বস্তুটিকে জানি, যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে মগজাস্ত্র, ইন্টারনেটের ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে তা ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। এত নোটিফিকেশন, অ্যালার্ট এবং অবাঞ্ছিত তথ্যের জন্য হারিয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিকভাবে আমাদের মনঃসংযোগের প্রক্রিয়া। বাইনারি দুনিয়ায় ‘আয় সবে বেঁধে বেঁধে থাকি’ বললেও আক্ষরিক অর্থে আমরা ক্রমশ হয়ে উঠছি অসামাজিক। রিপোর্ট আরও বলছে, শিশু বয়সে অত্যাধিক মোবাইল আসক্তি জন্ম দিতে পারে ডিমেনশিয়ার মতো রোগেরও। রোগের নামটিও জড়িয়ে থাকে লজ্জা-নুপূর। ডিজিটাল ডিমেনশিয়া। 'দ্য গার্ডিয়ান' থেকে জানতে পারলাম ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্লোরিয়া মার্কের একটি সমীক্ষার কথাও। কোনও স্ক্রিনের উপরে আমাদের অ্যাটেনশন স্প্যান কতক্ষণ থাকে তা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে গবেষণা চালিয়ে গিয়েছেন গ্লোরিয়া ও তাঁর টিম। দেখা গিয়েছে, ২০০৪ সালে স্ক্রিনের উপরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে মন দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সময়ের পরিমাপ ছিল ২ মিনিট ৩০ সেকেন্ড। ২০১২-তে এটি অর্ধেক হয়ে ৭৫ সেকেন্ডে এসে দাঁড়ায়। ২০১৭-য় এই সময়ের মাপ আরও কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৪৭ সেকেন্ডে। নিরবিচ্ছিন্নভাবে মন দেওয়ার অর্থ হল, পর্দার ফুটে ওঠা কোনও কনটেন্টের দিকে ধারাবাহিকভাবে চেয়ে থাকা, কনটেন্ট না বদলে। স্ক্রল করে কোনও লেখা পড়ে যাওয়া, সিনেমা দেখা এর আওতায় আসবে। কিন্তু, অহরহ আঙুল নাচিয়ে এক পেজ থেকে অন্য পেজ কিংবা এক ছবি থেকে অন্য ছবিতে সফর এর আওতায় আসবে না। আশা করা যায়, নিরবিচ্ছিন্নতা বিষয়টি এবার অপেক্ষাকৃত সহজ হল।
পর্দার দিকে একটানা কত সেকেন্ড মন দিতে পেরেছি আমরা সদ্য ফেলে আসা বছরে, ২০২৪-এ? পরিসংখ্যান প্রকাশ পায়নি এখনও। আঁধার নিয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়ের ল্যান্ডফল জানার মতো এই তথ্যের খোঁজ পেতে উদগ্র ইচ্ছে হয়। ম্যানহোলের গভীরে ঢুকে ক্রেনের মতো গলা বাড়িয়ে খোঁজ নিতে ইচ্ছে করে ভুলে যাওয়া আকাশের। বিশেষজ্ঞদের একদল বলছেন, স্ট্যাম্প পেপারে লিখে বলে দিতে পারি, ৩০ সেকেন্ডের নিচে এসে ঠেকবে এই সময়। আশ্চর্য হয়ে দেখি, সমাজমাধ্যমে আপলোড হওয়া অগুণতি রিলের গড় সময়ও তো এমনটাই। অর্থাৎ, রিলের গড় দৈর্ঘ্যের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে আমাদের মনোযোগ ধরে রাখার পরিমাপ। আরও একধাপ এগিয়ে জিজ্ঞেস করি, তা হলে কি এই নিম্নমেধার ভিডিওই আমাদের নিয়ন্ত্রক হতে চলেছে আগামী দিনে? উত্তর মেলেনা। শহরের স্কাইলাইন থেকে চকিতে উঠে পড়ে কয়েক কোটি হাত। কালো হাত। হাতের মুদ্রায় স্যালুট চিহ্ন। লাইক চিহ্ন। রিলনির্মাতারা হাঁ করেন। ওই হাঁ-এর ব্যাসভূমিকে টোকা মেরে চকিতে স্পর্শ করে মহাশূন্য। হাতগুলো বিলীন হয়ে যায় মুখগহ্বরে।
মগজের এই নয়া কারফিউ কি ক্রমশ জড় করে দিচ্ছে আমাদের? জানি না। ইকনমিক্সের ম্যামের মুখটা মনে ভেসে এলো হঠাৎ। আমার কলেজজীবন। পড়াচ্ছিলেন, ল অফ ডিমিনিশিং মারজিনাল ইউটিলিটি। কথাগুলো মনে আছে এখনও। "নামটা একটু খটোমটো হলেও ব্যাপারটা খুব সোজা বুঝলে। গরমকালে প্রথমবারের জন্য তোমার আইসক্রিম খেতে যত ভাল লাগবে, দ্বিতীয়বার কিন্তু আর অতটা ভাল লাগবে না। দাবদাহ এবং আইসক্রিম - দুটোই এক আছে যদিও। যা কমছে, তা হল প্রান্তিক উপযোগিতা।" মধ্যবয়স্ক এক ডাক্তারবাবু বলছিলেন, "এক ভিডিও থেকে আমরা যখন অন্য ভিডিওতে যেতে থাকি দ্রুত, প্রতিটি নতুন কনটেন্ট আসার আগে আমাদের মাথার মধ্যে ন্যানোসেকেন্ডের জন্য হলেও ক্ষরণ হয় ডোপামিন। উত্তেজনা হয় আমাদের। রিলগুলো তো দিনের শেষে স্টিমুলাস ছাড়া আর অন্য কিছু নয়। আর দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এই অভ্যাস জারি রাখলে তা আমাদের স্বাভাবিকভাবে খুশি থাকার প্রক্রিয়াটাকেই চাউমিনের মতো জট পাকিয়ে দেবে।" একটু থামলেন তিনি। চোখে উদাস দৃষ্টি। ফের যোগ করলেন, "এই ভিডিও দেখার যে মজা, তাও ডিমিনিশিং। আমরা কোনওদিনও থামতে পারব কি না জানি না। তবে তার মধ্যে মস্তিষ্ক পচে যাবে আমাদের।"
এমন শব্দের সেরার শিরোপা জেতা আমাদের সার্বিক প্রগতির কথা বলে না। চোখে আঙুল দিয়ে যা বলে, তা হলো আমাদের অন্দরে-অন্তরে পচে যাওয়ার বিষাদ। মুঠোফোনের সাত ইঞ্চির স্ক্রিনে আমরা নিজেদের অজান্তেই পুরে দিয়েছি এক মস্তিষ্ক প্রক্ষালক যন্ত্র। জেনে নিয়েছি ব্যস্ত থাকার যাদুমন্ত্র। যন্তর মন্তর। মগজ ধোলাই। না না, আলাদা কোনও অ্যাপ নাই। ’ব্রেইন রট’-এর যে লক্ষণগুলোর কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, কথাগুলো যেন আমার জন্যই তৈরি। এখানে বলা আমির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে কোরাসধ্বনি। অথচ কি আশ্চর্য, মস্তিষ্কে পচন ধরলে তার পরিণতির কথা ভেবে আমরা শিউরে উঠি না একটুও। এক চোখে পাথর বসিয়েও অন্য চোখ দিয়ে মোবাইল গিলি। আত্মীকৃত করি নিম্নমানের কিংবা মানহীন কনটেন্ট। আমরা থামি না। থামতে নেই।
অথচ এই পচন রোধ করার চাবিকাঠি রয়েছে আমাদের হাতেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটানোর সময় বেঁধে দেওয়া, যাবতীয় অবাঞ্ছিত নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখা, উল্টোপাল্টা রিল প্রদানকারীর চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে না রাখা কিংবা আনসাবস্ক্রাইব করে দেওয়া, ভুলভাল কনটেন্ট দেখলে কমেন্টবক্সে সমস্বরে প্রতিবাদ করা, শুতে যাওয়ার অন্তত ঘন্টাদুয়েক আগে মোবাইল ফোনের সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন করা - এটুকু করতে পারলেও অনেকখানি। বাইনারি অনলাইন থেকে নিজেকে দিনে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও বাস্তবের অফলাইন দুনিয়ায় নিয়ে আসতে পারলে আখেরে আমাদেরই লাভ। যুদ্ধটা নিজের সঙ্গে নিজের।
‘ব্রেইন রট’-এর পরবর্তী স্তর কি হতে পারে? ব্রেইন ডেড? সেটিও কি আগামী কোনও বছরে 'ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার' হওয়ার প্রহর গুণছে?
রুদ্ধ আমরা শুদ্ধ হব কবে?