আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা ● ১-১৫ জানুয়ারি, ২০২৫ ● ১৬-২৯ পৌষ, ১৪৩১

সম্পাদকীয়

মনমোহন সিংহ (১৯৩২-২০২৪)


দেশভাগের ক্ষত নিয়ে ভারতে এসে উদ্বাস্তু কলোনীতে পড়াশোনা শিখেছেন। অল্পবয়সে মাতৃহারা। বড় হয়েছেন দাদু-দিদার কাছে। তারপরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে পাস, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। দেশে ফিরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা, পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা। এই অবধি পড়ে মনে হতে পারে যে কোনো তাত্ত্বিক অর্থনীতিবিদের জীবন থেকে কথাগুলি নেওয়া। কিন্তু না। মনমোহন সিংহ চাইলে ভারত তথা বিশ্বের কোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে জীবন অতিবাহিত করতে পারতেন। কিন্তু মনমোহন তা না করে প্রবেশ করলেন অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের আমলাতন্ত্রে। ভারতবর্ষে এহেন কোনো অর্থনীতি সংক্রান্ত বড় পদ নেই যা মনমোহন সিংহ সামলাননি। অশোক মিত্রের পদত্যাগের পরে ১৯৭২ সালে তিনি মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা পদে আসীন হন, এর পরে ১৯৭৬ সালে তিনি দেশের অর্থমন্ত্রকের সচিব হন, ১৯৮০-৮২ সালে তিনি যোজনা কমিশনের সদস্য হন, ১৯৮২-৮৫ সালে তিনি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর, ১৯৮৫-৮৭ যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারপার্সন, ১৯৮৭-১৯৯০ তিনি জেনিভার সাউথ কমিশনের সচিব, তারপরে ১৯৯১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সভাপতি এবং দেশের অর্থমন্ত্রী। এরপরে রাজনৈতিক নানা উত্থান পতনের পরে ২০০৪ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন মনমোহন সিংহ।

আজকের দিনে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এই কথাটি প্রচারের কোনো অবকাশ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিফলে যেতে দেন না। বারংবার দেশের মানুষকে মনে করিয়ে দেন তার জীবনসংগ্রামের কথা। কিন্তু মনমোহন সিংহ ছিলেন সেই বিরল নীতি নির্ধারক এবং রাজনীতিবিদ যিনি একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে দেশের নীতি নির্ধারক আমলাতন্ত্রের শিখরে পৌঁছিয়ে বা তারও পরে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও কোনোদিন নিজের কথা জনসমক্ষে খুব বেশি বলেননি, নিজের শৈশব ও যৌবনের কষ্টসাধ্য জীবনকে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে পর্যবসিত করেননি। আজকের সময়ে এই বিজ্ঞাপনই যেখানে স্বাভাবিকতায় উত্তীর্ণ সেখানে মনমোহন সিংহ ব্যতিক্রমী থেকে গেলেন আজীবন। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী তখন তাঁর কন্যা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। তাঁর অনেক সহকর্মী জানতেও পারেননি যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কন্যা। আজ যখন দেশের গৃহমন্ত্রীর পুত্র হওয়ার সুবাদে, জীবনে একটিও ক্রিকেট ম্যাচ না খেলে ক্রিকেট বিশ্বকে একজন শাসন করছেন বাবার ক্ষমতার প্রসাদে, সেখানে মনমোহন সিংহের পরিবার গোটা জীবন অতিবাহিত করলেন সাধারণ মানুষের মতই। তাঁর জীবনবোধের মধ্যে এই যে সাধারণত্বকে বজায় রাখা ক্ষমতার শিখরে উঠেও, তাই মনমোহনকে অসাধারণত্ব প্রদান করে।

অবশ্য একজন নীতি নির্ধারক তথা প্রধানমন্ত্রীর মূল্যায়ন শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত সততা বা সাধারণ জীবনযাপনের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে না। তাই আমাদের তাকাতে হবে তাঁর নীতি এবং রাজনীতির দিকে। ১৯৯১ সালে দেশ যখন এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে, তখন মনমোহন সিংহের নেতৃত্বে ভারত বিশ্বায়ন তথা আর্থিক সংস্কারের নীতি গ্রহণ করে। এই নীতি একদিকে যেমন লাইসেন্স ও পারমিট রাজের সমাপ্তি ঘটায়, অন্যদিকে ভারতকে বিশ্বব্যাঙ্ক তথা আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার নির্ধারিত আর্থিক নীতির পরিধির মধ্যে নিয়ে আসে। একদিকে ভারতের পুঁজিপতিরা লাভবান হন, তাদের ব্যবসা বাণিজ্য বাড়তে থাকে, গোটা পৃথিবীতে ভারতের শিল্পপতিদের একটি অংশ তাদের বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন। এর ভিত্তিতে দেশে আর্থিক বৃদ্ধির হার ১৯৯১-এর ঠিক পরে কমলেও, দেখা যায় যে ২০০০-র দশকে তা বাড়তে থাকে। দেশে একটি শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়, যারা পরিষেবা ক্ষেত্রের বৃদ্ধির হাত ধরে আয় বাড়াতে সক্ষম হয়। দেশের রপ্তানিও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আমদানি তার থেকেও বেশি বৃদ্ধি হওয়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যায়।

এই বিশ্বায়নের নীতি সমূহের উলটো দিকে তাকালে দেখা যাবে যে দেশের কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়। কয়েক লক্ষ কৃষক ১৯৯৫ সালের পর থেকে ভারতে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। তাদের ব্যাপক পরিমাণ দেনার বোঝা বইতে হয়, যার জন্য মনমোহন সিংহ সরকারকেই তাদের ঋণ মাফ করার নীতি গ্রহণ করতে হয়। অন্যদিকে, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা বিক্রি করে ব্যক্তিগত পুঁজির হাতে বেচে দেওয়ার নীতিও মনমোহনের হাত ধরেই ভারতে লাগু হতে থাকে। রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা সমস্ত ক্ষেত্রে থাকতেই হবে তার কোনো মানে নেই। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বিক্রি করে দেশের আর্থিক ঘাটতি মেটানোর ভ্রান্ত নীতি বিশ্বায়নের হাত ধরেই দেশে আসে। এই নীতি সমূহের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আর্থিক বৈষম্যের ব্যাপক বৃদ্ধি। পিকেটি ও অন্যান্য গবেষকরা দেখিয়েছেন যে আর্থিক সংস্কারের নীতি গ্রহণ করার পর থেকে দেশের আর্থিক বৈষম্য লাগাতার বেড়েছে এবং বর্তমানে তা অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

২০০৪ সালে যখন মনমোহন সিংহ প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হচ্ছেন তখন বামপন্থী শক্তির সমর্থনের উপরে তার সরকারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ১৯৯৯-২০০৪ অবধি বিজেপি সরকার নগ্ন নবউদারবাদী অর্থনীতির মাধ্যমে দেশের গরীব মানুষদের যে সর্বনাশ করেছে তার থেকে তাদের কিছুটা বাঁচানোর তাগিদেই ইউপিএ সরকার গঠন। অতএব, মনমোহন সিংহ তথা সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস মানুষের স্বার্থে কিছু নীতি গ্রহণ করে। বিশেষ করে ১০০ দিনের কাজ, তথ্যের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, অরণ্যের অধিকারের মতন বেশ কিছু জনমুখী নীতি গ্রহণ করা হয় মনমোহন সিংহের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেচে দেওয়ার নীতির উপরেও কিছুটা লাগাম পরানো হয়। এই নীতিসমূহের মধ্য দিয়ে আর্থিক নীতির একটি মানবিক দিক নির্ণয় করার চেষ্টা করেন মনমোহন যার জন্য তাঁর অবশ্যই কৃতিত্ব প্রাপ্য।

কিন্তু ২০০৯ পরবর্তী মনমোহন সিংহের সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে থাকে। মনমোহন সিংহ যে ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে ছিলেন এই কথা তাঁর বিরোধীরাও সমস্বরে স্বীকার করেন। কিন্তু তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় যে দুর্নীতি হয়েছে তা মানুষের মনে প্রোথিত হয়। এই সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যে দৃঢ়তা দেখাতে পারতেন তা হয়ত দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে, ২০০৮ সাল পরবর্তী আর্থিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ভারতের অর্থব্যবস্থা যে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তার কারণ ভারতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের প্রাধান্য এবং নবউদারবাদী অর্থনীতির বিরুদ্ধে গিয়েও সরকারী খরচ বাড়িয়ে সেই সময় সরকার চাহিদার বৃ্দ্ধি বজায় রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু যেহেতু মনমোহন সিংহ তথা তাঁর সরকার মনে করে যে সরকারী খরচ তথা রাজস্ব ঘাটতি কমানো আর্থিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তাই তাড়াতাড়ি সরকারী খরচকে আবার কমিয়ে আনা হয়। এর ফলে আর্থিক বৃদ্ধির হারে পতন দেখা দেয়। সেই আর্থিক বৃদ্ধির হারকে বাড়ানোর জন্য পিপিপি-মডেল নির্ভর পরিকাঠামোগত বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এই সময়ে ব্যাঙ্ক থেকে বিপুল পরিমাণে ধার দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে অর্থব্যবস্থার বৃদ্ধির হারকে বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। বরং ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়। আবার নানা কারণে ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি হয় ভারতে। দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের ফলে মনমোহন সিংহ সরকার ২০১৪ সালে পরাজিত হয়।

ভারতের রাজনীতি তথা অর্থনীতিতে মনমোহন সিংহ নিজের যে আসন তৈরি করেছেন তার ইতিহাস দেশের মানুষ বহু দিন মনে রাখবেন। কারণ মনমোহন সিংহ এমন সময়ে দেশের আর্থিক নীতি নির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন যখন দেশের পরিকল্পনা নির্ভর অর্থব্যবস্থার সমস্যা ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। দেশের স্বাধীনতার সময় পরিকল্পনা নির্ভর অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে। কিন্তু মানুষের সমস্যার সমাধান পরিকল্পনা-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণভাবে হচ্ছিল না। অন্যদিকে দেশের পুঁজিপতি তথা ধনী শ্রেণি পরিকল্পনা-নির্ভর ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে বাজার নির্ভর ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার জন্য তদ্বির করছিলেন। মনমোহন সিংহ এই যুগসন্ধিক্ষণে আর্থিক নীতি নির্ধারণের সর্বোচ্চ স্তরে বসে বুঝতে পারেন যা চলছে তা চলতে দিলে হবে না। তাই তিনি ও তাঁর সাথীরা বাজার নির্ভর অর্থব্যবস্থার দিকে ঝোঁকেন। এর ফলে যেমন আর্থিক বৃদ্ধি হয়, দেশে পুঁজিবাদী বৃদ্ধি জোর পায়, মধ্যবিত্তের আয় বাড়ে, অন্যদিকে আর্থিক বৈষম্য বিপুলভাবে বাড়ে এবং বেকারত্বের সমস্যার সমাধান অধরাই থেকে যায়।

আজকের ভারতে যেখানে ধর্ম নিয়ে লাগাতার বিদ্বেষ ও বিভাজন তৈরি করার কাজে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী লিপ্ত থাকেন, তখন আমাদের তাকাতে হবে মনমোহন সিংহের মতন রাজনীতিবিদের দিকে। তিনি নিজেই একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ছিলেন। ইন্দিরা হত্যা পরবর্তী সময়ে শিখ নিধনের জন্য তিনিই সংসদে দাঁড়িয়ে দেশবাসীর কাছে সরকার তথা কংগ্রেসের হয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন। আজকের বিজেপি নেতাদের থেকে কেউ এই প্রত্যাশাও করে না, যে তারা গুজরাত দাঙ্গা অথবা মুজফ্ফরনগর দাঙ্গা অথবা দিল্লি দাঙ্গা নিয়ে মুসলমান সমাজ তথা দেশের কাছে ক্ষমা চাইবেন। ক্ষমা চাইতে হলে সাহসের দরকার। নতুন আর্থিক নীতি প্রণয়ন হোক অথবা শিখ দাঙ্গার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, মনমোহন সিংহ সেই সাহস দেখিয়েছেন বারংবার। গোটা দেশে মুসলমান সমাজ কেমন আছে তা মূল্যায়ন করার জন্য তিনি গঠন করেন সাচার কমিশন। আবারও পরিচয় দেন সাহসিকতার। দেশের সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আর্থ সামাজিক অবস্থা জানা থাকলে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুবিধা হয়, মনমোহন সেই কথা জানতেন। তাই সাচার কমিশনের সুপারিশের অধিকাংশ তিনি গ্রহণও করেছিলেন। আবার সামাজিক ন্যায়কে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে তাঁর সরকার ওবিসিদের জন্য উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ ঘোষণা করে। কিন্তু যাতে সাধারণ আসন সংখ্যা না কমে তার জন্য মোট আসন সংখ্যা ৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি করে মনমোহন সরকার। এই নীতির মাধ্যমে একদিকে যেমন সামাজিক ন্যায়ের দিকে অগ্রসর হওয়া যায়, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার সুযোগও বৃদ্ধি হয়।

দশ বছরের প্রধানমন্ত্রীত্ব এবং তার আগে বহু দশকের আর্থিক নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে মনমোহন সিংহের যে ছবি ফুটে ওঠে তা একজন চিন্তাশীল ও সৎ রাজনৈতিক ব্যক্তির। তাঁর বিস্তৃত কর্মজীবনের ব্যাপ্তি এমনই যে তা নিয়ে আরও বহু বছর আলোচনা হবে, তর্ক হবে। মনমোহন মনে করতেন এই আলোচনা এবং তর্ক গুরুত্বপূর্ণ। এর পথ ধরেই ভবিষ্যতের নতুন পথের সন্ধান পাওয়া যাবে।