আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ সপ্তদশ সংখ্যা ● ১-১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-৩১ ভাদ্র, ১৪৩২

প্রবন্ধ

পারমানবিক যুদ্ধের বিপদ

অর্ধেন্দু সেন


অপারেশন সিঁদুর স্থগিত রাখা হল এই ঘোষণার পরে পিএম মোদী পাকিস্তানকে সাবধান করে বলেন ভবিষ্যতে যেকোনও হামলাতেই ভারত এইভাবে জবাব দেবে। তার সঙ্গে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন করেন। তিনি বলেন পাকিস্তান জেনে রাখুক যে পারমানবিক যুদ্ধের জুজু দেখিয়ে কোনও লাভ হবে না। এই কথার কী তাৎপর্য?

১৯৯৮ সাল থেকে ভারত এবং পাকিস্তান দুই-দেশই পারমানবিক শক্তি হিসেবে পরিগণিত। ভারত ১৯৭৪ সালেও নিরীক্ষামূলক পারমানবিক বিস্ফোরণ ঘটাতে সমর্থ হয়। তখন ঘোষিত লক্ষ্য ছিল পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার। ১৯৯৮ সালে কিন্তু দু'পক্ষই বলে তারা পরমাণু বোমা বানাতে প্রস্তুত। বোমার সংখ্যা অতঃপর দ্রুত বেড়েছে যখনই সীমান্তে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে তখনই আশঙ্কা হয়েছে পরমাণু যুদ্ধের।

প্রথাগত যুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে পেরে উঠবে না তা পাকিস্তান ভালই জানে। লোকবলে সৈন্যবলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অর্থনীতির জোরে সে ভারতের ধারেকাছে নেই। এক পরমাণু বোমার হিসাবে দুই দেশ সমান সমান। তাই ১৯৯৯ সালে কার্গিলের যুদ্ধ থেকে শুরু করে যখনই যুদ্ধের উপক্রম হয়েছে তখনই পাকিস্তান পরমাণু বোমার ভয় দেখিয়েছে। ট্রাম্প সাহেব এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার কারণ হিসেবে এই পরমাণু যুদ্ধের কথাই বলেছেন।

মোদী সরকারের পক্ষে এই হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত। জেতা ম্যাচ ড্র করার মতো কষ্টকর। তাছাড়া রাহুল গান্ধী সুযোগ পায় 'নরেন্দর সারেন্ডার' বলে ব্যঙ্গ করার। আমাদের মনে হবে কৌতুক। কিন্তু বীর যোদ্ধাদের জন্য ব্যাপারটা দুঃখের অপমানের ও গ্লানির। আরও দেখুন। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করলেন বিদেশসচিব তার দুইপাশে তখন দুই মহিলা অফিসার। তার মধ্যে একজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ভক্তদের জন্য এই ঘোষণা এবং এই স্টেজ-সজ্জা কতটা পীড়াদায়ক হবে তা বোধহয় কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারেননি। বেশিদিন ক্ষমতায় থাকলে যা হয়।

সর্বশেষ গুনতিতে পাকিস্তানের কাছে বোমা আছে ১৭০ আর আমাদের কাছে ১৭২। তাহলে আমাদের এমন অসহায় অবস্থা কেন? দুটো চার্জ করে দেওয়া যায় না? যায়। কিন্তু আমরা তো পরমাণু যুদ্ধ শুরু করতে পারব না। আমরা তো 'নো ফার্স্ট ইউজ' নীতি গ্রহণ করেছি। আমাদের পরমাণু বোমা ব্যবহৃত হবে শত্রুর পরমাণু বোমার প্রত্যুত্তরে, নচেৎ নয়। নীতি অবশ্য বদল করা যায়। নেতা মন্ত্রীরা সে আভাসও দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু তাতে লাভ হবে কি?

যুদ্ধের সময়ে পরমাণু বোমার ব্যবহার হয়েছে একবারই। ১৯৪২ সালে। হিরোশিমা নাগাসাকিতে তার বিধ্বংসী ক্ষমতা দেখে সব দেশের উচিত ছিল একজোট হয়ে পরমাণু অস্ত্র বর্জন করা। তা তো হলই না। দেখা গেল এক বেপরোয়া রেষারেষিতে বোমার সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। পরে অবশ্য আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন চুক্তি করে সংখ্যা কমিয়ে আনে কুড়ি হাজারের নিচে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চিন ব্রিটেন ফ্রান্স উত্তর কোরিয়া ইজরায়েল ভারত ও পাকিস্তানের ভাণ্ডার। সব মিলিয়ে হাজার খানেক।

সব বোমার শক্তি এক নয়। হিরোশিমায় যে বোমা ফেলা হয় তার শক্তি ছিল ১৫ কিলোটন। নাগাসাকির বোমা ছিল ৪০ কিলোটনের। ভারত পাকিস্তানের বোমাগুলি মনে করা হয় ১০ থেকে ১০০ কিলোটনের মধ্যে। কতটা ক্ষতি করতে পারে এই বোমা? যে কোনও বিস্ফোরণে তৈরি হয় উচ্চ তাপমাত্রা আর উচ্চ চাপ। অ্যাটম বোমার বিস্ফোরণে তাপমাত্রা হয় কয়েক কোটি ডিগ্রি। কয়েক মাইল বিস্তৃত একটা আগুনের গোলা তৈরি হয়। পঞ্চাশ মাইল দূর থেকে দেখলেও মনে হবে সূর্যের মত উজ্জ্বল। গোলার মধ্যে দাহ্য পদার্থ সবই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। ঘণ্টায় হাজার কিলোমিটার বেগে বাতাস বইবে গোলার কেন্দ্রের দিকে। যারা আগুনে মরেনি যাদের মাথার উপর বাড়ি ভেঙ্গে পড়েনি তারা এবার মারা যাবে বায়ু শূন্যতায় নিঃশ্বাস না নিতে পেরে। হিরোশিমায় এই প্রথম ধাক্কায় মৃত্যু হয় এক লক্ষের বেশি মানুষের।

পারমানবিক বোমার দ্বিতীয় ধাক্কাও ভয়াবহ। নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় সৃষ্টি হবে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থের। এদের বিকিরণ যারা এড়াতে পারবে না তাদের ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। আমেরিকা রাশিয়ার যুদ্ধে একটা তৃতীয় ধাক্কার কথাও ভাবা হয়েছে। বায়ুমণ্ডলে কার্বন- ডাইঅক্সাইড উষ্ণতা বাড়াবে কিন্তু তার সঙ্গে অনেক পরিমাণে কার্বন থেকে যাবে যা পোড়েনি। এই কার্বন কয়েক বছর ধরে ঘন মেঘের মত ভেসে থাকবে। ফলে পৃথিবী জুড়ে তাপ আর আলো দুইই কমে যাবে। খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যাবে বিপদজনক ভাবে। ছয় কোটি বছর আগে বিশালাকার ডাইনোসরেরা হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। মনে করা হয় তখনও কোনও উপগ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষে বায়ুমণ্ডল ধুলোয় ভরে গিয়েছিল।

ভূপৃষ্ঠে বায়ুমণ্ডলের চাপ প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ১৫ পাউন্ড। এই চাপ বেড়ে ২০ পাউন্ড হলে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে পড়বে, ৩০ পাউন্ড হলে আরসিসি বিল্ডিং-ও ভাঙবে। ১০ কিলোটনের বোমায় ধরে নেওয়া যায় ৫ মাইলের মধ্যে কেউই বাঁচবে না। এ তো গেল একটা বোমার হিসেব। যুদ্ধ লাগলে কী হবে? আমাদের মতো পাকিস্তান কিন্তু 'নো ফার্স্ট ইউজ'- এর নীতি গ্রহণ করেনি। তারা অতর্কিতেই পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার করতে পারে। তাদের বিদেশমন্ত্রী যে ফোনে আমাদের জানিয়ে দেবেন কোথায় কোথায় বোমা ফেলা হবে তার সম্ভাবনা কম।

তারা কি চেষ্টা করবে ভারতের পরমাণু অস্ত্র খুঁজে বার করে নিষ্ক্রিয় করে দিতে? তা কিন্তু অত্যন্ত কঠিন হবে। আমেরিকার স্যাটেলাইট গোটা পৃথিবীর উপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখে। তারাও কিন্তু পোখরান বিস্ফোরণের খবর পায়নি। এখন অবশ্য নজরদারি বেড়েছে এবং পাকিস্তানকে তথ্য দিতে আমেরিকার আপত্তিও হয়ত কম হবে। তার চেয়ে অনেক সহজ হবে ভারতের ছোট বড় শহরে হামলা করে প্যানিক সৃষ্টি করা। গোটা কুড়ি শহরে যদি তিনটে চারটে করে বোমা ফেলা যায়? পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল সম্প্রতি বলেছেন আমরা যদি ডুবি অর্ধেক বিশ্বকে সঙ্গে নিয়ে ডুববো। তাঁর মনে বোধহয় এমনই কোনও প্ল্যান আছে।

শুধু বোমা থাকলে হয় না. তাকে শত্রুর ঘরে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থাও রাখা দরকার। গোড়ার দিকে বোমা নিয়ে যাওয়া হত প্লেনে। এখনও তা করা হয়। ভারতের রাফাল বিমান পরমাণু বোমা বহন করতে সক্ষম। কিন্তু প্লেনের তুলনায় মিসাইলের ব্যবহার বেড়েছে। ১০০-২০০ কিলোমিটার থেকে শুরু করে ১০ হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব অতিক্রম করে এই ক্ষেপণাস্ত্র। পরমাণু বোমা ফেলে পাইলটদের তাড়াতাড়ি পালিয়ে আসার সমস্যা আর নেই।

শত্রুপক্ষ কি মিসাইল মাঝপথে ধ্বংস করতে পারে? আমেরিকা রাশিয়া যে আন্তর-মহাদেশিয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবে তা ঘণ্টায় ১৫,০০০ কিলোমিটার বেগে ছোটে। তাকে মাঝপথে থামানো অসম্ভব। তাছাড়া তারা একলা চলে না। একটা মিসাইল কিছুদূর চলার পর চল্লিশটা মিসাইলে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে যার মধ্যে তিরিশটা হবে নকল। কটাকে ঠেকাবেন?

ইসরায়েলের মিসাইল প্রতিরক্ষা - আয়রনডোম - জগৎ বিখ্যাত। এবার কিন্তু দেখা গেল ইরানের অনেক মিসাইল তা ভেদ করে টেল আভিভ শহরে ভাঙচুর করল। তবে অপারেশন সিঁদুরের পরে পাকিস্তান ভারতকে লক্ষ্য করে যত ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্র পাঠায় তার বেশিরভাগই আমরা নিষ্ক্রিয় করতে পেরেছি। সাধারণ মিসাইলের ১০০টার মধ্যে ৯০টা আটকাতে পারলেই আর্মি সফল। পারমানবিক যুদ্ধে কিন্তু তা নয়। কারণ বাকি দশটা সামলানো সহজ হবে না। ১০ কিলোটনের একটা বোমা কী ক্ষতি করতে পারে তা আমরা দেখেছি। চার পাঁচটা বোমা কোনও শহরে পড়লে কী হবে? যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেওয়ায় একটা গৌরব আছে। অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ানোয় নিশ্চয়ই সে গৌরব নেই।

পিএম মোদী মনে করতেই পারেন যে আসীফ মুনির যাই বলুন না কেন তিনি ধর্মের পথ থেকে নড়বেন না। দেশবাসীও নিশ্চয়ই তাঁর সঙ্গেই থাকবে। তবে হাসপাতালের পরিকাঠামো ঢেলে সাজাতে হবে। পারমানবিক যুদ্ধ শুরু হলে কিন্তু ইন্সিওরেন্স কোম্পানিগুলোকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।