আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ সপ্তদশ সংখ্যা ● ১-১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ● ১৬-৩১ ভাদ্র, ১৪৩২
প্রবন্ধ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ভূত
গৌতম সরকার
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরে পরেই। এই সম্পর্কিত গাণিতিক তত্ত্ব আবিষ্কার হয়ে গেলেও ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় মডেলের অভাব ছিল। গত কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে৷ প্রযুক্তিবিদরা এর উপকারী দিকগুলোর সঙ্গে ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্বন্ধে সতর্ক করে দিচ্ছেন। প্রশ্ন উঠছে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আগামীদিনে মানুষের মেধাকেও ছাড়িয়ে যাবে? উদ্বেগটা তৈরি হয়েছে চ্যাটজিপিটি, ক্লডের মতো কিছু জেনারেটিভ এআই বাজারে আসার পর। ভাষাভিত্তিক এই এআইগুলো নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার সন্ধান করে প্রায় সব প্রশ্নেরই নির্ভুল উত্তর দিতে পারে। শুধু উত্তরই নয়, এই চ্যাটবট রচনা, রিপোর্ট, দরখাস্ত থেকে শুরু করে গান কবিতাও লিখতে পারে।
তাই বিজ্ঞানীদের মতে এআই নিয়ে এই শঙ্কা মোটেই অমূলক নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতের অন্যতম গডফাদার জেফ্রি হিন্টন সতর্ক করে বলেছেন, আগামীদিনে চ্যাটবটরা মানুষের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান 'ইউনাইটেড হেল্থ' গ্রুপের এআই প্রকৌশলী নাসিম মাহমুদের মতে, "এই ভয় অনেকটাই মানসিক। এটা অজানাকে ভয় পাওয়ার মত ভয়"। তবে তিনি এটাও জানিয়েছেন, "যদি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেয় যেটা মানবজাতির এথিক্সের সাথে সংঘাতপূর্ণ, সেক্ষেত্রে দুশ্চিন্তার কারণ ঘটতে পারে।"
আশঙ্কার মূল কারণগুলি হল:
এক, এর ফলে মানুষের কাজের একটা বড় অংশ এআই-এর দখলে চলে যাবে;
দুই, ফেক নিউজ, ফেক ইভেন্ট এবং ফেক রিলেশনশিপের মতো বিবিধ ধরণের প্রযুক্তির অপব্যবহার শুরু হবে;
তিন, এআই ব্যবহারের কারণে মানুষের মধ্যে ডিজিটাল ডিভাইড আরও বেড়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের প্রজ্ঞা একদিনে তৈরি হয়নি, দিনের পর দিন বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে বুদ্ধিমান হয়ে উঠেছে। এআই-ও নিজ ক্ষমতা বাড়াতে বাড়াতে একটা সময় মানুষের মতো কিংবা মানুষের চেয়েও বেশি সৃষ্টিশীল হয়ে উঠবে না কে বলতে পারে৷ নাসিম মাহমুদের কথায়, "মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান না হলেও, এই প্রযুক্তি যে দিনে দিনে শক্তিশালী হয়ে উঠবে তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই"।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'উচ্চ সৃজনশীল বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয় এমন পেশাগুলি বাদ দিয়ে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ড্রাইভিং থেকে শুরু করে আর্থিক পরামর্শদান পরিষেবার মতো প্রায় ৭০টি জীবিকা আস্তে আস্তে স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠবে'। এটা বুঝেই গুগল, মাইক্রোসফ্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের তথ্যপ্রযুক্তি ভাণ্ডার এআই প্রযুক্তি দিয়ে সাজিয়ে তুলতে শুরু করেছে। প্রযুক্তিবিদরা ইতিমধ্যেই নিত্যদিনের কাজে ব্যবহারযোগ্য একাধিক এআই প্রযুক্তি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ট্রিপ প্ল্যানার, জিএফপি-জিএনএন, লালাল এআই, মিডজার্নি, সক্র্যাটিক ইত্যাদি। 'ট্রিপ প্ল্যানার' নিজে থেকে কম খরচে বেড়ানোর সমগ্র সূচি বাতলে দেয়। 'জিএফপি-জিএনএন' হল একটি প্রযুক্তি যেটি অতি সহজেই পুরোনো কোনো ছবিকে নতুনের মত ঝকঝকে করে তুলতে পারে। 'লালান এআই'-এর কাজ আবার গানবাজনা নিয়ে। এই অ্যাপের সাহায্যে কোনও গানের ট্র্যাক থেকে ইচ্ছেমতো বাজনার শব্দ মুছে দেওয়া যায়। 'মিডজার্নি' কোনও লেখা থেকে নিজে নিজেই ছবি তৈরি করতে পারে। এছাড়াও ছবি নিয়ে কাজ করে 'রিমুভভি' বা 'বিজি', 'কাটআউট প্রো'-এর মত আরও অনেক ওয়েবসাইট। এছাড়াও আছে গুগলের 'জেমিনি', মাইক্রোসফ্টের 'ক্যাপিটল', ফেসবুকের 'মেটা এআই', 'পারপ্লেক্সিটি এআই', 'ডিপসিক', 'ডিপফেক', 'জেপিয়ের এজেন্ট', 'গ্রক', 'পাই', 'মিস্ত্রাল এআই', 'কোয়েনচ্যাট' ইত্যাদি উদ্ভাবিত নানান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যাপস। এগুলি ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস ও কাজের অঙ্গাঙ্গী হয়ে উঠছে।
এখন যে প্রশ্নটি ঘোরাফেরা করছে সেটা হল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আমরা ভয় পাব নাকি স্বাগত জানাব! এটা অনস্বীকার্য যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো প্রযুক্তিও আমাদের জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, তাই সেই প্রযুক্তির নয়ারূপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অগ্রাহ্য করা বোকামি হবে। তাছাড়া এই প্রযুক্তির বহু ভালো দিকও রয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে এআই-এর অবদান অনস্বীকার্য। এআই পুষ্ট উন্নত মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসা পরিকল্পনা রূপায়ণে সাহায্য করছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এআই পরিচালিত বিভিন্ন শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট পড়াশোনার ক্ষেত্রে বহুল সাহায্য করছে, যেমন - সক্র্যাটিক। তাই কেউ কেউ মনে করছেন দানব নয়, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারলে মেওয়া ফলবে। তবে তার জন্য প্রযুক্তিবিদ এবং ব্যবহারকারীদের এই প্রযুক্তিকে বিশ্বের কল্যাণে ব্যবহারের শপথ নিতে হবে। মানুষের কল্যাণকে প্রযুক্তির বিনিসুতোয় গাঁথতে হবে৷ কিন্তু সেটা কি সম্ভব? সব ফুলেই যে কাঁটা থাকে তা নয়, কিন্তু কীটের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় কি? তাই বিজ্ঞানীরা সতর্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে।
ইদানিং কৃত্রিম মেধার বৈপ্লবিক উত্থান বহু উৎপাদন ক্ষেত্রে শ্রমের ব্যবহার কমিয়েছে বা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে। ফলে আশঙ্কা দেখা গিয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে সব জীবিকাই কি এআই-এর করাল গ্রাসে নির্মূল হয়ে যাবে! আশার কথা বিশেষজ্ঞদের গভীর অনুসন্ধান থেকে জানা গিয়েছে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধা মানুষের প্রয়োজনীয়তাকে খর্ব করতে পারবে না। সেইরকম ক্ষেত্রগুলি হল:
এক, থেরাপিস্ট এবং কাউন্সেলর
অন্যের অনুভূতি অনুধাবনে মানুষের জুড়ি নেই, যে গুণটি থেরাপিস্ট বা কাউন্সিলরদের মধ্যে থাকা খুব জরুরি। কারোর মুখের দিকে চেয়ে বা স্বরক্ষেপ শুনে আমরা বুঝে নিতে পারি তার মনের মধ্যে কী চলছে! এআই এই অনুভুতি বোঝার চেষ্টা করলেও কিন্তু তার সব ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকে তার প্রোগ্রামিংয়ের ওপর। এর বাইরে যে সূক্ষ অনুভূতি, যেমন হাসিতে উষ্ণতার ছোঁয়া কিংবা কণ্ঠস্বরের বিচ্যুতি এআইয়ের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তাই এই জায়গাগুলোতে মানুষেরই জয় হবে।
দুই, বিচারক ও নীতিবাদী
নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নে মানুষ যেমন কোনটা ঠিক বা কোনটা ভুল বুঝতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পক্ষে সেভাবে বোঝা সম্ভব নয়। বিচারক ও নীতিবাদীরা প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াও যেকোনও বিষয় মানবিক, সামাজিক এবং নৈতিকতার জটিল আঙ্গিকে বিচার করে থাকেন যেটা এআইয়ের পক্ষে কখনও সম্ভব নয়। এআই প্রযুক্তি একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলায় কাজ করে, তাই গভীর নৈতিক বৈশিষ্ট্যগুলি সম্যক অনুধাবন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
তিন, শিল্পী এবং লেখক
চেতনা বা উপলব্ধি বিষয়টি মানুষের একেবারে নিজস্ব। এর অর্থ নিজের এবং পারিপার্শ্বিকের অস্তিত্বের বিষয়ে সজাগ থাকা এবং অভিজ্ঞতার আলোকে সেগুলিকে শিল্পমাধ্যমের সাহায্যে তুলে ধরা, যে গুণটি শিল্পী এবং লেখকদের মধ্যে থাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিজস্ব কোনও অনুভূতি নেই, তারা মূলত তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট অ্যালগরিদমের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষ যেভাবে জীবন থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে শিল্পকলা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে এআইয়ের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়।
চার, জরুরী পরিষেবা কর্মী
অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে মানুষ তার অন্তর্দৃষ্টি এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চটজলদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এআই-এর নেই। তাদের অ্যালগরিদমে যে সমস্ত পরিস্থিতির ইনপুটস অন্তর্ভুক্ত থাকেনা সেই পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা তাদের শূন্য।
পাঁচ, শেফ ও ফ্যাশন ডিজাইনার
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স অনেক কিছুই করতে পারে কিন্তু মানুষের মতো নিজে থেকে কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। শেফ নতুন নতুন রেসিপি তৈরি করতে পারে, ফ্যাশন ডিজাইনার নিত্য নতুন পোশাক তৈরি করতে পারে। একজন অভিজ্ঞ শিল্পী তাঁর সৃষ্টিতে নিজস্ব অনুভবের ছোঁয়া লাগাতে পারে, সেই সূক্ষ্ণ মার্গে পৌঁছনো কৃত্রিম প্রযুক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এখানেই এআই-এর সমূহ পরাভব।
ছয়, সমাজকর্মী
যে গুণটি সমাজকর্মীদের মধ্যে থাকা দরকার সেটা হল বিভিন্ন প্রেক্ষিতের মধ্যে তফাতটা বুঝে ওঠা। নানা-ভাষা-নানা-মত-নানা পরিধানের দুনিয়ায় যেটা খুবই জরুরি। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি নির্দিষ্ট প্রোগ্রামিংয়ের মাপদণ্ডে সমস্ত পরিস্থিতিকে বিচার করে, স্বভাবতই সেই বিচার সবসময় সুবিচার হয়না।
এককথায় যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এই প্রযুক্তি মানুষের অনুভূতি, নৈতিক বোধ ও চেতনাকে পুরোপুরি নকল করতে পারেনা। মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হল জ্ঞান ও আবেগের সঠিক মিশ্রণ। সেই কারণে যে সমস্ত জীবিকায় দরদ, হৃদ্যতা, আন্তরিক সহানুভূতি ও গভীর অনুভবের মতো মানবিক দ্যোতনা মিশে থাকে সেইসব কাজ এআই দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা সম্ভব নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের আচরণ নকল করতে পারে, লিখতে পারে, পড়তে পারে, জটিল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে পারে, কম্পিউটার কোড তৈরি করতে পারে, এমনকি রোগ নির্ণয়েও সক্ষম। স্বভাবতই ফিসফাস শুরু হয়ে গেছে, এই প্রযুক্তি কি একদিন মানুষের মেধাকেও ছাড়িয়ে যাবে? তাহলে তো একদিন এই দুনিয়া প্রযুক্তি ও যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে? তবে প্রযুক্তিবিদদের মতে এআইকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে প্রতিযোগী নয়, এটি মানুষের সহযোগী হয়ে উঠতে পারে। তবে এই প্রযুক্তিকে কতটা ক্ষমতাশীল করা হবে এবং কোথায় তাদের আটকানো দরকার সেটি প্রযুক্তিবিদদের ভাবতে হবে। এই প্রসঙ্গে কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভের ১৯৪২ সালে রোবট নিয়ে লেখা 'আই, রোবট' গল্পসংকলনটি উল্লেখ করা যায়। প্রযুক্তি যাতে লাগামছাড়া হয়ে না ওঠে তার জন্য তাকে শিকল পরানোর প্রয়োজন অনুভব করেছেন আসিমভ৷ তাঁর লেখায় আসিমভ প্রযুক্তিকে বেঁধে ফেলার তিনটি নিয়মের কথা বলেছেনঃ
প্রথম নিয়মঃ রোবট কোনও মানুষকে কোনওভাবে আহত করতে পারবে না অথবা কোনও মানুষকে রক্ষা না করে নিষ্ক্রিয় থাকতে পারবে না।
দ্বিতীয় নিয়মঃ রোবট ততক্ষণই মানুষের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকবে, যতক্ষণ তা প্রথম অনুশাসনের বিরুদ্ধে যাবে না।
তৃতীয় নিয়মঃ রোবট ততক্ষণই নিজের অস্তিত্বকে রক্ষা করতে বাধ্য থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রথম বা দ্বিতীয় অনুশাসন লঙ্ঘিত না হয়।
তবে গল্পের কাহিনি যত এগিয়ে চলতে লাগল অ্যাসিমভ টের পেতে লাগলেন এই তিনটি অনুশাসন এড়িয়ে রোবট মানুষের ক্ষতি করে দিতে পারে। তখনই প্রয়োজন পড়ল চতুর্থ অনুশাসন বা 'জিরোথ ল', যেখানে বলা হল, "মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এমন কিছুতে রোবট অংশগ্রহণ করতে পারবে না।" এ তো গেল কল্পবিজ্ঞানের গল্প। এই প্রযুক্তি কখনওই মানবজাতির কোনও ক্ষতি করবে না এমন কোনও পথের সন্ধান এখনও বিজ্ঞানীরা জানেন না, চিন্তাটা সেখানেই। 'নভিদিয়া' ফাউন্ডার জেন্সেন হুয়াং একটি ইন্টারভিউয়ে বলেছেন, "এআই-এর সবথেকে বড় কাজ হল, এটি আমাদের শেখাবে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে একজন মানুষ হিসেবে স্বাতন্ত্র রক্ষা করা যায়"। ইউনাইটেড আরব আমিরাতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মন্ত্রী ওমর আল ওলামা হুয়াংকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, "আজকের যুগে মানুষ নিজেকে বা নিজের সন্তানদের কী ধরনের পড়াশোনায় উৎসাহিত করবে!" তার উত্তরে হুয়াং বিপ্রতীপ উত্তর দিয়েছিলেন, "আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সবাই ভাবছে কম্পিউটার সায়েন্স এবং এআই প্রোগ্রামিং শেখা উচিত, কিন্তু করা উচিত ঠিক উলটোটা। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তি কোম্পানিদের কাজ হল যুগোপযোগী কম্পিউটার প্রযুক্তি বানানো তাই ভবিষ্যতে প্রোগ্রামিং তৈরির জন্য কোনও কর্মীর প্রয়োজন পড়বে না, সবাই তখন প্রোগ্রামার হয়ে যাবে"।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা আনীত প্রযুক্তি বিপ্লব মানুষ এবং যন্ত্রের মধ্যেকার তফাৎ দিনে দিনে ন্যূনতম করে তুলবে, হয়তো কোনোদিন এই তফাৎ পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যাবে। ইতিমধ্যেই আমরা কম্পিউটারকে মানুষের ভাষার সঙ্গে (বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি) পরিচিত করাচ্ছি, চিরাচরিত এসোটেরিক ল্যাঙ্গুয়েজ যেমন - C++, পাইথন বা পিএইচপি-র মতো মেশিনের ভাষার ব্যবহার দিন দিন কমছে। মানবিক যে গুণগুলো এতদিন প্রচ্ছন্ন ছিল, অতিসংবেদনশীল মনে হতো, সেগুলিই এআই-এর যুগে সবথেকে বেশি টেকসই হয়ে উঠতে চলেছে। বর্তমান সময়ে 'নলেজ ইকোনমি' ধীরে ধীরে 'রিলেসনশিপ ইকোনমি'কে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মিনোচে শফিক-এর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য, "অতীতে জীবিকা ছিল মূলত পেশীশক্তি নির্ভর, এখন সেটা হয়েছে মস্তিষ্কের, তবে আগামী সময়ে কৃত্রিম প্রযুক্তির দুনিয়ার সেটা হয়ে উঠবে হৃদয়ের।"