আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৫ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩২

প্রবন্ধ

প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের পরিণাম কী?

নিখিলরঞ্জন গুহ


লোকসভায় সরকারের বিবৃতি থেকে জানা যায় ২০২৫ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের খরচ হয়েছে মোট ৬৭ কোটি টাকা। এখানে বিশেষ চাটার্ড বিমান খরচ ধরা হয়েছে কিনা তা বলা নেই। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় এহেন সফরের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। তবে তা যদি দৃষ্টিকটু হয় তবে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকে। ভূরাজনীতিতে তার ইতিবাচক ভূমিকা থাকলে তা কাঙ্ক্ষিত হিসেবে মান্যতা পাওয়ার যোগ্য। মনে রাখতে হবে একশো চল্লিশ কোটির দেশের প্রায় আশি কোটি মানুষকে এখনও বিনামূল্যের রেশনের চাল খেয়ে দিন গুজরান করতে হয়। দেশের বেকারত্বের হারও উর্ধ্বমুখী। এই পরিস্থিতিতে জিডিপির বৃদ্ধির হারই এখন সরকারের হাতিয়ার।

জাপানকে ছাপিয়ে যাওয়া জিডিপির মান এখন প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে। যখন দেখা যায় ভিক্ষান্নের জন্য বুভুক্ষু মানুষ লাইন দিচ্ছে তখন বোঝা যায় তার সুফল কোথায় জমা হচ্ছে। মোদী সরকারের এহেন প্রচারকে গুরুত্ব দিতে হলে বলতে হয় ভারতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব। কারণ তার শাসনকালেই বিশ্বে মোট জিডিপির প্রায় ২৫% অংশীদারত্ব নিয়ে ভারতের স্থান ছিল দ্বিতীয় যা ব্রিটিশ ভারতেও দেখা যায়নি। আসলে জিডিপির হার বড় কথা নয়, তার সুফল মানুষ পাচ্ছে কি না সেটাই বড় কথা। সরকার যে এটাকে কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে তা বোঝা যাবে জাপানের মাথাপিছু বার্ষিক জিডিপিকে বিবেচনায় রাখলে। যেহেতু ধনী দরিদ্র সকলকে নিয়ে এই গড় তাই মনে রাখতে হবে এটাও মানুষের সঠিক অবস্থার নির্দেশক নয়। তবে দেশের আর্থিক স্বাস্থ্য বোঝাতে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সূচক। দেখা যাচ্ছে ভারতের বাৎসরিক মাথাপিছু জিডিপি যখন ২,৮৭৮.৪ (২০২৫) ডলার তখন জাপানে তা ৩৩,৯৩৬.৩ (২০২৫) ডলার (১১.৭৯ গুণ)। এমনকী বাংলাদেশের টালমাটালের মধ্যেও মাথাপিছু জিডিপি ২,২৩৬ ডলার।

আমেরিকায় দ্বিতীয়বারের জন্য ট্রাম্পের জিতে আসা বিশ্বের কাছে যে একটা বড় হুমকি তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ভারতের বানিজ্য নীতিতে তাঁর অনধিকার হস্তক্ষেপও ধৃষ্টতার নামান্তর বিশেষ। তবে ভারতের অর্থনীতি নিয়ে তাঁর মন্তব্যকে একেবারে উড়য়ে দেওয়া যায় না। তথ্য বলছে মাথাপিছু জিডিপিতে বিশ্বে ভারতের স্থান - ১৩৬ (প্রজেক্টেড, উইকিপিডিয়া), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম (মাথাপিছু ৮৯,১০৫.২ ডলার), এবং রাশিয়ার স্থান ৪৩ (মাথাপিছু ৪৯,৩৮০ ডলার)। সুতরাং ভারতীয় অর্থনীতিকে তাঁর কটাক্ষের একেবারে বাস্তব ভিত্তি নেই বলা যাবে না।

এখানে এই হিসেব উল্লেখের উদ্দেশ্য হল একটা দরিদ্র দেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ব্যয় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা বিবেচনা করা। সরকার প্রদত্ত তথ্য বলছে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের জন্য মোট খরচ হল ৩,৬৭৭ কোটি টাকা (২০১৪-২০২৫)। এখানে প্রাক্তন দুই প্রধানমন্ত্রীর এই খাতে ব্যয়কেও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। মনমোহন সিংহ এবং অটলবিহারী বাজপেয়ীর ক্ষেত্রে এই ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৬৯৯ কোটি এবং ১৪৪ কোটি টাকা। বোঝাই যাচ্ছে মোদী এই ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন। এটা স্বীকার করতেই হবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ় বিদেশনীতি ভারতকে বিশ্বে এক বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সাথে একথাও বলতে হবে ড. মনোমোহন সিং এবং অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বেও তাতে চিড় ধরেনি। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান ভারতের অবস্থা বিবেচনা করে বলা যায় ভারত সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রশ্নে বলা যায় ভারতের বর্তমান কোণঠাসা অবস্থা বেশ চিন্তার কারণ। এখানে এটা মনে রাখা আবশ্যক বানিজ্যের প্রশ্নে বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা আর ভূরাজনীতিতে দেশের অবস্থানকে দৃঢ় করা এক কথা নয়। এ দেশের বাজারের উপর বিভিন্ন দেশের লক্ষ্য থাকলেও তার প্রভাবকেও ভারত ঠিক মতো কাজে লাগাতে পারছে বলে মনে হয় না। তার উৎকট প্রকাশ ঘটতে দেখা গিয়েছে পহেলগাঁওয়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ড উদ্ভুত পরিস্থিতিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারত বিরোধীতা নতুন কিছু নয়। তবে কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নে নরমে গরমে ভারত একটা সম্মানজনক অবস্থায় ছিল। বর্তমানে তা শুধু অসহায়তার প্রতীকই নয় অপমানজনকও বটে। আন্তর্জাতিক সমস্ত বিধিনিষেধ ভেঙে প্যালেস্টাইনের উপর ইজরায়েলের ধারাবাহিক আক্রমণ সত্ত্বেও ডোনান্ড ট্রাম্পের ভাবশিষ্য নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিতে দেখা গিয়েছে মোদীকে। এমনকী গাজায় মানবতা বিরোধী ইজরায়েলি নৃশংসতার বিরুদ্ধেও তিনি নীরব থেকেছেন। তবে তিনি বন্ধুর মন পেয়েছেন এমন নয়। তাঁর রাষ্ট্রীয় অভিষেক অনুষ্ঠানেও তিনি উপেক্ষিত ছিলেন। পহেলগাঁওয়ের ঘটনার পর তা আরও প্রকটভাবে প্রকাশ পেতে দেখা যায়। যে সামরিক প্রধান সন্ত্রাসে উসকানিদাতা হিসেবে অভিযুক্ত সেই সেনাপ্রধানকে ডোনান্ড ট্রাম্পের মধ্যাহ্নভোজে বিশেষ আমন্ত্রণ নিঃসন্দেহে ভারতের কাছে বিড়ম্বনার কারণ। তা আরও স্পষ্টতাপ্রাপ্ত হয় যখন সেই সেনাপ্রধান ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বন্ধের কৃতিত্বের দাবিদার ট্রাম্পের নাম 'নোবেল' পুরষ্কারের জন্য প্রস্তাব করেন।

বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলির সাথে ভারতের বর্তমান সম্পর্ক বিবেচনার আগে সার্কভুক্ত দেশগুলির সাথে আমাদের সম্পর্কের দিকটি ভেবে দেখা যাক। পাকিস্তানেকে বাদ দিলেও এই দেশগুলির সাথে ভারতের সম্পর্ক ভাল যাচ্ছে না। বন্ধু বাংলাদেশ এখন আমাদের মাথাব্যাথার কারণ। পাকিস্তান-বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক শুধু বানিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না সামরিক ক্ষেত্রেও তার প্রভাব বর্তমান যা ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপরেও চাপ বাড়াচ্ছে। পহেলগাঁওয়ের ঘটনার প্রেক্ষিতে ভারত প্রাথমিকভাবে ১৩০টি দেশের সহানুভূতি পেলেও (যেটাকে মোদী সরকার কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখাতে চাইছেন) বিভিন্ন ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট যে তার বিরুদ্ধে ভারতের পদক্ষেপে বিশ্বজনমত বিপরীত পথে হাঁটতে শুরু করেছে। ভারতের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় বিশ্বের বৃহৎ রাষ্ট্রগুলির সমর্থনপুষ্ট পাকিস্তানকে আইএমএফ-এর বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের ঘটনাই তার প্রমাণ। পাক-ভারত যুদ্ধ বন্ধে ডোনান্ড ট্রাম্পের বানিজ্য বন্ধের হুমকি নিঃসন্দেহে ভারতের মতো রাষ্ট্রের পক্ষে অবমাননাকর যা ভূরাজনীতিতে ভারতের দুর্বলতার দিকটিকেই প্রকাশ করে। আকস্মিকভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং সর্বদলীয় দল গঠন, দেশে দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সামরিক অভিযান চালানোর ব্যাখ্যাদানের বাধ্যবাধকতা কেন দেখা দিল এখানে সেটাও একটা প্রশ্ন।

প্রসঙ্গক্রমে এখানে ইরানের কথা চলে আসে। ইজরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। এই যুদ্ধে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালালেও তার বিরুদ্ধে ইরানের দৃঢ় অবস্থান নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। বিদেশের মাটিতে মার্কিন ঘাটিতে ইরানের পালটা অভিযান আমেরিকার আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবে একটা হুমকি। যুদ্ধবিরতির প্রশ্নেও ট্রাম্পের প্রস্তাবের পালটা হিসেবে যুদ্ধ শুরু করার দায়ে অভিযুক্ত ইজরায়েলকে প্রথমে যুদ্ধ বন্ধ করার শর্তদান বিশ্বে ইরানকে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছে। বিপুল অর্থব্যয়ে ইরানকে সমর্থন ভিক্ষা করতে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হয়নি। সন্ত্রাসীদের আশ্রয়দাতা পাকিস্তানকে জবাব দেওয়া, পাক অধিকৃত কাশ্মীর উদ্ধারের প্রশ্নকে সামনে রেখে ভারতীয় জনমানসে শাসকদল, বৃহৎপুঁজি নিয়ন্ত্রিত দূরদর্শন ও সরকার সৃষ্ট প্রত্যাশায় জল ঢেলে ট্রাম্পের হুমকির মুখে শর্তহীনভাবে যুদ্ধবিরতি প্রমাণ করে এই যুদ্ধজিগির ছিল নেহাতই একটা রাজনীতির কৌশল। দেশবাসী এবং বিরোধী দলগুলির পূর্ণ সমর্থনপ্রাপ্ত একটা সরকার বিরোধীদের উপেক্ষা করে এককভাবে শর্তহীন এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারল কীভাবে সেটাও এক প্রশ্ন। বলা যায় এই ঘটনাই ট্রাম্পকে ভারতের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের উপর খবরদারি করার সুযোগ করে দিয়েছে। শুধু শুল্ক বৃদ্ধিই নয় রাশিয়া থেকে খনিজ তেল এবং যুদ্ধাস্ত্র আমদানির জন্য শাস্তি হিসেবে জরিমানা ধার্য করা ভারতের স্বাধীন বানিজ্য নীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ বিশেষ। এটা ঠিক মার্কিন নীতি কোনোদিনই নীতিনৈতিকতা নির্ভর ছিল না। তা ছিল বানিজ্য-স্বার্থ নির্ভর এবং কর্তৃত্ববাদী মনোভাব পুষ্ট। এই প্রশ্নে চীন, কানাডা এমনকী প্রতিবেশী মেস্কিকোর মতো রাষ্ট্রও যে দৃঢ়তা দেখাতে পেরেছে ভারত তা পারেনি। এখানে এটাও উল্লেখের দাবি রাখে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলি যেহেতু আমেরিকা দ্বারা প্রভাবিত সেহেতু তাঁদের সাথে ভারতের সম্পর্কের উপরেও তার প্রভাব পড়বে। বর্তমান বিশ্বে অস্থিরমতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিঃসন্দেহে একজন বিপজ্জনক ব্যক্তিত্ববিশেষ। রাশিয়ার উপকূলে পরমাণু চালিত ডুবো জাহাজ প্রেরণ তারই ইঙ্গিত বহন করে।

২০১৪ সালে ক্ষমতা লাভের পর মোদী সরকারের উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদে এ দেশের সংখ্যালঘুরা যেমন নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছে তেমনই বিশ্ব রাজনীতিতেও ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতাও কমেছে। শুধু মুসলিম রাষ্ট্রগুলিই নয় ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলির কাছেও ভারতের অবস্থান ঠিক আগের মতো আছে দাবি করা যায় না। পরিহাসের বিষয় হল সন্ত্রাসবাদীদের আঁতুড় ঘর হিসেবে দাবি করা পাকিস্তান পহেলগাঁও ঘটনার ঠিক পরেই রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্যদের দ্বারা 'অ্যান্টি টেররিস্ট কমিটি'র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে। এই যখন অবস্থা তখন বিপুল অর্থ ব্যয়ে মোদীজির বিলাসবহুল রাজকীয় এই বিদেশ সফর দেশের পক্ষে কতটা সুফলদায়ী তা বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।