আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৫ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩২

প্রবন্ধ

প্রম্পট্ করিব, খাইব সুখে

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী


একটি দেশজ সংস্থার মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি বিভাগে দশ বছর কলকাতায় টানা চাকরি করার পর বেঙ্গালুরু থেকে যেদিন কাজের অফার পেল আমার স্কুলজীবনের বন্ধু, ফোনের ওপাশ থেকে ওর গলায় ভেসে এসেছিল আনন্দহিল্লোল। গলা শুনে মনে হচ্ছিল, কয়েক হাজার লোক করতালি দিচ্ছেন নেপথ্যে। দিয়েই চলেছেন। অনীশ বলল, "নতুন সংস্থাটি বহুজাতিক। বিশ্বজুড়ে ব্যবসা।" বলল, "বায়োডাটায় এই সংস্থার নাম সোনার অক্ষরে প্রিন্ট হবে, বুঝলি ভাই। এত কষ্ট করে, রাত জেগে পড়াশোনা করে, নিজের উদ্যোগে এক্সেলের বাহারি ফর্মুলা শিখে এই প্ল্যাটফর্মটা তৈরি করলাম আমি। এটা আমার অর্জন।" সামাজিক মাধ্যমে ওর এই নতুন চাকরির পোস্ট স্নাত হয়েছিল অজস্র বেলুনে, গোলাপে, কেকে, কনগ্র্যাচুলেশনস লেখা ইমোজিতে।

অনীশের নাম লেখার পরে দুই বন্ধনীর মধ্যে লিখে দেওয়া যেতে পারত, 'নাম পরিবর্তিত'। খবরের কাগজে যেমন লেখা থাকে আর কি। পাল্টালাম না। এক অনীশকে লুকোতে চাইলে চকিতে উঠে আসবে অন্য অনীশ। কয়েকদিন আগে ওর সঙ্গে ফোনালাপ ছিল অনেকটা এরকম। তখন প্রায় মধ্যরাত। কলকাতার বিছানায় আমার পাশেই বেডসুইচ।

- সব নষ্ট হয়ে গেল। সব। স্বপ্নগুলো চৌচির।

- কী হল নতুন করে? বাড়িতে সবাই ঠিক আছেন তো?

- কর্মস্থল ধসে গেলে বাড়ি কী করে ঠিক থাকে? ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে আমার।

- একটু খুলে না বললে বুঝি কেমন করে?

- এই মাল্টিন্যাশনাল কী বলছে জানিস? বলে, এত কষ্ট করে রিপোর্ট বানাও কেন?

- যে কোনও ভাল কাজ করতে গেলেই তো কষ্ট হয়। তুই তো এটা অর্জন করেছিস।

- কলকাতায় এত বছর কাজ করে কি পিছিয়ে গিয়েছিলাম খুব? আমাকে একটু পরিশ্রম করতে দেখে উপরওয়ালা বলল, ইউ আর এ ফুল। এগুলো নিজে করছ কেন? এআই-কে দিয়ে করাও।

- নিজে না করে এআই?

- ঠিক তাই। এসে দেখছি, এখানে নিয়ম করে ট্রেনিং হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গেলানোর। সপ্তাহে তিন দিন করে চলছে এআই ওয়ার্কশপ। ডিরেক্টরের নির্দেশে উপস্থিতি ম্যান্ডেটরি। একটা কথা কি জানিস? যত শিখছি এসব, নিজের গা থেকে তত বেরোতে শুরু করছে বাসি গন্ধ। টানা সাত দিন হয়ে গেল রাতে এক ফোঁটা ঘুম হয় না।

- এটা তো যুগের ধর্ম। কিন্তু এত চিন্তা করলে যে ক্রমশ শরীর খারাপ হয়ে যাবে। অবসাদ আসবে। সঙ্গে আরও কতকিছু।

- অবসাদ কি এখনও থাবা বসায়নি ভেবেছিস? এই ট্রেনিং যত রক্তে মিশবে, আমরা তত পুরোনো হয়ে যাব রে। একটা সারসত্য বুঝে গিয়েছি। দশ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি আসলে শিখিনি কিছুই। যদি কিছু শিখেও থাকি, সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে যদি আমার এক দিন সময় লাগে, এআই তা করে দিচ্ছে ঠিক এক মিনিটে। মিনিটটাও মনে হয় বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। বলতে পারিস, কাজ মিটে যাচ্ছে কয়েক সেকেন্ডে।

- তাই বলে হাল ছেড়ে দিবি?

- যে নৌকোয় ফুটো হয়ে গিয়ে জল ঢুকছে হুড়হুড় করে, সেখানে মিছিমিছি হাল ধরে রেখেই বা কী লাভ? স্বপ্নের উপরে শ্যাওলা পড়ে গিয়েছে আমার। শুধু দেখতে থাক, কত হাজার টাইটানিক একসঙ্গে ডোবে।

ফোন কেটে দিয়েছিল অনীশ। আরও কিছু বলার চেষ্টা করছিল বিড়বিড় করে। শব্দগুলো পেরেক হয়ে আমার কানের মধ্যে গেঁথে যাচ্ছিল। সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। জোছনা হঠাৎ আড়ি করে চলে গিয়েছিল দূরে। আমিও নিদ্রাহীন ছিলাম, অনীশের মতো। দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো দুলছিল গরম হাওয়ায়, প্রশ্নচিহ্ন হয়ে।

ভুবনবিদিত সংস্থাগুলোতে হাল আমলে লে-অফের লাইন লেগেছে। পশ্চিমি দেশগুলোতে এর শুরুটা বেশ কয়েকমাস আগে হলেও কর্মী নাকচ করার ঢেউ চলে এসেছে এদেশেও। ভারতবর্ষের শীর্ষস্থানীয় একটি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা সম্প্রতি ১২,০০০ কর্মীর চাকরি বাতিল করার ঘোষণা করেছে। সংস্থার তরফ থেকে সোজাসুজি কিছু না বলা হলেও ওয়াকিবহাল শিবিরের বিশেষজ্ঞরা সমস্বরে বলছেন, যেভাবে এআই গিলছে আমাদের, এমনটা তো হওয়ারই ছিল। কর্মী কমানোর ঘোষণার সঙ্গে সংস্থাগুলোর তরফে জুড়ে দেওয়া হয় 'স্কিল মিসম্যাচ', 'স্মার্টসাইজিং' গোছের কিছু শব্দ। যে কর্মীরা এত বছর ধরে সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘর করলেন, তাঁদের ব্যবসায়িক উত্থানপতনের সঙ্গী হলেন, যাবতীয় ট্রেনিং ও ডেভলপমেন্ট কর্মসূচীতে আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ করলেন, তাঁদের দক্ষতা হঠাৎ কী কারণে ভূপতিত হয়, তার কারণ আন্দাজ করতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দশজন মানুষের এক দিনের কাজ যদি এক লহমায় করে দিতে পারে কোনও যন্ত্র, তাহলে রক্তমাংসের মানুষকে পুষে সংস্থাগুলোর কিছু লাভ হয় না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশে তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কাজ করা আমার স্কুলজীবনের এক বন্ধু সম্প্রতি বলছিল, "অফিসে আমাদের ফ্লোরে একবার ঢুকলেই নিজের ফেলে আসা দেশে, ফেলে আসা শহরে, রাস্তায় চিকেনের দোকানগুলোর কথা মনে পড়ে। খাঁচাভর্তি কিলবিল করছে একগাদা পাখি। পাশে রাখা এক উদ্ধত, জিরাফের মতো ঘাড় উঁচু করে থাকা বটি দা। দায়ের পাশের প্লেটে পড়ে থাকে কিছু লেগপিস, বডি, উইংস। খাঁচার পাখিগুলো তা দেখে। শুধু দেখা ছাড়া ওদের তো আর কিছু করার উপায় নেই। আমাদের অবস্থা ঠিক ওদের মতো। আগে টুকটাক খুচরো অর্ডার আসত। কেউ টের পেত না। এআই আসার পরে এখন প্রতিদিন বিয়েবাড়ির অর্ডার আসছে। এক হুকুমে এক ঘন্টায় একশ খাঁচা ফাঁকা। মরব জানি। তবে পালানোর পথ নেই।"

হজম করতে কষ্ট হলেও একথা সত্যি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝালর দেওয়া নয়া পৃথিবীর সঙ্গে মানিয়ে না নিতে পারলে আমাদের আর টিকে থাকার উপায় নেই। ডারউইন সাহেবের 'সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট' তত্বের কথা মনে পড়ে। আশ্চর্য হয়ে এবং খাবি খেতে খেতে আমাদের জন্ম দেওয়া এই নয়া দুনিয়ার কথা ভাবি। প্রতি পদক্ষেপে হাজারখানেক ধাপ এগিয়ে থেকে এআই জমানা যেন বলছে, "এসো। আমার সঙ্গে লড়ো। দেখি তুমি কত ক্ষমতা ধরো।" বি.টেক. কোর্সের স্পেশালাইজেশন হিসেবে এআই ঢুকে গিয়েছে বেশ কয়েক বছর হল। হাল আমলের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপনগুলোও আজকাল 'এআই-এনাবেল্ড' ক্লাসরুমের কথা বলে। কম্পিউটারকে মনের অনুসন্ধিৎসা গিলিয়ে দিয়ে আরও বেশি করে তথ্য আহরণের প্রচেষ্টা হয়তো শুরু হয়ে যাবে ক্লাস ফোর-ফাইভ থেকেই। এর একটা জেল্লা দেওয়া নাম আছে - প্রম্পট্ ইঞ্জিনিয়ারিং। শুনেছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্ল্যাটফর্ম জটিল, আরও জটিল প্রশ্ন শোনার জন্য মুখিয়ে থাকে। যত কঠিন প্রশ্ন করা যায়, উত্তর দেওয়ার সময় সে নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করে। আর এই চেষ্টা নিরন্তর। একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপকে পরপর দু'দিন একই প্রশ্ন করে দেখেছি, দ্বিতীয় দিনের উত্তর প্রথম দিনের থেকে অনেকটাই যথাযথ। শক্তিশালীও বটে।

একটি মুদ্রণ সংস্থায় প্রুফ এডিটর পদে কর্মরত আমার এক বন্ধু বলল, "কাজ হারাবো বলেই এবার কাজে নেমেছি।" জানলাম, মাঝারি মানের ওদের সংস্থাতেও নিয়মিত ব্যবহার করা শুরু হয়ে গিয়েছে এআই। যন্ত্র প্রুফ দেখে দিচ্ছে ঝড়ের গতিতে, আরও অনেক নির্ভুলভাবে। বিদেশের বেশ কিছু স্কুলে ইতিমধ্যেই ক্লাস নিতে শুরু করেছে রোবট শিক্ষক শিক্ষিকারা। আমাদের বেঁচে থাকায় যাবতীয় যা উপকরণ, তার মধ্যে কোথাও না কোথাও ভূমিকা পালন করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। গেল গেল রব তুলে, এআই বিদ্রোহী হয়েও আমরা উপকৃত হচ্ছি আমাদের অগোচরেই।

আগামীদিনে কাজের গতিপ্রকৃতি কী হবে, তার উত্তর আমাদের অজানা। কাজ করার জন্য মানুষের কতটা প্রয়োজন হবে সেটাই এখন একটি রহস্য গল্পের মতো। ফেলুদাকে প্রশ্ন করলেও উত্তর পাব না। আধুনিক যুগের সিধুজ্যাঠা নিজেই যে এক এআই! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে মানুষ আগের থেকে আরও বেশি ভালভাবে কাজ করতে পারবে। নিজের সেরাটা উজাড় করে দিতে পারবে। আধুনিক যন্ত্র তো মানুষের বন্ধু!" তবে সম্পূর্ণ অন্য ছবির কথা বলছে এ যুগের বাস্তব, আপাতত।

অনীশদের চোখ থেকে ঝরে পড়া জল হয়তো মুছিয়ে দেবে কোনও রোবট, কোনও একদিন। সে অন্তহীন কান্নার জল যত তাড়াতাড়ি বাষ্প হয়, ততই মঙ্গল।