আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৫ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা
স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লার প্রাকার থেকে জাতির উদ্দেশে সরকারি প্রথামাফিক ভাষণ দেওয়ার সময় কোনো রাখঢাক না রেখে সরাসরি তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের শততম বর্ষ উদযাপনের সূচনা করে দিলেন।প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, "আজ, আমি গর্বের সাথে উল্লেখ করতে চাই যে ১০০ বছর আগে, একটি সংগঠনের জন্ম হয়েছিল - রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। জাতির প্রতি ১০০ বছরের সেবা একটি গর্বিত, সোনালী অধ্যায়। 'ব্যক্তি নির্মাণ সে রাষ্ট্র নির্মাণ'-এর সংকল্প নিয়ে, মা ভারতীর কল্যাণের লক্ষ্যে, স্বয়ংসেবকরা আমাদের মাতৃভূমির কল্যাণে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন... এক অর্থে, আরএসএস বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও। এর ১০০ বছরের নিষ্ঠার ইতিহাস রয়েছে..."
স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে, শত শহীদের আত্মবলিদানকে অপমান করে ৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের ঐতিহাসিক উপলক্ষকে কলঙ্কিত করে একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন, যা প্রায়শই নিষিদ্ধ করা হয়, এমন সংগঠনের প্রচার অগ্রহণযোগ্য। বিশেষত সংগঠনটি জন্মলগ্ন থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করে এসেছে। সর্বোপরি এই সংগঠনের জনৈক সদস্য মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী। নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র চাদরে মোড়া সরকারি অনুষ্ঠান থেকে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টিকারী একটি সংগঠনের প্রশস্তি রীতিমতো লজ্জাজনক।
তিনি আরও বলেছেন যে অনুপ্রবেশকারীরা দেশবাসীর মুখের ভাত কেড়ে নিচ্ছে! এটা সহ্য করা হবে না। অবৈধ অনুপ্রবেশ কোনো মতেই সমর্থনযোগ্য নয়। অনুপ্রবেশ বন্ধ করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের প্রধান যখন অনুপ্রবেশকারীদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন তখন ধরে নিতে হবে যে অনুপ্রবেশ হচ্ছে। এবং তাঁর সরকার বিষয়টি নিয়ে সম্যক অবহিত। অনুপ্রবেশ বন্ধ করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। সেখানে তো তিনি এবং তাঁর দলীয় সহকর্মীরা অধিষ্ঠিত। তারপরেও যদি অনুপ্রবেশ হয় তবে তা সরকারের ব্যর্থতা। তিনি সম্ভবত প্রকারান্তরে তা স্বীকার করে নিলেন।
৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে অনুপ্রবেশকারীদের হুঁশিয়ারি দিলেন প্রধানমন্ত্রী। ঘোষণা করলেন কেন্দ্রের নতুন অভিযানের কথা। তাঁর মতে, অনুপ্রবেশকারীদের জন্য দেশের জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে। নতুন 'জনবিন্যাস অভিযান'-এর মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হবে। অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে দেশকে বাঁচানো হবে। অন্য দেশ থেকে যাঁরা ভারতে প্রবেশ করছেন, তাঁরা এ দেশের তরুণ প্রজন্মের মুখের ভাত কেড়ে নিচ্ছেন, মন্তব্য প্রধানমন্ত্রীর। এটা সহ্য করা হবে না, জানিয়েছেন তিনি।
জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, "আমি একটা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে দেশের মানুষকে সতর্ক করে দিতে চাই। সুচিন্তিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এই দেশের জনবিন্যাস বদলে দেওয়া হচ্ছে। নতুন নতুন সমস্যার বীজ বপন করা হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারীরা আমাদের তরুণ প্রজন্মের জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের মা-বোনেদের নিশানা করছে। এটা সহ্য করা হবে না।"
প্রশ্ন হলো অনুপ্রবেশ কেন বন্ধ করা হচ্ছে না? দেশের সীমান্ত এলাকায় মোতায়েন রয়েছে আধা-সামরিক বাহিনী। বাহিনী কি নিষ্ক্রিয়? না কি যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ? এর মূল্যায়ন কে করবে? বাহিনীর ব্যর্থতা স্বীকার করে নিলে প্রকারান্তরে সরকারের ব্যর্থতা মেনে নিতে হবে। এবং গত এগারো বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দেশ চালাচ্ছে। তাহলে কি তিনি লাল কেল্লার প্রাকার থেকে উদ্ধত উচ্চারণে নিজের সরকারের দুর্বলতা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলেন?
অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের তৎপরতা বেড়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ধরপাকড় শুরু হয়েছে। অভিযোগ, অনেককে গ্রেফতার করে বাংলাদেশে পাঠিয়েও দেওয়া হচ্ছে। কিছু দিন আগে বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালে দিল্লি পুলিশের একটি চিঠি, যেখানে পরিযায়ী শ্রমিকদের ভাষাকে 'বাংলাদেশি ভাষা' বলে উল্লেখ করা হয়। স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলা বা বাংলাদেশের নাম করেননি।
তিনি আরও বলেছেন যে অনুপ্রবেশকারীরা জনজাতির জমি কেড়ে নিচ্ছে। তাঁদের ভুল বোঝানো হচ্ছে। দেশ এটা সহ্য করবে না। ঠিকই তো। কেন সহ্য করা হবে? বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে কয়েকটি নির্দিষ্ট শিল্পোদ্যোগী গোষ্ঠীর স্বার্থে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনজাতির জমি দখল করা হচ্ছে। গত কয়েক মাসে আসাম, ছত্তিশগড় প্রভৃতি রাজ্যে অরণ্য সুরক্ষা আইনকে উপেক্ষা করে বুলডোজার চালিয়ে জনজাতির মানুষকে ছিন্নমূল করে দেওয়া হয়েছে। প্রবল বর্ষণে সেই হতদরিদ্র মানুষের মাথায় রয়েছে ত্রিপল-প্লাস্টিকের ছাউনি। রাতবিরেতে সেই ছাউনিও ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
অনুপ্রবেশকারীদের জন্য সীমান্ত এলাকায় জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী। একে জাতীয় নিরাপত্তার পক্ষেও বিপজ্জনক বলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, সীমান্ত এলাকায় জনবিন্যাসে পরিবর্তন জাতীয় নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক। এর মাধ্যমে সংঘর্ষের বীজ বপন হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারীদের সামনে কোনও দেশ মাথা নত করতে পারে না। আমরা কী ভাবে করব? আমাদের পূর্বপুরুষেরা আমাদের স্বাধীনতা উপহার দিয়ে গিয়েছেন। অনুপ্রবেশকারীদের রুখে তাঁদের প্রতি কর্তব্য আমাদের পালন করতে হবে।
ঝাঁকে ঝাঁকে অনুপ্রবেশকারী দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করায় দেশের জনবিন্যাস নাকি পাল্টে যাচ্ছে। যদি এমনটাই হয়ে থাকে তার অর্থ সীমান্ত এলাকায় পাহারাদারির করুণ পরিণতি। তার দায়িত্ব কার?
উল্লেখ্য, সীমান্তে অনুপ্রবেশ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই সরব কেন্দ্রের সরকার। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বহু মানুষ ভারতে ঢুকে পড়ছেন বলে অভিযোগ। তারপর তারা এ দেশের নাগরিক হিসাবেই থেকে যাচ্ছেন। ফলে জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পশ্চিম বাংলায় এসে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বার বার সরব হয়েছেন। এবার লালকেল্লা থেকেও সেই প্রসঙ্গ তুললেন।
এরপর তিনি ঘোষণা করেছেন যে আসন্ন দীপাবলির মরশুমে দেশবাসীকে নতুন প্রজন্মের জিএসটি উপহার দেওয়া হবে। অর্থাৎ বর্তমান জিএসটি ব্যবস্থায় ত্রুটি রয়েছে। বিরোধী দলগুলি সহ বিশেষজ্ঞরা জিএসটি প্রবর্তনের সময় থেকেই বিষয়টি সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করেছে।
তিনি আরও ঘোষণা করেছেন যে ১ লক্ষ কোটি টাকার প্রধানমন্ত্রী বিকশিত ভারত রোজগার যোজনা চালু করা হবে। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেননি। ফলে অপেক্ষা করতে হবে।
ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যচুক্তির জট এখনও কাটেনি। সংবাদ মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে যে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে অন্তরায় মূলত কৃষি এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য নিয়ে দুই দেশের একমত হতে না-পারা। সেই আবহেই কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু দেশের কর্পোরেটদের হাত থেকে কীভাবে কৃষকের উৎপাদন রক্ষা করবেন তার কোনো রূপরেখা তিনি জানাননি।
সবমিলিয়ে সরকার তথা প্রশাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতার স্বীকৃতি প্রকারান্তরে স্বীকার করে উদ্ধত উচ্চারণে দেশবাসীকে শোনালেন স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ।