আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৫ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

সংবিধান, গণতন্ত্র ও নির্বাচন কমিশন


সংসদের বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সাম্প্রতিক সাংবাদিক সম্মেলন গত কয়েক বছরের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলন বললে অত্যুক্তি করা হয় না। এই সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল গান্ধী ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে জাল ভোটার তৈরি করার যে অভিযোগ করেছেন, তা নজিরবিহীন। বেঙ্গালুরুর একটি বিধানসভা আসনে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে লক্ষাধিক ভুয়ো ভোটারের নাম ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই যে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল লোকসভা আসনে বিজেপি প্রার্থী জয়ী হয় ৩২,৭০৭ ভোটে। কিন্তু এই লোকসভার অন্তর্গত মহাদেবপুরা বিধানসভা ক্ষেত্রে বিজেপি প্রার্থী কংগ্রেস প্রার্থীর থেকে ১,১৪,০৪৬ ভোটে এগিয়ে থাকে। অর্থাৎ সাতটি বিধানসভা ক্ষেত্র মিলিয়ে বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল লোকসভা আসনের মধ্যে ৬টি বিধানসভা ক্ষেত্রে কংগ্রেস প্রার্থী বিজেপির থেকে ৮১,ল৩৩৯ ভোটে এগিয়ে ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র একটি বিধানসভা ক্ষেত্রে এই অত্যধিক ব্যবধান বিজেপিকে এই আসনে জেতায়।

এখানেই রাহুল গান্ধী প্রশ্ন তুলেছেন ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। বহুবার নির্বাচন কমিশনের কাছে ইলেক্ট্রনিক ভোটার লিস্ট চাওয়ার পরেও, নির্বাচন কমিশন তা দিতে অস্বীকার করে। তারা কংগ্রেসকে একটি বিধানসভা আসনের ভোটার তালিকা এবং অন্যান্য দস্তাবেজ কাগজে ছাপিয়ে দেয়, যা একসাথে রাখলে তার উচ্চতা সাত ফুট ছাড়িয়ে যায়। খুবই আশ্চর্যজনক এই যে ছাপানো কাগজও এমনভাবে দেওয়া হয়, যাতে কম্পিউটারে স্ক্যান করেও তথ্যের বিশ্লেষণ করা যাবে না। অতএব, রাহুল গান্ধীর টিমকে প্রত্যেকটি দলিলকে এক এক করে দেখে তা বিশ্লেষণ করতে হয়।

তাঁর বিশ্লেষণে রাহুল গান্ধী জানান যে এই একটি বিধানসভা ক্ষেত্রে একাধিক বুথে নাম রয়েছে এমন ভোটার সংখ্যা ১১,৯৬৫, ভুয়ো বা অপ্রামাণ্য ঠিকানার ভোটার সংখ্যা ৪০,০০৯, একই ঠিকানায় বহু মানুষ রয়েছেন (কোনো ক্ষেত্রে একটি এক কামরার বাড়িতে ৮০ বা তার বেশি) এমন ভোটারের সংখ্যা ১০,৪৫২, ছবিহীন বা ছবি দেখা যাচ্ছে না এমন ভোটারের সংখ্যা ৪,১৩২ এবং নতুন ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন এমন ব্যক্তি যাদের বয়স ১৮ বছরের অনেক বেশি এমন ভোটার সংখ্যা ৩৩,৬৯২। রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন যে এই একটি বিধানসভায় মোট এহেন ভুয়ো ভোটার সংখ্যা ১,০০,২৫০। তাঁর অভিযোগ শুধুমাত্র একটি বিধানসভায় ছয় মাসাধিক গবেষণা করে এই তথ্য তাঁরা একত্রিত করেছেন। এই ভুয়ো ভোটারদের ভোটেই বিজেপি এই আসনে জয়ী হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।

তিনি এহেন ভুয়ো ভোটের ভিত্তিতে হরিয়ানার ভোট তথা মহারাষ্ট্রের ভোটে বিজেপি জয়ী হয়েছে এই অভিযোগ করেছেন। এমনকি ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি ২৫টি আসনে জয়ী হয়েছে ৩৩,০০০-এর কম ব্যবধানে। এই সমস্ত আসনের ভোটার লিস্টের ইলেক্ট্রনিক কপি নির্বাচন কমিশন মোদীকে বাঁচাতেই বিরোধী দলকে দিচ্ছে না, এহেন অভিযোগও তিনি করেছেন।

দেশের বিরোধী দলনেতা ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যেভাবে তথ্য সহকারে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তা নজিরবিহীন এবং দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সংবিধান এক ব্যক্তি এক ভোটের কথা বলে, যেখানে প্রত্যেক মানুষের ভোটাধিকার সমান। কিন্তু যদি শাসকদল ও নির্বাচন কমিশনের মৈত্রীর ভিত্তিতে ভুয়ো ভোটার ঢুকিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া চুরির মাধ্যমে জেতা যায়, তাহলে ভারতের সংবিধানের মূল ভিত্তির উপর সরাসরি আঘাত করা হয়। প্রশ্ন হল রাহুল গান্ধী যা বলছেন তা কি সত্যি? সত্যিই কি আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা অসাধুতার কাছে হার মেনেছে, নির্বাচনের ফলাফল কি প্রকৃত জনমতের প্রতিচ্ছবি নয়?

এর উত্তর দিতে পারে একমাত্র নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তাদের বক্তব্যর মধ্যেই পক্ষপাতিত্বের গন্ধ রয়েছে। তারা রাহুল গান্ধীকে বলছেন হলফনামা দিয়ে তাঁর বক্তব্য পেশ করতে অন্যথায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ধরুন আপনি রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখলেন একজন মানুষ অন্য একজনকে খুন করছে। পুলিশ এল, আপনি বললেন আপনি যা দেখেছেন। পুলিশ খুনিকে গ্রেপ্তার না করে আপনাকে বলল যে হলফনামা পেশ না করলে তদন্ত করা হবে না। বর্তমানে নির্বাচন কমিশন এমনই একটি বালখিল্য কথা বলছে।

তাদের উচিত ছিল রাহুল গান্ধীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃতভাবে তদন্ত করে দেখা যে তাঁর অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে কি না। কিন্তু তদন্ত না করে বিভিন্ন আইনি অজুহাত খাড়া করে তারা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে বলেই জনগণের মনে হওয়া স্বাভাবিক। তারা বোধহয় ভুলে গেছেন যে ভোটারদের সামনে নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য হাজির করা তাদের দায়িত্ব। তা না করে, হলফনামার কথা বলে আসলে নির্বাচন কমিশন শাসকদলের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগকেই প্রামাণ্যতা দিচ্ছে। নিকট অতীতে বহুবার নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনের ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিকেল পাঁচটার পরে হঠাৎ ভোটার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, মহারাষ্ট্র নির্বাচনে একলাফে ভোটার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং প্রধানমন্ত্রী সহ অন্যান্য বিজেপি নেতাদের নির্বাচনী আচরণ সংক্রান্ত অভিযোগকে নির্বাচন কমিশন কোনোরকম গুরুত্ব দেয়নি, এই অভিযোগও উঠেছে। এই প্রত্যেকটি অভিযোগের জবাবে নির্বাচন কমিশন কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বা তথ্য দিয়ে উঠতে পারেনি। ফলত, তাদের পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার অভিযোগ মানুষের মনে দৃঢ় হয়েছে।

আবার বিহারের নির্বাচনী তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের আচরণ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধ উপেক্ষা করে তারা আধার কার্ড, রেশন কার্ড, ভোটার কার্ডকে নতুন ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য প্রামাণ্য দলিলের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। এক লপ্তে তারা জানিয়ে দেয় যে নতুন খসড়া ভোটার তালিকায় ৬৫ লক্ষ নির্বাচকের নাম বাদ গেছে। বিরোধীরা দাবি করেন যে নির্বাচন কমিশন কাদের নাম বাদ গেছে, কার নাম বাদ গেছে তা যেন তারা বুথ স্তরের তথ্য দিয়ে জানায়। নির্বাচন কমিশন পরিষ্কার জানায় যে তারা এই তালিকা দেবে না। অতএব, আবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়। সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে প্রত্যেক বুথে কারা বাদ গেল এবং কেন বাদ গেল, তা জানাতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। এই তালিকা তাদের প্রকাশ করতে হবে জনসমক্ষে। আবারও দেখা গেল যে নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতা নয়, অস্বচ্ছতাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। অতএব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে কেন এই অস্বচ্ছতা? নির্বাচন কমিশন কী গোপন করতে চাইছে?

রাহুল গান্ধীর অভিযোগ হোক অথবা বিহারের নির্বাচন তালিকা সংশোধনী বা তারও আগে ভিভিপ্যাট তথা বুথের সিসিটিভি সংরক্ষণ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতা নয়, অস্বচ্ছতাকেই প্রাধান্য দিয়েছে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত অশুভ। নির্বাচন কমিশন ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। যেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা ভারতের সংবিধানে লেখা আছে তার দেখভাল করার গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে নির্বাচন কমিশন তথা সুপ্রিম কোর্টের উপরে। যদি নির্বাচন কমিশন ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বিজেপির পক্ষে পরিচালনা করতে চায়, তাহলে আগামী ইতিহাস এই সমস্ত আধিকারিকদের ক্ষমা করবে না। এখনও সময় আছে, নির্বাচনী আধিকারিকরা ভারতের জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছভাবে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিন। তাদের মনে রাখা উচিত জনগণ তথা ভারতের সংবিধানের উপর তাঁরা নন। ইতিহাসের কাছে, জনগণের কাছে নতজানু হন। মানুষের মনে আপনাদের গতিপ্রকৃতি, কার্যপ্রণালী নিয়ে যেই প্রশ্ন উঠছে তার গ্রহণযোগ্য জবাব দেওয়ার দায় আপনাদের।

বিগত ১১ বছর ধরে মোদীর নেতৃত্বে যে সরকার চলছে, তার প্রভাবে ভারতের প্রত্যেকটি সাংবিধানিক বা স্বশাসিত সংস্থার বিরুদ্ধে হয় পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে অথবা তাদের বিরুদ্ধেই মোদী সরকারকে পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে গিয়ে নোটবন্দীর সিদ্ধান্ত হোক অথবা অযোধ্যায় রাম মন্দির বা ৩৭০ ধারা বিলোপের প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের রায়, সিবিআই এবং ইডিকে প্রকৃতপক্ষে শাসকদলের লেঠেল বাহিনীতে পরিণত করা হোক অথবা বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন, একের পর এক সাংবিধানিক সংস্থা মোদী সরকারের সামনে নতজানু হয়েছে। এর ফলে দুর্বল হয়েছে ভারতের সংবিধান এবং গণতন্ত্র। এখন সময় এসেছে মানুষের প্রশ্ন তোলার, সংবিধান এবং গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াইয়ে সামিল হওয়ার। নির্বাচন কমিশনকে আন্দোলনের মাধ্যমে বাধ্য করতে হবে রাহুল গান্ধীর তোলা প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দেওয়ার। বিহারের অস্বচ্ছ এবং গরিব মানুষের ভোটাধিকার বিরোধী নির্বাচনী তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে রুখে দেওয়া দরকার। নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করতে হবে ১১টি দলিল যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে তা বাতিল করে সহজলভ্য আধার কার্ড, রেশন কার্ড ইত্যাদিকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করতে। সংবিধান এবং গণতন্ত্র বাঁচানোর আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া বিরোধীদের আর কোনো পথ নেই। আমরা আশা করব সমস্ত প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি একজোট হয়ে এই আন্দোলনে সামিল হবেন।