আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৫ ● ১৬-৩১ শ্রাবণ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
ভিএস: সংগ্রামে শানিত জীবন
বিজু কৃষ্ণান

একজন বিপ্লবী যিনি এই দেশের রাজনৈতিক জীবনে শতাধিক বছর বিচরণ করেছেন, তাঁর জীবন ব্যাখ্যা করা সহজ কাজ নয়। জন্মের আগে বা মৃত্যুর পরে যে সময়, তা মানুষের আয়ত্বের বাইরে। কিন্তু জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে যে জীবন, সেই জীবনে মানুষের মনে যে অক্ষয় প্রতিচ্ছবি রেখে যাওয়া যায় তার বিরল উদাহরণ কমরেড ভি. এস. অচ্যুতানন্দন। কমরেড ভি. এস. অচ্যুতানন্দন, তাঁর কমরেড, বন্ধু ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে ভিএস, ৮৫ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন অতিবাহিত করার পরে বিগত ২১ জুলাই ২০২৫ প্রয়াত হন। তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম বিগত শতাব্দী ধরে লাগাতার চলে এসেছে। সামন্ততন্ত্র, জাতিগত শোষণ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র, পুঁজিবাদী শোষণ, প্যালেস্টাইনের গণহত্যাকারী জায়নবাদ, সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ, নবউদারবাদী যুগের ধান্দার পুঁজিবাদ, নারী বিরোধী হিংসা, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে আক্রমণ, পরিবেশ দূষণ, প্রান্তিক যৌনতার মানুষের সম্মান, মাইক্রোসফট্ তথা কোকা-কোলার মতো কোম্পানি, এন্ডোসাল্ফানের মতো কীটনাশক, রিয়েল এস্টেট মাফিয়ার জবরদখল, বেআইনি খনি, এবং আরও অন্যান্য অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে লাগাতার রাস্তার লড়াইয়ে সামিল হয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন ভিএস। তাঁর হার না মানা ব্যক্তিত্ব, সমষ্টির দ্বারা পুষ্ট হয়েছে। আবার এই সমষ্টির মধ্যে তাঁর যাপনে তিনি নিশ্চিত করেন যে বিরোধিতা শুধুমাত্র বিরোধিতা করার জন্যই যেন না করা হয়। তাঁর সংগ্রামের ঐতিহ্যের হাত ধরে বিভিন্ন সমস্যার সৃজনশীল বিকল্প সমাধানের জন্ম হয়, যা কেরলের বাম বিকল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে কেরলের লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় বেরিয়ে আসা প্রমাণ করে তাঁর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ব্যাপ্তি, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন ছুঁয়ে গেছে।
১৯২৩ সালে একটি গরিব কৃষক পরিবারে জন্ম হয় ভিএস-এর। তাঁর যখন মাত্র ৪ বছর বয়স তখন তিনি তাঁর মা'কে হারান এবং বাবাকে হারান ১১ বছর বয়সে। শৈশবেই মা-বাবার মৃত্যু হওয়ার ফলে তিনি সপ্তম শ্রেণির পরে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন এবং একটি দর্জির দোকানে কাজ নেন। পরে এসপিনওয়াল কোম্পানিতে (নারকেল ছোবড়ার কারখানা) শ্রমিকের কাজ নেন। শৈশবে অর্থনৈতিক মন্দা ও ক্ষুধার জ্বালায় ক্লিষ্ট হয়েছেন তিনি। বেকারত্ব, শ্রমিক ও কৃষকদের সামন্ততান্ত্রিক জমিদার ও পুঁজিপতিদের দ্বারা প্রবল শোষণ, মজুতদার ও কালোবাজারিদের মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি খাদ্য সংকট এবং খাদ্যের প্রবল মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমজীবি মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। দলিত ও অন্যান্য সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের উপর সামাজিক অত্যাচারের জন্য কেরালা সেই সময় কুখ্যাত ছিল। জীবিকা নির্বাহের জন্য এবং ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সামাজিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই তাঁকে করতে হয়েছে শৈশব থেকেই। তাঁর ব্যক্তিগত এই অভিজ্ঞতা থাকার ফলে তিনি দেশের শ্রমজীবি শ্রেণি ও তাঁদের দাবিদাওয়ার আন্দোলনের সঙ্গে সর্বদা একাত্ব থেকেছেন। তাদের প্রতি ভিএস-এর দায়বদ্ধতা কখনও হ্রাস পায়নি।
ত্রাভাঙ্কোর করদ রাজ্যের আধুনিক শ্রমিক আন্দোলনের ভরকেন্দ্র ছিল আলাপুজা। ভিএস নারকেল ছোবড়ার কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের অধিকারের দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত করেন। এখানেই তাঁকে কমিউনিস্ট পার্টিতে নিয়ে আসেন সেই সময়ের অগ্রণী কমিউনিস্টরা। কেরালায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সম্পাদক, কমরেড পি. কৃষ্ণপিল্লাই আলাপুজার বাসিন্দা ছিলেন। কৃষ্ণপিল্লাই ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। তিনি ভিএস-এর শ্রমিক শ্রেণি সংক্রান্ত বিষয়ে পারদর্শীতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা বুঝতে পারেন এবং তাঁকে আরও বড় দায়িত্ব দেন। ভিএসকে কুত্তানাডে পাঠানো হয় মূলত দলিত ও প্রান্তিক জাতির ক্ষেতমজুরদের সংগঠিত করার জন্য। এখনেই ভিএস, নামমাত্র প্রথাগত শিক্ষা থাকা সত্ত্বেও, তাঁর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দক্ষতা আরও শানিত করেন এবং একজন অগ্রণী সংগঠক, আন্দোলনকারী এবং রাজনৈতিক শিক্ষকে পরিণত হন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরাচারী সরকার এবং সামন্ততান্ত্রিক জমিদারদের বিরুদ্ধে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগ করে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে শোষিত ক্ষেত মজুর ও গরিব কৃষকদের সংগঠিত করেন ভিএস। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং বিশেষ করে ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির ‘নবরত্ন’-খচিত প্রথম পলিটব্যুরো থেকে শুরু করে আজ অবধি যেই মহান নেতারা প্রয়াত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র ই. বালানন্দন, মহম্মদ আমিন এবং ভিএস শ্রমিক শ্রেণি থেকে উঠে এসেছেন।
১৯৪৬ সালে পুন্নাপ্প্রা ভ্যায়ালার-এর বৈপ্লবিক আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনে ভিএস-এর ভূমিকা কিংবদন্তির সামিল। ত্রাভাঙ্কোরের স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র এবং তার দেওয়ান সি. পি. রামাস্বামীর ভারতের বাইরে মার্কিন মডেলে ত্রাভাঙ্কোরকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে তৈরি করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কৃষক ও শ্রমিকদের এই গণআন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন ভিএস। এই আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টি স্লোগান তোলে, ‘মার্কিন মডেলকে আরব সাগরে ছুঁড়ে ফেলুন’। এই আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে ব্যাপক অত্যাচার চালানো হয়, যার ফলে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু এই আন্দোলন মানুষের মনে জায়গা করে নেয়, শোষিত কৃষক ও শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা বাড়ায়, শ্রমিক-কৃষক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে এবং কেরলে বাম রাজনীতির উত্থানের মতাদর্শগত ভিত্তি তৈরি করে। এই আন্দোলনের ফলেই স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রকে খতম করে ভাষার ভিত্তিতে তৈরি ঐক্যবদ্ধ আধুনিক কেরল রাজ্যের জন্মের সূচনা ঘটে। শ্রেণি সংগ্রামের ভিত্তিতে কমিউনিস্ট পার্টির ব্যাপ্তি বৃদ্ধি, সাম্রাজ্যবাদ এবং রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকারের লড়াই, কায়ুর, কারিভেল্লুরের মতো বহু লড়াই এবং পুন্নাপ্প্রা-ভ্যায়ালার আন্দোলনের ফলে মানুষের মনে পার্টির প্রতি যে বিশ্বাসের জন্ম হয়, তা ১৯৫৭ সালে কেরালায় প্রথম কমিউনিস্ট সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভিএসকে অনেক সময় ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ থাকতে হয়েছে, বহুবার গ্রেপ্তার হয়ে পুলিশের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। পুন্নাপ্প্রা-ভ্যায়ালার আন্দোলনে পরে পুলিশ লকআপে ভিএসের উপরে পাশবিক অত্যাচার করা হয়, বেয়োনেট দিয়ে তাঁর শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া হয়। পুলিশ মনে করে যে ভিএসের অত্যাচারে মৃত্যু হয়েছে। তাই তাঁকে জঙ্গলে ফেলে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু একজন সাধারণ চোর লক্ষ্য করে যে তখনও ভিএস-এর প্রাণ রয়েছে। এর পরে তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় এবং তিনি আবার তাঁর কর্মজীবনে ফেরেন। জরুরি অবস্থার তিন মাসের মাথায় ভিএসকে গ্রেপ্তার করা হয়, এবং জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তিনি জেলেই ছিলেন। পুলিশ লকআপে তাঁর উপরে হওয়া ভয়াবহ অত্যাচারের ফলে শ্রমিক শ্রেণি এবং বিশেষ করে গ্রামীণ শ্রমিকদের প্রতি শাসক শ্রেণির হিংসার বিষয়ে ভিএস অবগত হন এবং শ্রমজীবি মানুষের উপরে ঘটে চলা অত্যাচার নিজের জীবন থেকেই বুঝতে পারেন। তাঁর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক জীবনে তাই তিনি বরাবর রাষ্ট্রীয় হিংসার বিরোধিতা করে গেছেন।
১৯৫৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য কমিটিতে ভিএস নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে নির্বাচিত হন পার্টির জাতীয় পরিষদে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় পরিষদের যেই ৩২ জন সদস্য বেরিয়ে এসে ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন, ভিএস ছিলেন তার শেষ জীবিত সদস্য। তিনি ১৯৮০-১৯৯১ সাল অবধি সিপিআই(এম)-এর কেরালা রাজ্য কমিটির সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৪ সালেই তিনি সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৫ সালে পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য হন। বয়সজনিত কারণে ২০২২ সালে তাঁকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিনি মোট সাত বার কেরালার বিধানসভায় নির্বাচিত জন। তিন বার তিনি কেরালার বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব সামলান। বিরোধী নেতা থাকাকালীন তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ, লিঙ্গ সমতা, জলাভূমি সংরক্ষণ, জনজাতি অধিকার, নার্সদের বেতনবৃদ্ধি, তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার এবং ফ্রি সফটওয়্যারের মতন বিষয় নিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করেন। ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল অবধি তিনি কেরালার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে কেরালায় শ্রমজীবি মানুষের কল্যাণে আইনগত এবং প্রশাসনিক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। তিনি মনে করতেন যে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, সংগ্রামের হাতিয়ার।
ভিএস-এর বৈপ্লবিক কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক ছিল। তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে এবং ভাষণে নব্য-উপনিবেশবাদ কীভাবে কৃষকদের লুঠ করছে তার বিশদ বিবরণ থাকত। কৃষক সভার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত পুন্নাপ্প্রা-ভ্যায়ালার বিদ্রোহ প্রসঙ্গে প্রবন্ধে এবং অন্যান্য লেখায় ভিএস শাসক শ্রেণির ভূমিকা এবং সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তাদের আপসের কথা তুলে ধরেন। কংগ্রেস সরকার যখন নবউদারবাদী অর্থনীতি শুরু করে তখন কেরালায় শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষকদের নেতৃত্ব দেন ভিএস। কৃষি ক্ষেত্রে উদারীকরণের নীতির বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র সমালোচনা কেরালার রাজনৈতিক-অর্থনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভারত ও ASEAN মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র বিরোধিতা বর্তমানে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে যখন ভারত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অসম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার দিকে এগোচ্ছে। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের সঙ্গে দেখা করে অসম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্য সরকারের অধিকারের কথা তুলে ধরেন। তিনি তাঁর দূরদৃষ্টিতে বুঝতে পেরেছিলেন যে এহেন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে কৃষি পণ্যের মূল্যে ব্যাপক পতন দেখা দেবে এবং কেরালার কৃষকরা সংকটাপন্ন হয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। অন্যদিকে, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের বিষয়ে ভিএস অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। কর্পোরেটদের প্রকৃতিকে পণ্যে পরিণত করার লালসার বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। আবার ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে কেরালায় নারীদের বিরুদ্ধে পুরুষতান্ত্রিক বিভিন্ন হিংসার ঘটনা ঘটে, যার বিরুদ্ধে ভিএস নিরলস সংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদান করেন।
তাঁর মুখ্যমন্ত্রীত্বের সময় কৃষি ক্ষেত্রের রাজনৈতিক-অর্থনীতিতে বিবিধ সৃজনশীল হস্তক্ষেপ ঘটে। কংগ্রেস সরকার দ্বারা যে উদারীকরণের নীতি শুরু করা হয়, যা বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারও চালিয়ে এসেছে, তার ফলে কেরালায় তীব্র কৃষি সংকট এবং বহু কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। ভিএস-এর নেতৃত্বে পরিচালিত বাম সরকার ঋণ মকুব কমিশন গঠন করে কৃষকদের জন্য, যার ফলে কৃষকদের ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। এই নীতি গোটা দেশে দৃষ্টান্তের সৃষ্টি করে এবং দেশের কৃষক আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান ও দাবিতে পরিণত হয়। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার ধান চাষকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতি চালু করে এবং দেশের মধ্যে সর্বাধিক সংগ্রহ মূল্যে চাষিদের থেকে ধান কেনে সরকার। সেই সময় অধ্যাপক প্রভাত পট্টনায়েক ছিলেন কেরালা রাজ্য যোজনা বোর্ডের ভাইস-চেয়ারম্যান, অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়েক ছিলেন কৃষি কমিটির সভাপতি, এবং সেই কমিটির সদস্য ছিলাম আমি, যারা কেন্দ্রীয় ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের থেকে ৪০০ টাকা প্রতি কুইন্টাল বেশি মূল্যে ধান কেনার সুপারিশ করে সরকারের কাছে। এই নীতি বর্তমান কেরালার বাম সরকারও চালু রেখেছে। যেখানে কেন্দ্রীয় ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ২,৩৬৯ টাকা প্রতি কুইন্টাল, সেখানে কেরালা সরকার চাষিদের ২,৮৩৯ টাকা প্রতি কুইন্টাল দাম দিচ্ছে। ভিএস-এর মুখ্যমন্ত্রীত্বে কেরালায় ধানের জন্য ব্যবহৃত জমি বা জলাজমির চরিত্র পরিবর্তন করা যাবে না বলে যেই আইন প্রণয়ন করা হয়, তা দেশের সামনে একটি বিকল্প নীতির মাইলফলক। তাঁর নেতৃত্বে গৃহীত প্রশাসনিক নীতি এবং তাঁর রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত লড়াই নবউদারবাদী নীতির দৈন্যকে বেপরদা করে। ভিএস সমবায়ের সংগঠনে আজীবন নিবেদিত ছিলেন। তাঁর জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি কৃষকদের উপর বৃহৎ পুঁজির শোষণের বিরুদ্ধে কীভাবে সমবায়কে নতুনভাবে সংগঠিত করে এই শোষণকে প্রতিহত করা যায়, তা নিয়ে লেখালেখি করেছেন।

তাঁর প্রয়াণে শ্রমজীবি মানুষ তাদের বিশ্বস্ত যোদ্ধাকে হারিয়েছেন। ভিএস-এর শূন্য স্থান পূরণ করা সহজ হবে না। তাঁর সঙ্গে আমার সুদীর্ঘ সম্পর্কের বহু স্মৃতি রয়েছে। শৈশবে তাঁর ভাষণ শুনে বড়ো হওয়া, তাঁর ভাষণের বক্তব্য ও স্টাইল আমাকে মুগ্ধ করত। আবার পরবর্তী সময় পার্টির ১৮-তম পার্টি কংগ্রেসে স্বেচ্ছাসেবক থাকার সময় তাঁকে কাছ থেকে দেখা, ২০০৬ সালের ওয়ানাড নির্বাচনের প্রচারে অংশগ্রহণ, কোঝিকোড পার্টি কংগ্রেস ও তার পরবর্তী পার্টি কংগ্রেসগুলিতে তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতা, এবং পরবর্তী কালে তাঁর সঙ্গেই পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য থাকা, আমার জীবনের সুখকর স্মৃতিগুলির অন্যতম হয়ে থাকবে। বহুবার তাঁর প্রতি আবালবৃদ্ধবণিতার ভালোবাসা আমি কাছ থেকে দেখেছি। বিশেষ করে তাঁর মৃত্যুর পরে তিন দিন ধরে বৃদ্ধ থেকে শিশু সবার উপচে পড়া ভালোবাসার যে নিদর্শন কেরালার রাস্তায় আমি দেখেছি, তা তুলনাহীন। তাঁকে পুন্নাপ্প্রা-ভ্যায়ালারের স্থলভূমিতে অগ্নিতে বিলীন হওয়ার সময় অবধি মানুষের আবেগ ছিল সীমাহীন। শ্রমজীবি মানুষের মুক্তির প্রতি ভিএস-এর দায়বদ্ধতা, কর্পোরেট, সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিস্ত শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর আপোসহীন সংগ্রাম সর্বদা আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। তাঁর মৃত্যুর পরে যেই স্লোগান কেরালার রাস্তায় ধ্বনিত হয়ে আকাশ-বাতাস মুখরিত করেছিল, তা অনুবাদ করলে হবে, “আমাদের চোখের মণি, আমাদের হৃদয় ভিএস! কে বলল তিনি মৃত? তিনি আমাদের মধ্যে জীবিত”। ভিএস-র উত্তরাধিকার অমর থাকবে।