আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৫ ● ১৬-৩১ শ্রাবণ, ১৪৩২
সমসাময়িক
অগ্রাধিকার
আমেরিকা তোলপাড়। খবরের কাগজের হেডলাইনগুলি শুধু একটি বিষয় নিয়ে। না, সেখানে গাজার অভুক্ত শিশুদের কথা নেই, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা চোখে পড়ে না।শুধু আছে ‘এপস্টাইন ফাইলস’ নিয়ে নালে-ঝোলে একাকার হওয়া হেডিং। ডোনাল্ড ট্রাম্প মহাশয় কখনও বলেছেন তাঁর নাম ‘এপস্টাইন ফাইলস’-এ থাকতেই পারে না, কখনও বলছেন ‘এপস্টাইন ফাইলস’-এ তার নাম কেউ ঢুকিয়ে দিতে পারে।
আপাত হাস্য ও অম্লরসের আড়ালে আমেরিকার নষ্টমতি জীবনের এক গল্প।
আসলে ‘এপস্টাইন ফাইলস’ শব্দটি কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসনকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এপস্টাইন হলেন দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক শিশু যৌন অপরাধী। অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে পতিতাবৃত্তি করিয়ে তিনি অর্থ উপার্জন করতেন। ২০০৮ সালে, ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর বাবা-মা ফ্লোরিডায় পুলিশকে জানায় যে এপস্টাইন তার পাম বিচের বাড়িতে তাদের মেয়েকে যৌন নির্যাতন করেছে৷ এগারো বছর পর, তার বিরুদ্ধে যৌনতার জন্য অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের একটি নেটওয়ার্ক চালানোর অভিযোগ আনা হয়। বিচারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় তিনি কারাগারে আত্মহত্যা করে মারা যান।
বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে, এপস্টাইন-এর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ফাইল সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। একটা অংশ অবশ্য এখনও গোপনীয় রয়েছে। 'ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এর মতে, এপস্টাইন-এর সঙ্গে সম্পর্কিত অপ্রকাশিত নথিতে ট্রাম্প-এর নামও রয়েছে। অবশ্য, ফাইলগুলিতে নাম থাকা অন্যায় কাজের প্রমাণ নয়।
১৯৯০ এবং ২০০০-এর দশকের গোড়ার দিকে ট্রাম্প এপস্টাইন-এর বন্ধু ছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময়ে তিনি বলেছিলেন, এই বিষয়ে তিনি আরও তথ্য জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করতে প্রস্তুত। কিন্তু এই মাসের শুরুতে তার অবস্থান পরিবর্তন করে বলেন, মামলাটি বন্ধ হয়ে গেছে। এপস্টাইনের তদন্তে যা এখনও পর্যন্ত জানা গেছে তাতে আরও স্বচ্ছতার জন্য রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর উপরে তার নিজস্ব রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে চাপ বাড়ছে।
পৃথিবীর অপর প্রান্তে ফিরে দেখা যাক। দেখা যাক গাজায় শিশুরা কী অবস্থায় আছে। নির্বাচনের সময়ে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি প্যালেস্টাইনের সঙ্গে ইজরায়েল-এর মধ্যস্থতা করে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করবেন। ওই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আসবে।
গাজা এখন খাদ্যহীন, পথ্যহীন। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ইজরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২৪ জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত, গাজা যুদ্ধে ৬১,৮০০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯,৮৬৬ জন ফিলিস্তিনি এবং ১,৯৮৩ জন ইজরায়েলি।
অকল্পনীয় ভয়াবহতার মধ্যে দিন যাপন করছে গাজা উপত্যকার শিশুরা। 'ইউনিসেফ' মে মাসে বলেছে ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর থেকে, ১,৩০৯ জন শিশু নিহত এবং ৩,৭৩৮ জন আহত হয়েছে। ২০২৫ সালে ৭৪টি অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর মধ্যে ৬৩টি জুলাই মাসে ঘটেছে - যার মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৪টি শিশু, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী একটি শিশু এবং ৩৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি ক্ষুধার্ত হয়ে মারা গেছেন।
অথচ এই সংকট এখনও প্রতিরোধযোগ্য। খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং মানবিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং দেরি করার ফলে অনেক জীবন নষ্ট হয়েছে। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থাগুলি এই সংকটের জন্য ইজরায়েল-এর ভূখণ্ডে সাহায্য অবরোধের জন্য দায়ী বলে জানিয়েছে। স্বভাবতই এই দায় আমেরিকারও থাকে। কারণ আমেরিকা প্রথমাবধি সাহায্য করে চলেছে ইজরায়েল-এর যুদ্ধবাজ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে। এই সংকটে হস্তক্ষেপ করার জন্য ট্রাম্প-এর উপরে চাপ বাড়ছে। তবে তাদের খবরের কাগজগুলি দেখে আমেরিকার অগ্রাধিকার কোথায় তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ান, ব্রিটেন, আরব দেশসমূহ, সর্বোপরি পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষ কি যথেষ্ট চাপ আমেরিকার উপরে দিতে পারবে? আগামীদিনের খবরের শিরোনামে কি মৃত্যুপথযাত্রী, পুষ্টিহীন অসহায় শিশুদের কথা উঠে আসবে?
নাকি দেখতে থাকব দ্বিপ্রহরে শিশুদের ক্ষুধার মিছিল!