আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৫ ● ১৬-৩১ শ্রাবণ, ১৪৩২

সমসাময়িক

দোষী কে?


জুলাই ১১, ২০০৬। পরপর বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল মুম্বাই শহর। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত লোকাল ট্রেনে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল জঙ্গিরা। ১৮৯ জন মানুষের মৃত্যু হয়, আহত হন ৮২৪ জন। স্বাভাবিকভাবেই গোটা দেশ সেদিন জঙ্গিদের শাস্তি চেয়ে সরব হয়েছিল। এমন ভয়ঙ্করভাবে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা যারা করে তাদের কঠোরতম শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু শাস্তি কি হল? নিহত মানুষ তথা আপামর মুম্বাইবাসী কি বিচার পেলেন?

মহারাষ্ট্রের বিশেষ আইন মকোকায় বিচার হয়েছিল ১৩ জন অভিযুক্তের। মকোকা আদালত ২০১৫ সালে ১২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে, তাদের মধ্যে পাঁচ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় এবং সাত জনের যাবজ্জীবন কারাবাসের। একজন ব্যক্তিকে নিরপরাধ বলে মুক্তি দেওয়া হয়। অনেকে ভেবেছিলেন যে বিচার হয়ে গেছে, দোষীরা শাস্তি পেয়ে গেছে। কিন্তু না।

২০২৫ সালের ২১ জুলাই মুম্বাই হাইকোর্ট জানিয়েছে যে, যেই ১২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে যে প্রমাণ দাখিল করা হয়েছিল, তা ভ্রান্ত। অতএব তাদের মুক্তি দিতে হবে। এই ১২ জনের মধ্যে ১ জন বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কোভিডের শিকার হয়ে প্রাণ হারায়। বাকি ১১ জন, ১৯ বছর জেল খাটার পরে মুক্তি পেয়েছে। একবার ভাবুন, আদালতের মতে এরা বিনা অপরাধে ১৯ বছর জেলে কাটিয়েছেন। এদের জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়, বন্ধুরা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। সমাজে মাথা নিচু করে এদের নিকটাত্মীদের বছরের পর বছর কাটাতে হয়েছে। কিন্তু তাদের অপরাধ প্রমাণিত করা যায়নি। এই মানুষগুলিকে এত বছর শাস্তি ভোগ করতে হল কেন? এর দায় কার? এই ব্যক্তিদের জীবন নষ্ট করে দেওয়ার দায় কার? দোষী কারা?

অবশ্যই এর দায় স্বীকার করতে হবে মহারাষ্ট্র সরকার তথা পুলিশকে। হাইকোর্টের মহামান্য বিচারপতিরা তাঁদের রায়ে বলেছেন যে আইনের শাসন প্রণয়ন করার জন্য কোনো অপরাধে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু অপরাধের কেসের সমাধান হয়ে গেছে, প্রকৃত দোষীরা ধরা পড়েছে, তাদের শাস্তি হয়েছে, এহেন মিথ্যা ধারণা মানুষকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে প্রকৃত দোষীরা ছাড়া পায়, এবং আইনের শাসন লঙ্ঘিত হয়। আমরা এর সঙ্গে বলতে চাই যে যাদের বিনা দোষে দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হল, তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।

কিন্তু হাইকোর্ট এই অভিযুক্তদের শাস্তি মকুব করল কোন যুক্তিতে? সরকার পক্ষ এই ব্যক্তিদের দোষী সাব্যস্ত করার জন্য মূলত দুটি প্রমাণের উপর নির্ভর করেছিল - প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং দোষীদের স্বীকারোক্তি। হাইকোর্টের বিচারপতিরা বলেন যে অভিযুক্তদের থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়, তাদের উপর অত্যাচার চালিয়ে। তাদের শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্ট প্রমাণ করে যে তাদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়। এমনকি, যদিও বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে তাদের স্বীকারোক্তি দেন, তাদের বয়ানের মধ্যে অদ্ভুত মিল ছিল, যা থাকা সম্ভব নয়। এমনকি, তাদের স্বীকারোক্তির মধ্যে ব্যাকরণগত ভুলগুলিও প্রায় একই ছিল। এছাড়াও এই স্বীকারোক্তি আদায় করার সময় বিধিবদ্ধ নিয়ম পালন করা হয়নি। অভিযুক্তদের জানানো হয়নি যে তারা উকিলের সাহায্য নিতে পারেন। স্বীকারোক্তির বয়ান অভিযুক্তদের পড়ে শুনিয়ে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি। অতএব, এই স্বীকারোক্তিগুলি আদালত গ্রহণযোগ্য প্রমাণ বলে মানেনি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের উপরেও আদালত ভরসা করতে পারেনি। আদালত বলে যে প্রত্যক্ষদর্শীরা পুলিশের কাছে আসে তিন থেকে চার মাস কেটে যাওয়ার পরে। এই সময়কাল অতিবাহিত হওয়ার পরে তাদের বক্তব্য যে নির্ভুল তার কোনো প্রমাণ পুলিশ আদালতে পেশ করতে পারেনি। বিশেষ করে যেই ট্যাক্সি ড্রাইভার-রা অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে গেছে বলে দাবি করে, তাদের স্বাক্ষ্য আদালত গ্রাহ্য করেনি, কারণ তারা প্রায় চার মাস পুলিশকে কিছু বলেনি। তারপরে এসে কয়েকজন মানুষকে মুম্বাইয়ের মতন শহরে নির্ভুলভাবে চেনা সম্ভব নয় বলে কোর্ট মনে করেছে।

এর সঙ্গে কোর্ট কিছু প্রথাগত ত্রুটির কথা তুলে ধরে যা এই কেসে ঘটেছে। যেকোনো অপরাধমূলক কাজকেই মকোকার আওতায় ফেলা যায় না। মকোকা আইনে যদি মামলা রুজু করতে হয় তাহলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে করতে হবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে পুলিশের যেই ঊর্ধ্বতন অফিসার অনুমতি দিয়েছিলেন, তিনি সমস্ত দলিল-দস্তাবেজ না দেখেই এই অনুমতি দেন। এমনকি অনুমতি প্রদান করার পরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিল তাঁর সামনে দাখিল করা হয়। এর ফলে আদালত মনে করে যে মকোকা আইনে মামলা রুজু করায় ত্রুটি থেকে গেছে।

আইনের ব্যাখ্যার দায় আদালতের এবং মুম্বাই হাইকোর্ট অভিযুক্তদের রেহাই দিয়ে এই বার্তাই দিতে চেয়েছে, অপরাধ যতই ভয়াবহ হোক, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার দায় সরকারের। এই প্রক্রিয়ায় যদি গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি এবং সন্দেহ থাকে তাহলে অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস করাই দস্তুর। কিন্তু আমাদের আদালত ও আইনের বাইরে বেরিয়ে কিছু কথা বলতেই হবে। আমাদের দেশে বিগত কয়েক বছর ধরে যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত চলছে তার প্রতিফলন কি আমাদের বিচার প্রক্রিয়াতেও ঘটছে? এই প্রশ্ন এই কারণে ওঠে যে যেই সমস্ত ব্যক্তিকে এত বছর পুলিশ আটক করে রাখল, তারা সবাই মুসলমান। এমন একটি কথা বাজারে রটিয়ে দেওয়া হয়েছে যে উগ্রপন্থী মানেই মুসলমান। অতএব উগ্রপন্থী আক্রমণ হলে যদি কিছু মুসলমানকে আটক করে জেলে রেখে দেওয়া যায়, তাহলে কঠিন প্রশ্নগুলি তোলার লোক কমে যাবে। লোকে ভাববে, যেহেতু অভিযুক্তরা মুসলমান, অতএব হয়ত পুলিশ সঠিক লোকদেরই গ্রেপ্তার করেছে। এই পূর্বধারণার বশবর্তী হয়ে পুলিশ তথা সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজেই মুসলমানদের অভিযুক্ত করতে বেশি সমস্যা হয় না। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায় তারা যখন ছাড়া পায়, ততদিনে তাদের জীবন প্রায় ধ্বংস। কিন্তু যারা এদের জেলে পাঠালো, যারা এদের উপর জেলের ভিতরে অত্যাচার করল, তাদের শাস্তি কে দেবে? তাদের দোষ কোন আদালতে প্রমাণিত হবে? আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়, যদি এই ১২ জন দোষী নয়, তাহলে মুম্বাই ট্রেন বিস্ফোরণ ঘটালো কারা? তাদের শাস্তি হবে কবে?

ইতিমধ্যে মহারাষ্ট্র সরকার মু্ম্বাই হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট অভিযুক্তদের মুক্তি দেওয়া থেকে আটকাতে রাজি হয়নি। কাজেই অভিযুক্তরা এখন স্বাধীন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন যে এই মামলার রায় মকোকা-র অন্তর্গত অন্য কোনো মামলায় প্রভাব ফেলবে না। আমরা সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার অন্তিম রায়ের দিকে তাকিয়ে থাকব। আশা রাখব প্রকৃত বিচার হবে। নিরপরাধীর শাস্তি না হয়ে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি হবে।

শেষে আমরা কুর্নিশ জানাই সেইসব উকিলদের যারা তাদের পেশাগত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ন্যায়ের প্রশ্নে অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। দিল্লি হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি এই মামলায় অভিযুক্তদের পক্ষে উকিলের পোশাকে অবতীর্ণ হন। সত্যের পক্ষে তথা ন্যায়ের পক্ষে এখনও মানুষ নিবেদিত হয়ে লড়াই করতে পারেন, এই ভরসা তারা আমাদের দিয়েছেন।