আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৫ ● ১৬-৩১ শ্রাবণ, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
ভাষা নয়, আক্রান্ত বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমজীবী
দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষত কেন্দ্রের শাসকদলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে যে সব রাজ্যের প্রশাসন, সেখানে সম্প্রতি বাংলাভাষী শ্রমজীবীদের খামোখা হেনস্থা-হয়রানি করা হচ্ছে। প্রশাসন এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি প্রায় সমান্তরাল ভাবে এহেন আক্রমণ হেনে চলেছে। আক্রান্তরা মুসলমান সম্প্রদায়ের হলে তো সোনায় সোহাগা।
সংগঠিত ক্ষেত্রের বাংলাভাষী স্থায়ী কর্মী আক্রান্ত নয়। শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অধ্যাপক বাদ। বিভিন্ন পেশায় জড়িত মানুষও আক্রান্ত হননি। কয়েক প্রজন্ম ধরে প্রবাসী বাংলাভাষীর অসুবিধা নেই। মূল লক্ষ্য - কায়িক শ্রম যাদের একমাত্র সম্বল, সেইসব খেটে খাওয়া পরিযায়ী মানুষ।
ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব এখনও ঠিকানা দিয়ে নির্ধারিত হয়। অথচ আজকের অর্থনীতিতে মানুষকে কাজের খোঁজে আন্তঃরাজ্য গমন করতেই হয়। সস্তায় থাকার জায়গা নেই, সরকারি বাসগৃহ নেই, ফলে বস্তিতে থাকতে হয়। স্বভাবতই অস্থায়ী পরিযায়ী শ্রমিক ফাঁকা জায়গা পেলেই কোনওমতে ঝুপড়ি-ঝুগ্গি গড়ে তুলে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে নেয়। বেছে বেছে সেইসব ঝুপড়ি-ঝুগ্গিতেই আক্রমণ চালানো হচ্ছে। হয়রানির সঙ্গে বাক্স-বোঁচকা বেঁধে চলে যাওয়ার নির্দেশ ঘোষণা করা হচ্ছে। বস্তি উচ্ছেদের ফলে একই সঙ্গে জমির দখলও হয়ে যাচ্ছে। পুলিশি হয়রানি, অবৈধতার অপবাদ, ঠিকাদারের শোষণ - সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তা।
সরকারি পরিচয়পত্র দেখালেও মুক্তি নেই। স্পষ্ট ভাষায় বলে দেওয়া হচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গের সব নথি জাল। রাজ্যের কী সুনাম বহির্বঙ্গে তৈরি হয়েছে! দিনমজুরি খাটা সাময়িক সময়ের দরিদ্র পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিচয় অনুসন্ধান করে সন্তুষ্ট না হলে তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন হয় পশ্চিমবঙ্গে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে নয়তো সরাসরি বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বিএসএফের হাতে তুলে দিচ্ছে। বিএসএফের জওয়ানরা তাদের ধাক্কা দিয়ে সীমানা পার করে দিচ্ছে। পে-লোডারে চড়িয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ছুঁড়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। অথচ প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে এখনও পর্যন্ত যারা ছাড়া পেয়েছে তারা প্রত্যেকেই ভারতবর্ষের বৈধ নাগরিক।
কেন্দ্রের শাসকদলের মতে যে সব বাংলাভাষীকে পাকড়াও করা হচ্ছে তারা সকলেই বাংলাদেশি। এবং অনুপ্রবেশকারী। অথবা রোহিঙ্গা। সম্ভবত আসাম, ওডিশা, দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ইত্যাদি এলাকার পুলিশের ধারণা বাংলাভাষী মানেই বাংলাদেশি। তা বলে রোহিঙ্গা? রোহিঙ্গারা কি বাংলাভাষী? সৈয়দ মুজতবা আলীর অনুকরণে বলা যায় - খোদায় মালুম।
এই আবহে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে তীব্র ভাবে প্রচারিত হচ্ছে যে বাংলা হল বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। কাজেই এই ভাষায় যারা কথা বলে তারা বিদেশি। এবং ভারতে যারা এই ভাষায় কথা বলে তারা অনুপ্রবেশকারী। একবারের জন্যও বলা হচ্ছে না যে ইংরেজি, হিন্দির মতো বাংলাও ভারতের সংবিধান স্বীকৃত বাইশটি ভাষার অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা। নবীন প্রজন্ম এই ভুল ধারণা নিয়ে বড়ো হবে। এবং পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রতি আরও অনেক বেশি বৈরি মনোভাব সৃষ্টি হবে। ফলে বিভাজনের রাস্তায় আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হবে।
ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই বাঙালি আছে। আজ নয়, দু’শো বছরের বেশি সময় ধরে বহু বাঙালির প্রবাসে বসবাস। সেই ১৭২৭-এ বিদ্যধর ভট্টাচার্যর পরিকল্পনায় নির্মিত হয়েছিল রাজস্থানের জয়পুর শহর। স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে - অনেক রাজ্যেরই ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা, স্থাপত্য, প্রশাসন ইত্যাদি বাঙালিদের হাতেই তৈরি। ২০১১-র জনশুমারিতে দেখা যায়, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বাঙালি আছে ১,০৮,৪৩১ জন, আসামে ৮৭,৮৬,৮২৭ জন, ওডিশায় সংখ্যাটি ৫,০৪,৪৪৩, মহারাষ্ট্রে ৪,৪১,৪৪৪৯, দিল্লিতে ২,১৫,৮১৮, গুজরাতে ৭৯,৬২৬, বিহারে ৮,০৭,৭৪৩, ঝাড়খণ্ডে ৩২,১২,৮৩১, মধ্যপ্রদেশে ১,০৮,২১৫ ইত্যাদি ইত্যাদি। এবার প্রশ্ন - এইসব রাজ্যের বাঙালিদের সংবিধান-প্রদত্ত অধিকার কতটা সুরক্ষিত?
দেশভাগের পর যখন ভারতের প্রশাসন কীভাবে চলবে তার বিধি প্রণীত হচ্ছে, সংবিধান প্রণয়নের জন্য আলোচনা চলছে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে, তখন এই আন্তঃরাজ্য সংখ্যালঘুদের (মাইনরিটি) অধিকার, সামাজিক পরিচিতি ইত্যাদি বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছিল সেটা একবার দেখে নেওয়া যাক। সংবিধানের ২৯ ও ৩০ অনুচ্ছেদে 'মাইনরিটি' শব্দটা কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, ড. বি. আর, আম্বেদকর তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উদাহরণ দিয়ে যা বলেছিলেন, তার সারার্থ এই যে -'মাইনরিটি' শব্দটি এখানে 'টেকনিক্যালি' ব্যবহৃত হয়নি, বৃহত্তর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন কিছু রাজস্থানবাসী যদি বাংলায় গিয়ে কাজকর্ম করেন তাহলে তাঁরা দেশীয় স্তরে মাইনরিটি না হলেও ওই রাজ্যস্তরে মাইনরিটি। তাঁরা তাঁদের নিজেদের রাজ্যে বিভিন্ন সামাজিক কারণে, যেমন বিয়ে বা অন্যান্য ব্যক্তিগত কারণে যাতায়াতও করেন। অতএব তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে সুরক্ষা দেওয়ার সাংবিধানিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মানে যেখানে তিনি কর্মসূত্র বা অন্য কারণে থাকছেন। কালক্রমে আমরা দেখছি যে, বিভিন্ন রাজ্যের মানুষজনকে বিভিন্ন কারণে যেমন শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি ইত্যাদি সূত্রে অন্য রাজ্যে থাকতেই হয়। এবার এই বিষয়গুলোর একটা নির্দিষ্ট সময়কাল পেরিয়ে যাওয়ার-পরও তাঁরা ওই ভিনরাজ্যেই থেকে যেতে পারেন অথবা ফিরেও আসতেও পারেন। এতদিন ধরে এই ভারসাম্য বজায় রেখেই সময় এগিয়ে চলেছে।
সংবিধান প্রণেতারা খেয়াল করেননি যে স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরে যখন ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন দেখানো হবে তখনও দেশের অন্তত ১৪-১৫ কোটি মানুষ রুটিরুজির সন্ধানে ভিন রাজ্যে - কখনও ভিন দেশে - অধিকারহীন, নিরাপত্তাহীন, পরিচয়হীন অবস্থায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হবে। 'পরিযায়ী' শ্রমিক শব্দের সঙ্গে সংবিধান প্রণেতাদের পরিচয় ছিল কি? বাস্তব অভিজ্ঞতা খেয়াল করে ১৯৭৯ সালে 'Inter-State Migrant Workmen (Regulation of Employment and Conditions of Service) Act' প্রবর্তিত হয়, উদ্দেশ্য ছিল পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষা, অধিকার ও মজুরি নিশ্চিত করা হবে। অথচ, বাস্তব পরিস্থিতি প্রমাণ করে দিয়েছে - এই আইন শুধুই কথার কথা। এর প্রকৃত প্রয়োগ বা নজরদারি আজও অধরা।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে ‘বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিক’দের উপর আক্রমণ আচমকা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে একটি ‘সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি’ জারি হয় - তাতে সরাসরি না বলা হলেও কার্যত নির্দেশ ছিল, “বাংলাভাষী শ্রমিকদের প্রতি অতিরিক্ত নজরদারি রাখা হোক, তারা ‘অনুপ্রবেশকারী’ হতে পারে”। এই একটি নির্দেশ দেশজুড়ে বিশেষত হিন্দুত্ববাদী শাসিত রাজ্যগুলিতে ‘বাংলায় কথা বলা মানেই বাংলাদেশি, আর বাংলাদেশি মানেই সন্দেহভাজন’ - এই বহু পুরোনো অপবাদকে ফের রাষ্ট্রীয় সিলমোহর দেওয়ার প্রচেষ্টা। এই বিজ্ঞপ্তিকে হাতিয়ার করে বাংলাভাষীদের 'বাংলাদেশি', 'রোহিঙ্গা' অজুহাতে আটক, নির্যাতন, দেশছাড়া করার অভিযোগ ওঠে। এমনকি সীমান্তে বিএসএফ দিয়ে ‘পুশব্যাক’ পর্যন্ত! বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স সীমান্তে নজরদারি রাখে দেশের নিরাপত্তার জন্য - কিন্তু নিজ দেশের নাগরিকদেরকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করার নজির আন্তর্জাতিক আইনে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সীমান্তের গ্রামে কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়া বহু শ্রমিককে সীমান্ত চৌকিতে বিএসএফ আটক করছে, ‘বাংলাদেশি’ অপবাদে গোপনে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিচ্ছে - যারা ফিরছে, তারা নির্যাতিত হয়ে ফিরে আসছে।
আরও ভয়ঙ্কর অভিযোগ আসছে - রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এই নির্দেশ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কোনও প্রতিবাদ করেননি। রাজ্যের শাসকদলের এই নীরবতা কি কেন্দ্রের সঙ্গে কোনও গোপন সমঝোতা? না কি ‘বাংলা ও বাঙালির অধিকার’ শুধুই রাজনৈতিক স্লোগান?
এই পরিসরে রাজ্যের শাসকদল ‘বাংলা ভাষা আক্রান্ত’ বলে সপ্তম সুরে স্লোগান হাঁকছে। বাংলা ভাষা নয়, বাঙালিও নয়, আক্রান্ত হচ্ছে ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া দিনমজুরিতে কাজ করা পরিযায়ী শ্রমজীবী বাংলাভাষী মানুষ। কেন এই সত্যকে প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা হচ্ছে না? বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে হঠাৎ করে এমন বাংলা প্রীতি কেন উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে? একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হয় কেন্দ্রের শাসকদলই বা এই সময়ে কেন এমন কীর্তিকলাপ শুরু করে ঝুঁকি নিতে গেল?
প্রশ্নগুলোকে কিঞ্চিত সরলীকরণ করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদল যৌথভাবে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দেশজুড়ে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের নির্যাতন করা হবে আর তাকে পুঁজি করে সহনাভূতি কুড়োতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে তাঁর দলের লোকজন রাস্তায় নামবে। উচ্চকণ্ঠে বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলনে রাজ্যবাসীকে এগিয়ে আসতে বলা হবে। প্রকারান্তরে এই ধরনের আন্দোলন বিভাজনের রাজনীতি অর্থাৎ ধর্ম, ভাষা ও পরিচিতি ভিত্তিক জোটবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা প্রকট করে তুলবে। কেন্দ্রের শাসকদল মেরুকরণের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। কাজেই নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য এমনটাই চলবে বলে অনুমান করা যায়।
বহুল প্রচারিত গুজরাট মডেল, ডাবল ইঞ্জিন সরকার, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্বচ্ছ ভারত, সবকা সাথ সবকা বিকাশ এইসবে আর মানুষকে ভোলানো যাচ্ছে না। পক্ষান্তরে উন্নয়ন মন্ত্র, সততার প্রতীক, বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট-ইশকুল-হাসপাতাল মানুষ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। এমনকি সাদা-নীল রঙও গেছে মিলিয়ে। সরকারি অর্থে জগন্নাথ ধাম প্রতিষ্ঠা করে ধর্মের ভেক ধরেও জল গলছে না। সবমিলিয়ে মানুষ এদের অপদার্থতা আর অন্যায় নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝছে। গত দেড় দশকের কুকীর্তি-দুর্নীতি এবং প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার দাপটে রাজ্যের শাসকদলের অবস্থা কোনঠাসা। কাজেই ক্ষমতা রক্ষার তাগিদে এমন একটা আকস্মিক সুযোগ হাতছাড়া করা মোটেই সঙ্গত নয়। রাজ্যের সাধারণ মানুষকে কি এই ভাঁওতা দিয়ে ভুলিয়ে রাখা যাবে?