আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৫ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

ধ্বংসস্তূপের নিচে, আমরা খুঁজি একটি গাছের স্মৃতি

গৌতম সরকার


মোসাব আবু তোহা একজন লেখক ও কবি, যাঁর শৈশব ও যৌবনের একটা বড় সময় কেটেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যালেস্তাইনের গাজা উপত্যকায়। ছোটবেলা থেকেই যুদ্ধ, সহিংসতা, ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন। বড় হয়ে তিনি সৈনিক হতে পারেননি, তাই সাহিত্যকে হাতিয়ার করে যুদ্ধ ও হিংসার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি তাঁর লেখার মধ্যে একাধারে মানুষের দুর্দশার বর্ণনা করেছেন, আবার সেই ধ্বংসের মধ্যে থেকে মানুষকে নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রেরণা যুগিয়েছেন। মানুষের কথা বলতে বলতে কখন যেন তাঁর কবিতা ও লেখাগুলো গাজার মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। এক জায়গায় তিনি লিখছেন,

"আমার জন্ম একটি শরণার্থী শিবিরে। কারণ, আমার মা-বাবা উদ্বাস্তু হয়ে ওই শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে এখন আমরা নিজের বাড়িতে থাকলেও সেটা যেন একটা কারাগার। কোনো জানালা নেই, দরজা নেই, কেবল অনাহূত অতিথির মতো আছে বোমার ধোঁয়া। এখানে ধ্বংসস্তূপের নীচে কাঁদছে মানবতা"।

এটা শুধু তাঁর নিজের নয়, তামাম গাজাবাসীর কথা। মানুষের দুর্দশা নিয়ে নিয়মিত লিখে গেছেন 'দ্য নেশন', 'লিটারারি হাব', 'দ্য নিউইয়র্ক টাইমস', 'দ্য নিউ ইয়র্কার'-এর মতো প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্রে।

বত্রিশ বছর বয়স্ক ফিলিস্তিনি কবি ও সাহিত্যিক মোসাব আবু তোহা গাজা যুদ্ধের উপর লেখা প্রবন্ধের জন্য ২০২৫ সালে 'কমেন্টারি' বিভাগে 'পুলিৎজার' পুরস্কার পেয়েছেন। বিচারকমণ্ডলীর কথায়, "গভীর অনুসন্ধান এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণার মিশ্রণে আবু তোহার লেখা যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি অভিজ্ঞতাকে জীবন্ত করে তুলেছে"। 'নিউইয়র্ক টাইমস' বলেছে, "কাব্যজগতে ব্যাতিক্রমী প্রতিভাধর আবু তোহার আবির্ভাবে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের সাথে রাজনৈতিক সহিংসতার বৈপরীত্য দৃশ্যমান হয়ে উঠতে শুরু করেছে"। ‘ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল’-এর পক্ষে বলা হয়েছে, "আবু তোহার কবিতার অনুরণন পাঠককে দৃঢ় হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর চারপাশের মানুষগুলোর দুর্দশা ও বিপর্যয় তিনি নিপুণ চিত্রশিল্পীর মতো শব্দের সমাহারে ফুটিয়ে তুলেছেন"। পুরস্কার পাওয়ার খবরে আবু তোহার প্রতিক্রিয়া, "এ অর্জন এক আশার হোক, হোক এক গল্পের শুরু"। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ইজরায়েলি হামলায় নিহত হন ফিলিস্তিনি কবি রিফাত আলারি। তাঁকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানাতেই এই স্বীকারোক্তি। আলারির শেষ কবিতার শিরোনাম ছিল, 'ইফ আই মাস্ট ডাই, লেট ইট বা আ টেল', ভাষান্তরে 'যদি আমাকে মরতে হয়, তবে তা যেন এক গল্প হয়'।

যুদ্ধ চিরকাল সাধারণ মানুষের জীবনে সর্বনাশ ও দুর্দশা ডেকে এনেছে। হতাশ কবি একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, "গত এক বছরে আমি আমার স্মৃতির অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছি যেগুলিকে স্পর্শ করা যেত - মানুষ, জায়গা, বস্তু, যেগুলো আমাকে অনেককিছু মনে রাখতে সাহায্য করত। আমি এখন ভালো স্মৃতি তৈরি করতে সংগ্রাম করছি, গাজার প্রতিটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ি এখন একটি অ্যালবামের মতো, যেখানে ছবির বদলে মৃত মানুষেরা পাতায় পাতায় চাপা পড়ে আছে"।

আবু তোহার শৈশব কেটেছে এমন এক জায়গায় যেখানে বোমার শব্দে ঘুম ভাঙে আবার ড্রোনের ওড়াউড়ি এবং মিসাইলের গর্জন শুনতে শুনতে মানুষ ঘুমোতে যায়। যুদ্ধ, হত্যা, রক্ত, একটুকরো রুটির জন্য আধখোলা দোকানের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা ছিল নিত্যসঙ্গী। এর মধ্যে বহু প্রতিকূলতার মধ্যে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন। সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা এবং ফিলিস্তিনি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ তৈরি করতে ২০১৭ সালে নিজ উদ্যোগে গাজা উপত্যকায় ‘বেইত লাহিয়া’ শহরে প্রথম ইংরেজি ভাষার গ্রন্থের 'এডওয়ার্ড সাঈদ লাইব্রেরি' প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে 'স্কলার অ্যাট রিস্ক' ফেলোশিপ নিয়ে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং স্কলার হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি কায়রোর আমেরিকান ইউনিভার্সিটির একজন ইন্সট্রাক্টর ও আবাসিক লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আবু তোহার প্রথম কবিতার বই, 'Things You May Find in My Ear' 'প্যালেস্তাইন বুক অ্যাওয়ার্ড' এবং 'আমেরিকান বুক অ্যাওয়ার্ড' জিতেছে। এছাড়াও বইটি ‘ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘ওয়ালকট পোয়েট্রি পুরস্কার'-এর চূড়ান্ত পর্বের জন্য মনোনীত হয়েছিল। তাঁর লেখা কবিতায় একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের আর্তনাদ শুনতে পাওয়া যায়, অন্যদিকে শোনা যায় ধ্বংসের মধ্যেও বেঁচে থাকার আশ্বাসবাণী। আপনজনদের রক্তে ভেজা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর লেখনীতে যে শব্দজগৎ সৃষ্টি করেন, সেখানে প্রতিরোধের জেহাদের সাথে নতুন করে বাঁচার স্বপ্নের কথাও বলা থাকে। এক জায়গায় তিনি বলেছিলেন, "কবিতা এমন একটি ভাষা, যা আমাদের ক্ষত এবং যন্ত্রণার চিত্র তুলে ধরতে পারে। কিন্তু তা থেকেও একটা মুক্তির পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করে"। তাই মোসাব আবুর কবিতা নিছক ক্ষোভ প্রকাশের নয়, এটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি শুধু ফিলিস্তিনি মানুষদের সংকটের কথা বলেন না, যুদ্ধবিধ্বস্ত তামাম মানুষের শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্মাণের কথাও বলেন। তাঁর প্রথম কবিতার বইয়ের একটি কবিতায় লিখেছেন, "আমি স্বপ্ন দেখি একটি আকাশের/ যেখানে ড্রোন নেই/ একটি আকাশ, যেখানে শিশুরা মেঘ আঁকে/ বোমার ভয় থেকে পালায় না"।

এই সংকলনের শীর্ষক কবিতায় কবির আর্তি,

"যখন আপনি আমার কান খুলতে যাবেন,
আলতোভাবে তা স্পর্শ করবেন,
কারণ আমার মায়ের কন্ঠ ভেতরে কোথাও লেগে আছে,
কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে গিয়ে যখন আমার মাথা ঘুরে ওঠে
তখন সেই কন্ঠ আমাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
আপনি আচমকা মুখোমুখি হতে পারেন আরবি গানের ইংরেজি কবিতায়,
যা আমি আবৃত্তি করে নিজেকেই শোনাতাম
অথবা আমাদের বাড়ির উঠোনে
পাখিদের কিচিরমিচিরের সঙ্গে গলা মেলানো একটি গান।
আপনি যখন কাটা জায়গা সেলাই করবেন
তখন এইসব জিনিস আমার কানে তুলে রাখতে ভুলবেন না
আগের মতো সেগুলোকে একটার পর একটা রাখুন
যেভাবে আপনার বইয়ের তাক সাজান।
"

মোসাবের কবিতাগুলো ধ্বংসের মধ্যে জীবনের গল্প শোনায়। তাঁর কবিতাগুলোকে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়, একটি হল 'ধ্বংসের যন্ত্রণা' এবং অন্যটি 'বাঁচার স্বপ্ন'। মানুষের প্রত্যাশা ও দৃঢ় প্রতিরোধের বার্তা দিয়েছেন আরেকটি কবিতায়, "ধ্বংসস্তূপের নিচে আমি একটি নোটবুক খুঁজে পেলাম/ এটি একটি বালকের/ যে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখত/ ধ্বংসস্তূপ তার স্বপ্নকে চাপা দিতে পারেনি।"

আবার সন্তান হারানো বাবার কান্না উঠে এসেছে,

"একজন বাবা রাতে ঘুম থেকে উঠে
তার চার বছরের মেয়ের দেয়ালে আঁকা
এলোমেলো রং দেখতে পান,
রংগুলো প্রায় চার ফুট উঁচু।
পরের বছর পাঁচ ফুট হবে।
কিন্তু চিত্রকরটি বিমান হামলায় মারা গেছে।
আর কোনও রং নেই।
কোনও দেয়াল নেই।
"

একইরকম আর্তি ফুটে উঠেছে,

"আমার শহরের রাস্তাগুলোর নাম নেই,
যদি কোনো ফিলিস্তিনি নিহত হয়
স্নাইপারের গুলিতে বা ড্রোন হামলায়
আমরা তখন তার নামে সড়কের নাম রাখি।
"

আরেকটি কবিতায় হতাশা-যন্ত্রণা মিলেমিশে এক হয়ে গেছে,

"আমাদের শিশুরা সবচেয়ে ভালো গুনতে শেখে
ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি বা স্কুলের সংখ্যা গুনতে গিয়ে
কত মা-বাবা হতাহত হলো বা জেলে গেল
সেই হিসাব রাখতে গিয়ে।
"

৭ অক্টোবর, ২০২৩ তারিখে ফিলিস্তিনি জঙ্গিরা ইসরায়েল আক্রমণ করে, দু-পক্ষের মোট ১,১৪৩ জন নিহত হয়, যার বেশিরভাগই বেসামরিক ফিলিস্তিনি নাগরিক। এর ফলশ্রুতিতে গাজা যুদ্ধ শুরু হয়। ইজরায়েল গাজা উপত্যকায় হামলা চালাতে থাকে, সরকারি হিসাবমতে এই হামলায় ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত ৪৩,০০০-এরও বেশি গাজাবাসী নিহত হয়েছে। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা, মৃত্যুর বিভৎসতা সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন মোসাব আবু তোহা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইজরায়েলি সেনা যেদিন তাঁকে আটক করে, সেইদিনই 'নিউ ইয়র্কার'-এ তাঁর একটা লেখা প্রকাশিত হয়, শিরোনাম ছিল 'দ্য ভিউ ফ্রম মাই উইন্ডো'। বোমা পড়ার ভয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বের হন শরণার্থী শিবিরের উদ্দেশ্যে। অনেকটা এগিয়েও আবার সাইকেল ঘুরিয়ে ফিরে আসেন ক'দিন আগে পরিবারের জন্য কেনা কয়েকটা রুটি নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ফেরা আর হলনা, তার আগেই বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেছে সবকিছু। সেই যন্ত্রণা ও আর্তির কথাই ফুটে উঠেছিল উক্ত লেখায়। 'আল জাজিরা'কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁর অসহায়তা ও গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেছেন, "কল্পনা করুন, একসময় আপনি আপনার বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গাজার একটা স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু আপনি কাউকে রক্ষা করতে পারছেন না। আর এখন আপনি স্বজনদের ছেড়ে বহু দূরে একটা দেশে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) রয়েছেন, যে দেশটি এই গণহত্যার পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এটি খুবই হৃদয় বিদারক।" এখানেও তিনি বিপদের মধ্যে আছেন। সম্প্রতি দেশটির কিছু উগ্র দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে বংশ পরম্পরায় ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধ ও সহিংসতার বলি হয়ে চলেছে। এক ফিলিস্তিনি নারী কবি ও ঔপন্যাসিক হেবা আবু নাদা সেই যন্ত্রণার কথা এক জায়গায় লিখেছিলেন, "রকেটের আলো ছাড়া গাজা অন্ধকার/বোমার শব্দ ছাড়া গাজা নীরব/ প্রার্থনা ছাড়া আর সবকিছুই ভয়ংকর/ শহীদের আলো ছাড়া সবকিছুই কালো/ শুভরাত্রি গাজা!" গত ২০ অক্টোবর, ২০২৩ ইজরায়েলি বিমান হানায় সেই নারী কবির কন্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। এভাবেই মাহমুদ দারবিশ, গাসান কানাফানি, মোসাব আবু তোহা, হেবা আবু নাদার মত তাঁদের শব্দ ও ভাষা দিয়ে মানুষের যন্ত্রণা, ধিক্কার ও প্রতিবাদের কথা লিখে গেছেন, আর আবু তোহা বাদে বাকিদের ভবিতব্য একেবারেই আলাদা কিছু হয়নি। বছরের পর বছর মাহমুদ দারবিশকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়, আর কানাফানিকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছিল। তাই হয়তো আবু তোহার কলমে উঠে আসে, "আমিও কি কোনোদিন তাহলে খবরের একজন সংখ্যা হয়ে যাবো?"

আবু তোহার কবিতায় অবরুদ্ধ জীবনের প্রতি ক্ষোভ থাকলেও, তা কখনও সহিংসতায় পর্যবসিত হয়নি। তাঁর সমস্ত লেখা ও কবিতায় মিশে আছে মানবতার গভীর আকুতি, যেটা জীবনকে ভালবাসতে শেখায়। তিনি লিখছেন, "ধ্বংসস্তূপের নিচে, আমরা খুঁজি/ একটি গাছের স্মৃতি।" কোথাও আবার লিখেছেন, "আমরা যারা রাস্তায় হাঁটছি/ তারা কখনোই শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যাবো না/ আমাদের পদধ্বনি এখনও প্রজন্মের পর প্রজন্ম/ আমাদের যুদ্ধের কাহিনী বলে যাবে।" তাঁর কবিতা শুধু ধ্বংসের নয়, প্রতিশ্রুতিময় জীবনের কথাও বলে। কবিতার ভাষা সরল, কিন্তু ব্যাপ্তিতে গভীর, যেখানে ছত্রে ছত্রে অস্থিরতা এবং আশ্বাসের দ্বন্দ্ব চলতে থাকে, পাঠক খুঁজে পায় হতাশার মধ্যে বিশ্বাসের জোর। তাই তিনি সহজেই বলতে পারেন,

"ছাইয়ের মধ্যেও/ একটি ফুল ফুটতে পারে/ সবচেয়ে অন্ধকার রাতেও/ একটি মোমবাতি জ্বলে উঠতে পারে।"

প্রেম এসেছে তাঁর কবিতায়, সেই সঙ্গে প্রেমের আর্তনাদ,

"আমি প্রতিদিন গোরস্তানে যাই
বৃথাই খুঁজে ফিরি তোমার কবরখানা
তোমাকে কি সত্যিই তারা কবর দিয়েছিল?
নাকি তুমি একটি গাছ হয়ে গিয়েছ
নাকি কোনো পাখির সঙ্গে কোথাও উড়ে গিয়েছ তুমি!"

তাঁর সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থের নাম 'অরণ্যের শব্দ', সেখানেও সংকলন জুড়ে রয়েছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস, হতাশা আর প্রতিজ্ঞা। একটি কবিতায় লিখছেন,

"যখন আমরা মারা যাই,
তখন আমাদের আত্মারা
দেহ ছেড়ে চলে যায়, আমাদের
শোবার ঘরে যা কিছু তারা পছন্দ করত
তা সাথে করে নিয়ে যায়;
সুগন্ধির বোতল, মেক আপ, নেকলেস এবং কলম
গাজায়, আমাদের দেহ এবং ঘরগুলি ভেঙে যায়।
আত্মার জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
এমনকি আমাদের আত্মাও,
তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে ধ্বংসস্তূপের
নিচে আটকে থাকে।
"

আরেকটি কবিতায় যুদ্ধ মানুষের জীবন নিয়ে কতটা ছিনিমিনি খেলতে পারে, সেটি ফুটে উঠেছে,

"সে তার বাচ্চাদের জন্য রুটি কিনতে ঘর থেকে বেরিয়েছিল,
তার মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছেছে,
কিন্তু রুটি নেই!
রুটি নেই।
মৃত্যু বাচ্চাদের, বাকিদের খেতে বসেছে
টেবিলের প্রয়োজন নেই, রুটির প্রয়োজন নেই।
"

আবু তোহার জীবন ও সাহিত্য আমাদের শিখিয়েছে, যুদ্ধ বা সংগ্রাম মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। ধ্বংসের মধ্যেও সৃষ্টির আলো খুঁজে নিতে হবে। তাঁর কবিতাগুলো ধ্বংসাবশেষের মধ্যে থেকে স্বপ্ন খুঁজে নিয়ে আসে, সে স্বপ্ন শুধু ফিলিস্তিনিদের নয় সমস্ত শোষিত মানুষকে বাঁচার প্রেরণা যোগায়, জীবনকে ভালবাসতে শেখায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, কলমও কখনও কখনও তরবারি, বেয়নেট, বন্দুকের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।