আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৫ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
রাজনৈতিক হিংসার উৎপাদন ও রূপান্তরঃ একটি নৃবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান
সুমন নাথ
ভূমিকা
পশ্চিমবঙ্গ, তার রাজনৈতিক ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য যেমন বিখ্যাত, তেমনি এটি এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক হিংসার জায়গা হিসেবেও দেশে ও বিদেশের জনমানসে জায়গা করে নিচ্ছে। এই হিংসা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপে দেখা দিয়েছে - মাওবাদী সন্ত্রাস, দলীয় সংঘর্ষ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, এমনকি অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবেও হিংসা ব্যবহৃত হয়েছে। এই প্রবন্ধে ২০০৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত একটি বহু-স্থানভিত্তিক, বহু-বছরব্যাপী ethnographic গবেষণার ভিত্তিতে আমরা বুঝতে চেষ্টা করব রাজনৈতিক হিংসার রূপান্তর কীভাবে ঘটে, কে বা কারা এই হিংসার এজেন্ট এবং কেন এই হিংসা একটি প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র ধারণ করেছে।
অংশ ১: জঙ্গলমহলের অস্থিরতা ও GSRB-এর উত্থান
২০০৮ সালের শালবনি বিস্ফোরণের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কড়া এবং কিছুটা তাৎক্ষণিক। পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি শাসকদল সিপিআই(এম) স্থানীয় দলীয় কর্মীদের নিয়ে গড়ে তোলে 'গ্রাম শান্তি রক্ষা বাহিনী' (GSRB)। এই বাহিনী প্রাথমিকভাবে মাওবাদীদের প্রতিরোধ করা এবং স্থানীয় সিপিআই(এম) নেতাদের সুরক্ষার জন্য গঠিত হলেও একদম গ্রামীণ স্তরে অতি দ্রুত এটি রাজনৈতিক হিংসার এক গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীতে পরিণত হয়। মাওবাদীদের হাতে একের পর এক সিপিআই(এম) নেতাদের সঙ্ঘবদ্ধ হত্যার ঘটনার পরম্পরা যেমন জারি ছিল তেমনই এই দলের সদস্যরা শুরু করেন গ্রামে গ্রামে নজরদারি, দলের 'বিরোধী'দের শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনে শারীরিকভাবে নিপীড়ন চালানো শুরু করেন।
Ethnographic অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেকেই এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন চরম দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি অথবা রাজনৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার আশায়। রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত না হয়েও অনেক গ্রামীণ যুবক এই বাহিনীতে জড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে তারা 'হিংসার পেশাজীবী'তে পরিণত হয়।
অংশ ২: নেতাই গণহত্যা এবং কাঠামোগত হিংসার চূড়ান্ত রূপ
২০১১ সালের জানুয়ারিতে নেতাই গ্রামে সংঘটিত গণহত্যা পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সিপিআই(এম)-এর ক্যাম্প থেকে গ্রামবাসীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়, যার ফলে নয়জন গ্রামের মানুষ মারা যান। এই ঘটনা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক শাসন কেবল দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে নয়, অস্ত্রধারী ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, দলীয় ক্যাডার এবং প্রশাসনের নীরবতা মিলেই এই কাঠামোগত হিংসার জন্ম দিয়েছিল।
এই সময়ে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে যে অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় তা হল - বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য স্থানীয় স্তরে হিংসাকে দৈনন্দিন জীবনের একটি 'আবশ্যিক অঙ্গ' হিসেবে দেখছে। রাজনীতি, জীবিকা এবং নিরাপত্তা - এই তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে একটি হিংসাপূর্ণ সমাজ কাঠামো এই সময়েই নির্মিত হয়।
অংশ ৩: বর্ধমান ও হুগলির অর্থনৈতিক হিংসা
২০০৯-২০১৩ সময়কালে বর্ধমান, হুগলি, নদিয়া এবং মুর্শিদাবাদের মতো কৃষিপ্রধান জেলাগুলিতে রাজনৈতিক হিংসা এক নতুন রূপে দেখা দেয়। এখানে হিংসার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কৃষি উৎপাদন, আলু ও ধান সংরক্ষণ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ। যারা 'হারমাদ ক্যাম্প' থেকে আসেনি, তারাও রাজনীতির মাধ্যমেই স্টোরেজ, বাজার কমিটি, মিল এবং কৃষি ঋণ বিতরণে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।
এই অঞ্চলে হিংসার কাঠামো গড়ে উঠেছে তিনটি স্তরে: (১) বড় পুঁজিপতি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, যারা অর্থ সরবরাহ করেন এবং সংগঠনগুলির নিয়ন্ত্রক; (২) মধ্যস্বত্বভোগী দালাল, যারা স্থানীয় স্তরে চাষি ও ক্ষেত মজুরদের নিয়ন্ত্রণ করেন; এবং (৩) স্থানীয় ছেলেরা, যারা এই ব্যবস্থার বাহিনী হিসেবে কাজ করেন। তাদের অনেকেই পূর্বতন হিংসাত্মক রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় ছিলেন।
অংশ ৪: সাম্প্রদায়িক হিংসার নতুন অধ্যায় (২০১৩-২০২২)
২০১৩ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হিংসা এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করে। এই সময়ে ধর্মীয় উৎসবগুলি রাজনৈতিক উত্তেজনার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। রামনবমীর মিছিল, ইসলামিক জলসা, মহরমের তাজিয়া মিছিল - এইসব 'ধর্মীয়' আচরণগুলিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা শুরু হয়।
এই হিংসার ধরণ ছিল অপেক্ষাকৃত কম তীব্র, কিন্তু নিয়মিত এবং সুপরিকল্পিত। একে বলা যায় 'scripted spontaneity' - যেখানে মিছিলের রুট, ফেসবুক পোস্ট, ছোটখাটো সংঘর্ষ ইত্যাদি থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত সবকিছু পূর্ব পরিকল্পিত। হুগলি, ধুলাগড়, আসানসোল, রানিগঞ্জ, খড়গপুর, কাঁচরাপাড়া-ভাটপাড়া - এইসব এলাকায় এই ধরণের সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতিবছর তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সম্পর্কে আমরা এক সচেতন প্রয়াস 'ফোরাম' তাঁদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত করে চলেছে, যা থেকে আমরা এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে পারি।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: তিন ধরণের হিংসার রূপ
নিচের ছকে তিন ধরণের রাজনৈতিক হিংসার তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করা হলো:
| হিংসার ধরন | সময়কাল | মূল উদ্দেশ্য | প্রধান এজেন্ট | কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|---|
| মাওবাদী বিরোধী হিংসা | ২০০৮-২০১১ | নিরাপত্তা ও আদিবাসী নিয়ন্ত্রণ | GSRB, দলীয় ক্যাডার | আধা-সামরিক, দলীয় ক্যাম্পভিত্তিক |
| অর্থনৈতিক হিংসা | ২০০৯-২০১৩ | কৃষি নিয়ন্ত্রণ, চক্রবৃদ্ধি দখল | রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী | তিনস্তর বিশিষ্ট দল-অর্থনীতি মিশ্রণ |
| সাম্প্রদায়িক হিংসা | ২০১৩-২০২২ | ভোটব্যাংক, ধর্মীয় মেরুকরণ | স্থানীয় গুণ্ডা, ধর্মীয় মিছিল | ধর্মীয় উৎসব কেন্দ্রীক ও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় |
এই ছকটি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, কীভাবে সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী হিংসার কাঠামো, উদ্দেশ্য এবং এজেন্ট পরিবর্তিত হয়েছে, অথচ হিংসা নিজেই একটি ক্ষমতার ভাষা হিসেবে অপরিবর্তিত থেকে গেছে।
অংশ ৫: এজেন্টদের তরলতা ও চরিত্র
এই গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে, তা হল - রাজনৈতিক হিংসার 'এজেন্ট' বা কারিগরেরা এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে যান। যারা একসময় মাওবাদীদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, পরে তারা হার্মাদ বাহিনীতে, আবার তারপর তৃণমূল কর্মী হিসেবে বা রামনবমীর মিছিলের 'সারথি' হিসেবে কাজ করছেন। এই পরিবর্তন নিছক দলের বদল নয়, বরং হিংসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার এক সামাজিক বাস্তবতা।
ভৌগোলিক বিস্তার: রাজনৈতিক হিংসার প্রধান কেন্দ্রগুলি
নিচের ছকে ২০০৮ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রধান হিংসা-প্রবণ জেলার তালিকা এবং তাদের প্রকৃতি উপস্থাপন করা হয়েছে:
| জেলা/অঞ্চল | সময়কাল | হিংসার ধরন | প্রভাবিত জনগোষ্ঠী | লক্ষণীয় ঘটনা |
|---|---|---|---|---|
| পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম | ২০০৮-২০১১ | মাওবাদী ও পাল্টা প্রতিরোধ | আদিবাসী, দলীয় কর্মী | শালবনি বিস্ফোরণ, নেতাই হত্যাকাণ্ড |
| বর্ধমান, হুগলি | ২০০৯-২০১৩ | অর্থনৈতিক/কৃষি-নিয়ন্ত্রণ | চাষি, স্টোরেজ মালিক, দালাল | আলু স্টোরেজ দখল, গ্রামীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব |
| প্রায় সারা বাংলা জুড়ে | ২০১৩-বর্তমান | সাম্প্রদায়িক মিছিল ইত্যাদি | হিন্দু, মুসলিম শ্রমজীবী | ধুলাগড়, আসানসোল |
এই ছক থেকে বোঝা যায় যে রাজনৈতিক হিংসা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয় বরং এর ছড়িয়ে পড়া এক গভীর সাংগঠনিক ও পরিকল্পিত গতিবিধির অংশ।
অংশ ৬: প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও প্রতিদিনের রাজনীতি
একাধিক সাক্ষাৎকার, ক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য - এই হিংসা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে এবং রাজনীতি, প্রশাসন এবং অর্থনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছে। হিংসা এখন আর শুধুমাত্র প্রতিপক্ষকে দমন করার মাধ্যম নয়, এটি নিয়োগ, পদ, সুযোগ, এবং সামাজিক অবস্থানের সিঁড়ি হয়ে উঠেছে।
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হিংসা এক পরিবর্তনশীল, বহুস্তরবিশিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। এটি কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক ঘটনা নয়, বরং একটি দৈনন্দিন সামাজিক বাস্তবতা। হিংসার এজেন্টরা রাজনৈতিক আদর্শ নয়, বরং সামাজিক স্বীকৃতি ও জীবিকা খোঁজেন। এ কারণে হিংসা একটি কার্যকরী পেশা হিসেবে টিকে আছে, এবং রাজনৈতিক দলগুলি তার সুযোগ নিচ্ছে।
এই বাস্তবতাকে বদলাতে হলে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমাজে বিকল্প জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সচেতনতার বিস্তার।
উল্লেখযোগ্য সূত্রসমূহঃ
1. Brass, Paul R. (2005). The Production of Hindu-Muslim Violence in Contemporary India. University of Washington Press.
2. Wilkinson, Steven I. (2006). Votes and Violence: Electoral Competition and Ethnic Riots in India. Cambridge University Press.
3. Michelutti, Lucia et al. (2019). Mafia Raj: The Rule of Bosses in South Asia. Stanford University Press.
4. Ruud, Arild Engelsen (2010). Uncivil Politics: Communal Violence and the 'Strongman' in Bangladesh. Forum for Development Studies, 37(1).
5. Nath, Suman (2024). The Production of Political Violence: Ethnographic Evidence of Fluidity of Agents and Their Mechanisms from a Violence-Affected State in India (ca. 2008-2022). Journal for the Study of Radicalism, 18(2), 165-198.
https://muse.jhu.edu/article/964282