আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৫ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

জনশুমারি - কেন দেরি, কোথায় ক্ষতি

অশোক সরকার


অবশেষে জনশুমারি হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তার সঙ্গে নাকি জাতি গণনাও হবে। জনশুমারি করতে কেন এত দেরি হল তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। কোভিড মহামারির কারণে ২০২১-এ নির্দিষ্ট সময়ে করা সম্ভব ছিল না একথা ঠিক, তবে তারপর ৬ বছর ধরে কেন করা হল না তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। ১৪৩টা দেশ কোভিডের পরে জনশুমারি করতে পেরেছে, আমরা পারলাম না৷ কেন?

জনশুমারি কী তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ধন্দ আছে। অনেককেই বলতে শুনেছি জনশুমারি মানে জনগণনা। আসলে জনশুমারির দুটি অংশ, একটিকে বলা হয় ডেমগ্রাফিক, তার মধ্যে জনগণনা, পুরুষ-নারী, শিশু-বৃদ্ধ, তপশিলী জাতি জনজাতি, শিক্ষা, পেশা, পরিযান ইত্যাদি গোনা হয়। গ্রাম ও শহরের প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি ব্যক্তির তথ্য নেওয়া হয়। জনশুমারি সংক্রান্ত আলোচনায় এই অংশটিই বেশি করে উঠে আসে। এই অংশ থেকেই বোঝা যায় ভারতে পুরুষ নারীর অনুপাত কী, মানুষ কত বছর বাঁচছে, কত মানুষ স্কুল কলেজ পেরিয়েছে, বোঝা যায় কত মানুষ কৃষি, পরিষেবা বা অন্য কোনো পেশায় যুক্ত, নগরায়ন কতটা এগোলো ইত্যাদি।

জনশুমারির দ্বিতীয় অংশটির নাম amenities (সুযোগ-সুবিধা), যেখানে মাপা হয়, কত বাড়িতে পাইপের জল আছে, শৌচাগার আছে, বিদ্যুৎ আছে, প্রতিটি গ্রামে কতটা পাকা রাস্তা আছে, স্কুল কত দূরে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতাল কত দূরে, জানা যায় পাকা বাড়ি কাঁচা বাড়ির সংখ্যা - আরও অনেক কিছু। এই তথ্যও প্রতি গ্রাম ও শহর থেকে পাওয়া যায়।

এত তথ্য নেবার দরকারটা কী? দরকার এই জন্য যে সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি নির্ধারণ করতে গেলে, তার পিছনে তথ্য লাগে। যদি বলি ৫০০-র বেশি মানুষ থাকেন এমন গ্রামগুলির দোরগোড়া পর্যন্ত পাকা রাস্তা করে দেওয়া হবে, তাহলে জানতে হবে এমন কত গ্রাম আছে যেখানে পাকা রাস্তা নেই। যদি বলি সব বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হবে, তাহলে জানতে হয় কত বাড়িতে এখন বিদ্যুৎ নেই। তার পরে জানতে হয় কোন রাজ্যে তা যথেষ্ট বেশি, কোন রাজ্যে অত বেশি নয় - সেই অনুযায়ী বাজেটে বরাদ্দ করতে হবে। একই কথা ওঠে জনকল্যাণ কর্মসূচি নিয়ে এবং অধিকার কেন্দ্রিক কর্মসূচিগুলি নিয়ে। ১০০ দিনের কাজের বরাদ্দ কোন রাজ্য কত পাবে, তা নির্ভর করে রাজ্যগুলির গ্রামীণ জনসংখ্যা কত, ভূমিহীন শ্রমিক কত, তার উপরে৷ তারপরে দেখতে হয় গত কয়েক বছরে কত দিন কাজ দেওয়া গেছে। খাদ্য সুরক্ষা আইন অনুযায়ী গ্রামে ৭৫ ভাগ আর শহরে ৫০ ভাগ মানুষকে রেশন দিতে গেলে জানতে হয়, গ্রামে ও শহরে জনসংখ্যা কত, তবে তার ৭৫ আর ৫০ ভাগ বের করা যায়। এছাড়া যত নমুনা সমীক্ষা হয়ে থাকে, সেখানে নমুনাগুলি চয়ন করতে গেলে মোট সংখ্যা জানতে হয়। ধরা যাক নগরায়নের নমুনা সমীক্ষা হবে, যেখানে ছোটো, মাঝারি, বড়ো, খুব বড়ো শহরগুলি থেকে নমুনা নিয়ে সেই শহরগুলির পরিকাঠামো বিশ্লেষণ করা হবে। নমুনা চয়ন করতে গেলে জানতে হয় এই চার রকমের শহর কতগুলি আছে, কোন রাজ্যে কত আছে ইত্যাদি। তবেই তার থেকে নমুনা চয়ন করা যায়।

জনশুমারি দেশের সরকারের গবেষক-সমাজকর্মীদের কাছে একটা অতি আবশ্যক আতসকাঁচের মতো, যা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও তার গতিপ্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে।

জনশুমারি ঠিক সময়ে না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রেশন পাবার যোগ্য প্রায় ১০ কোটি মানুষ। যে ৮১ কোটি মানুষকে রেশন দেওয়া হয়, সেই সংখ্যাটি ২০১১-র জনশুমারির ভিত্তিতে নির্ধারিত। ২০১৩ থেকে এরা রেশন পাচ্ছেন, কিন্তু ২০১৩-র পরে যাদের জন্ম তারা পাচ্ছে না। নগরায়ন কতটা এগোলো জানা যাচ্ছে না, বিশেষত গত ২০০১ থেকে ২০১১-র মধ্যে যে বিপুল সংখ্যায় জনশুমারি টাউন তৈরি হয়েছিল, সেই গতি বাড়ল না কমল? শুধু পশ্চিমবঙ্গেই তো ওই ১০ বছরে ৭৮০টি জনশুমারি টাউন তৈরি হয়েছিল। কৃষি শ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমিক বাড়ল না কমল?যারা বছরে ১৮০ দিনের বেশি কাজ পায় তাদের জনশুমারিতে বলে প্রধান শ্রমিক (main worker)। এদের সংখ্যা কি বাড়ল?বোঝা যাচ্ছে না।

নীতির জগতে জনশুমারির প্রয়োজন কিছু কম নয়। কেন্দ্রীয় অর্থ কমিশন ও রাজ্য অর্থ কমিশন কেন্দ্র, রাজ্য ও পঞ্চায়েত-মিউনিসিপ্যালিটির মধ্যে যে অর্থের বাটোয়ারা করে, তার সূত্রর মধ্যে জনসংখ্যার অংশটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই জনসংখ্যাটি পাওয়া যায় জনশুমারি থেকে। ১৬তম অর্থ কমিশন ২০২৩ সালে গঠন করা হয়েছে, ২০২৬-এ তার সুপারিশ দেবে। তাদের জনসংখ্যার সঠিক তথ্য ছাড়াই কাজ করতে হবে। আগেকার জনশুমারিতে পাওয়া জনসংখ্যার সঙ্গে বৃদ্ধির হার প্রয়োগ করে প্রক্ষিপ্ত জনসংখ্যা দিয়েই তাদের কাজ চালাতে হবে। রাজ্য অর্থ কমিশনগুলিও তাই করছে।

এই প্রসঙ্গে জাতি গণনার কথাও ওঠে। অনেক রাজ্যই ওবিসি সংরক্ষণ করেছে। কোন তথ্যের ভিত্তিতে? জনশুমারি ছাড়া কোন রাজ্যে কত ওবিসি আছে, ওবিসিদের মধ্যে কি কি জাতি কত সংখ্যায় আছে কী করে জানা গেল? না জানা যায়নি, ওবিসি সংরক্ষণগুলি হয়েছে কিছুটা আন্দাজে, আর কিছুটা সেই সাচার কমিটি (২০০৮)-র রিপোর্টের ভিত্তিতে। তার উপরে আবার সুপ্রিম কোর্ট একাধিক মামলার রায়ে স্পষ্ট করেছে যে ওবিসিদের মধ্যে ভাগ করতে হবে - সামাজিকভাবে উপরের দিকে, মাঝামাঝি আর একেবারে নিচের দিকে যারা তাদের আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে। সে না হয় করা গেল কিন্তু তারা কত সংখ্যায় আছেন জনশুমারি ছাড়া জানা যাবে কী করে?কিছু রাজ্য অবশ্য নিজেরা জাতি গণনা করে তা বের করেছে, কিন্তু সারা দেশে সেরকম কোনো কাজ হয়নি।

জনশুমারির কাজ ২০২৭-র ফেব্রুয়ারিতে শেষ হবে বলা হয়েছে, কবে শুরু হবে বলা হয়নি। জাতি গণনা হবে বলা হয়েছে, কিন্তু তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। নানা রকম ব্যাখ্যা সম্ভব। এক, ওবিসি জাতিগুলিকে গণনা করা হবে, যাতে জানা যায় কোন ওবিসি জাতি কোন রাজ্যে কত সংখ্যায় আছে। দ্বিতীয় সম্ভাবনা, ওবিসি জাতিগুলি চিহ্নিত করা হবে না, শুধু ওবিসি চিহ্নিত হবে। তাতে মোট ওবিসি কত জানা যাবে কিন্তু কোন জাতির সংখ্যা কত, তা জানা যাবে না। উচ্চ জাতিগুলিকে গণনা করা হবে কি? আজকের রাজনীতিটা যেহেতু ওবিসিকে ঘিরে তাই সরকার বলতেই পারে, উচ্চ জাতিগুলিকে গণনা করার দরকার নেই। উচ্চ জাতিগুলিকে গণনা না করলে জানা যাবে না, ডাক্তার, উকিল, জজ, অধ্যাপক, ব্যাঙ্কিং, ইন্সিউরান্স, তথ্যপ্রযুক্তি জাতীয় লোভনীয় পেশাগুলিতে কোন জাতির উপস্থিতি কতটা - অর্থাৎ সামাজিক অসাম্য কতটা। সেই দরকারি কাজটি হবে কি?এবার তো জনশুমারি নাকি মোবাইল অ্যাপ দিয়ে হবে, কাজেই জনশুমারির অ্যাপটি দেখলে তবেই এসব স্পষ্ট হবে।

জনশুমারি কেন হল না সেই কথাতে ফিরে আসি। তিনটে সম্ভাব্য কারণ দেখা যাচ্ছে। এক তো কোভিডের পরেই জনগণনা করলে ভারতের কোভিড মৃত্যুর সংখ্যার সঠিক হিসেবটা জানা যেত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা দাবি করেছিল ভারতে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৭ থেকে ৫০ লক্ষের মতো, সরকার অস্বীকার করেছিল। দ্বিতীয়, সেই সময়টায় এনআরসি নিয়ে ভীষণ হইচই হচ্ছিল; নানা দিক থেকে রব উঠেছিল যে দেশে অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা মারাত্মক বেড়ে গেছে, আর সংখ্যালঘুদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়ে যাচ্ছে। এই দুই তথ্য প্রমাণ করতে গেলে জনশুমারি লাগে। জনশুমারি হলে স্পষ্ট বোঝা যেত সত্যিই পরিস্থিতিটা কিরকম, এবং তা যে এই সব দাবির অনুকূলে যেত না সেটা বলাই বাহুল্য। তৃতীয় সম্ভাব্য কারণ হয়ত ভবিষ্যৎমুখি। লোকসভার আসন ২০২৬-এর পরের জনশুমারি পর্যন্ত ৫৪৫-এ বেঁধে রাখা আছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে। ২০২৭-এ জনশুমারি করলে তখনই জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভা আসনের পুনর্বিন্যাসের দাবি উঠবে। যেভাবেই তা করা হোক না কেন, দক্ষিণের রাজ্যগুলির তুলনায় উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির আসন বাড়বে। মোট লোকসভা আসন যদি ৫৪৫ই রাখতে হয়, তাহলে দক্ষিণের রাজ্যগুলির আসন কমবে ২৬টি, উত্তরের রাজ্যগুলির আসন বাড়বে ৩৪টি। আর যদি নতুন করে লোকসভার আসন নির্ধারিত হয় তাহলে মোট আসন হবে ৮৪৮, দক্ষিণের রাজ্যগুলির বাড়বে ৩৫টি, আর শুধু উত্তরপ্রদেশ আর বিহার মিলিয়ে বাড়বে ১০৩টি। কারণ গত ৫০ বছরে শিক্ষা ও আর্থিক প্রগতির ফলে দক্ষিণের রাজ্যগুলির লোকসংখ্যা বৃদ্ধির হার শতকরা ১.৬-১.৭, সেখানে বিহার উত্তরপ্রদেশে ২.৩ থেকে ২.৭। ২০২৯-এ লোকসভা নির্বাচন, কাজেই তার আগে লোকসভা আসনের পুনর্বিন্যাস করতে পারলে, যেহেতু উত্তর ভারতেই বিজেপির প্রাধান্য, সেই প্রাধান্য আরও শক্তপোক্ত ও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে। সহজ কথায় উত্তরপ্রদেশ বিহার আর তিন চারটে রাজ্য জিততে পারলেই লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্ভব হবে।

এই সুগভীর রাজনৈতিক ছকের প্রয়োজনেই কি আসলে জনশুমারি করতে এত দেরি হল? জাতি গণনা কি পূর্ণমাত্রায় হবে, জাতি গণনা ঠিক সময়ে প্রকাশ হবে?জনশুমারির পরই কি তাড়াহুড়ো করে 'Delimitation' কমিশন গঠন করে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস করে দেওয়া হবে? সময়ই এইসব প্রশ্নের উত্তর দেবে।