আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৫ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

দেউচা-পাঁচামি খনি প্রকল্পে কেন উঠছে তদন্তের দাবি?

প্রসেনজিৎ বসু


বীরভূমের দেউচা-পাঁচামিতে কয়লা খনি প্রকল্প নিয়ে কিছু নতুন তথ্য সামনে আসায় বিতর্ক শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ কলকাতায় অনুষ্ঠিত 'বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট'-এ ঘোষণা করেছিলেন যে দেউচা-পাঁচামিতে কয়লা খনির খননকার্য শুরু হতে চলেছে। বাণিজ্য সম্মেলনে এই প্রকল্পকে "বাংলার উন্নয়নের অনুঘটক" বলে আখ্যা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে এই খনি প্রকল্প থেকে আগামী একশো বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা সরবরাহ হবে এবং এক লক্ষেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান এতে সুনিশ্চিত হবে।

দেউচা-পাঁচামি-দেওয়ানগঞ্জ-হারিণসিঙ্গা কয়লা ব্লকটি যে সংস্থাকে বরাদ্দ করা হয়েছে, সেই পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম (ডব্লিউ.বি.পি.ডি.সি.এল.) কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলায় নথিপত্র সমেত যে হলফনামা দায়ের করেছে তা শুধু মুখ্যমন্ত্রীর আগের ঘোষণার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণই নয়, এই খনি প্রকল্পে নানাবিধ অনিয়ম এবং বেআইনি কার্যকলাপের ইঙ্গিতবাহি।

কয়লা খনি প্রকল্প বিশ বাঁও জলে

বাণিজ্য সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে, কয়লা খনির জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ইতিমধ্যেই পাওয়া গিয়েছে। কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রক ২০১৯-এর ডিসেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমকে দেউচা-পাঁচামির কয়লা ব্লকটি বরাদ্দ করার নির্দেশিকা জারি করে। তার আগে, ২০১৯-এর সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রক এবং পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম এই কয়লা ব্লক সংক্রান্ত চুক্তি সই করে। সেই বরাদ্দের চুক্তি অনুযায়ী কয়লাখনির লিজের আবেদন এবং মাইনিং প্ল্যান জমা করে অনুমোদন নেওয়ার সময়সীমা ছিল ২০২১-এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অথচ আজ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম কয়লা খনির লিজের আবেদন বা পরিকল্পনা জমা করতে পারেনি। এক্ষেত্রে কয়লা ব্লক বরাদ্দের চুক্তির সরাসরি উল্লঙ্ঘন করা হয়েছে।

২০২৪-এর ডিসেম্বর মাসে দেউচা-পাঁচামি-দেওয়ানগঞ্জ-হারিণসিঙ্গা ব্লকে কয়লা খননের জন্য মাইন ডেভেলপার কাম অপারেটর (এম.ডি.ও.) নিয়োগের উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম একটি আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করে। এই টেন্ডারের জন্য আগ্রহপত্র (ই.ও.আই.) জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে, যা পরে দুই দফায় এপ্রিল মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সময়সীমা বাড়ানো সত্ত্বেও কয়লার খননে আগ্রহ প্রকাশ করে কেউ আবেদন জমা করেনি। এতে স্পষ্ট যে কয়লা খনি প্রকল্পে কোনো বেসরকারি বিনিয়োগকারীর আগ্রহ নেই।

শুরু হয়েছে ব্যাসল্ট খনন

আসলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বা বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের দেউচা-পাঁচামি কয়লা খনন শুরু করার সামর্থ্য বা সদিচ্ছা, কোনোটাই নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের অন্ধকারে রেখে ২০২৩-এর নভেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য মন্ত্রিসভা বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থা নিয়োগ করে দেউচা-পাঁচামি অঞ্চলের ৪৩১.৪৭ একর জমিতে ব্যাসল্ট উত্তোলন করে বাজারে বিক্রি করার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে।

রাজ্য বিদ্যুৎ দপ্তরের সেই প্রস্তাবে ১৪১.১২ মিলিয়ন মেট্রিক টন ব্যাসল্ট উত্তোলন এবং বিক্রি করে ৫৬০০ কোটি টাকার প্রত্যাশিত মুনাফা করার কথা বলা হয়। প্রস্তাবে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চল, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের বাজারে ব্যাসল্টের বিপুল চাহিদার উল্লেখ থাকলেও ব্যাসল্ট খনন বা বিপণনে কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকা বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের মাধ্যমেই কেন এই খননকার্য করা হবে তার কোনো যুক্তি দেওয়া হয়নি। কয়লা খনি অঞ্চলে ব্যাসল্ট খননের জন্য কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রকের থেকে কোনো অনুমোদনও নেওয়া হয়নি।

পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের (ই.আই.এ.) নিয়মাবলী অনুযায়ী ৪৩১.৪৭ একর বা ১৭৪ হেক্টর জমিতে ব্যাসল্ট খনি 'ক্যাটেগরি এ' (৫০ হেক্টরের বেশি) প্রকল্প হিসাবে গণ্য হওয়ার কথা, যার জন্য 'কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটি'-র ছাড়পত্র এবং গণশুনানি বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম প্রথমে ৪৪ একর জমিতে ব্যাসল্ট খনির জন্য অনুমোদন নিয়ে তারপর মাত্র ১২ একর (৪.৮৫৬ হেক্টর) জমিতে খননের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র চায়, যাতে এটি 'ক্যাটেগরি বি-২' হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যাসল্ট খনি প্রকল্পে গণশুনানি এবং কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞ কমিটির নজরদারি এড়িয়ে সহজে ছাড়পত্র পাওয়ার জন্যই ৪৩১ একর জমির প্রকল্পকে ছোট ছোট খণ্ডে ভেঙে অনুমোদন নেওয়া হয়।

২০২৪-এর ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম দেউচা-পাঁচামিতে ব্যাসল্ট খননের যে দরপত্রের আহ্বান করে তার নথিতে বলা হয় যে প্রথমে ১২ একর অঞ্চলে খনন শুরু হবে, পরে খনির আয়তন ধাপে ধাপে ৪৩.৯৪ একর এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৩২৬ একর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে। প্রকল্প এলাকা নিয়ে এমন অস্পষ্টতা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে খনি প্রকল্পের প্রকৃত আয়তনকে কম করে দেখানো যায়। এর ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক ২০২৪-এর অক্টোবর মাসে এই ব্যাসল্ট খনিকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দিয়ে দেয়।

ব্যাসল্ট খননের দরপত্র প্রক্রিয়ায় গরমিল

২০২৪-এর মার্চ মাসে ট্রান্সমেরিন অ্যান্ড কনফ্রেইট লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি সংস্থাকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম দেউচা পাঁচামিতে ব্যাসল্ট খননের জন্য নিয়োগ করে। এই বেসরকারি সংস্থা বাছাইয়ের দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়াটাও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ব্যাসল্ট খননের দরপত্রে ট্রান্সমেরিনের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের রাজস্বের ভাগ ছিল ৭১.৫ শতাংশ, যেটা দ্বিতীয় স্থানে থাকা দরদাতার প্রস্তাবিত ৭১ শতাংশের তুলনায় যৎসামান্য বেশি। এটা সন্দেহের উদ্রেক করে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী ব্যাসল্ট খনন প্রকল্পের জন্য নিয়োগ হওয়া কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদে কোনও পরিবর্তন নিগমের লিখিত অনুমতি ছাড়া করা যাবে না। ১৬ মার্চ, ২০২৪ তারিখে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের পক্ষ থেকে ট্রান্সমেরিনকে যে কাজের আদেশপত্র বা লেটার অফ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে তাতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে প্রকল্পের পুরো সময়কালে খননকারী সংস্থায় ট্রান্সমেরিনের ন্যূনতম ৫১ শতাংশ মালিকানা থাকতে হবে। অথচ ২০২৫-এর এপ্রিল মাসে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থা হিমাদ্রি স্পেশালিটি কেমিক্যাল লিমিটেড ট্রান্সমেরিনকে অধিগ্রহণ করে নিয়েছে।

৩ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে হিমাদ্রি স্পেশালিটি কেমিক্যালের স্টক এক্সচেঞ্জের দাখিলপত্রে জানানো হয়েছে যে তারা ট্রান্সমেরিন অ্যান্ড কনফ্রেইট লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড-এর ৬০ শতাংশ শেয়ার ৪.২৩ কোটি টাকার বিনিময়ে অধিগ্রহণ করছে। এই অধিগ্রহণের ফলে ট্রান্সমেরিনের সাবসিডিয়ারি স্টার্ডি নিকেতন নামের কোম্পানিও হিমাদ্রি স্পেশালিটি কেমিক্যালের সাবসিডিয়ারিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৩-এর জানুয়ারি মাসে সল্টলেক সেক্টর ফাইভের একটি ঠিকানায় নথিভুক্ত স্টার্ডি নিকেতন নামের কোম্পানির আর্থিক লেনদেন শূন্য। এহেন একটি কাগুজে কোম্পানিকে খনিজের রয়্যালটি বাবদ ১৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার জন্য হিমাদ্রি স্পেশালিটি কেমিক্যাল চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

ট্রান্সমেরিন এবং স্টার্ডি নিকেতনকে অধিগ্রহণ করার মাধ্যমে হিমাদ্রির স্পেশালিটি কেমিক্যাল দেউচা পাঁচামির ব্যাসল্ট খনির বরাতও হাতিয়ে নিয়েছে। প্রায় ১৬০০ কোটি টাকার মুনাফার প্রকল্প মাত্র ৪.২৩ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণ আর ১৫০ কোটি টাকার ঋণের বিনিময়ে হস্তান্তর হয়ে গেছে। এই অধিগ্রহণ স্পষ্টতই বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের টেন্ডারের শর্তাবলি লঙ্ঘন করেছে। প্রশ্ন উঠছে, যে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম কি ব্যাসল্ট খনির এই হস্তান্তরের অনুমতি দিয়েছে?

তদন্তের যৌক্তিকতা

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি দেউচা-পাঁচামি থেকে কয়লা উত্তোলনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং এক লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে দাবি করেছিলেন, সেটা নির্জলা মিথ্যাচার। কয়লা খনির লিজ এবং খনির পরিকল্পনা অনুমোদনের জন্য আবেদন এখনও পর্যন্ত জমা দেওয়া হয় নি। ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দেউচা-পাঁচামিতে আসলে যা শুরু হয়েছে তা একটি স্বতন্ত্র ব্যাসল্ট খনি প্রকল্প। লাভজনক সেই প্রকল্পে বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের মাধ্যমে খননকারী সংস্থা বাছাই এবং সম্প্রতি সেই সংস্থার নিয়মবহির্ভূত মালিকানা হস্তান্তর, বৃহত্তর দুর্নীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেই কারণেই দেউচা-পাঁচামিতে ব্যাসল্ট খনন প্রকল্প অবিলম্বে স্থগিত রেখে পুরো বিষয়টির বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিৎ।