আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৫ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
নিজভূমে পরবাসী
বিগত কয়েকমাস ধরে আবারও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা ছুতোয় বাঙালি বিতাড়ন শুরু হয়েছে। তবে এবারে লক্ষ্য কেবল বাঙালি নয়, বরং বাংলাভাষীদের। তাদের বাংলাদেশি বলে তকমা দিয়ে একেবারে দেশ থেকেই বার করে দেওয়ার হিড়িক পড়েছে। ১৯৬০ এবং ৭০-এর দশকে আসামে যে রক্তক্ষয়ী ‘বঙ্গাল খেদাও’ অভিযান শুরু হয়েছিল, তার থেকে কিছুটা ভিন্ন এই নতুন সময়ের প্রক্রিয়া। তখনকার আক্রমণ ছিল একান্তভাবে প্রাদেশিক, অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট রাজ্য থেকে বাংলাভাষীদের বিতাড়নের প্রচেষ্টা। আজকের সময়ে তা একেবারে রাষ্ট্রীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। এখন রাজ্য নির্বিশেষে, বিশেষত যেখানে বিজেপি সরকার রয়েছে, সেখান থেকে বাংলাভাষীদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘বিদেশি’ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এবং এই আখ্যার ভিত্তিতে চলেছে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর প্রক্রিয়া, পুশব্যাকের পরিকল্পনা, এবং কখনও কখনও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নো ম্যান্স ল্যান্ডে জোর করে ফেলে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত। আপাতত আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি হওয়ায় পুশব্যাকের কাজ হয়ত সাময়িকভাবে থেমে আছে, কিন্তু তা যে আবার নতুন করে শুরু হবে না, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। একথা বুঝতে কষ্ট হয় না যে দেশভাগের যন্ত্রণায় আক্রান্ত বাঙালি আবারও নিজভূমে পরবাসী হতে চলেছে।
গত তিন মাসে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঘটনাগুলোর হিসেব করলে দেখা যায় যে প্রায় চার শতাধিক বাংলাভাষী মানুষকে তাঁদের ঘর থেকে উৎখাত করা হয়েছে। কারও কারও রুজি-রোজগার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, কাউকে আটক করে পাঠানো হয়েছে জেল বা ডিটেনশন সেন্টারে। কেউ আবার হারিয়েছেন সমস্ত নাগরিক স্বীকৃতি, দিনের পর দিন থানার বারান্দায় পড়ে থেকেছেন পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে। এর মধ্যেই সবচেয়ে আলোড়ন ফেলেছে আসামের ধুবড়ি, বরপেটা এবং নওগাঁ অঞ্চলের ঘটনাগুলো। এনআরসি প্রক্রিয়ার নামে বহু বছর ধরে বসবাসরত নাগরিকদের ‘ডকুমেন্ট যাচাইয়ের’ ছুতোয় বিদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশের কাছেই ভোটার কার্ড, আধার, ভূমি পাট্টা বা জন্ম প্রমাণপত্র থাকলেও ফরেনার্স ট্রাইবুনাল তা ‘অগ্রাহ্য’ করে রেখেছে। দিল্লির বসন্ত কুঞ্জ এলাকার জয় হিন্দ কলোনি, যেখানে বহু নিম্নবর্গের বাংলাভাষী শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে বাস করছিলেন, সেই বস্তি সম্প্রতি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে পানীয় জল ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর রাতারাতি তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হয়। এমনকি অনেককে বাংলাদেশি বলে ঘোষণা করে পুশব্যাকের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। সেই পুশব্যাক কার্যত স্থগিত হলেও সরকারের মনোভাব পরিষ্কার। রাজস্থানে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি। প্রায় তিন শতাধিক বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিককে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বছরের পর বছর ধরে রাজস্থানে নির্মাণ কাজ ও কৃষিশ্রমিকের কাজ করে আসছেন। কিন্তু স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসন তাঁদের না কোনও সঠিক শুনানি দিয়েছে, না আইনগত সহায়তা। এছাড়াও গুজরাট, হরিয়ানা, কর্ণাটকেও এমন বহু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। মুখ্য অভিযোগ একটাই, বাংলা ভাষায় কথা বলা মানেই বাংলাদেশি হওয়া।
এই ঘটনাগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় যে এমন কিছু নতুন হচ্ছে না। ১৯৬০-৭০-এর দশকে আসামে শুরু হয়েছিল ‘বঙ্গাল খেদাও’ নামক এক ভয়াবহ সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিযান। মূলত ভাষার ভিত্তিতে তৈরি এই আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিলেন হিন্দু ও মুসলিম উভয় বাংলাভাষী সম্প্রদায়ের মানুষ। অসমিয়া জাতীয়তাবাদ তৎকালীন রাজনৈতিক সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে বাঙালিকে ‘ঘুসপেটিয়া’ এবং ‘বহিরাগত’ বলে দাগিয়ে দেয়। তেজপুর, বরপেটা, শিলচর, গোলাঘাটের মতো অঞ্চলে ঘটে যায় ভয়াবহ হামলা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ এবং গণহত্যা। এই হিংসা শুধু মানুষের প্রাণ নেয়নি, হাজার হাজার মানুষকে উদ্বাস্তু বানিয়ে দেশের অভ্যন্তরে নতুন করে বিতাড়িত করেছে। দেশভাগের ক্ষত না শুকোতেই আসাম ও ত্রিপুরা হয়ে গিয়েছিল আরেকবার বাস্তুচ্যুতি ও বঞ্চনার মঞ্চ। সেই সময়ের ঘটনা কেবল রাজনৈতিক বিভাজনের নিদর্শন নয়, বরং তা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের সংকটকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল। আজকের সময়ের রাজনীতি যেন সেই ইতিহাসকে আরও গভীর ও সাংবিধানিকভাবে বৈধতা দিয়ে নতুন করে পুনরাবৃত্তি করছে।
এই নতুন যুগের বিতাড়নের পেছনে শুধুই ভাষা বা জাতিগত বিদ্বেষ কাজ করছে না। এর পেছনে রয়েছে একাধিক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বার্থ। দিল্লির উচ্ছেদের ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়, বস্তি ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই সেই জমি চলে যাচ্ছে আবাসন মাফিয়াদের হাতে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, সেখানে বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প গড়ার ছক তৈরি হয়ে আছে। বাংলাভাষী শ্রমিকদের সরিয়ে ফেলে সেই জমি দখল করাই ছিল মূল লক্ষ্য। একইভাবে আসামের ধুবড়ি অঞ্চলের যেসব এলাকায় উচ্ছেদ হয়েছে, সেগুলোতে সম্প্রতি খনিজ সম্পদ, বিশেষত লৌহ আকরিকের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেই জমিগুলো একাধিক কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। যার মধ্যে আদানি গোষ্ঠীর নাম বারবার উঠে আসছে। এই জমি দখলের রাজনীতিকে চাপা দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘বাংলাদেশি’ তকমা। শুধু জমির লোভ নয়, শ্রমবাজারেও রয়েছে এই বিতাড়নের সুপরিকল্পিত অর্থনীতি। বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকরা স্বল্প বেতনে কাজ করেন। তাঁদের সরিয়ে দিলে স্থানীয় বেকার যুবকদের জন্য শ্রমের বাজার খুলে যায়। এবং এই যুবকরা, বিশেষত হিন্দু সমাজের নিম্নবর্গের অংশ, বহুক্ষেত্রে বিজেপির রাজনৈতিক সমর্থক। কাজেই একটি রাজনৈতিক বলয়ের ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে অন্য একটি দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে মুসলিম বিদ্বেষকেও বড়সড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেহেতু বাংলাভাষী পরিযায়ীদের একটি বড় অংশ মুসলিম, তাই বিজেপির দীর্ঘদিনের মুসলিম বিরোধী রাজনীতিকে এই বিতাড়ন রাজনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কার্যত অসহায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজস্থানে বাঙালি শ্রমিকদের গ্রেপ্তারের পরে রাস্তায় নেমে মিছিল করেছেন, সংবাদমাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু কোনও আইনি বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই ঘটনা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে পড়লেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার চাইলেই সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারত, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাতে পারত, এমনকি সংসদে সাংবিধানিক আলোচনার দাবি জানাতে পারত। এসবের কোনোটাই করা হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মনে একটা প্রশ্ন উঠছে তৃণমূল কংগ্রেস কি এই প্রশ্নে সত্যিই লড়ছে, নাকি কেবল বিরোধিতার ভান করছে। আবার রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্ব এই বিতাড়নের প্রশ্নে কার্যত মৌন সমর্থন জানাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি প্রকাশ্যে বলছেন যে এ রাজ্যে বহু বেআইনি অনুপ্রবেশ হয়েছে। কিন্তু কোথা থেকে, কতজন, কী প্রমাণ - এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। এইভাবে দুর্বল তথ্য দিয়ে বাংলাভাষী পরিযায়ীদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, যেটা আদতে বিজেপির বাঙালি বিরোধী অবস্থানকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে।
আসলে আরএসএস-বিজেপি-র হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানের যে ভয়াবহ রাজনীতি দেশে প্রোথিত করা হয়েছে, তারই মাসুল গুনছে বাঙালিরা। হিন্দি ছাড়া কোনো ভাষাই যেন ভাষা নয়, এমন একটি ধারণা উত্তর ভারতের মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলত, বাংলা, যেই ভাষায় দেশের জাতীয় সঙ্গীত রচিত হয়েছে তাকেও অনেকে ভাবেন বাংলাদেশীদের ভাষা। অশিক্ষা ও কুশিক্ষার এই আঁতুরঘরে বিজেপি সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়েছে। অসমিয়াদের বোঝানো হয়েছে যে বাঙালি তাড়ানো আসলে মুসলমান তাড়ানো। তাই অসমিয়া জাতীয়বাদের সঙ্গে বিজেপি-র জোট বাঁধতে খুব অসুবিধা হয়নি। তেমনি অন্যান্য রাজ্যে বিবিধ বিভেদকে উস্কানি দিয়ে বিজেপি বাঙালি তথা মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। পাখির চোখ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন। যদি মুসলমান অনুপ্রবেশের ভাঁওতাবাজিকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যের মানুষের সমর্থন আদায় করা যায়, এটাই বিজেপির মূল লক্ষ্য।
এই অবস্থায় সময় এসেছে বাংলাভাষী নাগরিক সমাজের এক ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ গড়ে তোলার। এটি শুধু একটি ভাষা বা গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার লড়াই নয়, এটি ভারতের সাংবিধানিক মূল্যবোধ, নাগরিকত্বের মৌলিক অধিকার এবং শ্রমিকের মর্যাদার প্রশ্ন। প্রয়োজন সেই নাগরিক প্রতিবাদ, যেটা কোন রাজনৈতিক দলের মুখাপেক্ষী নয়। বাঙালি সমাজকে বুঝতে হবে - এই মুহূর্তে উগ্র প্রাদেশিকতা নয়, বরং দরকার নতুন এক জাতীয় বাঙালি আত্মচেতনার উত্থান। আমাদের দরকার সেই সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আত্মপরিচয়, যা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে রুখে দাঁড়াতে পারে। যে জাতি বিদ্যাসাগর, রামমোহন, সুভাষ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে জন্ম দিয়েছে, তাদের উত্তরসূরিরা যদি আজ নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে নির্লিপ্ত থাকে, তবে ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না।