আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্দশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ জুলাই, ২০২৫ ● ১-১৫ শ্রাবণ, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

ভোটার তালিকা সংশোধন না ভোটাধিকার হরণ?


গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হওয়ার পূর্বশর্ত হল যে সমস্ত নাগরিকের ভোটাধিকার থাকার কথা তাদের সবার যেন ভোটার তালিকায় নাম থাকে। এই প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য ভারতের নির্বাচন কমিশনের গুরুত্ব সর্বাধিক। নির্বাচকদের বাদ দিয়ে কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচন হতে পারে না। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কি আদৌ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাইছেন?

এই প্রশ্নটি উঠছে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার বাস্তবতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে। বিহারে নির্বাচন আসন্ন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই সেখানে নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে সমস্ত নির্বাচনের আগেই নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন করে। এতে কোনো নতুনত্ব নেই। এমনকি বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াও ২০০৪ সালে শেষবার হয়েছিল। কিন্তু এত তাড়াহুড়ো করে তা করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ১ সেপ্টেম্বর সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে। তার আগে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা ১ আগস্টের মধ্যে। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে জুন মাসের ২৪ তারিখে। অর্থাৎ মাত্র ৬৮ দিনের মধ্যে বিহারের ৭.৮৯ কোটি ভোটারের আবেদনপত্র যাচাই করে নির্বাচন কমিশনকে সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এই বিপুল প্রক্রিয়া এই কম সময়ের মধ্যে কীভাবে সম্পন্ন করা হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

এর থেকে অবশ্য অনেক বড়ো সমস্যা রয়েছে এই প্রক্রিয়া নিয়ে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশন যে সমস্ত দলিল বা প্রমাণপত্র নির্বাচকদের থেকে চাইছেন, তা অধিকাংশ মানুষের কাছে থাকার সম্ভাবনা কম। যেমন যে সমস্ত ভোটারের জন্ম ১ জুলাই, ১৯৮৭ থেকে ২ ডিসেম্বর, ২০০৪-এর মধ্যে, তাদেরকে তাদের বাবা অথবা মায়ের জন্মের তারিখ ও স্থানের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। আবার যাদের জন্ম ২০০৪ সালের পরে তাদেরকে উভয়ের ক্ষেত্রেই এই প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। কিন্তু কেন?

২০০৩ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী বাবা এবং মা দুজনকেই ভারতের নাগরিক হতে হবে, যদি আপনাকে ভারতের নাগরিক হতে হয়। ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র বাবা অথবা মা যদি ভারতের নাগরিক হয় তাহলেই আপনাকে ভারতের নাগরিক হিসেবে মান্যতা দেওয়া হবে। যেই তারিখ ভিত্তিক প্রমাণপত্র নির্বাচন কমিশন দাখিল করতে বলছে তা আসলে নতুন নাগরিকত্ব আইন ২০০৩ অনুযায়ী নাগরিকত্বের প্রমাণ। ভেবে দেখুন আপনাকে যদি এই নথি জমা দিতে বলা হয়, যদি বলা হয় আপনার বাবা এবং মায়ের জন্মের তারিখ ও স্থানের প্রমাণ দিতে, আপনি কি তা পারবেন? নির্বাচন কমিশন কি আদৌ নাগরিকত্বের প্রমাণ জনগণের থেকে চাইতে পারে, তাও একটি নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে?

স্বভাবতই নির্বাচন কমিশনের এই কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বিরোধীরা আদালতে গেছেন। সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য বিচারপতি মামলা শুনানির সময় বলেন যে সেই সমস্ত নথি জমা করতে বলা হচ্ছে তা অনেক জজ বা আধিকারিকদের কাছেও থাকবে না। তাঁরা নির্বাচন কমিশনকে বলেন যে আধার কার্ডের মতন নথিকেই প্রামাণ্য নথির মান্যতা দেওয়া হোক, কারণ আধার কার্ডের ভিত্তিতেই জাতি শংসাপত্র ইত্যাদি দেওয়া হয়ে থাকে। যদিও বিচারপতিরা কোনো নির্দেশ দেননি, নির্বাচন কমিশনকে এই নথিগুলিকে গ্রাহ্য করার কথা ভাবতে বলেছেন, তবুও বিহারে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ না মেনেই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ চলছে। যদিও সুপ্রিম কোর্ট এই প্রক্রিয়ার উপরে কোনো স্থগিতাদেশ দেননি, তবু আধার কার্ডকে মান্যতা দেওয়ার পরামর্শ কেন নির্বাচন কমিশন মানল না সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশের প্রায় সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে, এই অভিযোগ বহুবার উঠেছে। বিজেপি যেখানে এনআরসি করে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার ছক কষছিল তা প্রবল গণআন্দোলনের চাপে রদ করা হয়েছে। অন্যদিকে নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে বিজেপি এনআরসি থেকে বাদ পড়া মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের যাতে আর নাগরিকত্ব প্রদান না করা যায় তার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু নাগরিকত্ব প্রমাণের বোঝা নির্বাচন কমিশন চাপাতে চাইছে সাধারণ মানুষের উপরে। সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থকে চরিতার্থ করতেই কি এই নীতি হঠাৎ চালু করল নির্বাচন কমিশন? বিহারের প্রক্রিয়া নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখন তারা ঘোষণা করে দিয়েছে যে দেশজুড়ে এই প্রক্রিয়া চালু করা হবে।

নির্বাচন কমিশন ভারতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্থা যা বিগত কয়েক দশকে গোটা বিশ্বে সমাদর পেয়েছে। যেখানে নির্বাচন কমিশনের কাজ ভোটারদের সহায়তা করা, তাদের পক্ষে পদক্ষেপ নেওয়া সেখানে কে নাগরিক ও কে নয় তা যাচাই করার দায় কেন কমিশন সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপাল? গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা একজন নাগরিককে যখন বলে তার নাগরিকত্বের প্রমাণ দাখিল করতে, আসলে তখন সমস্ত নাগরিককেই বলা হয় যে প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তারা নাগরিক নন। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেকে মান্যতা দিলেও নাগরিকদের দেয় না। রাষ্ট্রের চোখে কেউ নাগরিক নয় যতক্ষণ না সে প্রমাণ করতে পারছে যে সে নাগরিক। এই প্রমাণ দাখিলের যে নীতি ধার্য করেছে নির্বাচন কমিশন, যেই সব নথি তারা চাইছে, তা অধিকাংশই গরিব মানুষের কাছে নেই। তাহলে কেন নির্বাচন কমিশন সাধারণভাবে আধার বা অন্যান্য সহজলভ্য নথিকে মান্যতা দিচ্ছে না? তবে কি গণতান্ত্রিকরণ নয়, কমিশনের আসল উদ্দেশ্য গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা?

দুর্ভাগ্যজনক হলেও এই প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশন সূত্র মারফত সংবাদমাধ্যমে খবর হল যে প্রচুর বিদেশি ভোটারকে নাকি চিহ্নিত করা গেছে। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে গোপন সূত্র মারফত কেন সংবাদমাধ্যমকে তা জানানো হচ্ছে? নির্বাচন কমিশন কেন নিজে সমস্ত তথ্য স্বচ্ছভাবে মানুষের সামনে রাখছে না? আসলে নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুঠে নেওয়ার চেষ্টা করছে শাসক শিবির।

গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে প্রধানতম অধিকার হল ভোটদানের অধিকার। সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য বিচারপতি বলেছেন যে বিরোধীদের দাখিল করা মামলা ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক বিষয় সংক্রান্ত কারণ তা ভোটাধিকার নিয়ে। সুপ্রিম কোর্টের উপর এখন গুরুদায়িত্ব রয়েছে মানুষের ভোটাধিকারকে সুরক্ষিত করার। সুনিশ্চিত করতে হবে যাতে একজন ভারতীয় নাগরিকও ভোটাধিকার না হারান। এই প্রশ্নে বিরোধীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাজ নির্বাচন কমিশনের উপরে গণতান্ত্রিক চাপ বজায় রাখা যাতে মানুষের ভোটাধিকার সুরক্ষিত থাকে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন তার নিরপেক্ষতার জন্য গোটা বিশ্বে সমাদৃত। আমরা আশা করব তারা সরকার তথা শাসকদল নয়, ভারতের সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ থেকে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে পালন করবেন। কিন্তু ভোটার তালিকা সংশোধনের নীতি গ্রহণ করার ফলে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেছে। ভারতের গণতন্ত্রের পক্ষে তা সুখকর নয়।