আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৫ ● ১৬-৩২ আষাঢ়, ১৪৩২
সমসাময়িক
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা
মহাপ্রলয় থেকে ৮৯ সেকেন্ড দূরে দাঁড়িয়ে মানব সভ্যতা। আলবার্ট আইনস্টাইন, ওপেনহাইমারের মতন বৈজ্ঞানিকরা ১৯৪৭ সালে তৈরি করেন 'Doomsday Clock' যা মানবজাতিকে আণবিক বোমা সংক্রান্ত বিপদের সম্ভাবনার কথা বলে। সেই ঘড়ি অনুযায়ী মানবসভ্যতা প্রলয়ের মধ্যরাত থেকে মাত্র ৮৯ সেকেন্ড দূরে রয়েছে। প্রতি বছর এই বৈজ্ঞানিকরা হিসেব কষে জানান যে আমরা আর প্রলয় থেকে কতদূরে। বিগত ৮০ বছরে আমরা আপাতত প্রলয়ের সবচেয়ে কাছে রয়েছি, এই হিসেব অনুযায়ী।
মনে রাখতে হবে যে 'Bulletin of the Atomic Scientists' দ্বারা প্রকাশিত এই হিসেব প্রকাশিত হয়েছে ২৮ জানুয়ারি, ২০২৫। যখন এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তখন একদিকে চলছে ইজরায়েল দ্বারা সংগঠিত গাজার মানুষের নরমেধ যজ্ঞ। সর্বশেষ প্রকাশিত হিসেব অনুযায়ী গাজায় মৃত মানুষের সংখ্যা ৩,৭৭,০০০-এর বেশি। চোখের সামনে প্রায় ৪ লক্ষ মানুষকে খুন করল ইজরায়েল সেনা এবং রাষ্ট্র। আর গোটা বিশ্ব বলে চলেছে যে হামাস একটি উগ্রপন্থী সংগঠন যারা ১,২০০ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। কিন্তু ইজরায়েল লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ গাজাবাসীকে হত্যা করার পরেও সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র নয়, কারণ তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পাশ্চাত্য ক্ষমতাধরদের প্রতিনিধি। ক্ষমতাই স্থির করে দেয় যে কে সন্ত্রাসবাদী, আর কে নয়। আমরা সাধারণ মানুষ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত আখ্যানকে সত্য বলে ধরে নিয়ে হামাসের বিরোধিতা করি, আর ইজরায়েলের প্রশ্নে নরম হয়ে যাই।
যেমন ইজরায়েলের গাজা আক্রমণ করা অন্যায় নয়, ঠিক তেমনই রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ করাও ভীষণ অন্যায়। 'আরেক রকম'-এর সম্পাদকীয় নীতি যুদ্ধবিরোধিতা। তাই আমরা মনে করি যেকোনো যুদ্ধই অন্যায়। কিন্তু পশ্চিমের দু'মুখো নীতির সমালোচনা করা আমাদের কর্তব্য বলে আমরা মনে করি। তাই নির্দ্বিধায় আমরা বলতে পারি যে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে অন্যায় করে থাকলে ইজরায়েলও একই দোষে দুষ্ট। ইজরায়েলকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র সাহায্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে কন্ঠস্বর রোধ করার চেষ্টা করবে, আর অন্যদিকে রাশিয়াকে পর্যুদস্ত করার সমস্ত নীতি গ্রহণ করবে, এই দ্বিচারিতার সত্য উন্মোচন করা দরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক তথা দেশীয় মিডিয়া আমেরিকা বর্ণিত আখ্যান দ্বারা এতটাই মুগ্ধ, তাদের মালিকরা বাণিজ্যের জন্য আমেরিকার উপরে এতটাই নির্ভরশীল যে ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতা ও মানুষ মারার নীতির কথা তারা মুখে আনতে ভয় পায়।
৮৯ সেকেন্ড বাকি ছিল জানুয়ারি মাসে। কিন্তু তারপরে ইজরায়েল আক্রমণ করেছে ইরানকে। কেন এই আক্রমণ? কারণ ইরান নাকি আণবিক বোমা বানিয়ে ফেলেছে। প্রমাণ আছে? না নেই। আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার প্রধান জানিয়েছেন যে ইরান আণবিক বোমা বানাচ্ছে এমন কোনো প্রমাণ তাদের হাতে নেই। মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান মার্কিন সাংসদদের জানিয়েছিলেন যে ইরান আণবিক বোমা তৈরি করছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। অথচ ইজরায়েল বলছে ইরান বোমা বানাচ্ছে তাই তারা ইরানের উপর প্রবল আক্রমণ নামিয়ে আনে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অন্য কোনো দেশের উপর সামরিক আক্রমণ সম্পূর্ণভাবে বেআইনি যদি না তা রাষ্ট্রপুঞ্জের সিকিউরিটি কাউন্সিল দ্বারা অনুমোদিত হয়। ইজরায়েল বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেইসবের ধার ধারে না। তাই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তারা আক্রমণ চালিয়েছে ইরানের উপর। ইরান Neuclar Non-proliferation Treaty (NPT)-তে সই করেছে বহু বছর আগে। এই চুক্তি অনুযায়ী যেকোনো দেশ যারা এই চুক্তির অংশ তারা পারমানবিক শক্তিকে অসামরিক কাজে ব্যবহার করতে পারবে। শুধু তাই নয়, যেই দেশের কাছে এই প্রযুক্তি রয়েছে, তারা অন্যান্য দেশগুলিকে পারমানবিক শক্তির ব্যবহার করতে সাহায্য করবে। কিন্তু এই দেশগুলির পারমানবিক বোমা বানানোর অধিকার নেই। ইরান এই চুক্তির উল্লঙ্ঘন করেছে, এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে একটি দেশ রয়েছে যে লাগাতার এই চুক্তির উল্লঙ্ঘন করেছে - ইজরায়েল। প্রথমত, ইজরায়েল এই চুক্তিতে হস্তাক্ষর করেনি। তা না করে তারা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে পারমানবিক বোমা বানিয়েছে। এবং আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থাকে তারা কখনই তাদের দেশের পারমানবিক প্রযুক্তির জরিপ করতে দেয়নি। যারা বেআইনিভাবে পারমানবিক বোমা তৈরি করে আরব দেশগুলিকে লাগাতার শাসিয়ে চলেছে, তারাই এখন 'ইরান বোমা বানিয়ে ফেলেছে' এই মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বোমাবর্ষণ করেছে একটি স্বাধীন দেশের উপর। ইরানের পদার্থবিদ এবং সেনা নেতৃত্বকে ইজরায়েল হত্যা করেছে। ইরানের নেতা খোমেইনিকে হত্যা করার হুমকিও দেয় ইজরায়েল।
ইজরায়েল ভুলে গিয়েছিল যে ইরান গাজা নয়। গাজায় বসবাসকারী মানুষের কোনো সামরিক শক্তি নেই, মিসাইল নেই, বায়ুসেনা নেই। ইরানের আছে। ইরান বহু বছর ধরে ইজরায়েলের আক্রমণকে প্রতিহত করার পরিকল্পনা করেছে। তাই তাদের উপর আক্রমণ হওয়া মাত্রই, একের পর এক আধুনিক প্রযুক্তির মিসাইল আছড়ে পড়েছে ইজরায়েলের রাজধানীসহ একাধিক শহরে। বহু সামরিক ও অসামরিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে ইজরায়েলকে, তাদের ইতিহাসে প্রথমবার। তাদের তথাকথিত লৌহ প্রাচীরকে চূর্ণ করে ইরানি মিসাইল আছড়ে পড়েছে ইজরায়েলে।
এই পরিস্থিতিতে পাড়ার ছোট মস্তান যেমন শহরের বড়ো মস্তানকে ডেকে নিয়ে আসে নিজের পিঠ বাঁচাতে, তেমনই ইজরায়েল ছুটে গেছে তার দাদা আমেরিকার কাছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ইরানের সঙ্গে পারমানবিক বিষয়ে আলাপ আলোচনা চালাচ্ছিল, যেই সময় ইজরায়েল ইরান আক্রমণ করে। অনেকের মতে ট্রাম্প সবুজ সংকেত না দিলে ইজরায়েল এই আক্রমণ করত না। অর্থাৎ ট্রাম্প প্রথম থেকেই সব জানতেন, কিন্তু তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনার নাটক করছিলেন। আলোচনা চলাকালীন আক্রমণ হবে তা ইরান হয়ত ভাবতে পারেনি। তাই শুরুতে কিছুটা তারা অপ্রস্তুত দেখালেও, অচিরেই ইজরায়েলের উপর তীব্র আঘাত হানে। এই পরিস্থিতিতে আবার ইজরায়েলকে আমেরিকার সাহায্য নিতে হয়, ইরানের পারমানবিক ঘাঁটিগুলি ধ্বংস করার জন্য।
রাতের অন্ধকারে ইরানের পারমানবিক ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায় মার্কিন বোমারু বিমান। একুশ শতকে দাঁড়িয়ে পারমানবিক স্থলে বোমা আক্রমণ বিরলতম ঘটনার মধ্যে পড়ে। এর ক্ষতি কতটা হতে পারে তা নিয়ে ট্রাম্প চিন্তিত নন। আক্রমণের পরে জানানো হয় যে ইরানের পারমানবিক ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীকালে বিশেষজ্ঞরা জানান যে ক্ষতি হলেও ইরানের পারমানবিক ক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা যায়নি। করা গেছে কি করা যায়নি সেই বিতর্কের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল এই কথা যে ইরানের কাছে কোনো বোমা ছিল না। তাই যদি কিছু ধ্বংস করা হয়েও থাকে, তা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে করা হয়েছে কারণ অসামরিক ক্ষেত্রে পারমানবিক শক্তির প্রয়োগ করার অধিকার ইরানের রয়েছে NPT সাক্ষরকারী হিসেবে। এই আক্রমণের জবাবে ইরান কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়।
আপাতত ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন। দুই দেশের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হয়েছে। এই যুদ্ধে হার যদি হয়ে থাকে তা ইজরায়েলের হয়েছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানেয়াহু বলেছিলেন যে ইরানের সরকারের পতন তাঁর লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যপূরণ হয়নি। ইরানের পারমানবিক শক্তিও সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি। বরং ইজরায়েলের অপ্রতিরোধ্যতার মিথ ধ্বংস হয়েছে।
অন্যদিকে, খোমেইনি শাসিত ইরানে নারী অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে যে আন্দোলন বহু বছর ধরে হয়ে এসেছে তারাও ইজরায়েলের বিরোধিতা করেছে। বলা যেতে পারে ইজরায়েলের আক্রমণের ফলে খোমেইনি-র শাসন ব্যবস্থা ইরানের অভ্যন্তরে শক্তিশালী হয়েছে। ইরানের সরকার কে চালাবে তা একান্তভাবেই সেখানকার মানুষের বিষয়। ইরানের গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে আমরা সবসময় থাকব। কিন্তু ইজরায়েল ও আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে আমাদের লাগাতার অবস্থান নিতে হবে।
৮৯ সেকেন্ড বাকি ছিল ইজরায়েল ইরান যুদ্ধের আগে। এই ভয়াবহ যুদ্ধ, পারমানবিক স্থলে বোমা আক্রমণের পরে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে আমরা মানবসভ্যতাকে ধ্বংস করার দিকে আরও একটি সুদৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছি। এখন দেখার আমাদের হাতে আর কতটা সময় বাকি!