আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৫ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩২

প্রবন্ধ

অদ্ভুত আঁধার এক

শুভনীল চৌধুরী


ধরুন একটি টাইম মেশিনে চেপে আপনি পৌঁছে গেলেন ৮০ বছর আগের পৃথিবীতে। ফ্যাসিবাদ পরাস্ত হয়েছে। হিটলার, মুসোলিনি মৃত। সোভিয়েত লাল ফৌজ পৌঁছে গিয়েছে বার্লিন অবধি। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী অজস্র ইহুদী মানুষ মৃত হওয়ার পরেও, আরও বহু মানুষকে মুক্ত করা গেছে। ইউরোপ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, কিন্তু পুনর্গঠনের কাজও শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ১০০ বছর ধরে চলে আসা মুক্ত বাজার অর্থব্যবস্থার বিপরীতে রাষ্ট্র নির্ভর অর্থব্যবস্থার দিকে পা বাড়াচ্ছে ইউরোপ তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে প্রায় ২৫ বছর উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার আগের সমস্ত রেকর্ডকে ছাপিয়ে যাবে, শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত আয়ও বাড়বে। এই সময় থেকে কয়েক দশকের মধ্যে মনে হবে যেন পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে গেছে মানুষের উন্নতির দিকে।

একই সময় ভারত তথা এশিয়া ও আফ্রিকা জুড়ে তীব্র সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, মাও সে তুঙ, নাসের-এর মতন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নেতারা কোটি কোটি মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছেন যে মুক্তি আসন্ন। সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনের ফলে জন্ম হবে একের পর এক স্বাধীন দেশের - ভারতের স্বাধীনতা, চিনের বিপ্লব পৃথিবীর বৃহদাংশের মানুষকে সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মুক্তি দেবে।

কিন্তু তাই বলে কি পুঁজিবাদের চাকা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই সময়? নিশ্চই নয়। কিন্তু মানুষের সামনে পুঁজিবাদের বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার স্বপ্ন জ্বালিয়ে রেখেছিল সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজবাদী শিবির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বীরের ভূমিকা, ১৯৩০-এর মহামন্দার সময়েও সোভিয়েতে কর্মসংস্থান এবং শ্রমিকদের উন্নয়ন চমকে দিয়েছিল এমনকি রবীন্দ্রনাথকেও। বলা যেতে পারে যে সোভিয়েতের অর্থব্যবস্থার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই তৃতীয় বিশ্বে পরিকল্পনা নির্ভর অর্থব্যবস্থার চিন্তা বাস্তবায়িত করা হয়। আবার ইউরোপে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণাও প্রভাবিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাফল্যের কারণে।

এবারে আসুন ১৯৯১ সালে। সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন যা এক সময়ে মানুষের মুক্তির দিশারি হয়েছিল, যা গোটা পৃথিবীর মানুষকে বিকল্প সমাজ ও অর্থব্যবস্থার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে সাহস জুগিয়েছিল, তা ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো। সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজবাদী শিবিরের পতন কেন হয়েছিল তা নিয়ে লেখার পরিসর এই প্রবন্ধে নেই। তবু বলতেই হয় যে একদিকে পুঁজিবাদী সমাজের উন্নয়ন তথা ঠাণ্ডা যুদ্ধের চাপ, এবং অন্যদিকে দীর্ঘ বহু বছরের পার্টির একনায়কতন্ত্র তথা গণতন্ত্রের অভাব সোভিয়েতের কোমর ভেঙে দেয়। সমাজবাদী শিবিরের পতনের পরে উল্লসিত মার্কিন তথা পশ্চিমী লিবেরাল চিন্তাবিদরা ঘোষণা করে দিলেন যে ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেছে। মানব সভ্যতার সর্বোচ্চ সোপান হল মুক্তবাজার নির্ভর অর্থব্যবস্থা এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্র। এর কোনো বিকল্প সম্ভব নয়। আর কোনো মতাদর্শের জন্ম হবে না। লিবেরাল গণতান্ত্রিক মতাদর্শ ব্যতিরেকে বাকি সব আদর্শ মৃত। অর্থাৎ, এই চিন্তাবিদরা বললেন যে মানুষের উন্নয়ন আপাতত শুধু লিবেরাল গণতন্ত্রের মধ্য দিয়েই হবে। ফ্যাসিবাদকে আমরা আগেই পরাজিত করে ফেলেছি। এবারে পরাজিত হয়েছে সমাজতন্ত্র। এখন শুধু একমুখী উন্নয়ন। আর কোনো বিকল্পের কথা কেউ ভাববেও না।

এটি কাকতালীয় নয়, যে এই একই সময়, অর্থাৎ ১৯৯০ দশকের শুরু থেকে গোটা বিশ্ব তথা ভারতে বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া ত্বরাণ্বিত হয়। আবারও তাত্ত্বিকরা বলতে থাকেন যে এটাই একমাত্র পথ। গোটা বিশ্ব এখন একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাদের সুফল চুঁইয়ে পড়বে ধনী দেশের গরিব মানুষের উপরে এবং গরিব দেশের আপামর জনসাধারণের উপরে। তাই আবারও বলা হল একদিকে লিবেরাল বুর্জোয়া গণতন্ত্র এবং অন্যদিকে মুক্ত বাজার নির্ভর বিশ্বায়নের অর্থনীতি, এই দুই ছাড়া গতি নেই। মানুষের উন্নয়ন, মুক্তি সবই আসবে এই পথ ধরেই। বাকি সব পথ পরিত্যাজ্য।

সেই পথ ধরে কি পৃথিবীতে মুক্তির আলো এল? গোটা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখুন কী চলছে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা পুঁজিবাদী দুনিয়ার পয়লা নম্বর দেশ তথা মোড়ল, সেখানে আর্থিক বৈষম্য সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। যেই আমেরিকা তাদের ম্যানুফাকচারিং শিল্প নিয়ে গর্ব করত, তা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আফ্রিকান আমেরিকান বা কালো মানুষেরা এখনও সমস্ত সূচকে সাদা মানুষদের থেকে কয়েক যোজন পিছিয়ে আছেন। এবং গোটা দেশ জুড়ে চরম বর্ণবাদের চর্চা বেড়েছে। এর ফল একটাই, ট্রাম্পের মতন একজন দক্ষিণপন্থী নেতার আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদে দুই-দুই বার নির্বাচিত হওয়া।

প্রথম ট্রাম্পের সময়কালে তিনি মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর গড়তে চেয়েছিলেন, অভিবাসী বা বিশেষ করে মুসলমান অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। হেরে যাওয়ার পরে তিনি হার স্বীকার করেননি। বরং তাঁর সমর্থকরা মার্কিন সংসদ আক্রমণ করে। এত কিছুর পরেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন নিয়ে আবারও রাষ্ট্রপতি। ইলন মাস্কের মতো একজন ধনকুবের তাঁকে পূর্ণ সমর্থন দেন। তাঁকে ট্রাম্প দায়িত্ব দেন সরকারী বাজে খরচ ছেঁটে ফেলার। ক্ষমতায় আসার পরে সমস্ত দেশের উপর আমদানি মাসুল চাপান। গোটা অর্থব্যবস্থাকে ধ্বংসের সামনে দাঁড় করিয়ে, তিনি কিছুটা নরম হন। আমদানি মাসুল কিছুটা কমান। দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে তাঁর নিশানায় নিয়ে আসেন। হার্ভার্ড বা কলম্বিয়ার মতন বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারী অনুদান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন। ইজরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা যাবে না বলে ঘোষণা করেন। বৈষম্য বা সমকামীতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে কোনো আলোচনা করা যাবে না, এই ফরমানও ঘোষণা করেন। এবং বিদেশ নীতিতে ইজরায়েলকে পূর্ণ সমর্থন জানান গাজার গণহত্যা চালিয়ে যাওয়ার জন্য।

ইজরায়েল বিগত প্রায় দুই বছর ধরে গাজা ভূখণ্ডে যে হত্যালীলা চালাচ্ছে তার তুলনা আর নেই বললেই চলে। একটি জনগোষ্ঠী যাদের কোনো সামরিক বাহিনী নেই, বিমানবাহিনী নেই, যাদের একদিকে ভূমধ্য সাগর, আরেকদিকে মিশর (যার সীমানা বন্ধ) এবং আরেক দিকে ইজরায়েল - অর্থাৎ যাদের পালানোর কোনো জায়গা নেই - তাদের উপরে নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করে চলেছে ইজরায়েল। প্রকাশ্যে সংঘটিত হয়ে চলেছে একটি গণহত্যা। কিন্তু কেউ কিছু বলার নেই। রাষ্ট্রসঙ্ঘ নীরব দর্শক। মাঝে মাঝে সংঘর্ষ বিরতির প্রস্তাব পাশ করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ভোট দিয়ে সেই প্রস্তাব আটকে দেয়। ভারত এই মানবিক প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকে। অর্থাৎ গাজার আরব মানুষের হয়ে বলার মতন কেউ নেই। তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করার নীতি নিয়ে চলছে নেতানেয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইজরায়েল।

যারা গাজার মানুষের পক্ষে ন্যূনতম সমর্থন জানানোর চেষ্টা করেছে, তাদেরকেও নিকেশ করার নীতি নিয়েছে ইজরায়েল। সিরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, লেবাননে হিজবুল্লাহ প্রধানকে হত্যা এবং সর্বশেষে ইরানের উপরে মিসাইল আক্রমণ ইজরায়েলের যুদ্ধবাজ মতাদর্শের দলিল দেয়। এই বর্বরতা ইজরায়েল চালিয়ে যেতে পারছে কারণ তার পেছনে রয়েছে মার্কিন সমর্থন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পেয়াদা ইজরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি সম্পূর্ণভাবে বিঘ্নিত করছে।

ভাবলে অবাক হতে হয় যে যেই মানুষদের হিটলার গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করল, যাদের উপর কয়েক শতাব্দী ধরে অত্যাচার হয়েছে ইউরোপের বুকে, সেই ইহুদী মানুষদের নামে তৈরি হওয়া রাষ্ট্র আপাতত গণহত্যার কাণ্ডারী হয়ে উঠেছে। দার্শনিকভাবে ভাবলে মনে হবে মানুষের হিংস্রতার আদিম প্রবৃত্তিকে আমরা যে আজও সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে পারিনি, তার প্রমাণ ইজরায়েল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দার্শনিকতার স্থান নেই। আসলে ইজরায়েলকে প্যালেস্টাইনের উপরে চাপিয়ে দেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং এখন তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। বহু মানুষের রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ইজরায়েলের জন্ম। ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন সমস্যার যে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের কথা প্রায় সমস্ত দেশ বলে (ইজরায়েল সহ), সেই দুই-রাষ্ট্র নির্ভর সমাধানকে নাকচ করার উদ্দেশ্যেই নেতানেয়াহুর এই গণহত্যা। যদি প্যালেস্টিনীয় মানুষকেই সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়, যদি তাদের জমি সম্পূর্ণভাবে দখল করে নেওয়া যায়, তাহলে তারা আর রাষ্ট্র বানাবে কী করে? তাই একদিকে গাজা ভূখণ্ডে গণহত্যা এবং অন্যদিকে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে লাগাতার বেআইনিভাবে প্যালেস্টিনীয়দের জমি দখল এবং ইহুদীদের সেখানে জোর করে দাখিল করানোর নীতি নিয়েছে ইজরায়েল। যদি নেতানেয়াহুর হাতে প্যালেস্টিনীয়দের ভাগ্য ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তিনি যে সবাইকে হত্যা করবেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এইসব কথা বললেই কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে হামাস নিয়ে নীরব কেন? হামাস নিয়ে নীরবতার কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু হামাসকে পিএলও-র মতন ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে ইজরায়েল এবং নেতানেয়াহু। গাজা ভূখণ্ড থেকে পিএলও-র নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ারও নেপথ্যে রয়েছে ইজরায়েলের নীতি। লাগাতার আন্দোলন করার পরেও পিএলওকে কোনোরকম রাজনৈতিক সুবিধা পেতে দেয়নি ইজরায়েল। বরং পদে পদে গাজা ভূখণ্ডে পিএলও-র নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে গেছে ইজরায়েল। এর ফলে মানুষ বেশি করে হামাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে, পিএলও ইজরায়েলের চাপে এবং নিজেদের সমস্যায় গাজা থেকে প্রায় বিলীন হয়ে যায়। এই রাজনৈতিক পরিসরে পড়ে থাকে একমাত্র হামাস। দিনের পর দিন যাদের উপরে গুলি চালানো হয়েছে, বোমাবর্ষণ করা হয়েছে, যাদের গণতান্ত্রিক কন্ঠস্বরকে টুঁটি চেপে হত্যা করা হয়েছে, তারা যখন আর কিছু না পেয়ে হামাসের মতন একটি মৌলবাদী শক্তিকে সমর্থন জানাচ্ছে, তখন যারা তাদের হত্যা করতে করতে খাদের কিনারে নিয়ে এল, সেই ইজরায়েল এবং তাদের প্রতিনিধি পশ্চিমী সংবাদমাধ্যম গাজার মানুষকে বলি দিতে কুন্ঠাবোধ করছে না, তাদেরকে বোমার সামনে দাঁড়িয়েও শুনতে হচ্ছে যে তারা সন্ত্রাসবাদী। হামাস ইজরায়েলের উপর যে আক্রমণ চালিয়েছে তার নিন্দা সর্বস্তরে করা হয়েছে। কিন্তু কত হাজার গাজাবাসীকে হত্যা করলে ইজরায়েল বলবে যে তাদের প্রতিশোধ শেষ হল? এর কোনো উত্তর নেই। কারণ তারা সম্পূর্ণভাবে প্যালেস্টাইনকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। ইজরায়েলের এই ভয়াবহ চিন্তাকে রোখার আপাতত কেউ নেই।

আপনি যদি ভাবেন যে ইজরায়েল আর ট্রাম্প তো আমার থেকে অনেক দূরে। আমি আছি ভারতে। এখানে এই সব যুদ্ধবাজদের সমস্যা নেই। অতএব আমি সুখে আছি। এই ভাবনা একাধিক কারণে ভুল। প্রথমত, ইউরোপ জুড়ে বর্তমানে ফ্যাসিবাদী রাজনীতিবিদদের সমর্থন বাড়ছে। হাঙ্গেরি, পোলান্ডের মতন দেশে এই ফ্যাসিস্ট-রাই সরকার পরিচালনা করছে। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড্সের মতন দেশে ফ্যাসিস্ট শক্তি বেড়েছে বহুগুণ। গোটা পৃথিবী জুড়ে উগ্র দক্ষিণপন্থীদের ক্ষমতা বেড়েই চলেছে।

পৃথিবীর এই দক্ষিণপন্থী ঝোঁকের ভারতীয় সংস্করণ আমরা দেখছি বিজেপি তথা আরএসএসের উত্থানের মধ্যে। দেশের স্বাধীনতার সময় ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া তৃতীয় বিশ্বের উত্তরউপনিবেশিক ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। আপাতত মোদী সরকার এই ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের উপর লাগাতার আক্রমণ করে চলেছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে রাম মন্দির তৈরি, নাগরিক আইন, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ ইত্যাদি নীতির মধ্য দিয়ে বিজেপি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের উপরে লাগাতার কুঠারাঘাত করে চলেছে। সুপ্রিম কোর্ট বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যাদের দায়িত্ব ছিল সংবিধানকে রক্ষা করার, তারাও বিজেপি সরকারের এই নীতিগুলির উপরে সীলমোহর লাগিয়েছে। কোনো অবস্থাতেই তারা মোদী নেতৃত্বাধীন সরকারের মূল নীতিগুলিকে প্রশ্ন করতে রাজি হয়নি। এর উলটো পিঠে রয়েছে লাগাতার সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা হিংসা। গণপিটুনি, দাঙ্গা, সোশাল মিডিয়ায় লাগাতার মুসলমান বিরোধী প্রচার, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যেই ভাষায় মুসলমানদের আক্রমণ করেন, এই সব দেখে বোঝা যায় যে বিজেপি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতাকে শুধু সংবিধান নয়, সমাজ থেকেই উৎখাত করতে চায়।

তাই আবার যদি আমরা ৮০ বছর আগের ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে মনে হবে ফ্যাসিবাদ পরাজিত হলেও আবারও বর্তমানে বিভিন্ন প্রকারের ফ্যাসিবাদ এবং গণহত্যার আদর্শ পৃথিবীতে থাবা গেড়ে বসেছে। ৮০ বছর পরে যেন ঘড়ির কাঁটা আবার পিছনের দিকে ফিরে গেছে। কেন এমন হল, তা নিয়ে অন্য প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে। কিন্তু ৮০ বছর আগে এই দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে জোরালো চ্যালেঞ্জ ছিল। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক শিবির অন্যদিকে তৃতীয় বিশ্বের দেশে উপনিবেশবাদ বিরোধী গণআন্দোলন গোটা পৃথিবীতে মানুষের অধিকারকে সম্প্রসারিত করেছিল। পিছু হটেছিল দক্ষিণপন্থা।

১৯৯১ সালের পর থেকে মনে করা শুরু হল যে লিবেরাল পুঁজিবাদই মানুষের সামনে একমাত্র পথ। এমনও ভাবা হয়েছিল যে লিবেরাল পুঁজিবাদের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ফ্যাসিবাদকে রুখে দেওয়ার রসদ। লিবেরাল পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে এমনভাবে গঠিত করা হয়েছে যেখানে ফ্যাসিবাদী কোনো শক্তি গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় আসতে পারে না। এই ধারণাগুলি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাম্প, মোদী, এরদোগান সহ পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দক্ষিণপন্থী শক্তি ক্ষমতায় এসেছে লিবেরাল পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে। তাদেরকে গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংস করে ক্ষমতার্জন করতে হয়নি, যা হিটলারকে করতে হয়েছিল। অতএব, লিবেরাল পুঁজিবাদের জঠরেই বর্তমান দক্ষিণপন্থার জন্ম। তাই এর বিকল্প সমাজ নির্মাণের কল্পনা করা জরুরি। আপাতত এই কথা বলা এবং বোঝা দরকার।

কিন্তু এই কথা বললেই প্রশ্ন উঠবে, তাহলে কি আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের মতন ব্যবস্থা নির্মাণ করতে হবে? এর উত্তরে অবশ্যই না বলতে হবে। গণতন্ত্রহীন কমান্ড অর্থনীতির যে ধারণা সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিল, তার আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা আজকের দুনিয়ায় নেই। লিবেরাল পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের মধ্যে গণতান্ত্রিক যে উপাদান রয়েছে তাকে শক্তিশালী করতে হবে, আর পুঁজিবাদী উপাদানকে দুর্বল করতে হবে। এটি করার ক্ষেত্রে লড়াইয়ের মূল উপাদান হওয়া উচিত একচেটিয়া পুঁজিকে দুর্বল করা। প্রতিযোগিতামূলক অর্থব্যবস্থায়, এমনকি পুঁজিবাদী তাত্ত্বিকদের মডেলেও, একচেটিয়া পুঁজির কোনো জায়গা নেই। লিবেরাল মতবাদের সমস্যা হল এই যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার সর্বাধিক অগ্রাধিকার পায়। অতএব এই মতবাদে ব্যক্তিগত সম্পত্তি যদি আপনি তৈরি করেন, তবে তা যতই বড়ো হোক না কেন, তা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তির সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পূর্ণ মেলবন্ধনই ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। এর ফলে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্তরে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে থাকে এবং তা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়। সবটা যদি হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে মানুষের প্রতিবাদের ঢেউ আটকানো কঠিন হয়ে পড়বে। অতএব প্রয়োজন হয় পরিচিতি সত্ত্বা নির্ভর অপরের নির্মাণের। মুসলমানদের জন্য যত সমস্যা। হিন্দুদের একত্রিত করলেই সব সমস্যা মিটে যাবে। ক্ষমতা এবং অর্থের যুগল মিলনে পুষ্ট মিডিয়ার প্রচারের ফলে মানুষ এই অপরের নির্মাণে আপাতত গলা মেলাচ্ছেন, আর্থিক বৈষম্য কিন্তু বেড়েই চলেছে। লিবেরাল চিন্তাবিদরা এই প্রক্রিয়ার সামনে কোনোরকম বিকল্প তুলে ধরতে পারছেন না। তারা মুক্ত বাজার অর্থব্যবস্থার মূল পৃষ্ঠপোষক, অতএব তার কোনো সমালোচনা তারা করেন না। আবার উগ্র দক্ষিণপন্থার কাছে পরাজিত হয়ে তারা দিশেহারা, কোনো বিকল্প ভাবনা আপাতত তারা মানুষের সামনে রাখতে পারছেন না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বার্নি সান্ডার্স যেই ধরনের কথাবার্তা বলছেন, সরাসরি বিলিয়নেয়ারদের বিরুদ্ধে মত রাখছেন, ধনকুবেরদের উপরে কর চাপিয়ে আর্থিক বৈষম্য কমানোর দাবি জানাচ্ছেন, ইজরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন - এই উদ্যোগগুলি বেশ কিছু মানুষের মনে আশা জাগাচ্ছে। কিন্তু ডেমোক্রাটিক পার্টির কোনো হেলদোল আছে বলে মনে হচ্ছে না। আগামীদিনে ডেমোক্রাটিক পার্টি সান্ডার্সের তোলা প্রশ্নে কী অবস্থান নেয়, তার উপরে মার্কিন রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করবে।

ভারতে কংগ্রেস সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতিকে অবলম্বন করে, জাতি গণনার মতো নীতিকে মানুষের সামনে নিয়ে এসে একটি বিকল্প রাজনীতি ও মানুষের জোট নির্মাণ করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও লাগাতার প্রশ্ন তুলছে। এই উদ্যোগে আরও বেশি করে রাজনৈতিক দল এবং মানুষ সামিল হোক, এটাই আমরা চাইব। বামপন্থী শক্তিদের এই সমস্ত প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে। যদিও আপাতত একথা বলতেই হবে যে দক্ষিণপন্থা যথেষ্ট শক্তিশালী মাটির উপরে এখনও দাঁড়িয়ে।

বর্তমান পৃথিবীতে যেই অন্ধকার নেমে এসেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত হয়ে চলেছেন, তার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নতুন রাজনৈতিক ভাষ্যের প্রয়োজন। আমাদের দেশে সংবিধান বাঁচানো প্রয়োজন। দক্ষিণপন্থা চিরস্থায়ী হতে পারে না। দক্ষিণপন্থাকে পরাজিত করার লক্ষ্যে প্রগতিশীলদের লাগাতার লড়াইয়ের ময়দানে থাকতে হবে, নতুন কথা মানুষকে বলতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।