আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৫ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩২

প্রবন্ধ

সংবিধান বাঁচাও, দেশ বাঁচাও (কনভেনশনের প্রস্তাবনা)


সংবিধান বাঁচাও, দেশ বাঁচাও

প্রস্তাবনা

এই কনভেনশন অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত অশুভ শক্তির দ্বারা ভারতের সংবিধানের মূল কাঠামোর উপর লাগাতার আঘাত হানায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। "আমরা ভারতের জনগণ" একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছিলাম। আমরা সকল নাগরিকের জন্য সুনিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম (১) সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; (২) চিন্তা, মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম ও উপাসনার স্বাধীনতা; (৩) সুযোগের সমতা ও সমমর্যাদা; এবং (৪) ব্যক্তির মর্যাদা এবং জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষায় সৌভ্রাতৃত্বের প্রসার। আজকের সংকটপূর্ণ সময়ে সংবিধানের প্রস্তাবনায় থাকা এই শপথকেই আমরা পুনরায় ব্যক্ত করছি।

ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান

গত ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওতে বর্বরোচিত সন্ত্রাসবাদী হামলায় ২৬ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যুকে আমরা গভীর শোকের সঙ্গে স্মরণ করছি, এবং স্বজনহারা প্রত্যেকটি পরিবারের প্রতি সংহতি জানাচ্ছি। পহেলগাঁও হামলায় সন্ত্রাসীরা ধর্মের ভিত্তিতে পর্যটকদের আলাদা করে খুন করেছিল। এটা ছিল আমাদের সাংবিধানিক মূল্যবোধের উপর একটি নির্মম কুঠারাঘাত। ১৭ এপ্রিল ইসলামাবাদে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের দেওয়া সাম্প্রদায়িক ও উস্কানিমূলক ভাষণও ভারতের সংবিধানকে সরাসরি আঘাত করে। দ্বি-জাতিতত্ত্বের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি বলেনঃ
"আমাদের পূর্বপুরুষরা বুঝেছিলেন, আমরা হিন্দুদের থেকে জীবনের প্রতিটি সম্ভাব্য ক্ষেত্রেই ভিন্ন... এইটাই দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তি, যে আমরা দুটি আলাদা জাতি, এক নই।"

আমরা যেকোন ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকেই দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। এই বিকৃত চিন্তাধারাই দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তহীন রক্তপাত, যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। ১৯৪৭-এর মর্মান্তিক দেশভাগ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গণহত্যা, ১৯৮০-র দশক থেকে ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাম্প্রদায়িকতা এবং পাকিস্তানে ধর্মীয় সামরিকবাদের উত্থান এবং উপমহাদেশজুড়ে গত কয়েক দশকে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের ঘটানো একের পর এক সন্ত্রাসী আক্রমণ - যার সর্বশেষ উদাহরণ পহেলগাঁও হামলা - এক একটি সাক্ষ্য বহন করছে।

দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ কেবলমাত্র ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর ভিত্তি করেই গড়ে তোলা সম্ভব। স্বাধীনতা সংগ্রামের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানই পারে এইরকম ভবিষ্যতের দিশা দেখাতে।

আমরা শ্রদ্ধা জানাই পহেলগাঁওর টাট্টু ঘোড়ার সহিস সৈয়দ আদিল হুসেন শাহ-কে, যিনি সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে শহিদ হন। তিনি শুধু নিরীহ পর্যটকদের নয়, ভারতের সাংবিধানিক আদর্শকেই রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন।

অবিলম্বে ডাকতে হবে সংসদের বিশেষ অধিবেশন

সীমান্তের ওপারের জঙ্গি ও তাদের সামরিক পৃষ্ঠপোষকদের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমরা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর 'অপারেশন সিঁদুর'-কে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক প্রচারের স্বার্থে অপব্যবহারের আমরা তীব্রভাবে নিন্দা জানাচ্ছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পরেও মোদী সরকার বলে চলেছে যে 'অপারেশন সিঁদুর' এখনও শেষ হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয় জবাবদিহি এড়িয়ে দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ চালানোর উদ্দেশ্যেই এই বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। সংসদ এবং দেশের জনগণের থেকে জাতীয় সুরক্ষা সংক্রান্ত প্রকৃত দায়ভার গোপন রেখে মোদী সরকারের প্রতিনিধিরা বিদেশি সরকার ও মিডিয়ার সামনে আত্মপ্রচারে ব্যস্ত।

এই সুযোগে একদিকে আরএসএস-বিজেপি দেশজুড়ে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে সরকারপন্থী মিডিয়া যুদ্ধোন্মাদনা ও মিথ্যা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকার চরমভাবে আক্রান্ত। কর্নেল সোফিয়া কুরেশির সম্বন্ধে জঘন্য সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের পরেও মধ্যপ্রদেশে বিজেপির মন্ত্রী বিজয় শাহ-কে এখনও গ্রেপ্তার করা হয়নি, অথচ অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলি খান মাহমুদাবাদকে ফেসবুক পোষ্টে যুদ্ধজিগিরের বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ বিরোধিতা করার জন্য জেল খাটানো হয়েছে।

এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্‌-র তত্ত্বাবধানে ছত্তিসগড়ে নিরাপত্তা বাহিনী আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে বিনা বিচারে গণহত্যা শুরু করেছে। মোদী সরকারকে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে সংবিধানপ্রদত্ত নাগরিক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের উপর উপর্যুপরি আঘাত অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

পহেলগাঁও হামলার সন্ত্রাসীদের এখনও গ্রেপ্তার না করতে পারার ব্যর্থতা নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। পহেলগাঁও হামলায় নিরাপত্তা গাফিলতির দায় কাদের, সেটাও নির্ধারণ করা জরুরি। আমাদের দাবি, অবিলম্বে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে পহেলগাঁও হামলা, অপারেশন সিঁদুর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে হবে।

সংবিধান বিরোধী আইন প্রত্যাহার করতে হবে

পহেলগাঁও হামলার পর, চরম দুর্দশায় পড়া জম্মু-কাশ্মীর এবং পাঞ্জাবের সাধারণ মানুষের প্রতি আমরা সংহতি জানাচ্ছি। নিয়ন্ত্রণ রেখার নিকটবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানের গোলাবর্ষণে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন, আরও বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, পর্যটন শিল্পও মুখ থুবড়ে পড়েছে। সরকারকে অবিলম্বে আক্রান্তদের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণ এবং সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণ রাজ্যত্ব এবং সংবিধান প্রদত্ত সমস্ত রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা যথাশীঘ্র ফিরিয়ে দিতে হবে।

সংসদে একের পর এক সংবিধান বিরোধী আইন পাশ করিয়ে মোদী সরকার ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সংবিধানকে ক্রমাগত দুর্বল করেছে। সম্প্রতি সংসদে পাশ হওয়া ওয়াকফ সংশোধনী আইন, ২০২৫ ধর্মীয় স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর বড়সড় আঘাত হেনেছে। এর আগে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯ এবং জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সংক্রান্ত সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ করার মতন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সমস্ত আইনের একটাই লক্ষ্য, ভারতের মুসলিমদের বিভিন্ন অধিকারগুলো একে একে কেড়ে নিয়ে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা।

মুসলমান সহ বিভিন্ন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শাসন ব্যবস্থা মোদী সরকার চালু করেছে, তা ভারতের সংবিধানের মূল চেতনা ও কাঠামোর পরিপন্থী। আমরা ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের কাছে আবেদন জানাই, এই সংবিধান বিরোধী আইনগুলো বাতিল করতে হস্তক্ষেপ করুন।

পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে

পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে গণতন্ত্রের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। সরকারি মদতে হিংসা এবং দেদার ভোট লুটের মাধ্যমে নির্বাচনগুলি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। রাজ্য প্রশাসনের অপদার্থতা এবং পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক হিংসা মাথা চারা দিচ্ছে বারবার। সম্প্রতি মুর্শিদাবাদে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক দমনপীড়নের স্বার্থে ব্যবহার করার ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার মৌলিক দায়িত্বপালনেই পুলিশ কার্যত অক্ষম হয়ে পড়েছে।

দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতা সরকারের প্রতিটি স্তরকেই গ্রাস করেছে, যার ফলে জনসম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের লুঠতরাজ একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। স্কুল শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পঁচিশ হাজারের বেশি শিক্ষকের চাকরি বাতিল হওয়ায় স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে। ২০২৪ সালের আগস্টে কলকাতার আর. জি. কর হাসপাতালের মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুন, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবক্ষয়ের জ্বলন্ত প্রমাণ। অভয়া আজও ন্যায়বিচার পায়নি।

আদ্যোপান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপরাধীদের দ্বারা পরিচালিত তৃণমূল কংগ্রেস সরকার জনগণ ও ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী দলগুলির গণতান্ত্রিক অধিকারকে দমন করে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতায় টিকে আছে। অন্যদিকে বিজেপি নিজেকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরলেও, তাদের বিভাজনের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গকে আরও বেশি করে সাম্প্রদায়িক হিংসা এবং সামাজিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা পশ্চিমবঙ্গের জনগণের কাছে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে সংবিধান রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল শক্তিদের পাশে দৃঢ়ভাবে থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।

প্রস্তাবসমূহ -

• আমরা ভারতের সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করার সাংবিধানিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি।
• আমরা যেকোনো ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকেই প্রত্যাখ্যান করছি এবং এর থেকে জন্ম নেওয়া সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের তীব্র বিরোধিতা করছি।
• আমরা পহেলগাঁও হামলা, অপারেশন সিঁদুর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে অবিলম্বে সংসদ অধিবেশন ডাকার দাবি জানাচ্ছি।
• আমরা ওয়াকফ সংশোধনী আইন ২০২৫, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ ও ৩৭০ ধারা রদের মতন সংবিধান-বিরোধী আইনগুলো বাতিল করতে সুপ্রিম কোর্টের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি।
• আমরা পশ্চিমবঙ্গের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি - স্বৈরাচার এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে সংবিধান রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল শক্তির পাশে দাঁড়ান।

ধন্যবাদান্তে,

প্রসেনজিৎ বসু, আলী ইমরান রামজ (ভিক্টর), অতনু চক্রবর্ত্তী, বিশ্বজিৎ মাইতি, উমর ওয়াইস, কল্লোল মজুমদার

যুগ্ম আহ্বায়কবৃন্দ,
সংবিধান বাঁচাও, দেশ বাঁচাও কনভেনশন

[২ জুন, ২০২৫ তারিখে মৌলালি যুব কেন্দ্র, কলকাতায় অনুষ্ঠিত 'সংবিধান বাঁচাও, দেশ বাঁচাও' কনভেনশনের প্রস্তাবনা।]