আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৫ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩২
সমসাময়িক
ক্রিকেট ও ক্রোনি ক্যাপিটালিজম-এর ককটেল - আইপিএল
জগৎ জুড়ে ক'টা দেশ আছে? কম বেশি ২০০টা। ক'টা দেশ ক্রিকেট খেলে? এই মেরে কেটে গোটা ১০-১২।অর্থাৎ সব মিলিয়ে ধরলে পৃথিবীর ৫ শতাংশ দেশ ক্রিকেট নামে খেলাটা খেলে। ব্রিটিশ উপনিবেশের বাইরের মানুষ ক্রিকেটের নাম শোনেনি। এক সময়ে ক্রিকেট ছিল ব্রিটিশ লর্ডস ওরফে কাজকর্মহীন অভিজাতদের যতসামান্য পরিশ্রমের খেলা - খেলা শেষে উড়ত শ্যাম্পেন! তবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে অভিজাত সমাজ ক্রমবিলীয়মান। শুধু অভিজাতদের নিয়ে আর খেলা চলে না, খেলা চলে এল তৃতীয় বিশ্বের খেলা প্রিয় মানুষের মধ্যে। একদা প্রজারা খেলাতে রাজাকে ঘায়েল করে দিল। আজকে ক্রিকেট জগতে দক্ষিণ এশিয়া হল ক্রিকেট খেলার রাজগৃহ।
এ পর্যন্ত মন্দ ছিল না।
অভিজাতরা খেলত পুরো পাঁচ দিন ধরে, এখন অত সময় নেই। এল ৫০ ওভারের খেলা, দিনরাতের খেলা, শেষে ২০ ওভারের লিগ। সময় পাল্টেছে - ক্রিকেট বিশ্বে ভারতবর্ষের ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টরা জাঁকিয়ে বসেছে। এই শতকে তারা মালকড়ির গন্ধ শুঁকে খেলায়, নাচে, ফিল্মে, জলসায় এক ক্রিকেটীয় খিচুড়ি বানিয়েছে। তার নাম ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) - ভারতবর্ষের গ্রীষ্মকালের চাঁদিফাটা রোদে 'টি টুয়েন্টি ক্রিকেট লিগ'। শুরু হয়েছে ২০০৮ সালে, প্রতি বছর সাধারণত এপ্রিল ও মে মাসে ভারতের কয়েকটি নির্দিষ্ট শহর এবং রাজ্যের প্রতিনিধিত্বকারী দলের মধ্যে আয়োজিত হয় এই খেলা। এর উদ্ভাবক ললিত মোদী। ঠিকই ধরেছেন, ইনিই সেই পলাতক যার বিরুদ্ধে ভারতে আর্থিক অনিয়মের বেশ কয়েকটি মামলা আছে। বিজেপি নেত্রী বসুন্ধরা রাজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে, একসময় রাজস্থানে মোদীর যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব ছিল৷ সেই সময়ে মিডিয়ার কাছে তিনি ছিলেন 'সুপার চিফ মিনিস্টার' - ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের কুৎসিত উদাহরণ।
আইপিএল খেলায় কী নেই! এখানে আছে বাজারি জীবন - আছে দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতি, মেগা বলিউড ফিল্মস্টার, বিভিন্ন শহরের নামে প্রভূত লাভজনক ব্যবসায়িক মডেল, ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভিত্তিক ব্যবস্থা যেখানে দলগুলি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন, আছে উত্তেজক প্রতিযোগিতামূলক নিলামের মাধ্যমে মালিকের অধিকার অর্জন। আছে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ, কর ফাঁকি দেওয়া, লাস্য, গসিপ - যা কিছু এঁটুলি পোকার মতো এই ব্যবস্থার সঙ্গে আসে। স্পনসরশিপ, নাচ, গান, মুক্ত বাজার - আর কী চাই! ক্রিকেটারেরা ক্রিকেট খেলা ছাড়েন - তবে আইপিএল ছাড়েন না - এতো ঠিক ক্রিকেট নয়। ৬ থেকে ৪ সপ্তাহ খেলার বিনিময়ে এ'হল টাকার ফোয়ারা।
এই বছর রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু আইপিএল ২০২৫ জিতেছে। এই উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত ভিড় এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের অব্যবস্থার কারণে পদদলিত হয়ে ১১টি তরতাজা যৌবন-টলমল প্রাণ চিরতরে হারিয়ে গেছে। বহু আইপিএল প্রেমী আহত হয়েছেন।
এটা বিগত শতকের সত্তরের দশক নয়, তবু শুধুমাত্র আইপিএল-এর বিজয়ে ক্রিকেটারদের অভিনন্দন জানাতে গিয়ে ক্রিকেটপ্রেমী দেশের আইটি হাব-এ ১১ জন তরুণ প্রাণ হারায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং ভিডিও ফুটেজ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় আয়োজক এবং কর্তৃপক্ষের মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না। তারা ছিলেন চূড়ান্ত অপ্রস্তুত অবস্থায়।
এদিকে দায় ঝাড়ার সময় এসে গেছে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে অনুষ্ঠানটি একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি-নেতৃত্বাধীন অনুষ্ঠান এবং বোর্ড এর আয়োজক নয়। বিসিসিআই সচিব বলেছেন যে এটি 'একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা'। মুখ্যমন্ত্রীও প্রায় একই স্বরে বলেছেন, এটি একটি বেসরকারি অনুষ্ঠান, ৩৫ হাজার মানুষের বসবার জায়গায় ভিড় করেছিল ২ লক্ষ মানুষ। দোষ মানুষের। যাদের থেকে টিকিট বিক্রি করে টাকার হরির লুট চলে প্রতি বছর।
দায়িত্ব নেই কিন্তু প্রাপ্তি আছে। ২০২৪ অর্থবছরে বিসিসিআই তাদের রাজস্ব বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে, তারা ২০,৬৮৬ কোটি টাকা আয় করেছিল। ২০২৩ অর্থবছরে, তারা ১৬,৪৯৩ কোটি টাকা আয়ের কথা বলেছিল। ১১টি প্রাণের কোনো দায়িত্ব না নিয়ে এবারে তারা আরও কত বেশি মুনাফা করবে সেই ঘোষণা এখনও করেনি।
একই সঙ্গে অন্য সকল অংশীদার এবং বেঙ্গালুরুর আইপিএল কর্ণধাররা প্রচুর টাকা আদায় করে চলেছে।
টিকিট এবং অন্যান্য ম্যাচ-ডে বিক্রি আইপিএল লিগের নিয়মিত রাজস্বের উৎস। আইপিএল ২০২৫-এর মোট সম্প্রচার ফি ছিল ৯,৬৭৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সহ প্রতিটি মরশুমের জন্য টাটা গ্ৰুপ ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এছাড়াও ২০২৫-এর আরও অনেক স্পনসর ছিল। আইপিএল দলগুলি বিভিন্ন মাধ্যমে বিক্রি হওয়া পণ্যদ্রব্যের মাধ্যমেও বিশাল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে। আবার রাজস্ব ভাগাভাগির মডেলের ভিত্তিতে বিসিসিআই এই সমস্ত থেকে কিছু অংশ কেটে নেয়। এই অর্থের মোট পরিমাণের হদিস পাওয়া সহজ নয়।
অঢেল অর্থ, প্রভূত ক্ষমতা।
শেষ পর্যন্ত সকলেই দুঃখ প্রকাশ করবেন। আবার একটা মৃত্যুর ঘটনা আসবে, সকলে ভুলে যাবে সেই ১১ জন তরুণ তরুণীকে। এই দেশে, The buck stops nowhere, কেউ দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক নয়, তবে অর্থ ভাগাভাগিতে বাধা নেই।
আইপিএল এখন নতুন ভারতের প্রতীক - অশ্লীল, দায়িত্বহীন তবে জমজমাট।