আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৫ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
মানুষ বড়ো সস্তা
১৪০ কোটি মানুষের দেশে দুর্ঘটনায় কিছু মানুষের মৃত্যু হওয়া অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু ভারতে মানুষ যে কতভাবে বেঘোরে মারা পড়তে পারে, তার যেন কোনো হিসেব নেই। প্রিয় ক্রিকেট দলের জয়ের উৎসব পালন করতে গিয়ে আপনি ভিড়ে চাপা পড়ে মরতে পারেন, ভিড় ট্রেনের দরজায় ঝুলতে ঝুলতে পা ফস্কে পড়ে গিয়ে আপনি মৃত্যুবরণ করতে পারেন, স্টেশনে ট্রেন ধরতে গিয়ে ভিড়ের চাপে হোক, অথবা কুম্ভের মহাস্নানের ভিড়ে, অথবা প্লেনে করে বিদেশ সফর করতে গিয়ে, ইত্যাদি বহু উপায়ে মানুষের মৃত্যু ঘটে চলেছে। কিছু ক্ষেত্রে সত্যিই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব নয়। বিরলতম কোনো আকস্মিক ঘটনার জন্য দুর্ঘটনায় মৃত্যু হতে পারে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এইরকম ক্ষেত্রে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু উপরোক্ত ঘটনাগুলি কি সত্যিই এড়ানো যেত না?
প্রথমে তাকানো যাক মুম্বাইয়ের ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনার দিকে। প্রতি বছর মুম্বাই লোকাল ট্রেন পরিষেবার আওতায় ২,৫০০-৩,০০০ মানুষের মৃত্যু হয় দুর্ঘটনায়। অর্থাৎ গড়ে প্রতি দিনে পাঁচ জন প্রাণ হারান। লন্ডনের রেলে প্রতি বছর গড়ে ৩ জনের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়, প্যারিসে ট্রেন দুর্ঘটনায় গড়ে বছরে ৬০ জনের মৃত্যু হয়। আর মুম্বাইয়ে সংখ্যাটা ৩,০০০! গোটা দেশে ২০২২ সালের হিসেব অনুযায়ী ২১,০০০ ব্যক্তির ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ যায়, যার মধ্যে ৭৩ শতাংশ ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারান। কেন আপনি ভিড় ট্রেনে ঝুলতে ঝুলতে যাবেন? কারণ পরিকাঠামোর অভাব। লাগাতার জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। কিন্তু ট্রেন আর বাড়ছে কই? নতুন লাইন, নতুন ট্রেন, আধুনিক গণবাহনের সংখ্যা সমান হারে বাড়ছে না। গরিব মধ্যবিত্ত মানুষ জীবিকার সন্ধানে ট্রেনে করে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছতে চাইছেন গন্তব্যে। সময়ে না পৌঁছলে হয়ত সেদিনের টাকা কাটবে কর্তৃপক্ষ। তাই ঝুঁকি, দৌড়ে গিয়ে ভিড় ট্রেনে ওঠা, তলিয়ে যাওয়া চাকার নিচে, দলাপাকানো মাংসখণ্ড হয়ে পড়ে থাকা মর্গে।
অথবা পুণ্যের লোভে পঙ্গপালের মতন মানুষ চললেন কুম্ভস্নানে। সাত জন্মের পাপ ধুয়ে নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এই জীবনের কাছে তুচ্ছ। তাই ভোরবেলা লক্ষ লক্ষ মানুষ ছুটছেন গঙ্গার দিকে। আবারও পড়ে গিয়ে ভিড়ের পায়ে পিষ্ট হয়ে মৃত বহু মানুষ। অথবা আইপিএল-এ প্রিয় দলের জয়োৎসবে সামিল হতে ভিড়ের চাপে মৃত মানুষ। অথবা প্লেনে করে বিদেশ যাত্রা শেষ হয়ে যেতে পারে এয়ারপোর্টের অদূরে হোস্টেলের মাথায়। সেই হোস্টেলে ডাক্তারি পড়ার ফাঁকে খেতে বসে মারা গেলেন বহু পড়ুয়া ডাক্তার। সবই ঘটে চলেছে আমাদের চোখের সামনে।
যারা দেশটা পরিচালনা করেন, অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতারা, তাদের এই বিষয়ে খুব বেশি মাথাব্যথা নেই। নিয়ম মেনে শোকজ্ঞাপন তারা অবশ্যই করেছেন বা করে চলেছেন। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ স্রেফ পরিকাঠামোর অভাবে ট্রেন থেকে পড়ে মারা পড়ছেন, কিন্তু ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর ভাবনাচিন্তা নেই। বিনিময়ে রয়েছে বিভিন্ন চমক - 'বন্দে ভারত'-এর মতো ট্রেন। এই চমক ট্রেনগুলিকে দেখিয়ে চাপা দেওয়া হচ্ছে রেল পরিকাঠামোর আসল চিত্র। সাধারণ ট্রেনগুলির অবস্থা কীরকম হয়েছে তা নিয়ে নিত্যদিন সংবাদপত্র সাক্ষ্য দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের নেতাদের ওইসব নোংরা পূতিগন্ধময় ট্রেনে চেপে কোথাও যেতে হয় না। তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। অতএব এই সব ‘তুচ্ছ’ বিষয়ে তাদের খুব বেশি মাথাব্যথা নেই।
কোথায় কখন কীভাবে ভিড় জমতে পারে, তা সরকার, পুলিশ প্রশাসন জানতে পারবে না, তা হয় না। যেকোনো রাজনৈতিক দলের ঘোষিত কর্মসূচীকে ভণ্ডুল করে দেওয়ার জন্য আমরা দেখেছি ট্রেন বা মেট্রো বন্ধ করে মানুষের গতিবিধি আটকাচ্ছে সরকার। কিন্তু পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা ছাড়া যখন হাজার হাজার মানুষ বেঙ্গালুরুতে একত্রিত হচ্ছে বিজয়োৎসবে, তখন সরকার ও নেতারা নির্বিকার। ক্রিকেট প্রশাসক, সংগঠক, নেতা মন্ত্রীরা টিআরপি এবং জনগণের আবেগকে গুরুত্ব দিয়ে মানুষকে আটকানোর কোনো চেষ্টা করলেন না। অতএব আবারও কিছু মানুষের মৃত্যু।
আহমেদাবাদের বিমান দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে সময় লাগবে। কিন্তু ইতিমধ্যে যেসব কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে সেখানেও দেখা যাচ্ছে সিস্টেমের চূড়ান্ত ঔদাসীন্য। আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের আশেপাশে গড়ে উঠেছে ঘনবসতি, যেখানে উঁচু বাড়িও রয়েছে। এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ বারংবার বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য জমি চেয়েও পাননি। নতুন এয়ারপোর্ট বানানোর কথা বলা হলেও তা তৈরি হয়নি। কলকাতা বিমানবন্দরের আশেপাশেও উঁচু বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। সবই কি নিয়ম মেনে হচ্ছে? কেউ জানে না। আবার বোয়িং-এর যেই বিমান ভেঙে পড়েছে তার ত্রুটি আগেই ধরা পড়েছিল। 'ড্রিমলাইনার ৭৮৭' বিমানের নানা সমস্যা নিয়ে আগেও কথা হয়েছে, সংস্থার এক কর্মী এই নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য রেখে চাকরি খুইয়েছেন। কিন্তু চলছে চলবে মানসিকতা নিয়ে এয়ারপোর্ট বিপদসঙ্কুল হলেও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বিমান দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তিদের আত্মীয়পরিজনের হয়রানির কথাও উঠে এসেছে সংবাদপত্রে। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেলেও তাদের প্রিয়জনের দেহ তারা পাচ্ছেন না। চূড়ান্ত ঔদাসীন্যের সামনে অসহায়ের মতো আর্তনাদ করছেন তারা। কিন্তু কে শুনবে তাদের কথা? বিমান দুর্ঘটনার সত্য উদ্ঘাটিত হবে, এই আশা আমরা রাখি। কিন্তু বিগত দিনে ভারতে যেই বিমান দুর্ঘটনাগুলি ঘটেছে তারপরে যে আমাদের দেশের বিমান চলাচলের সুরক্ষা নিয়ে কর্তৃপক্ষ খুব বেশি বিচলিত হয়েছেন তা নয়। চলছে চলবে মানসিকতা এখানেও বিপদ বাড়াচ্ছে।
আসলে নাগরিক তথা যাত্রী সুরক্ষা আমাদের দেশে খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্ব পায় রাজনৈতিক নেতাদের সুরক্ষা। তাই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ বা লাইনচ্যুত হওয়া এই দেশে ঘটতেই থাকে, মানুষ বেঘোরে বিবিধ উপায়ে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু জনগণের মনেও মনে হয় না সরকার তথা নীতিনির্ধারকদের থেকে দায়বদ্ধতা আদায় করার কোনো তাগিদ রয়েছে। যেন মানুষ নিজের ভাগ্যকেই দোষারোপ করে আবারও আরেকটি দিনের জীবনযুদ্ধে নেমে পড়ে। এই স্থবিরতা ভাঙা দরকার। কিন্তু কে ভাঙবে? দেশের রাজনীতি আপাতত ধর্ম তথা যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত। ট্রেন-বাস-প্লেন-রাস্তার সুরক্ষা নিয়ে ভেবে কী হবে? মানুষ বড়ো সস্তা যে!