আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা ● ১৬-৩১ মার্চ, ২০২৪ ● ৩-১৮ চৈত্র, ১৪৩০

প্রবন্ধ

কয়েক টুকরো এলোমেলো

অমিয় দেব


খাতা খুলে বসে আছি, কিছু লিখতে পারছি না। মস্তিষ্ক জবাব দিয়েছে। এমন আচরণ ও আগেও করেছে, কিন্তু এতটা প্রবলভাবে নয়। খানিক শূন্যে ঝুলিয়ে রাখার পরে একটা কোনো ভাবনা জুগিয়েছে। আস্ত না হলেও ভাঙাচোরা। তাই সম্বল করে নৌকো ভাসিয়েওছি। লগি ঠেলতে ঠেলতে যদি কাদাজল পেরোনো যায় সেই আশায়। দু-একবার তাও ঘটেছে, দাঁড় বাইবার মতো জলে পৌঁছেছি এবার ঝুলছি তো ঝুলছিই, শূন্যের যেন শেষ নেই। তবু খাতা খুলছি, আর তো কিছু করবার নেই আমার।অপেক্ষা। রোজ তা-ই।

তবে এক্ষুনি কি একটু দয়া হল মস্তিষ্কের? দেখি।

।। ১ ।।

ভোটের আমি ভোটের তুমি ভোট দিয়ে যায় চেনা। মাত্র মুজতবা আলীকে মনে রেখে এই প্রস্তাবনা করছি না। এক ভিনদেশী প্রবাদের এই প্রকরণ এখন দাপাচ্ছে এখানে। কোনো দল একবার কি দুবার ভোটে জিতে ক্ষমতায় এলে ক্ষমতাতেই থেকে যেতে চায়। তার জন্য হেন কাজ নেই যা তারা না করে, হেন কথা নেই যা না বলে! অথচ দলাদলি সত্ত্বেও ক্ষমতার পালাবদলই তো গণতন্ত্রের এক আদর্শ। আমাদের এক রাজ্যইতো তা দেখিয়ে এসেছে: একবার এ-জোট, অন্যবার ও-জোট, এইভাবে বারবার। তা কি আমরা ভুলতে বসেছি? মন্দলোকে বলে ভোট নাকি এখন কেনাও হচ্ছে। তাই? সেই যে কে যেন একবার কোথায় বলেছিলেন - তাও তো হয়ে গেল অনেকদিন - ওরা টাকা দেবে, টাকা নেবেন, কিন্তু ভোট দেবেন না। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র আমরা, ১৯৫২ থেকে সাধারণ নির্বাচন হয়ে এসেছে। আরেক সাধারণ নির্বাচন আসন্ন। আমাদের সবরকমের বৈচিত্র্য ঘোচাতে তৎপর যে-দল তারা কি এবার সংসদ দখল করতে যাচ্ছে? আর দখল-করা সংসদে কতটা অটুট থাকতে পারে আমাদের সংবিধান?

।। ২ ।।

বেশ কিছুদিন ধরেই দেখছি বাড়ির কমোড দুটো যখন রোজ সকালে সাফ করি, তখন জ্যোতির কথা মনে আসে। জ্যোতি মানে জ্যোতির্ময় দত্ত, আমার বন্ধু। তার এখনকার কথা নয়, অনেক আগেকার কথা, যখন সে নিজেকে নিয়ে কিছু বিপ্লব করছিল। আর আমরা কেউ কেউ সেই বিপ্লবের সাক্ষী হচ্ছিলাম। যখন সে বাড়ির ধারাস্নান বর্জন করে মোড়ের টিউবওয়েলে চান করতে লাগল। আমাদের কাজ হল সেই কল টিপে দেওয়া। বা পাদুকা ত্যাগ করে খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করল। বা রাস্তায় কোনো রোগীকে পড়ে থাকতে দেখলে তাকে তুলে কোনো আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া এবং তার প্রাথমিক চিকিৎসার চেষ্টা করা। স্থায়ী যে হতে যাচ্ছিল এই বিপ্লব তা নয়। কিন্তু তা যে একবার ঘটেছিল, তার কি মানে নেই? এই জ্যোতিই না পরে, বিজয়সিংহের উত্তরাধিকার মাথায় করেই বুঝি-বা, এক ডিঙি নিয়ে সিংহল রওয়ানা হয়েছিল - সঙ্গে দুই বন্ধু। রেডিও ছিল না সেই নৌকোয়। বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে দুলতে দুলতে অন্তত অন্ধ্রের কাকিনাড়া পৌঁছেছিল তারা। কম কথা! তারও পরে এক গঙ্গাবক্ষে ভাসমান রেস্তোরাঁ খুলেছিল জ্যোতি আর, ঘুসুড়িতে বানানো, সেই বড়ো নৌকোর নাম দিয়েছিল 'কন্টিকি'। (গঙ্গাবক্ষে এখনকার রমণীয় 'ফ্লোটেল' হোটেলের কি কন্টিকিরই কথা মনে ছিল?) সিংহলের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়া ওই ডিঙি, মণিমেখলা-র, এবার কাজ হল ফেরি করে আমাদের কন্টিকিতে পৌঁছে দেওয়া। ব্যবসা নয়, বন্ধুদের নিয়ে মাঝগঙ্গায় আড্ডাই ছিল জ্যোতির ঈপ্সা। কিন্তু নদীর অভিভাবকেরা কি এই আনন্দে বাধ না সেধে থাকতে পারেন! অতএব আয়ু ফুরোল কন্টিকির। অবশ্য তার আগেই অঞ্জন দত্ত গীটার বাজিয়ে গান শোনাতে শুরু করেছে খদ্দেরদের। আর ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের দুই কলকাতা-পরিদর্শক, ডেভিড কুক ও (কী যেন) ব্রাস, কে.এম.ডি.এ.-তে কর্মরত কণিকা সরকারের সঙ্গে এসে হাজিরও হয়েছেন একদিন। হঠাৎ ব্রাস দূরে নবনির্মিত তৃতীয় সেতুর দুই স্তম্ভের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বলে উঠলেন, "হোয়াট ইজ দ্যাট পার্থেনন?" তখনো ওই পোল ওঁদের দেখা হয়নি, কন্টিকিই দিল তাঁদের দূরদৃষ্টি।

।। ৩ ।।

পাঁচ বছরের নিউমোনিয়া ভ্যাক্সিন নিয়ে পাঁচ বছরের কভার করেছি নিজের সঙ্গে। আরো পাঁচ বছর বেঁচে থাকতে হবে। সেই যে কবে মরতে বসেছিলাম একাশি সালে! এনসেফেলাইটিস ও নিউমোনাইটিস নিয়ে পি.জি.-র ইনটেন্সিভ থেরাপি ইউনিটে। চারদিনের কোমা। সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু স্বপ্নের বাঘ এসে আমার দিকে তাকিয়ে রইল - কয়েকটি ভয়ানক মুহূর্ত - তারপর সরে গেল। কে যেন বললেনও, বাঘ তোমাকে খাবে না। আমি ঘুম ভেঙে জেগে উঠলাম। জীবন নিয়ে এর পরের বিয়াল্লিশ বছর যা করেছি তাতে কি বাঘের দেওয়া ওই অব্যাহতির মর্যাদা রেখেছি? জানি না। তবে পুণ্য না করলেও পাপ বোধহয় করিনি। মস্ত কোনো মিথ্যাও বোধহয় বলিনি। স্বধর্ম পালন না করে মাত্রাছাড়া অলসতারও বোধহয় শিকার হইনি। খুব লোভ করিনি। যা পেয়েছি তার খানিক চেয়েছি, আবার খানিক না চেয়েই পেয়েছি। একেই কি এখনকার কৃষ্ণ বলবেন, আংশিক নিষ্কাম?

।। ৪ ।।

পুরো না হলেও আমি এখন আদ্ধেক গৃহবন্দি। মাসে একবার কি দুবার ব্যাংকে যাই। বাহন রিকশো। কিন্তু মোড়ের রিকশো স্ট্যান্ড পর্যন্ত হাঁটতে হয়। সমতলে হাঁটা নিয়ে এই সেদিনও সমস্যা ছিল। মনে হতো, হঠাৎ না পড়ে যাই। লাঠি নিয়ে - স্ফিংক্‌স কথিত তিনপেয়ে হয়ে - সেই ভয় একটু কমেছে। তবে যথার্থ স্বাচ্ছন্দ্য আসেনি। থাকি যেহেতু চারতলায়, সিঁড়িও ভাঙতে হয়। একটু কষ্টের ও সময়সাপেক্ষ হলেও ওই নামা, বা ওঠা, অসাধ্য নয়। কারণ সিঁড়িতে রেলিং আছে। বস্তুত, আমি সিঁড়ির নতুন সংজ্ঞা দিয়েছি। সিঁড়ি সেই ধাপ যার রেলিং আছে। রেলিং না থাকলে তা নেহাতই ধাপ। লাঠি নিয়ে দু-তিনটে ধাপ সামলানো যায়। তার বেশি হলে কাউকে ধরতে হয়। বাড়ির ভিতরে যে-হাঁটাহাঁটি করি তা এখনো লাঠি ছাড়াই। ফলে একটু-আধটু ঘসটাতে হয়, কেননা পদক্ষেপ ছোটো হয়ে গেছে। তাছাড়া খেয়াল রাখতে হয় যেন পড়ে না যাই। পড়লেই মুশকিল। ভাগ্যিস আমার বাথরুমটা ছোটো, পড়ো পড়ো হলে কিছু একটা ধরতে পারি। চেয়ারে বসা যত সহজ, চেয়ার থেকে ওঠা তত সহজ নয়। ইত্যাদি ইত্যাদি যত শারীরিক গল্প আমার। বিশেষভাবে আহূত হলে সভা-সমিতিতে এখনো যাই, কিন্তু যাঁরা ডাকেন তাঁরা গাড়ি করে নিয়ে ও ফিরিয়ে দিয়ে যান। এ-ব্যাপারে পরমুখাপেক্ষী না হয়ে উপায় নেই, কারণ একা একা পাড়ার বাইরে কোথাও যেতে সাহস হয় না। আর শহর ছেড়ে বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। তবু হঠাৎ হঠাৎ ইচ্ছে হয় একবার রেলগাড়ি চড়ি। অন্তত শান্তিনিকেতন। ও একটু চেষ্টাচরিত্র করে জানলার কাছে বসি যাতে বাইরেটা দেখতে পাই। এবং এমন ট্রেন নিই যা সব স্টেশনে থামে। কোনো কাজে তো যাচ্ছি না যে ঝটিতি পৌঁছতে হবে। কত কিছুই তো দেখবার আছে! মানুষজন, খেতখামার, গাছপালা - গাছপালা যারা ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটবে উল্টোদিকে। আর, অজয় পেরোবার সময় ওই বাজনা কি বাজবে না যা প্রথম শুনেছিলাম আশি বছর আগে? সেই নদীর নাম ছিল কুশিয়ারা। সে ও তার বোন সুরমাতে মিলে এক আস্ত জেলা (তখন ছিল জেলা, এখন বোধহয় ডিভিশন) ধুয়ে দিচ্ছিল। আর কৈশোরে পা দিয়েই না, ‘সঞ্চয়িতা’-র এক ডাইনের পৃষ্ঠার তলার দিকে নতুন করে দেখা হল রেলগাড়ি শব্দটির সঙ্গে সেই অবিস্মরণীয় পঙক্তিতে, "এ প্রাণ, রাতের রেলগাড়ি"!

।। ৫ ।।

‘খাওয়া মানেই ধোওয়া’। বলতে শুরু করেছিলাম আমিই একসময় আমাদের এ-বাড়ির পরিসরে। যতীন দাশ রোড, অর্থাৎ ১৯৬৭, থেকেই আমার নিজের থালা আমি নিজে ধুই। শুধু ভাতের থালা-বাটি নয়, চায়ের পেয়ালা-চামচ ও জলের গেলাসও। অভ্যাসটি বোধকরি এক মার্কিনি অর্জন। ওদেশে গিয়ে আমাদের রাঁধতে-বাড়তে হতো নিজেকেই, বাসনকোসনও ধুতে হতো নিজেকেই। দুজনের - কদাচিৎ তিনজনেরও - হেঁসেল এক হলে ও-কাজে পালা করা যেত। স্বপ্নেও কোনো ‘ডোমেস্টিক হেল্প’-এর কথা ভাবা যেত না। আমরা তো ছাই এশীয়, টায়েটুয়ে চালাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত মার্কিন মা-বাবার মার্কিন ছেলেমেয়েরাও ছিল পুরো স্বয়ম্ভর। বস্তুত, গোড়ার দিকে একবার দুই মার্কিন বন্ধুর সঙ্গে এক কফিশপে, এক মার্কিন মেয়েকে আমাদের অর্ডার নিয়ে স্যান্ডুইচ ও কফি এনে দিতে দেখে, বোধকরি তার সঙ্গে একটু উপর থেকেই কথা বলে ফেলেছিলাম। শ্রেণী কি আমাদের মধ্যবিত্ত রক্তে? নিজের শ্রমের মুল্য দিই, অন্যের শ্রমের মূল্য দিই না! বন্ধু দুজন আমাকে বুঝিয়ে বলল, মেয়েটিও নিশ্চয়ই ছাত্রী, এক সেমেস্টার কাজ করে পরের সেমেস্টারের জন্য পয়সা জমাচ্ছে। ওই ক্যাম্পাস-শহরে এমন কত! আর কত রকমের কাজ। মায় পেট্রল পাম্পে তেল ভরানো। উপার্জন ঘন্টা হিসেবে। পরে আমার বন্ধুতা হয়েছিল ড্যান সালিভান-এর সঙ্গে যে তার স্ত্রী মোরীন যাতে কোর্সের মাত্রা শেষ করতে পারে, সেইজন্য নিজে কোর্স না নিয়ে কাজ করছিল। শহরের বাইরে এক সস্তা বাড়িতে ওরা থাকত। ওদের বাহন ছিল এক সস্তা মোটরগাড়ি। কত গল্প একসময় করেছি ড্যানের সঙ্গে। আর, কতকাল পরে, এই সেদিন ইন্টারনেটে আমার খোঁজ পেয়ে যোগাযোগ করল। আইন পড়েছে, নতুন জীবন চলছে ওর। চিঠিতে চিঠিতে কী স্নেহ! কখন আমাকে ‘ম্যান উইথ দ্য ম্যাজিক মুশটাশ’ বলেছিল - সে কি এই দফায় না আগে? না, না, আগে, একখণ্ড পাউন্ড উপহার দিয়েছিল আমাকে ওই লিখে। এবার পাঠাল এক নতুন শেক্সপিয়র-জীবনী। আইন করছে বলে মার্কিনদেশে ছাপা অনুরাধা মহাপাত্রের কবিতার অনুবাদ সংক্রান্ত এক আইনি পরামর্শও চাইলাম ওর কাছে। কর্কট বাসা বেঁধেছে শরীরে। কষ্ট পাচ্ছে, তবু আশা আমাদের দেখা হয়ে যাবে। হঠাৎ আমাদের আরেক বন্ধু এমি-র কাছে খবর পেলাম ড্যান নেই। সেও তো হয়ে গেছে বছর দশেক। নাকি তারও বেশি? ড্যানের পাঠানো একটা এ৪ সাইজের খাম, ছেঁড়াখোঁড়া হয়ে গেলেও, এখনো ব্যবহার করি। বড়ো বন্ধু ছিল সে আমার!