আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩১
প্রবন্ধ
"জাগিয়া উঠিছে গুপ্ত গুহার কালীনাগিনীর দল"
রঞ্জন রায়
ডিসেম্বর মাস স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে কালো অক্ষরে লেখা হয়ে গেছে।
১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর রাতে ৬০ জনের একটি দল বাবরি মসজিদের পাঁচিল টপকে ভেতরে গিয়ে বালক রামচন্দ্র বা রামললার ছোট্ট একটি পেতলের মূর্তি সেখানে রেখে আসে। বিবাদ এবং উত্তেজনা দেখে নেহেরু সরকার ওখানে তালা লাগিয়ে দেন। কিন্তু ১৯৮৬ সালে তাঁর নাতি রাজীব গান্ধী আদেশ দেন - ৮ মার্চ মহাশিবরাত্রির আগে ওই তালা খুলে দেওয়া চাই।
ফল হল হিতে বিপরীত।
অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জমির অধিকার নিয়ে একটি দেওয়ানি মামলা আদালতে বিচারাধীন ছিল। এই সময় বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবাণীর ধনুক হাতে রথযাত্রা, গ্রেফতারি এবং বাবরি মসজিদ ভাঙার ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ায়।
১৯৯১ সাল। চারদিকে শ্লোগান উঠছে “অযোধ্যা মেঁ জিত হমারী হ্যায়, অব কাশী-মথুরা কী বারি হ্যায়”।
তখন কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার একটি আইন প্রণয়ন করলেন - The Places of Worship (special provision) Act, 1991.
ওই আইনের মোদ্দা কথা হলঃ ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭-এর পর কোনো পূজাঅর্চনার স্থলের ধর্মীয় চরিত্রে কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। ব্যতিক্রম শুধু অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি। কারণ সেটি তখন আদালতে বিচারাধীন।
উক্ত আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী দেশ স্বাধীন হওয়ার দিন ধর্মস্থলের ধর্মীয় চরিত্র অপরিবর্তিত থাকবে। ধারা ৪ অনুযায়ী কোনো ধর্মস্থলের ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ তারিখের আগে থেকে যে ধর্মীয় পরিচয় স্বীকৃত তার পরিবর্তনের দাবিতে সমস্ত আদালতী মোকদ্দমা খারিজ বা বাতিল করতে হবে।
৬ ডিসেম্বর ১৯৯২। উন্মত্ত জনতা আদালতের রায়ের তোয়াক্কা না করে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলল। সুপ্রীম কোর্টের পরিদর্শক উপস্থিত ছিলেন এবং উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং ও ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী কথা দিয়েছিলেন আদালতের আদেশ মেনে শান্তিপূর্ণ করসেবা হবে, কোনো ভাঙচুর হবে না।
জাস্টিস লিবেরহান তদন্ত কমিটি ওই বিধ্বংসের জন্য বিজেপির চার শীর্ষনেতা - অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবাণী, মুরলী মনোহর যোশী এবং রাজমাতা সিন্ধিয়া সমেত ৬৮ জনকে দোষী সাব্যস্ত করল।
কিন্তু ওই ভগ্নস্তুপের উপরে কি গড়ে উঠবে রামমন্দির? জমিটা কার - মসজিদের ওয়াকফ কমিটির? হনুমানগড়ী মন্দিরের সেবাইতদের? নাকি ওই বালক মূর্তির তরফে ‘রামলালা বিরাজমান’ নামক নতুন এক পিটিশনার?
মামলা এলাহাবাদ হাইকোর্ট হয়ে সুপ্রীম কোর্টে গেল। তারপর ৯ নভেম্বর, ২০১৯ তারিখে সুপ্রীম কোর্টের রায় বেরোল।
তার চারটে পয়েন্টঃ
১. বাবরি মসজিদ খননে অ-ইসলামিক স্থাপত্যের নিদর্শন পাওয়া গেছে, কিন্তু মসজিদ যে মন্দির ভেঙেই তৈরি হয়েছে এমনটা বলা যাচ্ছে না।
২. মুসলিম পক্ষ বিবাদিত ২.৭৭ একর জমিতে সম্পূর্ণ মালিকানা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের অধিকার ভেতরের অংশেই শুধু ছিল। হিন্দুদের অধিকার বাইরের চৌহদ্দীতে ছিল। সেখানে পুজোও হতো। হিন্দু পক্ষের প্রমাণ বেশি জোরদার। পুরাতত্ত্ব বিভাগের দলিল উড়িয়ে দেবার নয়। বিরোধী পক্ষের কিছু ইতিহাসবিদ এবং পুরাতত্ত্ববিদদের রিপোর্ট বড়জোর একটি ‘ওপিনিয়ন’ মাত্র।
৩. ওই বিবাদিত ২.৭৭ একর জমি কেন্দ্রীয় সরকার অধিগ্রহণ করে রামমন্দির নির্মাণের জন্য ট্রাস্ট বানিয়ে তাদের সঁপে দিক। আর মুসলিম পক্ষকে একটু দূরে ৫ একর জমি দিক যাতে সেখানে তারা মসজিদ বানিয়ে নিতে পারে।
৪. কিন্তু যারা নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলল তারা আইন ভাঙার এবং ‘ক্রিমিনাল’ আচরণের দোষী। তাদের চিহ্নিত করে কড়া শাস্তি দিতে হবে।
তবে মামলায় লিবারহান কমিশনের চিহ্নিত অভিযুক্তরা বেকসুর খালাস পেল আর সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশ মেনে সরকারি ট্রাস্ট জমি অধিগ্রহণ করে ‘মর্যাদাপুরুষোত্তম রামচন্দ্র’র বিশাল মন্দির নির্মাণ করা হল।
অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এই রায়কে স্বীকার করে আশা প্রকাশ করল যে এবার দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং বিভেদ কমবে।
মাত্র ১৯৯০ সালেই ওই আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রীম কোর্টে একটি মামলা দায়ের হল। কোর্ট মামলাটি গ্রহণ করে ভারত সরকারকে নোটিশ দিয়ে দু’সপ্তাহের মধ্যে তাদের বক্তব্য শুনতে চাইল। পরে আরও তিনটি পিটিশন যুক্ত হল। ভারত সরকার এই বিষয়ে চার বছর পরেও এফিডেভিট জমা দেয়নি।
কিন্তু রাজীব গান্ধীর রামলালার তালা খোলার মতো আইনকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখালেন প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচুড়। তিনি জ্ঞানবাপী মসজিদ সমেত সমস্ত ইসলামিক স্থাপত্যকে খোঁড়ার আইনি অনুমতি দিলেন।
তাঁর মতে -
১. ওই আইনের ধারা তিন এবং চার বর্তমান কোনো ধর্মীয় স্থাপত্যের চরিত্র বদলাতে এবং সেই দাবিতে মামলা করতে নিষেধ করেছে বটে, কিন্তু সেই চরিত্রটি কী তা নিয়ে তদন্ত করতে তো নিষেধ করেনি। ভাঙচুর না করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লেজার দিয়ে খোঁজ করা হোক।
২. চরিত্র না বদলালেই হল। তাতে আইন ভঙ্গ হবে না।
আমার দুটো কথা -
এক, আইন পালন করতে হয় শুধু অক্ষর ধরে নিক্তি মেপে নয়, উদ্দেশ্যটি বুঝেও। যখন আইন স্পষ্ট করে বলছে কোনো ধর্মীয় স্থাপত্যের ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ তারিখে যা চরিত্র ছিল তাই বলবৎ থাকবে তখন নতুন করে চরিত্র নির্ণয়ের প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?
দুই, চন্দ্রচুড় বাবরি মসজিদ রায়ের অন্যতম কারিগর। তিনি অবসরের অল্পদিন আগে বিবৃতি দেন যে, রায় দেওয়ার আগে দ্বিধায় পড়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, তাতেই সমাধান সূত্র পেয়ে যান!
আবার ওই রায়ে ধর্মস্থলের চরিত্র অপরিবর্তিত রাখার অনুচ্ছেদেরও তিনি রূপকার।
সুপ্রীম কোর্টের রায় যে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য জনতার ধ্বংস আটকানোর গ্যারান্টি হতে পারে না তা বাবরি মসজিদ কাণ্ডের সময়ই প্রমাণিত।
সম্ভল মসজিদ বিবাদ
প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের ওই রায়ের পর যেন সাপের ঝাঁপি খুলে গেল। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের সম্ভলের মোগল যুগের শাহী জামা মসজিদকে, যা কিনা মুসলিম পক্ষ অনুযায়ী ১৬শ শতাব্দী থেকে তাদের ধর্মস্থল, খনন করার দাবি নিয়ে আটটি পিটিশন ট্রায়াল কোর্টে জমা পড়ল।
অভিযোগ ওই মসজিদের নিচে হরিহর মন্দির রয়েছে।
বিচারক মুসলিমদের পক্ষ না শুনেই একতরফা রায় দিয়ে কথিত সার্ভের অর্ডার জারি করলেন এবং ২৪ ঘন্টার মধ্যে সার্ভে দল বিরাট পুলিশ বাহিনী নিয়ে মসজিদে পৌঁছে গেল।কিন্তু সম্ভলের জেলা কোর্ট হিন্দু পক্ষের পিটিশনের আইনি গ্রাহ্যতা নিয়ে এখনও নির্ণয় দেয়নি, তবু ট্রায়াল কোর্ট সাত তাড়াতাড়ি সার্ভে শুরু করিয়ে দিল।
দ্বিতীয় দিন সার্ভের সময় বিরাট জনতা বাধা দিল এবং খণ্ডযুদ্ধে চারজন অল্পবয়সি মুসলিম তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেল। পুলিশ মুসলিম পক্ষের কিছু লোককে আইন ভাঙা এবং দাঙ্গার অভিযোগে আটক করল। মুসলিম পক্ষ সুপ্রীম কোর্টে গেলে নতুন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার নেতৃত্বে দুজনের বেঞ্চ আবেদকদের রিলিফ পেতে হাইকোর্টে যেতে বলল, কিন্তু হাইকোর্টের রায় না আসা পর্যন্ত সার্ভে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিল।
বিচারপতি জোর দিলেন - সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং শান্তি বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একের পর এক যতগুলি পিটিশন জমা হচ্ছে সবার একটাই উদ্দেশ্য - The Places of Worship (special provision) Act, 1991 আইনটিকে অচল এবং অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া।
একটি কাল্পনিক কথোপকথন
ভারতবর্ষের মাটিতে যেখানে যত মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে সব কোনো না কোনো মন্দিরকে ভেঙে তার ধ্বংসস্তুপের উপর গড়ে উঠেছে?
- নিশ্চয়ই, তাদের কাজই হল কাফেরদের ধর্মস্থান গুঁড়িয়ে দেওয়া, দেখছেন না বাংলাদেশে কী হচ্ছে? আক্রান্ত হচ্ছে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ এবং ইসকন।
তাহলে কী করণীয়?
- খুব সোজা। যেভাবে বাবরি মসজিদকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তেমনই বাকি সব ধুলোয় মিশিয়ে দিতে হবে।
কেন?
- বাঃ, বে-আইনিভাবে বাড়ি তৈরি হলে বুলডোজার চালিয়ে ভাঙা হয় না? আকাশ থেকে পড়লেন নাকি?
সব মসজিদ ভেঙে দিতে চান?
- আমার মুখে কথা বসাবেন না। যেগুলো বে-আইনি, মন্দির ভেঙে গড়া হয়েছিল, শুধু সেগুলো।
কে ঠিক করবে কোনটা বে-আইনি, কোনটা ভাঙা উচিত?
- কেন, আমাদের আদালত। আমরা ওদের মতো বর্বর নই। আমরা আগে আদালতে কেস লাগাই। আদালত ভাঙার অনুমতি দিলে তবে।
কিন্তু উত্তরপ্রদেশে যে অধিকাংশ বুলডোজার-ন্যায় ঘটেছে সেগুলো তো আদালতে না গিয়েই হয়েছে। এমনকি উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চেপেছে। স্বামীর কথিত দোষে বৌয়ের বাড়ি ভাঙা পড়েছে। ভাড়াটের দোষে বাড়িওয়ালার বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এমনকি উত্তরাখণ্ডে টানেল ধ্বসে চাপা পড়া লোকদের যে লোকটা নিজের দল নিয়ে র্যাট-হোল-মাইনিং করিয়ে বাঁচিয়ে দিল তার বাড়িও বিনা নোটিশে ভেঙে দেওয়া হল।
- ভাল করে খোঁজ নিন। সেই বাড়ি সরকারি জমিতে অতিক্রমণ করে তৈরি হয়েছিল।
হুঁ, একই লাইনে অন্য একটাও বাড়ি ভাঙা হয়নি। আর ওর অবর্তমানে রাতারাতি ভেঙে ওর বৌ এবং বাচ্চাদের রাস্তায় বের করে দেওয়া হল। কোনো আদালতের আদেশ ছিল না, কোনো ‘ডিউ প্রসেস অফ ল’ মানা হয়নি।
- আপনি কিছুই জানেন না। এই ব্যাপারে শহরের মিউনিসিপ্যালিটিই আদালত, ওর কমিশনার এবং জেলার কালেক্টরই বিচারপতি। ওঁনারা যখন আদেশ দিয়েছেন - ভেবেচিন্তেই দিয়েছেন। আর আপনি তাঁদের থেকে বেশি বোঝেন?
না সবজান্তা তো নই, কিন্তু এইটুকু জানি যে “Justice must not merely be done, but it must also be seen to be done”.
- এই সব গোল গোল কথা কে বলেছে?
আমাদের সুপ্রীম কোর্ট, ১৯৯৭ সালে।
- অ..., তবে ২০১৪ সালের পর অনেক কিছু পালটে গেছে। আমাদের সুপ্রীম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মসজিদের চারপাশে খোঁড়াখুঁড়ি করে তার ধার্মিক চরিত্র নির্ণয়কে আইনসম্মত বলে রায় দিয়েছেন। আপনি ফালতু চেঁচামেচি না করে মুসলমানদের বুঝিয়ে বলুন - তাদের ভয় পাবার কিছু নেই। আমরা ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ, সব কা বিশ্বাস’ নীতিতে বিশ্বাসী। আরে যদি খুঁড়ে দেখা যায় যে নিচে মন্দির নেই, তাহলে তো চিন্তার কথাই নেই। সাংসদ গিরিরাজ সিং কি সদনে দাঁড়িয়ে বলেননি যে শুধুমাত্র সার্ভে হলে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
সত্যিই নেই?
এই ডিসেম্বর মাসেই যে মসজিদগুলো খোঁড়ার জন্য আদালতে শুনানির তারিখ পড়েছে তার হিসেবগুলো একটু দেখা যাক।
১. কাশীতে বিশ্বেশ্বর মন্দিরের গায়ে লাগা জ্ঞানবাপী মসজিদ। বলা হয় মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব শিব মন্দির ধ্বংস করে ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে ওই মসজিদ নির্মাণ করেন। আরও বলা হল যে মসজিদে যে ফোয়ারার জল নিয়ে মুসলমানরা ওজু করেন সেটি আসলে শিবলিঙ্গ! অতএব মসজিদের নিচে খোঁড়ার অনুমতি দেওয়া হোক।
২. মধ্যপ্রদেশের ধার জেলার ভোজশালায় বিতর্কিত ভবনটি মুসলমানদের দাবি অনুসারে কামালমৌলা মসজিদ, তার পাশে ১৩৯২ সালের একটি ফলকে লেখা রয়েছে যে, তৎকালীন প্রশাসক দিলাওয়ার খান এটির মেরামত করিয়েছিলেন এবং তার পাশেই সুফি সাধক কামালুদ্দিন চিস্তির দরগা রয়েছে। (সূত্রঃ 'জার্নাল অফ এশিয়াটিক সোসাইটি'তে এম উইলিস-এর প্রবন্ধ)। সেই থেকেই এর নাম কামালউদ্দিন মসজিদ।
হিন্দুদের মতে এটি বাগদেবীর মন্দির। পরমার রাজা ভোজ ১১শ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মাণ করেন। মুসলমান শাসকেরা একে আংশিক ভেঙে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
সাল ২০০৩। হিন্দু মুসলমান দুই পক্ষে সমঝোতা হল যে প্রতি শুক্রবার এখানে মুসলমানেরা নমাজ পড়বে। আর হিন্দুরা মঙ্গলবারে দেবী সরস্বতীর উপাসনা করবে। এইভাবে ২১ বছর কেটে গেল। কিন্তু ২০২৪ সালে হিন্দু পক্ষ থেকে হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চে মামলা করা হল যে, এটিকে পুরোপুরি হিন্দু মন্দির ঘোষণা করে মুসলমানদের নামাজ পড়া বন্ধ করা হোক। হাইকোর্টের দুই সদস্যের বেঞ্চ ১১মার্চ, ২০২৪ তারিখে 'আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া'কে (এএসআই) সার্ভে করার অনুমতি দিল। কিন্তু সুপ্রীম কোর্ট বলল - শুধু লেজার দিয়ে নন-ইনভেসিভ তদন্ত চলবে। তদন্ত সম্পূর্ণ হয়েছে। পরমার বংশীয় রাজা নরবর্মণ এবং খিলজি বংশীয় মুহম্মদ শাহ - দুজনেরই শিলালিপি পাওয়া গেছে।
শুনানি ২০ ডিসেম্বর, ২০২৪।
৩. উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে আটালা মদজিদ নিয়ে আগ্রার কোর্টে পিটিশন দেওয়া হয়েছে যে ওটা আসলে আটালা মাতার মন্দির। ফিরোজ শাহ তুঘলক নাকি মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। ডিসেম্বর মাসেই শুনানি হবে।
৪. মথুরায় কৃষ্ণজন্মভূমি এবং শাহী ঈদগাহ মসজিদ বিবাদ সর্বজনবিদিত। তবে ১৯৬৮ সালে 'শ্রীকৃষ্ণ জন্মস্থান সেবা সংস্থান' এবং 'শাহী মসজিদ ঈদগাহ ট্রাস্ট'-এর মধ্যে সমঝোতা হয় যাতে দুই পক্ষই নিজেদের মতো করে পূজাঅর্চনা এবং নামাজ পড়া জারি রাখতে পারে।
কিন্তু কয়েক বছর আগে হিন্দুপক্ষ ওই জমির উপর টাইটেল ডিড নিয়ে মামলা দায়ের করে, খানিকটা বাবরি মসজিদ সংলগ্ন জমির টাইটেল নিয়ে মামলার ঢঙে। এলাহাবাদ হাইকোর্ট The Places of Worship Act-এর দোহাই দিয়ে বলল যে এই পিটিশন শুনানি যোগ্য নয়। হিন্দুপক্ষ এবার সুপ্রীম কোর্টে আপিল করেছে। এমাসের ৯ তারিখে শুনানি হওয়ার কথা।
৫. এবার দিল্লির জামা মসজিদ খুঁড়ে দেখার দাবি তুলেছে হিন্দু সেনা। এখনও আদালতের বক্তব্য শোনা যায়নি।
কিন্তু খুঁড়ে দেখার ব্যাপারটা শুধু মসজিদেই থেমে গেল না। দাবি উঠেছে সুফি সন্তদের সমাধিক্ষেত্র, অর্থাৎ মাজার, দরগা ইত্যাদি খুঁড়ে দেখার।
৬. দিল্লির ফতেপুর সিক্রি কেল্লার ভেতর শেখ সেলিম চিস্তির বিখ্যাত দরগা রয়েছে। আগ্রা কোর্টে পিটিশন জমা পড়েছে –এর নিচে নাকি কামাখ্যা দেবীর মন্দির রয়েছে। অতএব, মাননীয় আদালত ভিত খুঁড়ে দেখার অনুমতি দিন।
৭. সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা যে রাজস্থানের আজমীর শরীফে আটশো বছরের বেশি পুরোনো খাজা মইনুদ্দিন চিশতির দরগা খুঁড়ে দেখার দাবিতে আদালতে হিন্দু সেনার আবেদন জমা পড়েছে। আবেদক হিন্দু সেনার অখিল ভারতীয় প্রধান অ্যাডভোকেট বিষ্ণু গুপ্তা। দাবি ওই সুফি সন্তের কবরের নিচে এক শিব মন্দির রয়েছে।
এই দরগার বার্ষিক উরস উদযাপনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রতি বছর চাদর চড়িয়ে থাকেন। মার্চ ২০১৬ সালে ভারতে 'বিশ্ব সুফি ফোরাম'-এর আয়োজন হয়েছিল। প্রধান অতিথি জর্ডনের রাজা। মোদীজি প্রধান বক্তা। এই বছরই আগস্ট মাসে মন্ত্রী কিরণ রিজিজু জানালেন যে মোদী সরকার এক ‘সুফি করিডোর’ প্রজেক্ট শুরু করতে যাচ্ছেন। শুরু হবে আজমীর দরগা থেকে । এই দরগায় প্রধানমন্ত্রী নেহরু থেকে আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা, পাকিস্তানের জেনারেল মুশারফ, রাজমাতা সিন্ধিয়া, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে থেকে শুরু করে সব বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব চাদর চড়িয়েছেন।
ওই দরগার আশপাশে যত দোকানপাট তার ৭৫ শতাংশ দোকান হিন্দুর। তাই রাজস্থানের একটি আদালত আবেদনের শুনানি করতে রাজি হওয়ায় সবাই অবাক। শুনানির তারিখ ছিল ৬ ডিসেম্বর, যেদিন বাবরি মসজিদ ধ্বংসের স্মৃতিতে সংঘ পরিবার 'শৌর্য দিবস' পালন করে।
উপসংহার
সুপ্রীম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি জাস্টিস ফলি নরিম্যান ‘সেকুলারিজম এন্ড ইন্ডিয়ান কন্সটিট্যুশন’ নিয়ে এক লেকচারে ২০১৯ সালের বাবরি মসজিদ রায়কে ‘বিচারের নামে প্রহসন’ আখ্যা দিলেন।
কিন্তু তিনি বললেন ওই রায়ে একটিই রূপোলী রেখা। তাতে The Places of Worship (Special Provision) Act, 1991 আইনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখন চারদিকে প্রতিদিন ধর্মীয় স্থানের চরিত্র এবং মালিকানা নিয়ে নতুন নতুন বিবাদ জন্ম নিচ্ছে হাইড্রার মাথার মতো। একটাই উপায় - সুপ্রীম কোর্ট ওই আইন নিষ্ঠার সাথে প্রয়োগ করে এই জাতীয় পিটিশনগুলোকে খারিজ করুক। কিন্তু আমরা দেখছি -
‘জাগিয়া উঠিছে গুপ্ত গুহার কালীনাগিনীর দল।
দুলিছে বিকট ফণা,
বিষনিঃশ্বাসে ফুঁসিছে অগ্নিকণা।’
এই নিবন্ধটি The Places of Worship (Special Provision) Act, 1991 সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিকতম পর্যবেক্ষণ এবং রায়ের আগে লেখা - সম্পাদকমণ্ডলী, 'আরেক রকম'।
তথ্যসূত্রঃ
● সাংবাদিক নীরজা চৌধুরীর ‘হাউ প্রাইম মিনিস্টার্স ডিসাইড্’।
● লিভ ল।
● ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২০ এবং ২৬ নভেম্বর, ২০২৪.
● Restatement of Values of Judicial Life, as adopted by Full Court of Supreme Court of India, 7th May, 1997.
● জনসত্তা পত্রিকা, ১ ডিসেম্বর, ২০২৪।
● বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ৭ ডিসেম্বর, ২০২৪।