আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩১

প্রবন্ধ

শেখ হাসিনার পতন এবং বর্তমান বাংলাদেশ

গৌতম লাহিড়ী


(১)

৫ আগস্ট। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে গেল নাটকীয়ভাবে। পরিবর্তনের কুশীলবরা বলছেন ‘স্বৈরাচারী’ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’। সত্যিই কি তাই! নাকি এক গভীর ষড়যন্ত্রের নীল নকশার পরিণতি শেখ হাসিনার আচমকা পতন!

‘বিপ্লবের’ পরবর্তী ঘটনাক্রম দেখে সন্দেহ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। আদতে বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র চলেছে অর্থাৎ পুনরায় পূর্ব পাকিস্তান করে তোলাই মূল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ ’৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হলেও সেদেশের সমাজ বরাবরই দুটি মেরুকরণে বিভক্ত ছিল। একটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে - অসাম্প্রদায়িক, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এই ভিত্তিতে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করেন। বিপরীত ধারা হল ইসলামিক বাংলাদেশ - প্রথম পরিচয় মুসলিম, পরে বাঙালি। এই দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ আবর্তিত হয়েছে বরাবর। সুফি ইসলামের বাংলাদেশে প্রভাব পড়ল ওয়াহাবী ইসলামের। বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের এক অংশ সংযুক্ত হয়ে গেল আন্তর্জাতিক মুসলিম দুনিয়ার সঙ্গে। মুসলিম 'ব্রাদারহুড' সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হল দক্ষিণপন্থী জামায়েতে ইসলামী - যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় 'রাজাকার বাহিনী' তৈরি করে পাকিস্তান শাসকদের মদতে। এরা ভয়াবহ গণহত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের উপরে, এর ফলে কয়েক লক্ষ নারী, পুরুষ, শিশুকে নির্বিশেষে হত্যা করা হয়।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের পর বাংলা সংস্কৃতি পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু করলেন। যখন দেশকে প্রায় সুসংহত করেছেন তখন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি বাংলাদেশের সেনার মধ্যে বিদ্রোহ ঘটিয়ে বঙ্গবন্ধু সমেত তার পরিবারের সকলকে হত্যা করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ মুছে ফেলা। শুধুমাত্র বিদেশে থাকবার জন্য তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং রেহানা বেঁচে যান। তারপর ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আগ্রহে তারা ছিলেন ভারতে আশ্রিত। তাদের অভিভাবক ছিলেন প্রণব মুখার্জী।

১৯৭৫ থেকে একটানা ১৯৯১ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল সেনা শাসক ও তাদের সমর্থিত পুতুল সরকারের হাতে। এই সময় কালে ইসলামিক মৌলবাদীরা মদত পেল। সুফি সংস্কৃতির পরিবর্তে মৌলবাদ ইসলাম সমাজে শিকড় গেড়ে বসল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর এই সময়ে সর্বাধিক সংখ্যক হিন্দু পলায়ন করে। ফলে ২৭ শতাংশ হিন্দুর সংখ্যা কমে এল ১০-১১ শতাংশতে। এখন তো তা ৮ শতাংশ।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হল বিএনপি নেতৃত্বের সরকার। প্রধানমন্ত্রী হলেন বেগম খালেদা জিয়া। তবে নির্বাচনী সমঝোতা করলেন জামায়েত ইসলামীর সঙ্গে, যেহেতু তাদের ৮ শতাংশ ভোট রয়েছে। তাদের যুক্তি ছিল ৯ শতাংশ হিন্দু ভোট আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। তাতে ক্ষতি হল বাঙালি সমাজের। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে পিতা মুজিবরের স্বপ্নের বাংলা গড়ে তোলা এবং হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়া।

খালেদা জিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে তিনি প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তুললেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হলেন আওয়ামী লীগ সরকারের। প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়ে গঙ্গা নদীর জল বণ্টন চুক্তি সাক্ষর করলেন। ভারতের কাছে মাথা নত করেছেন এই অভিযোগে খালেদা জিয়ার বিএনপি জামাতকে সঙ্গে নিয়ে প্রবল আন্দোলন করে। নির্বাচনে ভারত বন্ধু হওয়ার অভিযোগে হাসিনা পরাস্ত হন। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির প্রভাব আরও বাড়ল। প্রশাসন ও সেনার মধ্যে অনুগতদের প্রবেশ করান হল। তারাই আছে আজকের বিদ্রোহের নেপথ্যে।

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ তখনও ম্লান হয়নি। অচিরেই খালেদা জনরোষে পড়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তবে সেই সময়ে সেনা মদতে এক সরকার তৈরি হয়। সেনা প্রধান মঈন আহমেদের সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত হয় অন্তর্বর্তী বা কেয়ারটেকার সরকার - আজ যেমন নোবেল জয়ী মহম্মদ ইউনূস হয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা হন ফখরুদ্দিন আহমেদ। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১/১১ বলে কুখ্যাত।

ওই সময় বাংলাদেশের সুশীল সমাজের একাংশ প্রচার করলেন ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা। অর্থাৎ খালেদাও নয় হাসিনাও নয়। অরাজনৈতিক সরকার। এই সময় আবির্ভাব ইউনূসের। তিনি ততদিনে 'নোবেল শান্তি পুরস্কার' পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মদতে। ইউনূসকে আমেরিকা মদত দিতে থাকে। তাঁকে নোবেল ছাড়াও আমেরিকার 'প্রেসিডেন্ট মেডেল' ও আমেরিকা কংগ্রেসের পুরস্কার দেওয়া হয়। আমেরিকার বরাবরের লক্ষ্য তাদের পুতুল সরকার তৈরি করে এই অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

ভারতের প্রণব মুখার্জীর দৌত্যে এবং হাসিনার গণআন্দোলনের চাপে ইউনূস পিছিয়ে আসেন। কেয়ারটেকার সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হাসিনা দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হলেন। এটাকে বাংলাদেশের অবাধ নির্বাচন বলে গোটা দুনিয়া স্বীকৃতি দেয়।

(২)

এই নির্বাচনের পরে হাসিনাকে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০০৯ থেকে ২০২৪ আগস্ট মাসে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া পর্যন্ত তিনি নিরবিচ্ছিন্ন নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হন। তিনি একটানা ২০ বছর ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সময়ের প্রধানমন্ত্রী। তিনিই বিশ্বের মধ্যে একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী যিনি সর্বোচ্চ সময়ের সরকার প্রধান - পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী।

তাঁর শাসনকালে সংঘটিত হওয়া নির্বাচনগুলিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে পশ্চিমী সংবাদমাধ্যম হাসিনার নির্বাচনগুলিকে অগণতান্ত্রিক আখ্যা দেয়। তাতে উৎসাহিত হয় বিরোধী দল, উগ্র চরমপন্থীরা। ২০১১ সালে হাসিনা সরকার সংবিধান সংশোধন করে কেয়ারটেকার সরকার প্রথার বিলোপ ঘটান।

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি দাবি করে কেয়ারটেকার সরকার প্রথা অনুযায়ী নির্বাচন করতে হবে। তা হয়নি বলে বিএনপি এবং বিরোধীরা নির্বাচন বয়কট করে। হাসিনা একতরফা বিপুল ভোটে জয়ী হন। এটাও ঘটনা নির্বাচন বাতিল করার জন্য লাগাতার হিংসার ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। তার আগে হাসিনা সরকার জামাতকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করেন। হাসিনার প্রতিশ্রুতি ছিল নির্বাচন অবাধ হবে। আওয়ামী লীগের নেতারা ক্ষমতায় থাকার জন্য নির্বাচনে রিগিং করে, এটা হাসিনা চাননি। তিনি ঘরোয়াভাবে বলতেন, "আন্তর্জাতিকভাবে আমার ভাবমূর্তি কলুষিত হল"। এই নির্বাচন নিশ্চিতভাবে শেখ হাসিনার গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলল।

এর আগে 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল' গঠন করে একের পর এক জামাত, দুইজন বিএনপি নেতাকে যুদ্ধ অপরোধে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসি দেওয়া হয়। এতে দেশের মধ্যে যেমন জামাত সহ রক্ষনশীল শক্তি ক্রদ্ধ হল তেমনি আন্তর্জাতিক স্তরেও অনেক প্রশ্ন উঠল। একমাত্র ভারত সরকার এই বিচার নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি। এরপর থেকেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি জোট বাঁধতে শুরু করে। এমনকি আন্তর্জাতিক মুসলিম চরমপন্থীরা বাংলাদেশ মোল্লাদের সঙ্গে হাত মেলায়।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠল। বিএনপি সহ বিরোধীরা কেয়ারটেকার সরকার না করার কারণে সহিংস আন্দোলন শুরু করল। পশ্চিমী দুনিয়াও নেপথ্যে সহমর্মিতা জানাল। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করার জন্য হাসিনা সরকার একের পর এক বিরোধী নেতাদের জেলবন্দী করলেন। সমালোচনা হল, তিনি গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট করছেন।

অনেকেই একটা বিষয় খতিয়ে দেখেননি। বিএনপি কেয়ারটেকার সরকার দাবি করেছিল ঠিক, কিন্তু তারা চেয়েছিল ক্ষমতাসীন হাসিনা পদত্যাগ করলে নির্বাচন হবে নতুবা নয়। কেমন কেয়ারটের সরকার হবে সেটাও স্থির করবেন বিরোধীরা।

ভারতের পক্ষে এবারেও কোনো নীতির পরিবর্তন হল না। কংগ্রেস সরকারের সময়কার বাংলাদেশ নীতি নরেন্দ্র মোদী সরকার অনুসরণ করল। কেন? ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে খালেদা সরকার থাকাকালীন উত্তর-পূর্ব ভারত বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্রপন্থীরা অশান্ত করে তোলে। এদের আশ্রয়স্থল ছিল বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর এইসব উগ্রপন্থীদের কেবলমাত্র দমন করেননি, জঙ্গিদের ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে এমন সরকার ভারতের প্রয়োজন ছিল। তাই বিরোধীরা অভিযোগ করল ভারতের বিরুদ্ধে - কেন ভারত একটি রাজনৈতিক দলের সরকারকে সমর্থন দিয়ে চলেছে। আসলে ভারতের কাছে বিকল্প ছিল না।

হাসিনা কেবলমাত্র জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করেছেন তাই নয়, আল কায়েদা, আইসিস, হিজবুত তাহরীরের মতো সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদের কারাবন্দী করেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল ৫ আগস্টের ‘বিপ্লবের’ পর ইউনূস সরকার এদের অধিকাংশকেই মুক্ত করে দিয়েছে। জেল ভেঙে সন্ত্রাসবাদীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। লুট হয়েছে আধুনিক মারণাস্ত্র - এগুলি আজও উদ্ধার হয়নি, উদ্ধার করার কোনো চেষ্টাও হয়নি। এরা বাংলাদেশকে আবার ‘পাকিস্তান’ করতে চায়। তালিবানরা আফগানিস্থানে যেমন বৌদ্ধ সংস্কৃতি ধ্বংস করেছে তেমনভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে।

মুজিবর রহমানের বাড়ি ধানমন্ডিতে। সেটা জাদুঘর ছিল। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত যাবতীয় অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। মৌলবাদীরা চায় বাংলাদেশকে 'ইসলামিক রাষ্ট্র'তে রূপান্তরিত করতে। প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূস অসহায়; অথবা অনেকে বলছেন তাঁর প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে। তাঁকে কখনও মুক্তিযুদ্ধ করতে দেখা যায়নি। স্বাধীনতার পর তিনি কোনওদিন শহীদ স্মৃতিতে যাননি। এরা ফের বাংলাদেশের হিন্দু সহ সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ করছে। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে তারা বাধ্য হয়েছে স্বীকার করতে যে হিন্দুদের উপর ৮৮টি জায়গায় আক্রমণ হয়েছে। যদিও প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। ভারত বিরোধী জিগির তুলে দেশের প্রকৃত সমস্যা থেকে দৃষ্টি ঘোরানো হচ্ছে। ভারতের জাতীয় পতাকার অপমান করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ পন্থি হলে মুসলিমদেরও টার্গেট করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে বহু মানুষ পালিয়ে রয়েছেন।

লক্ষণীয় হল এই প্রথম দেখা গেল হিন্দুরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছেন। এই আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠতে পারে বলেই আরও আক্রমণ নেমে আসছে।

(৩)

২০২৪ নির্বাচনের পরে শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করার উদ্যোগ নিলেন। ৭ জানুয়ারির ফল নিশ্চিত ছিল যেহেতু বিরোধী দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। কিন্তু শেখ হাসিনা উপেক্ষা করেছিলেন সাধারণ আওয়ামী লীগ কর্মীদের। দলের মধ্যে যে সংস্কার করার প্রয়োজন ছিল সেটা করেননি। পার্টি দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার পর যে ঘুন ধরার কথা তাই হয়েছিল। মন্ত্রী, সাংসদ, আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড় জমছিল। ক্ষোভ সঞ্চার হয়েছিল নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে। দলের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষমতায় থাকা নেতাদের বদলে দেওয়া। তা করা হয়নি।

ভোটের আগে হাসিনা বুঝতে পারছিলেন সংস্কারের প্রয়োজন। যারা তার কাছে থাকার সুযোগ পেয়েছেন তারা অনেক গোপন রিপোর্ট নেত্রীর কাছে পৌঁছে দেননি। হাসিনাকে বুঝিয়েছিলেন সব ঠিক আছে। তখন কিছুটা হলেও সংসদ বদলে ক্ষোভ মেটাতে বিদ্রোহীদের প্রার্থী হওয়ায় অনুমোদন দিয়েছেন। ৭০ জনের বেশি বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়। তবে যাদের বদল করার প্রয়োজন ছিল তাদের করা হয়নি। নিচুতলার কর্মীদের ক্ষোভ বারুদের স্তূপ হয় উঠছে এটা হাসিনা হয় বোঝেননি অথবা তাঁকে বোঝানো হয়নি। এরই মধ্যে দলের একাংশ উৎকোচের বিনিময়ে পুরোনো রাজাকার পরিবার ও জামাত শিবিরকে দলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। পরে ছাত্র আন্দোলনে তারাই মুখোশ খুলে সামনে চলে এল। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন 'ছাত্র লীগ' প্রায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ভর্তির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০ শতাংশ কোটা ছিল। অভিযোগ ছিল কোটার নামে অযোগ্যদের সব সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যোগ্যরা বঞ্চিত। হাসিনা বুঝতে পেরে কোটা বাতিল করেন। কিন্তু একদল আগেই নীল নকশা তৈরি করেছিল। তারা সেই আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে স্থগিতাদেশ নেয়। এবার ছাত্রদের ক্ষোভ বাড়তে থাকল। হাসিনা এর বিরুদ্ধে উচ্চআদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু উত্তেজিত ছাত্রসমাজ অপেক্ষা করতে রাজি নয়। আদালতের দিন এগিয়ে এনে কোটা পরিবর্তন করে মাত্র ৫ শতাংশ করা হল। তাতেও আন্দোলন থামল না। আসলে নেপথ্যে যারা হাসিনা উৎখাতের সুযোগ খুঁজছিল তারা আন্দোলনকারীদের আরও উস্কে দিল।

এই আন্দোলনটা আসলে ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য করা হচ্ছে সেটা হাসিনা সরকার বুঝতেই পারেননি। ভারতের গোয়েন্দারা বারবার বার্তা দিচ্ছেন, তাতেও হাসিনা সরকার অবিচল। সামান্য ছাত্র আন্দোলন সামলে দেওয়া যাবে।

এর মধ্যেই হাসিনা ভারতে এলেন। ঘোষণা করলেন তিস্তা নদীর উপত্যকা উন্নয়নের প্রকল্প ভারতের হাতে দেবেন। চীন এটা করতে চাইছিল। এছাড়া ভারত থেকে একটা নতুন পণ্যবাহী ট্রেন বাংলাদেশ হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে যাবে। বিএনপি এবং জামাত রটিয়ে দিল বাংলাদেশকে বঞ্চনা করে ভারত একতরফা সুবিধা নিচ্ছে। ভারত বিরোধী জেহাদ তীব্র হয়ে উঠল।

(৪)

মে মাস থেকেই হাসিনা গন্ধ পেয়েছিলেন তাঁর সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের সংসদে তিনি আমেরিকার নাম না করে বলেন, "আমি যদি একটা পশ্চিমী দেশকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি করতে দিতে যদি রাজি হতাম তাহলে আমার নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠত না"। বলেছিলেন, "আমি বঙ্গবন্ধু কন্যা। দেশের কোনো অংশ বিদেশিদের হাতে বেচব না"। বলেছিলেন, "সাদা চামড়া বঙ্গোপসাগরে ঘাঁটি বানিয়ে চট্টগ্রাম, মায়ানমার নিয়ে একটা খ্রিস্টান রাষ্ট্র তৈরি করতে চায়"। রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রক প্রকাশ্যে বলেছিল, ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্যাপক সরকার বিরোধী আন্দোলন তৈরি করছে, যাতে হাসিনা সরকারকে উৎখাত করে পুতুল সরকার করা যায়। ওয়াশিংটন যদিও একথায় আপত্তি জানায়।

পরিকল্পনাটা ওয়াশিংটনের অনেকদিনের। ২০১৯ থেকেই পরিকল্পনা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গোপন দলিল অনুসারে আমেরিকার ‘ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট’ বা আইআরআই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অপছন্দের সরকার পরিবর্তনের নকশা তৈরি করে। এরা ১৯৯৬ সালে মঙ্গোলিয়, ২০০৬ সালে হাইতি এবং ২০২১ সালে উগান্ডায় সরকার পরিবর্তন ঘটায়। সর্বশেষ সাফল্য বাংলাদেশ।

এই আইআরআই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ‘ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি’ (এন.ই.ডি.) এবং ‘ইউনাইটেড স্টেট এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট’ (ইউ.এস.এ.আই.ডি.) বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে অর্থ প্রদান করে ‘স্বৈরাচার’ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রভাব ফেলতে এক গোষ্ঠী তৈরি করে লাগাতার প্রচার করা হয়। দেখা গেছে হাসিনা বিরোধী পোস্ট ৪ লক্ষের বেশি ভিউ হয়েছে। এগুলি জারি রাখতে মার্কিন সংস্থাগুলি ৯ লক্ষের বেশি ডলার ব্যয় করে।

এর পরের ঘটনা সকলেই জানেন। হাসিনা চীন সফর শেষে সাংবাদিক বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে অসাবধানে উত্তেজক মন্তব্য করে ফেলেন। "মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা না দিয়ে কি রাজাকারদের দেব"? এই মন্তব্য বারুদের স্তূপে আগুন লাগাল। ছাত্রদের সকলেই রাজাকার পরিবারের নয়। ততক্ষণে জামাতের ছাত্র শাখা শিবির আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে, যারা এতদিন সুযোগ খুঁজছিল হাসিনা হটানোর। শেষ পর্যন্ত হাসিনাকে ভারতে পালিয়ে আসতে হল।

এর পরের বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব নৈরাজ্যের মধ্যে পড়ল। হিংসায় নিমজ্জিত হল ‘সোনার বাংলা’। আক্রমণের চরিত্র দেখলেই বোঝা যায় মৌলবাদীদের কব্জায় বাংলাদেশ। বেছে বেছে যাবতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করা হল। গোটা বাংলাদেশে ১৫০০ মূর্তি ও ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হল। মুজিবনগরের স্মৃতি সৌধ, জয়নুল আবেদিনের ভাস্কর্য ভাঙ্গা হল। নিষিদ্ধ হল লালন ফকির মেলা। গ্রীক ভাস্কর্য ভেনাস চুরমার। নারীমূর্তির উপর ওড়ানো হলো হিজাব। বাদ গেলেন না রবীন্দ্রনাথও। এখন "আমার সোনার বাংলা" জাতীয় গীত পরিবর্তনের দাবি উঠছে। মৌলবাদীরা সংবিধান বদলের আওয়াজ তুলছে। পাঠক্রম থেকে রবীন্দ্রনাথ বাদ দিয়ে উর্দু প্রভাবিত সাহিত্যের অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে। জামায়েত ছাড়াও ইসলামিক উগ্রপন্থী হিজবুত তাহরীরের এখন রমরমা। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পাশেই ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইউনূস সরকারের একশো দিন দেখলে বোঝা যায় বাংলাদেশের অবস্থা।

২০০ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে খুনের মিথ্যা মামলা, সম্পাদকদের গ্রেপ্তার, সাংবাদিকদের সরকারি পরিচয়পত্র বাতিল করে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। সমস্যা তীব্র হল যখন নিপীড়িত হিন্দুরা রুখে দাঁড়ালেন। এখনও ১ কোটি ৮০ লক্ষ হিন্দু বাংলাদেশে রয়েছেন। ইউনূস সরকার বাস্তবতা অস্বীকার করলেও প্রতিদিন সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের কাহিনী সামাজিক মাধ্যমে ছেয়ে গেছে।

(৫)

৫ আগস্ট গোটা ঢাকা শহর অবরোধ করে ফেলল ছাত্র-জনতা। সেনাবাহিনী প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে জানিয়ে দিল দেশ না ছাড়লে তাঁকে হত্যা করা হবে। সেনাবাহিনী তাদের হেলিকপ্টারে তাঁকে বিমানবন্দরে নিয়ে এল, সঙ্গে সহোদরা রেহানা। সামরিক বন্দর থেকে সেনাবাহিনীর বিশেষ বিমানে দিল্লির উদ্দেশ্যে উড়লেন হাসিনা। বাংলাদেশে সাধারণত এই ধরনের অভ্যুত্থানে সেনা ক্ষমতা দখল করত। এবারে আমেরিকার চাপে সেটা হয়নি। তাই বেছে নেওয়া হল মহম্মদ ইউনূসকে। ৮ আগস্ট তিনি শপথ নিলেন প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে। উপদেষ্টা অর্থে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা, তবে প্রশাসনিক ক্ষমতায় তিনি। বাংলাদেশে কোনো অন্তর্বর্তী সরকার হতে পারে না। হাসিনা আগেই সংবিধান থেকে তা বাতিল করেছেন। তবু সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নিয়ে ইউনূস শপথ নিলেন। যেহেতু নির্বাচিত সরকার নয়, তাই এখানে মন্ত্রী পদমর্যাদার ২২ জন উপদেষ্টা হলেন। দপ্তর ভাগ হলো। তাৎপর্যের বিষয়ে হল এদের একজনও রাজনৈতিক নেতা নন। সরকার চালানোর কোনো অভিজ্ঞতাই তাদের নেই। মন্ত্রী হলেন চরমপন্থী হেফাজত উল্লাহ। এও আশ্চর্যের যে এই হেফাজতকে শেখ হাসিনা গুরুত্ব দিয়েছিলেন জামায়েতকে নিয়ন্ত্রণ করতে। অথচ সেই হেফাজত হাসিনা উৎখাত এবং ইসলামিক বাংলাদেশ করার প্রবক্তা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এখন হতে চলেছে ইসলামিক বাংলাদেশ। একসময় আমেরিকা চেয়েছিল ‘মাইনাস টু’, অর্থাৎ অরাজনৈতিক সরকার। এখন বাংলাদেশে অরাজনৈতিক সরকার। মহম্মদ ইউনূস কবে নির্বাচন ঘোষণা করবেন কেউ জানে না। এতে প্রধান বিরোধী বিএনপি ক্রমেই অধৈর্য হয়ে পড়ছে। তাদের কাছে সুবর্ণ সুযোগ ক্ষমতায় আসার। এই অনিশ্চিত পরিমণ্ডলের মধ্যে একদিকে ক্রমাগত ভারত বিরোধী জিগির এবং সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ বাড়ছে। অন্যদিকে জঙ্গিরা মাঠে ময়দানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই বাংলাদেশ তাই ক্রমেই ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয়ে হয়ে উঠছে।