আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩১

সমসাময়িক

রাষ্ট্রপ্রধান পলাতক


একবিংশ শতাব্দীর প্রথম পঁচিশ বছর (২০০০-২০২৪) প্রায় অতিক্রান্ত। এই সিকি শতাব্দীতে মানবসভ্যতার বিচিত্র বিবর্তন হয়েছে। পৃথিবী এখন মানুষের মুঠোবন্দি। ফলে অধিকাংশ মানুষ মনে মনে গৃহবন্দি। মানুষ এখন অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। আবার একইসঙ্গে বেশিরভাগ মানুষ আত্মপ্রচারে উৎসাহী। সমাজমাধ্যম এখন ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের জন্য সদাই সরগরম। এই সুযোগে প্রতিটি মানুষ কীভাবে কখন যেন এক নির্দিষ্ট সংখ্যায় পর্যবসিত হয়ে গেছে তার খবর কে রাখে। মোবাইল, আধার, রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট ইত্যাদির নম্বর ছাড়া মানুষের অন্য পরিচয় এখন অচল।

নম্বর নির্বাচন করে তার ভবিষ্যতের শাসক। নির্বাচিত শাসকের দাপট বেড়ে গেলে তার গতিবিধি জনস্বার্থ বিরোধী হয়ে গেলে সেই নম্বরে দাগানো মানুষই সম্মিলিতভাবে গড়ে তোলে গণবিক্ষোভ। সরকারের পতন ঘটে। সরকার পতনের ইতিহাস বরাবরই রক্তাক্ত। কোথাও বিদ্রোহের আঁচ পেয়ে রাষ্ট্রপ্রধান পালিয়ে গিয়েছেন। কোথাও আবার পালানোর সুযোগ পাননি। বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে শাসককে। সরকার পতনের এই তালিকায় রয়েছে আফ্রিকার লিবিয়া থেকে শুরু করে ভারতের পড়শি শ্রীলঙ্কাও।

বিক্ষোভের মাত্রা কখনও কখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। কোথাও আবার অন্য কোনো বিদেশি শক্তির প্রচ্ছন্ন অথবা প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় দেশান্তরী হন রাষ্ট্রপ্রধান। এই প্রক্রিয়ায় কোথাও জাঁকিয়ে বসছে কট্টর মৌলবাদ। কোথাও আবার ক্ষমতায় আসছে কোনো পুতুল সরকার।

রাষ্ট্রপ্রধানদের পলায়ন কোনো নতুন ঘটনা নয়। ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক দেশান্তরীর খবর পাওয়া যায়। তবে বিগত বছরগুলোতে এহেন প্রবণতা হঠাৎ করেই যেন বেশ বেড়ে গেছে। এই সব পলায়নের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা/বিশ্লেষণ করা যেতেই পারে। তবে এই স্বল্প পরিসরে সাম্প্রতিক সময়ের (২০০০-২০২৪) দেশান্তরী রাষ্ট্রপ্রধানদের খোঁজখবর নিতে অসুবিধা নেই।

সিরিয়া

বিদ্রোহীদের চাপে রাজধানী ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। দামাস্কাস দখল করে নিয়েছেন বিদ্রোহীরা। আসাদ কোথায়, কেউ জানেন না। তবে সংবাদ সংস্থাদের মতে তাঁকে রবিবার ৮ ডিসেম্বর, ২০২৪ সকালে দামাস্কাসের বিমানবন্দর থেকে বিমানে উঠতে দেখা গিয়েছে।

বাংলাদেশ

চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অশান্তির সূত্রপাত ঘটেছিল। সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আং‌শিক সংস্কার চেয়ে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় না থেকে পথে নেমেছিলেন ছাত্রছাত্রীরা। কিন্তু কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি এই আন্দোলনের রাশ হাতে তুলে নিয়ে এটিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের 'এক দফা দাবি'র আন্দোলনে পরিণত করে। বিক্ষোভ সামলাতে না পারায় ৫ আগস্ট, ২০২৪ দেশজুড়ে চলতে থাকা গণআন্দোলনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান ‘গণভবন’ ছেড়ে কপ্টারে তিনি ভারতে চলে যান।

শ্রীলঙ্কা

দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা ২০২২-এ গণবিদ্রোহে উত্তাল হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপক্ষে এবং তাঁর ভাই তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষের শাসনকালে তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছিল শ্রীলঙ্কা। সাধারণ মানুষ তাঁদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রবল গণবিক্ষোভে দেশ যখন জ্বলছে, তখনই কলম্বোয় সরকারি বাসভবন ছেড়ে সেনাবাহিনীর বিশেষ বিমানে চেপে তাঁরা গোপনে দেশ ছাড়েন।

সুদান

গৃহযুদ্ধে দীর্ণ আফ্রিকার সুদানেও স্বৈরতন্ত্রী শাসক ওমর আল বশির ৩০ বছর ক্ষমতাসীন থেকে শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের জেরে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হন। কিন্তু তার পরেও সুদানে গৃহযুদ্ধ থামেনি। এই যুদ্ধে প্রধান প্রতিপক্ষ সে দেশের সশস্ত্র বাহিনীরই দুই জেনারেল - সেনাপ্রধান আবদেল আল ফতা আল বুরহান ও জেনারেল মহম্মদ হামদান দাগালো। ২০২১-এর অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লা হামদক-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকেও উৎখাত করেন সেনাপ্রধান বুরহান।

আফগানিস্তান

আফগানিস্তানেও সাম্প্রতিক অতীতে সরকারের পতন ঘটেছে। তবে তা অবশ্য গণবিক্ষোভের ফলে নয়। তালিবানের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই আফগানিস্তান ছেড়ে গিয়েছিল আমেরিকার সেনা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উগ্র মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী তালিবান ওই দেশের দখল নিয়েছে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল দখল করে নেয় তালিবান। তার কিছুদিনের মধ্যে তারা সরকার ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপতি আশরফ গনি কাবুল ছেড়ে পালিয়ে যান। সেই থেকে তালিবান রয়েছে আফগানিস্তানের কুর্সিতে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে তারা একাধিক ফতোয়া জারি করেছে আফগানিস্তানে। হস্তক্ষেপ করা হয়েছে নারীস্বাধীনতায়। তালিবানি শাসনের অধীনে আফগানিস্তানে অর্থসঙ্কটও চরমে উঠেছে।

ইউক্রেন

ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ছিলেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি। ২০১৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে বিরোধীরা রাজধানী কিভ দখল করে নেয়। তখন ইউক্রেনের পার্লামেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে বরখাস্ত করে এবং তিনি রাশিয়ায় পালিয়ে যান।

লিবিয়া

চার দশকের বেশি সময় ধরে আফ্রিকার লিবিয়ায় ক্ষমতাসীন ছিলেন মুয়াম্মর গদ্দাফি। ২০১১ সালে গণঅভ্যুত্থানের জেরে তাঁর পতন ঘটে। বিদ্রোহীরা রাজধানী ত্রিপোলি দখল করে নেয়। ত্রিপোলি দখলের পর বেশ কিছু দিন গা ঢাকা দিয়ে ছিলেন গদ্দাফি। পরে বিদ্রোহীদের হাতেই তিনি ধরা পড়ে যান। প্রকাশ্য রাস্তা দিয়ে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। বলা হয়, এর পর গদ্দাফিকে ট্রাকের সামনে ফেলে চাপা দিয়ে মারা হয়েছিল।

তিউনিশিয়া

আফ্রিকার তিউনিশিয়ায় গণবিক্ষোভের ফলে পতন হয় একনায়ক বেন আলী-র সরকারের। ১৯৮৭ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত তিউনিশিয়ায় ক্ষমতাসীন ছিলেন তিনি। ২০১১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ চরম আকার নেয়। চাপের মুখে প্রাণ বাঁচাতে তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

পাকিস্তান

প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে নওয়াজ শরীফকে পদচ্যুত করার মাধ্যমে সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মুশাররফ ক্ষমতা দখল করেছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ২০০৮ সালে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তিনি দেশ ছেড়ে যান। পাঁচ বছর পরে ২০১৩ সালে তিনি দেশে ফিরে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেষ্টা করলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৬ সালে পারভেজ মুশাররফ সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে চিকিৎসার জন্য দুবাই যান এবং ২০২৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন।

লাইবেরিয়া

দেশে গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০০৩ সালে চার্লস টেলর লাইবেরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের পদ ছাড়তে বাধ্য হন। তিনি ছয় বছর লাইবেরিয়ার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে ছিলেন। চার্লস টেলরের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবাতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ছিল। সিয়েরা লিওনে গৃহযুদ্ধের সময় বিদ্রোহীরা গণহত্যা, ধর্ষণসহ নানা ধরণের অপরাধ করেছিল। লাইবেরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে চার্লস টেলর বিদ্রোহীদের অর্থ এবং অস্ত্র দিয়ে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছিল। এছাড়া লাইবেরিয়ার ভেতরে বিরোধীদের উপর সহিংসতা এবং সেনাবাহিনীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চেয়েছিলেন চার্লস টেলর। গৃহযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে ক্ষমতা ছেড়ে নাইজেরিয়ায় চলে যান তিনি। মানবতা-বিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। দ্য হেগের বিশেষ আন্তর্জাতিক আদালত চার্লস টেলরকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ৫০ বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করেছে।

থাইল্যান্ড

প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শিনাওয়াতকে ২০০৬ সালে থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী পদচ্যুত করে। থাকসিন পরিবার ও তাদের রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। ক্ষমতাচ্যুত হবার সময় থাকসিন শিনাওয়াত বিদেশে অবস্থান করছিলেন। সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেবার পর মি. থাকসিন লন্ডনে চলে যান। সেখানে তিনি ১৫ বছর নির্বাসনে ছিলেন। এরপর ২০২৩ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

ইত্যবসরে তাঁর বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা ২০১১ সালে থাইল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের হওয়ায় ২০১৪ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। এছাড়া ইংলাকের বিরুদ্ধে তার ভাই এবং থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার নির্দেশ অনুযায়ী দেশ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৫ সালে সেনাসমর্থিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে। বিচারের মুখোমুখি না হয়ে ২০১৭-র আগস্টে দেশ ছেড়ে পলায়ন করেন থাইল্যান্ডের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা।